শীতকাল আর শীতলতা আমাদের এই গরম দেশে বড় আদরের, বড় বিলাসের জিনিস। শীতের দেশের লোক ‘অ্যাজ ইউ লাইক ইট’ নাটকের এমিয়েনস বলেছিলেন, ‘ব্লো ব্লো দাও উইনটার উইন্ড, দাও আরট নট্ অ্যাজ আনকাইন্ড অ্যাজ ম্যানস্ ইনগ্র্যাটিচুড’। এখানে ‘নট অ্যাজ আনকাইন্ড’ বললেও ইউরোপের হিমেল বাতাসের ‘নৃশংসতা’ পুরোপুরি ফুটে উঠেছে। কিন্তু আমাদের রাজ্যে শীত নয় বরং গরম-ই ‘নৃশংসতা’ বয়ে আনে। বিশেষ করে মার্চ থেকে জুনের মাঝামাঝি। যদিও প্রতিবছর গড়ে ১০ থেকে ১২টি কালবৈশাখী আমরা পেয়ে থাকি, তবে এইবছর এখনও পর্যন্ত কপাল মন্দ। পুরো এপ্রিল চলে গেল কালবৈশাখীর নামগন্ধ নেই। আমির খান অভিনিত ‘লাগান’ সিনেমার প্রথম দৃশ্যটি বারবার মনে পড়ছে — একটুকরো কালো মেঘ ঘনিয়ে আসছে বটে কিন্তু তা বৃষ্টিতে রূপান্তরিত না হয়ে, চলে যাচ্ছে অন্যত্র। আর আমরা আকাশের দিকে চাতক পাখির মতো তাকিয়ে আছি কয়েক পসলা বৃষ্টির আশায়।

এই দমবন্ধ করা গুমোট পরিস্থির হাত থেকে পালাতে হাজির হওয়া গেল দার্জিলিং-এ। ‘শীত ভোগের কাল, শীত ভোগীর কাল। শাল, মাফলার, গরম বিছানা, উষ্ণ আমেজ, উষ্ণ পানীয়, উষ্ণ সান্নিধ্য। জোর আড্ডা। সান্ধ্য মজলিশ। উচ্চাঙ্গ সংগীত। বহুতর খাদ্যের আয়োজন। সব নিয়ে শীত বয়ে আনে সুখের ছোঁয়া। খাইয়ে দাইয়ে ভ্রমণ করিয়ে তৈল-চিক্কন শরীরটিকে হাঁসফাঁস গ্রীষ্মের হাতে তুলে দেবার আগে সামান্য আয়েস’ — নিয়ে যে শীত আমাদের ক্ষনিকের অতিথি, সেই শীতকে উপভোগ করার জন্য হাজির হয়েছিলাম দার্জিলিং-এ। মনোবিদরা বলেন, গরম বা শীত অনুভূতির সহ্য-শক্তি অনেকটাই নির্ভরশীল মানসিকতার উপর। তাই অনেকে গরম কালে নিজের ঘরে পাহাড়ে বরফ পড়ার ছবি টাঙিয়ে রাখেন। এর ফলে উষ্ণতার ডিগ্রি হয়তো কমে না, কিন্তু গরমকে সহ্য করার জন্য মনের জোর বৃদ্ধি পায়। খানিকটা এই কারণকেই প্রত্যক্ষ করতে গ্রীষ্মে দার্জিলিং ভ্রমণের প্ল্যান। উদ্দেশ্য পাহাড়ে কিছু কিলোমিটার হাঁটাহাঁটি। সঙ্গে কাঞ্চনজঙ্ঘা দর্শনের অভিলাশা।

শিয়ালদা থেকে রাতে কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেসে উঠে, পরের দিন সকাল ৮টায় নামা হলো নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে। এখান থেকে আটো করে পৌঁছানো গেল শিলিগুড়ি বাসস্ট্যান্ডে। সেখানে গিয়ে অভিজ্ঞতা হলো সরকারি বাস পরিষেবা বেশ উন্নত। সকাল দশটা পর্যন্ত ৩০ মিনিট অন্তর বাস ছাড়ে। পাহাড়ে ওঠার শেষ বাস দুপুর দেড়টা। সময় লাগে ৪ ঘন্টা। মাঝখানে কিছুক্ষণ বিশ্রামের ব্যবস্থা আছে। পাহাড়ের গায়ে নির্জন দোকানে গরম মোমো, বা নুডলস্ চা-কফি সহযোগে খেতে খেতে ব্যাগ থেকে সোয়েটার ও মাফলার বের করার প্রয়োজনীয়তা বেশ টের পাওয়া গেল। ভেবেই আশ্চর্য লাগছিল আগের দিন দুপুরে এ.সি-র রিমোট ২৪ ডিগ্রি থেকে কমিয়ে ২২ বা ২০ ডিগ্রিতে নিয়ে আসার প্রয়োজনীয়তা যেমন টের পাচ্ছিলাম, ঠিক একই ভাবে একদিনের তফাতে টের পাচ্ছি গরম-কাপড়, জামা, মোজা, সোয়েটার বের করার প্রয়োজনীয়তা ! এই হলো আমাদের রাজ্য ! ট্রেনে বা বাসে ১০ ঘন্টার জার্নি বা প্লেনে ৩০ মিনিটের জার্নি করে-ই পৌঁছানো যায় বিপরীত আবহাওয়ার গন্তব্যে। সঙ্গে ঝির-ঝিরে বৃষ্টি, মেঘের স্পর্শ সবই পাওয়া সম্ভব। যদিও কপাল মন্দ হবার কারণে এই ভ্রমণে কাঞ্চণজঙ্ঘার দর্শন পাওয়া যায়নি, তা-সত্ত্বেও দার্জিলিং-এর মেঘাচ্ছন্ন আবহাওয়া মনকে আনন্দ দিয়েছে বইকী !

