কেন্দ্রের বাজেট নিয়ে মধ্যবিত্তের বিশেষ আগ্রহ থাকে। যে কারণে বাজেটে অর্থমন্ত্রী সমৃদ্ধ দেশ, উন্নয়নের ফল সমস্ত নাগরিকের কাছে পৌঁছে যাবে, মহিলা, কৃষক, অনগ্রসর শ্রেণী, তফসিলী জাতি ও উপজাতি বিশেষভাবে উপকৃত হবে ইত্যাদি গালভরা কথাগুলি বলেন। এবারে পূর্ণাঙ্গ বাজেট পেশের সুযোগ নেই কারণ, চলতি বছরই লোকসভা ভোট তাই ৩ মাসের জন্য ভোট অন অ্যাকাউন্ট পেশ হয়েছে। বড় ঘোষণার অবকাশ সেই অর্থে ছিল না। কিন্তু ২০১৯ সালে লোকসভা ভোটের আগে অন্তর্বর্তী বাজেটেও বেশ কিছু বড় ঘোষণার চমক ছিল। সেটা ছিল মোদী সরকারের প্রথম দফা আর চমক থেকে ভোটের ফায়দা তোলাই ছিল লক্ষ্য। যে কারণে অন্তর্বর্তী বাজেটেও বড় অঙ্কের কর ছাড় দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু ২০১৯ আর ২০২৪-এর পরিস্থিতি পুরোপুরি আলাদা। ২০১৯-২০-তে অর্থমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল যখন বাজেট পেশ করছেন তখনও পুলওয়ামা বা বালাকোটের ঘটনা ঘটেনি। বরং মোদি সরকার তখন বেশ চাপেই ছিল। প্রথমত রাফালে দুর্নীতির অভিযোগে বিদ্ধ হয়ে যথেষ্ট বিপাকে, এর উপর ছিল কৃষকদের ব্যাপক অসন্তোষ। দুয়ে মিলে যে চাপ তাকে কাটাতে কেন্দ্র একই সঙ্গে মধ্যবিত্ত, কৃষক, শ্রমিক সবার জন্য বড় ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছিল।২০২৪-এ সেই পরিস্থিতি নেই, বরং মোদী সরকার এখন রামমন্দিরের ভক্তিস্রোতে ভাসতে ভাসতে হিন্দুত্ববাদের প্রচার এতটাই জোরদার চালাচ্ছে বিরোধীরা বেশ নাজেহাল।একে তো বিরোধী শিবির বিক্ষিপ্ত। ইন্ডিয়া জোট তৈরি হলেও সেই জোট যে অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে তা বলাই বাহুল্য। নীতীশ কুমার ইতিমধ্যে বিহারের জোট ভেঙে এনডিএ জোটে নাম লিখিয়েছেন। অন্যদিকে জোটের অন্যতম শরিক হেমন্ত সোরেন ইডির হেফাজতে,অরবিন্দ কেজরিওয়াল, তেজস্বী যাদবদের তাড়া করছে কেন্দ্রীয় এজেন্সির ত্রাস। এর উপর রাজ্যে রাজ্যে আসন সমঝোতা নিয়েও রয়েছে জট।এই অবস্থায় মোদি-শাহরা নিশ্চিত ভাবে বুঝছেন যে ২০২৪-এ তারা রেকর্ড সংখ্যক আসন নিয়ে ফিরতে চলেছেন।সাম্প্রতিক কালের সভা-সমাবেশে নরেন্দ্র মোদি একথা প্রকাশ্যেই বলছেন।যে কারণে লোকসভা ভোটের আগে অন্তর্বর্তী বাজেটে মোদীর অর্থমন্ত্রী নির্মলা শুধুমাত্র সুদূরপ্রসারী স্বপ্নের কথা বলে গেলেন, বিরত থাকলেন বড় ঘোষণা থেকে।
