এটা ঘটনা যে বাঘ, সিংহ নিয়ে যত কথাবার্তা হয়, কুকুর, বেড়াল নিয়ে তা হয়না। কেউ বলবেন, হওয়ার কথাও না। কিন্তু গৃহপালিত তকমাটা মুছে দিলেই তাদের একটা আলাদা পরিচয় তৈরি হয়ে যায়। যেমন, কুকুর-বেড়াল সম্পর্কে আমরা অনেক তথ্য জানলেও বুনো কুকুর বা বনবেড়াল মানুষজনের কাছে অনেকটাই অপরিচিত থেকে গেছে। এই অজ্ঞতার কারণেই বুনো কুকুর বা বনবেড়াল আমাদের কাছে প্রাণী হিসেবে বিশেষ গুরুত্ব পায়না। অথচ সারা পৃথিবীতে এই প্রাণীগুলিকে নিয়ে আগ্রহ ও কৌতূহল কম নয়।

পরিবেশ বিজ্ঞানী ও বন্যপ্রাণ বিশেষজ্ঞরা কিন্তু দেশে বুনো কুকুরের সংখ্যা কমা নিয়ে বেশ চিন্তিত। তাদের মতে, কোন জঙ্গলে তাদের অস্তিত্ব বাড়া মানে জঙ্গলের স্বাস্থ্য ভালো থাকা। কারণ অরণ্যের গভীরতা কমলে সেখানে বুনো কুকুররা থাকতে পারেনা। শুধু আমাদের দেশ নয়, গোটা দক্ষিণ এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া জুড়েই বুনো কুকুরদের অবস্থা খারাপ কারণ তাদের বাস করার মত বনাঞ্চল ছোট হচ্ছে। আগে আসাম, অরুণাচল সহ গোটা উত্তর-পূর্ব ভারতের বনবাদাড়ে ঢোল বা বুনো কুকুরদের বেশি দেখা যেত। জঙ্গলের খোঁজখবর রাখা লোকজন বুনো কুকুর এবং তাদের প্রিয় খাদ্য সম্বরদের উপস্থিতি দেখে জানতে পারতেন অরণ্যের শরীর-স্বাস্থ্য ভালোই আছে। এখন বুনো কুকুরের সংখ্যা গোটা পৃথিবী জুড়েই কমছে। সত্যি বলতে কি, তাদের বাস করার মত বনাঞ্চল কমেছে। যার পরিণতিতেই প্রায় ৮০ শতাংশ বুনো কুকুর পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।

পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবন, বক্সার জঙ্গল সহ বর্ধমান, বীরভূমের জঙ্গলে একসময় ঢোল কুকুরদের দল বেশ চোখে পড়তো। এমনকি হাওড়ার পাঁচলা সংলগ্ন জঙ্গলেও দেখা গেছে বুনো কুকুর। এখন তাদের খুব কমই চোখে পড়ে, কারণ জঙ্গল ছোট হচ্ছে। আয়তন হয়তো এক কিন্তু কমছে গাছপালার ঘনত্ব। ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন (আইইউসিএন) ইতিমধ্যেই এদের লাল তালিকাভুক্ত করেছে। অর্থাৎ এই প্রাণীকুল বিপন্ন। অবস্থা এতটাই খারাপ যে কয়েকবছর আগের একটা হিসেবে দেখা গেছে সারা পৃথিবীতে মাত্র আড়াই হাজার বুনো কুকুর রয়েছে।

হিংস্র হলেও কিংবা গভীর জঙ্গলে দলবদ্ধ অবস্থায় মানুষকে আক্রমণ করলেও এই প্রাণীগুলি মানুষের বৈরী নয়। অনেকে পোষ মানিয়ে বাড়িতে পুষতেনও। দলবেঁধে থাকা এদের স্বভাব। শিকার থেকে জল খাওয়া সবই দল বেঁধে করতে পছন্দ করে এরা। দলবদ্ধ বুনো কুকুরদের ভয় করে অরণ্যের সব প্রাণী। ঢোল বাঘকেও ভয় পায়না। বহু সময় বাঘের হত্যা করা প্রাণীটিকেও খেয়ে নেয় এরা। বাধা দিতে এলে মেরে ফেলে বাঘকেও। সরু মুখ, স্ফটিকের মত চোখ, পাটকিলে রঙ আর কালো রঙের মোটা ল্যাজ দেখে এদের আলাদা করে চিনে নেওয়া যায়। সারা পৃথিবীতে এদের দেখতে প্রায় একইরকম।

এটা ঘটনা বুনো কুকুর বাঘ, সিংহের মত বিরাট কোন গুরুত্বপূর্ণ প্রাণী নয়। তাই তাদের সংখ্যা কমা নিয়ে হৈচৈ কম। কিন্তু অরণ্য ও জীববৈচিত্র বাঁচিয়ে রাখার স্বার্থে এদের সংরক্ষণ জরুরি।