দক্ষিণ এশিয়ার রেশম পথের তিনটি অন্যতম বর্ধিষ্ণু প্রাচীন গ্রাম গোবিন্দপুর সুতানুটি কলকাতা। সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ পৃষ্ঠপোষণায় উদ্ভুত ভদ্রবিত্তের হাতে তৈরি উপনিবেশিক কলকাতায় ইওরোপিয় আধুনিকতা প্রসারের আগের সময়ের অভদ্রলোকদের কলকাতা ছিল বিকেন্দ্রিভূত অর্থনীতি, কৃষ্টির অন্যতম পৃষ্ঠপোষক — যে অর্থনীতি এবং কৃষ্টিতে মহিলাদের বিশাল অবদান ছিল। আজও গ্রামীন উৎপাদন ব্যবস্থা দেখলে এই মন্তব্যের সার বোঝা যাবে। যাই হোক, এই কলকাতা হঠাৎ গজানো ছিল না। এর একটা দীর্ঘ বাণিজ্য এবং কৃষ্টিচর্চার ইতিহাস ছিল বলেই ধুরন্ধর লুঠেরা ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, ১৮৮৬ তে মুঘলদের কাছে হুগলী যুদ্ধে গো-হারান হেরে, সে সময়ের এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসাকেন্দ্র হুগলী বন্দরের বাইরের ব্যবসাকেন্দ্র গোবিন্দপুর সুতানুটি কলকাতায় বাণিজ্য কুঠি ফাঁদার পরিকল্পনা করে। সেই পলাতক কোম্পানির পলাতক সেনাপ্রধানের উত্তরাধিকারীরা পলাশীর পরের বাংলার সম্পদ লুঠের উদ্বৃত্ত ব্যবহার করে বাংলার বিকেন্দ্রিত অর্থনীতিকে দাবিয়ে নতুন কেন্দ্রিভূত অর্থনীতির হৃদঅক্ষ হিসেবে কলকাতাকে গড়ে তুলবে। নব্য উপনিবেশিক আধুনিকতা প্রসারের ক্রীড়াভূমি নব্যকলকাতা তখন ব্রিটিশ লুঠ-কোম্পানির অন্যতম সেরা এম্পোরিয়াম; সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় রাজধানী। সেই নবজাগরিত কলকাতায় একদা রোজগেরে অভদ্রবিত্ত মেয়েদের রোজগার, কৃষ্টিই ধ্বংস হল না, মেয়েদের অন্তঃপুরে ঢুকিয়ে, সামগ্রিকভাবে তাদের রোজগার কাড়ার, দেশিয় কৃষ্টির অধিকার কেড়ে বিদেশিয় কৃষ্টি অর্থনীতিতে জোড়ার পাকা ব্যবস্থা করা হল।
বঙ্গ-লুঠের উদ্বৃত্তে ভিক্টোরিয় ভদ্রলোকিয় নবজাগরনীয় প্রগতিশীল মহামানবেরা দৈহিক, মানসিক, সামাজিকভাবে ইওরোপমন্য হয়ে ওঠার সাধনায় দিগ্বিদিক জ্ঞান শূন্য। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সিপাহি যুদ্ধের কাছাকাছি সময় থেকেই আইন প্রণয়ন করে, পুলিশ লেলিয়ে, মামলা ঠুকে, সামাজিকভাবে বলপ্রয়োগ করে, অভদ্রলোকদের কৃষ্টিকে অশ্লীল, পিছিয়েপড়া দেগে দিয়ে কলকাতার নিজস্ব পরম্পরার কৃষ্টির সমাধিক্ষেত্র তৈরি হল। পুরোনো কলকাতার মাথায় পরানো হল হল অশ্লীলতার টিকা। আখড়াই, পক্ষীর গান, সং, কবির লড়াই, মানুষ যাত্রা, পাঁচালী, মুখোশ-নাচ, পুতুল নাচ ক্রমশ ঠেলে দেওয়া হল পর্দার আড়ালে। পলাশীর পর মেয়েদের সম্পত্তির অধিকার, বিশ্ববিখ্যাত তাঁত ধ্বংস করে সুতো কাটার রোজগার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, পলাশীর ৬০/৭০ বছর পর নবজাগরিত কলকাতায় কেড়ে নেওয়া হল মেয়েদের কৃষ্টির অধিকারও।