যদিও এবারেও মধ্যবিত্তের প্রত্যাশা ছিল করের ক্ষেত্রে কিছু ছাড় ঘোষণা হতে পারে।কিন্তু নির্মলা আয়কর কাঠামো অপরিবর্তিত রেখে মধ্যবিত্তকে হতাশ করলেন।তিনি করদাতাদের পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ করের ক্ষেত্রে বড় কোনও ছাড় দিলেন না। বাজেটের আগে করছাড় নিয়ে চর্চায় উঠে এসেছিল যে, মধ্যবিত্তের মন জয়ের জন্য এবার আয়করের সীমা বৃদ্ধি করে ১০ লক্ষ করা হতে পারে, অন্যদিকে ৮০সি-র আওতায় সঞ্চয়ের ক্ষেত্রে আয়করের ছাড় দেড় লক্ষ টাকা থেকে বাড়িয়ে আড়াই লক্ষ করা হতে পারে। একথাও শোনা যাচ্ছিল স্বাস্থ্যবিমার ক্ষেত্রেও আয়কর ছাড়ের সীমা বাড়ানো হতে পারে।কিন্তু নির্মলা এদিন তাঁর ঘোষণায় জানিয়ে দিলেন, করদাতাদের আগের হারেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কর দিতে হবে।অর্থাৎ আয়কর ছাড়ের ঊর্ধ্বসীমা আগের মতোই ৭ লক্ষ টাকা থাকছে।
সাধারণত ভোটের মুখে অন্তর্বর্তী বাজেট হলেও তা যে জনমুখী হবে এমনটাই ধরে নেওয়া হয়। তাই এবারও সেই আশা করা হয়েছিল। অর্থনীতি বিশেষজ্ঞরা মনে করেছিলেন, এই বাজেটে ২০২৪ লোকসভা ভোটকেই পাখির চোখ করা হবে এবং প্রবীণ নাগরিক, মহিলা ও কৃষকদের জন্য নান ধরনের উপহার থাকবে। আশা করা হয়েছিল মধ্যবিত্ত, চাকুরিজীবীরা আয়করে কিছুটা সুরাহা পাবেন। পুরোনো এবং নতুন দুই কর কাঠামোতে স্ট্যান্ডার্ড ডিডাকশনের পরিমাণ ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়ানো হবে। কিন্তু নির্মলা আয়কর কাঠামো অপরিবর্তিত রেখে মধ্যবিত্তের সেই আশায় কার্যত জল ঢেলে দিলেন।
তবে ভোটবাক্সে যে মহিলারা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ তা ভালো করেই বুঝেছেন নির্মলা, তাই মোদি সরকারের শেষ বাজেটে মহিলাদের মন ছোঁয়ার প্রচেষ্টায় ‘লাখপতি দিদি’দের সংখ্যা আরও বাড়ানোর সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন৷ দেশজুড়ে ‘লাখপতি দিদি’র লক্ষ্যমাত্রা ২ কোটি থেকে বাড়িয়ে ৩ কোটি রাখা হচ্ছে বলে জানান নির্মলা সীতারমন৷ এক্ষেত্রে বাংলার লক্ষ্মীর ভান্ডার, মধ্যপ্রদেশে লাডলি বহেনা প্রকল্পের কথা তিনি মাথায় রেখেছেন৷ কিন্তু আয়করের হার অপরিবর্তিত রাখলে মুদ্রাস্ফীতির হার তো বাড়বে। ইতিমধ্যেই তা বেড়ে যাওয়ায় মধ্যবিত্তের অবস্থা শোচনীয়। কিন্তু তাদের জন্য বাজেটে কোনও কিছু ভাবা হল না, তাদের কথা আলোচনাতে এল না। বলা হল, তাদের ঋণ দেওয়া হবে। কিন্তু তাদের কি ঋণ নেওয়ার ক্ষমতা আছে? তাহলে এই বাজেটকে দিশাহীন বলতে অসুবিধা কোথায়।