করোনার কারণে প্রায় ৩-৪ বছর পর দার্জিলিং গিয়ে অভিজ্ঞতা হলো ভালই। আগেই বলেছি সরকারি পরিবহণ ব্যবস্থা এখানে খুবই উন্নত হয়েছে সম্প্রতি। কার্সিয়াং হয়ে এবং তিস্তা ব্যারেজ দিয়ে — দুই রাস্তাতেই বাস পরিষেবা আছে। আমরা উঠেছিলাম তিস্তা ব্যারেজের রাস্তা দিয়ে। ড্রাইভার দাদা জানালেন, কার্সিয়াং দিয়ে গেলে সময় কিছুটা কম লাগে। তবে তিস্তা ব্যারেজ রাস্তায় উপরি পাওনা বিস্তৃত চা-বাগান ও এক এক পাহাড়ে এক এক রকম প্রজাতির গাছ দর্শন। রাস্তা বেশ ভালো। চা-বাগানের শ্রমীকরা মাঝে মাঝেই বাসে উঠছিলেন। তাঁদের হাসি মুখ ও অজানা ভাষায় আলাপ করার প্রয়াস আমাদের মুগ্ধ করল। তবে এই হাসি মুখের অন্তরে হয়তো কন্যাশ্রী, রূপশ্রী, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, স্বাস্থ্য সাথী-র অবদান আছে। শিলিগুড়ি নামার ক্ষেত্রেও সকালে প্রথম বাস ছাড়ে সাড়ে সাতটায়। দশটার পর থেকে সাড়ে তিনটে পর্যন্ত ৩০ মিনিট অন্তর বাস পাওয়া যায়। মল রোডের সংযোগস্থল থেকে কিছুটা নিচে নামলেই বাসস্ট্যান্ড। আগে থেকে টিকিট বুক করার ব্যবস্থা নেই। বাস ছাড়ার আগে টিকিট কাউন্টার থেকে সিট বুক করতে হয়। তবে একটা বাস মিস করলেও ৩০ মিনিট অন্তর বাস পাওয়ার নিশ্চয়তা আছে।

হোটেলে পৌঁছেই যাওয়া হলো মল-এ। কেভেন্টাস এখন নব-রূপে সেজে উঠছে। গ্যেনারিসের সামনে লম্বা লাইন। কলকাতার দুর্গাপুজোর অষ্টমীর সমান ভিড় মল রোডে। বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। মল-এ ঘোড়ার মলের গন্ধ প্রায় পাওয়া গেলনা। মল রোডের হকারদের জন্য আলাদা করে জায়গার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেলফি তোলার জন্য স্থান নির্দিষ্ট করা হয়েছে। বিক্রি-বাটা ভালোই চলছে, ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়েই খুশি। ট্রাফিক ব্যবস্থাও আগের থেকে অনেক মজবুত। প্লাস্টিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে।

যদিও ২০১৭ সালে পাহাড় ছিল পর্যটকশূন্য। তবে আজ সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটেছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আন্তরিক প্রচেষ্টায় ও প্রশাসনিক দক্ষতায় আজ পাহাড়ে উন্নয়ন অব্যাহত। পেটে খাবার, পরনে বস্ত্র, স্বাস্থ্য-শিক্ষার ব্যবস্থা শক্তপোক্ত করা গেছে এই সরকারের আমলে। আজ পাহাড়ে পর্যটকদের ঢল। পর্যটকরা যাওয়ায় নিউ জলপাইগুড়ির স্টেশনের বাইরে অপেক্ষারত ট্রেকারের মালিক, চালক, হেল্পার, হিল স্টেশনের মালবাহক, হোটেল মালিক, কর্মচারী, দোকানদার, সাইট সিইংয়ের জন্য অপেক্ষারত ট্রেকারের মালিক-কর্মীদের রোজগার বেড়েছে। কার্শিয়াং থেকে দার্জিলিং যাওয়ার পথে পাহাড়ের নীচে যে সব গ্রামগুলি দেখা যায়, তার বাসিন্দারা আজ সাবলম্বী। সাধ্যের মধ্যে বিভিন্ন দামের হোটেল পাওয়া যাচ্ছে। কোনও কোনও হোটেলে জন প্রতি থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাও আছে। সাইট সিইংয়ের ক্ষেত্রেও আলাদা করে নিজেরা গাড়ি ভাড়া করতে পারেন বা সেয়ারে যেতে পারেন। বাস স্ট্যান্ড থেকে মিরিক, তেনজিং নোঙরে রক, রায় ভিলা, ঘুম স্টেশন প্রভৃতি জায়গায় যাওয়ার জন্য ৩০ থেকে ৫০ টাকার মধ্যে মাথা প্রতি ভাড়া দিয়ে গণপরিবহণের সুব্যবস্থাও আছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, কলকাতার এই গরম থেকে মুক্তি পেতে সাধ্যের মধ্যে খরচ করে তিন-চার দিনের জন্য ঘুরে আসতেই পারেন দার্জিলিং-এ। এই সময় কাঞ্চনজঙ্ঘার দেখা না মিললেও মেঘাচ্ছন্ন পরিবেশ, ঝির-ঝিরে বৃষ্টির মধ্যে ছাতা মাথায় কিছুটা হাঁটা, দার্জিলিং চায়ের সুবাস, ওক-ফার গাছের সাদা ফুল, রাতে জেনাকির আলোর মতো জ্বলতে থাকা পাহাড়ের গায়ে অবস্থিত বাড়ি — আপনার মন ভোলাবে সন্দেহ নেই।