উপনিবেশিক ভদ্রলোকিয় লন্ডনে ১৮৫৬-য় অবসিন পাবলিকেশন এক্ট চালু হওয়ারও এক বছর আগে সাম্রাজ্যবাদীরা একই ধরণের অশ্লীলতা নিবারণী আইন কলকাতায় লাগু করে হাত পাকিয়ে নিয়ে লন্ডনে প্রয়োগ করেছে। নব্য লুঠেরা সময়ে কলকাতায় উদয় হওয়া ব্রিটিশ জীবনযাত্রা অনুসরণকারী ভদ্রবিত্তরা তখন শাসকদের ঢাকেরর বাঁয়া। আইনের লগুড় দেখিয়ে যাত্রা, পাঁচালি, কবির লড়াই, ঝুমুর ইত্যাদি প্রকাশভঙ্গী বন্ধ করতে পুলিশ এবং সামাজিক মৈত্রমশাইরা কড়াভাবে উদ্যমী হয়। এর প্রভাব শুধু পুরুষ কৃষ্টিকর্মীদের ওপরেই পড়ল না, সুমন্ত্র বন্দ্যোপাধ্যায় উনিশ শতকের কলকাতা ও সরস্বতীর ইতর সন্তান বইতে বলছেন পুলিশ নিয়ম প্রয়োগ করে খোলাখুলি মেয়েদের যত আখড়া ছিল সব কটাকে তুলে দেয়। বিবেকানন্দের ভাই মহেন্দ্রনাথ দত্ত জানাচ্ছেন উনিশ শতকের শেষে মেয়ে পাঁচালি দল অদৃশ্য হয়েগেছে কারন ‘শিক্ষিত লোকেরা নিন্দা করিতে লাগিল — ও উঠিয়া গেল’। শিবনাথ শাস্ত্রী বলছেন কবির লড়াই ও হাফ আখড়াই উঠে যাওয়ার কথা — ‘ইংরাজি শিক্ষা দেশমধ্যে যখন ব্যপ্ত হইতে লাগিল, তখন এই সকলের প্রতি শিক্ষিত ব্যক্তিদের বিতৃষ্ণা জন্মিতে লাগিল’। আইন করে, সামাজিক চাপ দিয়ে, কৃষ্টিকে অশ্লীল দাগিয়ে অভদ্রবিত্ত মেয়েদের মুখের কৃষ্টি ভাষা কেড়ে নিল ভদ্রবাঙ্গালি।
ব্রিটিশ ভদ্রবিত্তের অনুসরণে, চাকুরিদাতা কোম্পানিকে খুশি করতে জনগণের কৃষ্টিগুলোকে ব্রিটিশধন্য সমাজপতি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় অশ্লীল দেগেদিলেন। বঙ্গদর্শন পত্রিকায় দেশিয় অভদ্রলোকের কৃষ্টিকে অশ্লীল দাগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘অশ্লীলতা বঙ্গদেশিয়দের জাতীয় দোষ বললে অত্যুক্তি হয় না। …যাঁহারা ইহা অত্যুক্তি বিবেচনা করিবেন তাঁহারা বাঙ্গালির রহস্য, বাঙ্গালির গালি, নিম্নশ্রেণীর বাঙ্গালির স্ত্রীলোকের কোন্দল, এবং বাঙ্গালির যাত্রা পাঁচালী মনে ভাবিয়া দেখুন। মুহূর্তের জন্যে বাঙালি কৃষকের কথোপকথন শ্রবণ করিয়া দেখুন — বাঙ্গালির প্রণীত যে সকল কাব্যগ্রন্থ সর্ব্বোৎকৃষ্ট বলিয়া খ্যাত তাহা পাঠ করিয়া দেখুন’। অথচ শোনা যায় তিনি চাষী রমা কৈবর্ত আর হাসিম শেখের পৃষ্ঠপোষক। তিনি তাদেরই অশ্লীলতার অভিযোগে কাঠগড়ায় দাঁড় করালেন।

