বো-ব্যারাক থেকে বউবাজার তথা বৌবাজার নামটির সৃষ্টি হয়েছে কিনা সেটা নিয়েও একসময় বেশ আলোড়ন উঠেছিল। অ্যাংলো ইন্ডিয়ানদের এই ডেরা পুরনো কলকাতার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।
যদিও এটা বলা হয় যে বো ব্যারাক প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় সৈন্যদের থাকার এক মেস ছিল, এই কাহিনীর কোনো লিখিত প্রমাণ নেই। যখন সেনারা ভারত ছেড়েছিলেন, তখন তাঁরা ওই আবাসনগুলিকে ইঙ্গ-ভারতীয়দের হাতে ছেড়ে দিয়েছিলেন। অ্যাংলা ইন্ডিয়ানরা এটিকে ভাড়ায় নিয়েছিলেন। ২০২২-এর হিসাব অনুযায়ী, ১৩২ জন পরিবার বো ব্যারাকে বাস করেন। বড়দিন উদ্যাপনের জন্য এটি খ্যাতিলাভ করেছে।
অঞ্জন দত্ত এর পটভূমিকায় একটি আস্ত সিনেমাই করে ফেলেছেন। এখনও পেল্লায় পেল্লায় পুরনো বাড়িগুলি সেখানে অতীতের মুখর খ্রিস্টান পাড়ার স্মৃতি জাগায়। বড়দিনে এখানে এখনও বেশ জাঁকজামক হয়। তবে গুটিকয় ভিস্তিওয়ালা কালের অতন্দ্রপ্রহরী হয়ে এখনও এখানে তিনতলা-চারতলা বাড়ির টংয়ে জলের জোগান দেয়।

বৌবাজার বিংশ শতকের গোড়ার দিক
বৌবাজারের মেডিকেল কলেজ মেন হস্টেলে ১৯৭৯-১৯৮২ সাল অতিবাহিত করার সুবাদে জায়গাটি আমার কাছে ‘হাতের তালুর মতো’ চেনা৷ ফিরিঙ্গি কালীবাড়ির প্রতিষ্ঠাতা যে শ্রীমন্ত ডোম তা অনেকের কাছেই অজানা৷ যৌবনের উপবন কুমার্স ক্যান্টিন এখনও চালু থাকলেও বঙ্গলক্ষ্মী হোটেল বন্ধ হয়ে গেছে৷ ভুবনের সেলুন এই বিশ্বায়নের যুগে টিকে থাকার জন্যে ‘এখানে আধুনিক পদ্ধতিতে চুলকাটা হয়’ বলে সাইন বোর্ড লাগিয়েছে৷ এখন যেটা বিপিনবিহারী গাঙ্গুলী স্ট্রিট, আগে সেটা ছিল বৌবাজার স্ট্রিট৷ তারও আগে ‘বৈঠকখানা রোড’ বলে পরিচিত ছিল রাস্তাটি৷ এই রাস্তার একপ্রান্তে বৈঠকখানা বাজার৷ এককালে সেখানে ছিল এক প্রকাণ্ড বটগাছ৷ কথিত আছে, কলকাতার আদিযুগে জোব চার্নক পারিষদ-সমেত ওই বটগাছের নীচে বিশ্রাম নিতেন৷ যাই হোক, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ান বিশ্বনাথ মতিলাল তাঁর এক পুত্রবধূকে এই বাজারটি দান করেন বলেই ইতিহাসবিদদের বিশ্বাস৷ সেই থেকেই বাজারটি ‘বধূবাজার’ ও পরে ‘বৌবাজার’ নামে চিহ্ণিত হয়৷ অনেকে আবার বলেন, বৌবাজার আসলে অনেকগুলি ছোটো ছোটো বাজারের সমষ্টি৷ সেই জন্যই এটি ‘বহুবাজার’ তথা ‘বৌবাজার’ ৷
বাজার নিয়ে অনেক মাথা ঘামানোর পর তৃতীয় একটি সম্ভাবনার কথা মনে এল৷ ‘বাজার’ শব্দটি ফার্সি থেকে এসেছে৷ এখনকার দিনে বাজার মনে ক্রয়বিক্রয়ের স্থান বোঝালেও, আদিতে বাজার মানে মেলামেশার বা আড্ডার স্থানও বোঝাত৷ আড্ডাপ্রিয় ও তর্কপ্রিয় বাঙালির প্রিয় জায়গা শুধু সাবেক বাড়ির রকই ছিল না, বাজারও ছিল৷ কলকাতা ও কলকাতার বাইরে এমন অসংখ্য বাজার-নাম পাওয়া যায়, যেখানে আদপেই কোনো বাড়ির বাজার ছিল না৷ গোরাবাজার, সখেরবাজার, জানবাজার প্রভৃতি জায়গায় বিখ্যাত বা প্রতিষ্ঠিত কোনো বাজার ছিল না, বরঞ্চ জমায়েত স্থান বা আড্ডাস্থান বললেই বেশি মানানসই হত৷ আস্তে আস্তে জমায়েতগুলিতে দোকানপাট গড়ে উঠতে লাগল লোকের জৈবিক ও ব্যবহারিক প্রয়োজনে৷ দরদাম করে জিনিসপত্তর কিনতে শুরু করল নেহাতই আড্ডার মেজাজে