শুধু মহিলাদের অপ্রাতিষ্ঠানিক কৃষ্টিচর্চাই নয় প্রতিষ্ঠান থেকেও ভদ্রকুললনাদেরই নয় বারবণিতাদেরও কাজ পাওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠল অশ্লীলতার অনুষঙ্গে ভদ্রবিত্তিয় সমাজে। ভদ্রবিত্তরা প্রকাশ্যে নাট্যচর্চা থেকে মহিলাদের বাদ দিতে উদ্যোগী হয়। অর্থাৎ নাট্যচর্চা থেকেও যাতে মহিলারা রোজগার না করতে পারে, সে ব্যবস্থাও নিশ্চিত করল নবজাগরণীয় প্রগতিশীল সমাজ। অর্থাৎ মেয়েদের এই প্রকাশ্য কৃষ্টিচর্চার রোজগারেও হাত বসাল এবং প্রকাশ্যে আবির্ভূত হয়ে কৃষ্টিচর্চাকে নিষদ্ধ করল মহামানব ভদ্দরলোকেরা।
জাতীয় নাট্যসমাজের বাৎসরিক উৎসবে কবি, গীতিকার, নাট্যকার মনোমহন বসু ভদ্রবিত্ত পরিবারের মহিলাদের রোজগার, কৃষ্টিচর্চা বন্ধ করার জন্যে প্রথমে বললেন, ‘স্ত্রী অভিনেত্রী সংগ্রহ করিতে গেলে কুলটা বেশ্যা পল্লী হইতেই আনিতে হইবে’। একদা বাংলায় সুতো কাটাতে অভ্যস্ত ছিলেন বাংলার প্রতিটি সামাজিক স্তরের মহিলা। অর্থাৎ শূদ্র থেকে বামুন পরিবারের মেয়ে পর্যন্ত রোজগার করতেন। তাঁত ব্যবস্থা ধ্বংস করে তাদের রোজগার খেল মহিলাফোবিক ভদ্রবিত্ত বাঙালী, আর কাজ পেল ইংলন্ডের মিল মালিকেরা। আত্মচরিতে রাজনারায়ণ বসু লিখছেন, ‘রামপ্রসাদ বসু [তাঁর ঠাকুর্দা] ঢাকার কস্টমের দেওয়ান ছিলেন। তখন ঢাকাই কাপড়ের ব্যবসার বিনাশ করিবার জন্য ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানী ঐ কাপড়ের উপর ভয়ানক জেয়াদা মাশুল বসাইয়াছিলেন। আমাকে কোন সাহেব বলিয়াছিলেন যে, এই নিদারুণ প্রনালী দ্বারা ঢাকার কাপড়ের ব্যবসায়ের গলায় দড়ি দিয়া উহাকে হত্যা করা হয়’। শুধু ঢাকাই কাপড় উতপাদনেই গলার দড়ি পড়ল না, গলায় গড়ি পড়ল মহিলাদের রোজগারে, কৃষ্টিচর্চাতেও।
উপনিবেশিক ভদ্রলোকিয় নিপীড়ন তখনও যে শেষ হয় নি, সেটা নিয়ে আরও একটু পরে আলোচনা করব। তাঁতের রোজগার খাওয়ার পরে ভদ্রবিত্তের এবারে চোখ পড়ল নাট্যমঞ্চে মহিলাদের রোজগার খাওয়ার দিকে। সেখানেও তাদের কাজ করা, কৃষ্টিচর্চা করা সামাজিক বলপ্রয়োগ করে বন্ধ করে দেওয়া হল। শুধু ভদ্রবিত্ত পরিবারের মহিলাদের কাজ বন্ধ করা হল না, ভদ্রবিত্ত পরিবারের সন্তানেরাও যাতে বেশ্যাদের সঙ্গে নাটক না করতে পারে তারও নিদান দিলেন মনোমোহনের মত সমাজকর্তারা। বেশ্যাদের সঙ্গে নাটক করা দেখে আতঙ্কিত মনোমোহন হুঁশিয়ারি দিলেন ‘ভদ্রযুবকগণ আপনাদের মধ্যে বেশ্যাকে লইয়া আমোদ করিবেন, বেশ্যার সঙ্গে একত্র সাজিয়া রঙ্গভূমিতে রঙ করিবেন, বেশ্যার সঙ্গে নৃত্যও করিবেন ইহাও কি কর্ণে শুনা যায়?’

একটু আগেই বলেছিলাম বাংলার বর্ণ-জাতি-সামাজিকস্তর নির্বিশেষে মহিলারা চরকা কেটে রোজগার করতেন, ফলত তারা তুলনামূলকভাবে স্বাধীন ছিলেন এবং মনু পর্যন্ত বাংলার মেয়েদের সম্পত্তির অধিকার কাড়তে পারেন নি। এটা করা হল ব্রিটিশ আমলে। মাথায় রাখতে হবে মহিলা কারিগরদের রোজগার কাড়ার অন্যতম হাতিয়ার ছিল অশ্লীলতা বিরোধী সামাজিক আন্দোলন এবং আইন – সেটা পরে আলোচ্য। আইন করে মহিলাদের সম্পত্তির অধিকার ছিনিয়ে নিয়ে অন্তঃপুরে ঢোকানোর উদ্দেশ্য, তারা যাতে কোনও রকম প্রতিবাদ না করতে পারে, তার জন্যে বাংলার উচ্চবর্ণের মহিলাদের ব্রিটিশ আমলে সতীদাহ নামক প্রথা তৈরি করে মৃত্যু মুখে ঠেলে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হল — বেশ কিছু সতীদাহের হুমকি উচ্চবর্ণিকদের দিয়ে কার্যকর করানো হল। এ নিয়ে বিশদে জানতে পড়ুন দেবোত্তম চক্রবর্তী, বিদ্যাসাগর নির্মান বিনির্মান পুনর্নির্মান প্রসঙ্গ। মহিলারা শেষ পর্যন্ত ঢুকে গেল অন্তঃপুরে। এরপরে উপনিবেশিকদের লেলিয়ে দিয়ে শুরু হবে মহিলা উদ্ধার প্রকল্প — সে অন্য গল্প। অন্য এক দিন।
ইংলন্ডে টমাস বোল্ডারের (যেখান থেকে বুল্ডোজিং শব্দটার উতপত্তি) সময় যে পাগান (সেক্সপিয়ারও ছাড় পান নি) অশ্লীলতা, অশ্লীল বাক্য শব্দ দূরীকরণের কাজ শুরু হয় ভদ্রলোকিয় ইংলন্ডে। কলকাতায় বসে এই কাজে অনুপ্রাণিত হয়ে ইসলামোফোবিক বাঙালী পণ্ডিত জয়গোপাল তর্কালঙ্কার শুধু যে বাংলা ভাষা বচন থেকে আরবি ফারসি দূর করার কাজে লাগবেন তাই নয়, ব্রিটিশ জেন্টলম্যান বোল্ডারের নকলে কৃত্তিবাসী রামায়ন ও কাশীদাসী মহাভারতের ওপর কলম চালিয়ে অশ্লীলতা দূর করে বিশুদ্ধ সংস্করণ বার করেন।
কলকাতার নকুলে ভদ্রলোকিয় বাবু সমাজ সেই সময়েই সেনা-পুলিশ হাতে নিয়ে গ্রামীনদের স্বাধীনতা স্পৃহা দমন করার সময় কলকাতায় আরও দুটো কাজ সেরে রাখে ১) চাল বাছার মত করে ভাষায় যবনী মিশেল ছেঁটে ফেলে প্রমিততার পরিবেশ শুরু করা হয়[উপরে উল্লিখিত তর্কালঙ্কার উদ্যম দ্রষ্টব্য] ২) একইভাবে ইংরেজি শিক্ষিত পাশ্চাত্যের অনুকরণে অভ্যস্ত ভদ্র বাবুজীবন শিল্প সাহিত্য থেকে মহিলাদের ছেঁটে ফেলার মুখড়া হিসেবে তথাকথিত যৌনগন্ধী, দেহের নানান অঙ্গপ্রত্যঙ্গ উল্লিখিত শব্দ ছেঁটে ফেলে ভিক্টোরিয় ভদ্রলোক সেজে বসে। ভদ্রলোকেরা ব্রিটিশ উপনিবেশিক অর্থনীতির লুঠের এজেন্ডা পূরণ করার কাজ ত্বরান্বিত করতে, মহিলাদের হঠিয়ে বাঙ্গালী ভদ্রলোকিয় পুরুষদের চাকরি, ব্যবসা, দালালি, উমদোরিকে