আসা বাবুরা৷ কোনো-কোনো জমাতেয়-স্থল এভাবেই কেনাকাটা-দরদস্তুরের জায়গা হয়ে উঠল৷ আড্ডার বা জমায়েতের বাজারের সঙ্গে প্রধানত কেনাকাটার বাজারের একটা তফাত রাখার জন্য ‘ভাও-বাজার’ নামটির উৎপত্তি হল৷ ‘ভাও’ মানে দরদাম৷ শব্দটি এসেছে হিন্দি ‘ভাউ’ বা মৈথিলি ‘ভাও’ থেকে৷ ‘ভাও কত’ বা ‘কিত্না ভাও আছে’ — এরকম ‘হিংলা’ অনেক বাঙালির মুখেই শোনা যায় হাটেবাজারে৷ কলকাতার মতো মফস্সলে ‘ভাও-বাজার’ বলে ডাকা হত কোনো-কোনো বাজারকে৷ মূলত আড্ডার বা জমায়েতের বাজার থেকে কেনাকাটার বা দরদাম হাঁকার বাজারকে আলাদা করার জন্যই ‘ভাও-বাজর’ নামটির সৃষ্টি হয়৷
কলকাতার বৌবাজার, শ্রীরামপুর চাতরার বৌবাজার বা চন্দননগরের বৌবাজার, সবের উৎপত্তির মূলে হয়তো-বা এই ‘ভাও-বাজার’ তথা ‘ভাউবাজার’৷ ভাউ থেকেই কি তবে বউ? তবে কি বিশ্বনাথ মতিলালেলর পুত্রবধূও নন, অনেক বা বহুও নয়, বৌবাজারের আদি রূপ ছিল ‘ভাউবাজার’? এদিকে, বৌবাজার সম্পর্কে এক অশীতিপর কৃষকের কাছে যে তথ্য পেলাম, তাও চমকপ্রদ৷ বাজারে চাষি-বিক্রেতাদের প্রথম কোনো জিনিস বিক্রি হওয়াকে বলে ‘বহুনি’ বা ‘বউনি’ হওয়া৷ কলকাতা, চন্দননগর বা শ্রীরামপুর — সব জায়গায় বৌবাজারই চাষিদের কাছে পয়মন্ত ছিল৷ সেখানে বিক্রির জন্যে জিনিস নিয়ে গেলে বউনিটা অন্তত হত৷ দিনের শেষে হতাশ হয়ে ক্লান্ত শরীরে পুরো অবিক্রীত পসরা নিয়ে বাড়ি ফিরতে হত না৷ ‘বউনিবাজার’ বা বহুনিবাজার বলেই প্রথমে হয়তো পরিচিত ছিল বৌবাজার৷ বহুনিবাজার কালক্রমে অপভ্রংশ হয়ে ‘বহুড়িবাজার’ হতেও পারে৷ ‘বহুড়ি’ মানে যেহেতু পুত্রবধূ বা ‘বহু’ (হিন্দিতে), আস্তে আস্তে বহুড়িবাজার সংক্ষিপ্ত হয়ে দাঁড়ায় বহুবাজার৷ সেখান থেকেই কি তবে আজকের বউবাজার তথা বৌবাজার?

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ান বিশ্বনাথ মতিলাল বিলিতি নুনের ব্যবসা করে ফুলে ফেঁপে উঠেছিলেন৷ ইংরেজরা ভারত থেকে লুণ্ঠিত দ্রব্য জাহাজে করে বিলেতে পাঠাত৷ পরে খালি জাহাজ সমুদ্রে চলাচলে অসুবিধে হওয়ার জন্য নুন ভরতি করে তারা ভারতে ফেরত পাঠাত৷ এই নুন অত্যন্ত উচ্চ মূল্যে দালালরা কলকাতার বিভিন্ন বাজারে বিক্রি করত৷ বিলিতি নুনের বিক্রেতাদের গায়ে দালালদের গন্ধ লেগে যেত৷ আগেকার দিনে লঙ্কা মানে ‘বিলেত’-ও বোঝাত৷ নুন-লঙ্কা বাজার নামে পুরোনো কলকাতায় যে বাজারটি ছিল ও পরবর্তীকালে যা কলকাতা মিউনিসিপ্যালিটির ম্যাপ থেকে অবলুপ্ত হয় তার আসল মানে হয়তো বিলিতি নুনের বাজার৷ বিশ্বনাথ মতিলালের নুন মনে হয় এই বাজারেই বিক্রি হত৷ গা থেকে দালালির গন্ধ মুছে ফেলার জন্য মতিলালবাবু পাশের ডোমতলা বা তুরুল বাজার-এর সঙ্গে নুন-লঙ্কা বাজারকে একত্রিত করে হয়তো বহুবাজার তথা বৌবাজার-এর সৃষ্টি করেছিলেন৷ এই ঘটনাটিই লোকমুখে অতিরঞ্জিত হয়ে পুত্রবধূকে বাজার দানের গল্পে পর্যবাসিত হয়৷ ইতিহাসবিদরা এদিকটায় আলোকপাত করলে আমাদের মতো স্বশিক্ষিত গবেষকদের অশেষ উপকার হয়৷
বো-ব্যারাকের সৃষ্টি, তার মিলিটারি ইতিহাস, তার খ্রিস্টান পটভূমিকা, তার বড়দিনের উৎসব, সবই এখনও প্রাসঙ্গিক। বৌবাজারের নামের সৃষ্টির পেছনে এর অবদান আছে কিনা, সেটা ভাবিয়ে তোলার মত বিষয়।