সুরক্ষিত করল। ভারত শাসক বেথুন গৌরদাস বসাককে লিখলেন, ‘আপনাদের দেশিয় সাহিত্য সম্বন্ধে আমি যতটা জানি, তার থেকেও বলতে পারি এর সর্বোৎকৃষ্ট নিদর্শনগুলি অশ্লীলতা ও কুরুচি কালিমালিপ্ত’। উপনিবেশে পশ্চিমের প্রখর নজরদারিতে ভিক্টোরিয়-ব্রাহ্মীয় মডেলে গল্প, কবিতা, সিনেমা, উপন্যাস ইত্যাদি শিল্প সাহিত্য নামে যা তৈরি হতে শুরু করল, সেই সব কৃষ্টিকাহিনীর রেশ আজও চলে আসছে ভদ্রলোকিয় বাংলায়।
অশ্লীলতা বিরোধী আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ল কলকাতার ভদ্রসমাজ জুড়ে। আগেই বলেছি, অশ্লীলতা নিবারণী আন্দোলন হয়ে উঠল বাংলার কারিগরদের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ — যদিও এই বিষয়টি বক্ষ্যমান প্রবন্ধে আলোচনার সুযোগ নেই। এর ফল ফলল ভদ্রলোকিয় সমাজে গা পা হাত মাথা ঢেকে মুড়ে শাড়ি পরার ব্রাহ্ম ঠাকুরিয় নিদানে। অথচ মনে আছে আমি ছোটবেলায় উত্তর কলকাতার স্বচ্ছল পরিবারের বহু মহিলাকে বাড়িতে ব্লাউজ ছাড়া ছোট শাড়ি পরে থাকতে দেখেছি।
এই অশ্লীলতার বড় প্রভাব পড়ল দেশিয় উৎপাদন ব্যবস্থায়। তখন সদ্যচিরস্থায়ী বন্দোবস্তের লুঠেরা সময় চালু হওয়ার ফলে আর্থিক এবং সামাজিক উত্তোরণ ঘটেছে নানান ভদ্রলোকিয় পেশাদারের। এরা পলাশীর পরের লুঠের রাজত্বে প্রচুর অর্থ রোজগার করেছেন। গোমস্তা হয়ে দেশিয় কারিগরি ধ্বংস করেছেন। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে, পরের ধনে পোদ্দারির যুগে জমিদারদের জমিদারিতে থাকার তরিকা পুরোনো হয়ে গেল। আজ যেমন শান্তিনিকেতন এবসেন্টি ল্যান্ডলর্ড ছেয়ে গিয়েছে, তেমনি সেদিন অন্ধকারের মূর্ত প্রতিমা গ্রাম-জেলা-সদরে ছেড়ে, জমিদারি চালানোর ভাগ দালাল অস্বচ্ছল ভদ্রলোকেদের হাতে তুলে দলে দলে জমিদার ভূস্বামী স্বচ্ছল অর্থবান প্রখ্যাতরা কলকাতায় রওনা দিলেন। একে একে জমিদারের প্রাসাদ গজিয়ে উঠছে আলোকোজ্জ্বল প্রগতিশীল এগিয়ে থাকা ইংরেজদের প্রতিষ্ঠিত কলকাতার প্রাণকেন্দ্র এবং মফস্বলেও।

কলকাত্তিয়া নবজাগরিত ভদ্রলোকেরা ততদিনে ছোটলোকেদের টাইট করে দিয়েছেন কারিগরদের বিশ্ব বাজার থেকে ছেঁটে ফেলে। সুমন্ত্রবাবু তার পূর্বোক্ত বইতে যে সময়টির কথা বলছেন, সে সময় ঢাকার গরীমা শেষ — জন টেলর, জেমস টেলর দুজনের সমীক্ষা প্রমান। অভদ্রলোকিয় গ্রামীন স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁতিরাও অংশ নিচ্ছেন। ভদ্ররা ঠিক করলেন টেঁঠিয়া তাঁতিদের বোঝানো দরকার দয়ালু ব্রিটিশ সরকার কত ক্ষমতাময়। ছোটলোকের আবারও ভাত মারতে চেষ্টা করল ভদ্রলোকেরা। মিহি কাপড় তৈরি বাংলার তাঁতিদের চরমতম দক্ষতা ছিল — তারা ব্রিটিশদের সুতি পরা শিখিয়েছিল। যে কাপড় শশাঙ্ক পাল সেন সুলতান মোগল নবাবি আমল পর্যন্ত শাসকদের অশ্লীল অভিধা নয় পৃষ্ঠপোষকতা অর্জন করেছিল, নবজাগরিত ভদ্ররা অশ্লীলতা রোধে জমিদারদের নির্দেশ/চাপ দিলেন শ্লীলতার নামে সেই মিহি কাপড় উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়ার জন্যে। বাঙলায় ভদ্রদের প্রভুদের তৈরি ম্যাঞ্চেস্টারের মিলের মোটাকাপড়ের আর মিহি প্রতিদ্বন্দ্বী রইল না।
যে মসলিনের চরকা কাটনিদের কাজের, রোজগারের প্রাবল্যে বাড়ির কাজে সাহায্যকারী রাখতে হত, সেই মিহিবস্ত্র পরার ক্ষেত্রে সামাজিক নিষেধাজ্ঞা জারি হল। দৈনন্দিনের পরিধেয় পাতলা শাড়ি সম্বন্ধে মন্তব্য করতে গিয়ে এক পত্রলেখক লিখলেন, ‘এতদ্দেশীয় স্ত্রীলোকের পরিধেয় অতিসূক্ষ্ম এক বস্ত্রই সাধারণ ব্যবহার্য ইহা অনেক দোভাষের ও ভিন্নদেশীয় লোকেরও ঘৃণার্হ… যেহেতুক বর্ত্তমান ব্যবহারে অর্থাৎ অতিসূক্ষ্ম সর্ব্বাঙ্গাভাদর্শক বস্ত্রে স্ত্রীলোকের তাদৃশ সম্ভ্রম না যাদৃশ উত্তরীয় তদুপরি সর্ব্বগাত্রাচ্ছাদন বসনে হয়’। তার উপদেশ বাংলার কাপড় না পরে বিদেশি মোটা কাপড় পরার। আরেক চিঠিলেখক লিখলেন ঢাকা, চন্দ্রকোনা ও শান্তিপুরের কাপড় কারিগরেরাই ভিলেন, তাদের উচ্ছেদ করা দরকার ‘ঐ তিন স্থানীয় বস্ত্রেতেই বঙ্গদেশীয় পুরুষীগণ লম্পট-লম্পটী হইয়া উঠিতেছেন। …বর্ধমানাধিশ্বর মহারাজা তাঁহার অধিকার হইতে সূক্ষ্ম বস্ত্র ব্যবহার উঠাইয়া দিয়াছেন এবং ঘোষণা করিয়াছেন তাঁহার অধিকারে কেহ সূক্ষ্ম বস্ত্র পরিধান করিতে পারিবেন না, যদি করেন তবে দণ্ডযোগ্য হইবেন…’। ১৮৮৩ তে এক বাঙালী ভদ্রলোক বাংলার মেয়েদের পরামর্শ দিয়ে বললেন বেনারসি বা ফরাসি কাপড় পরতে।
এইভাবে ভদ্রলোকেরা অশ্লীলতাকে হাতিয়ার করে অর্থনৈতিক অবরোধ করল শুধু ছোটলোক কারিগরদেরই নয়, বাংলার সামাজিকস্তরনির্বিশেষে মহিলাদের রোজগার কেড়ে অন্তঃপুরবাসী করল।
অসাধারণ! ধন্যবাদ দিদি, এই লেখাটির জন্য। এসব নিয়ে প্রচুর লেখালেখির প্রয়োজন – আপনারা শুরু করছেন। কৃতজ্ঞতা
আইডিয়া অব দ্য রেনেসাঁ আসলে ইউরোপের তৈরি সর্ব কালের সেরা কালচারাল স্ক্যাম। পরবর্তী দুশো বছর এশিয়া আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকায় অর্থনৈতিক শোষণ চালানোর জন্য এর বিনির্মাণ হয়েছিল।
ললিতা ঘোষের লেখাটির সঙ্গে সহমত।