জহর রায় বাংলা সিনেমার এক অসাধারণ কমোডিয়ান। তিন বছর আগে পেরিয়ে এলাম তাঁর জন্মশতবর্ষ। চুয়াল্লিশ বছর হল জহর রায়ের মৃত্যু হয়েছে কিন্তু আজও জহর রায়ের মাপের কোন কমেডিয়ান বা চরিত্রাভিনেতা বাংলা চলচ্চিত্রে আসেননি।
জহর রায়ের কথা এলেই অবধারিতভাবে এসে যায় ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা, দুজনে যেন মাণিকজোড়, একই ব্রাকেটে দুটি নাম ভানু-জহর। চার্লি চ্যাপলিনকে গুরু মেনেছিলেন ভানুর চেয়ে এক বছর আগে সিনেমায় আসা জহর রায়। ভানুর প্রথম ছবি ১৯৪৭-এ আর জহরের ১৯৪৬-এ।
জহর রায়ের জন্ম পূর্ববঙ্গের বরিশালে হলেও পরবর্তী স্কুল জীবন কাটে কলকাতা শহরেই। ১৯৩৬ সালে ম্যাট্রিক পাশ করে তিনি চলে যান পাটনা। পাটনায় থাকতে থাকতেই অ্যামেচার থিয়েটারে তার অভিনয় যাত্রা শুরু হয়। অভিনয়ের সাথে জহরের পরিচয় কিন্তু এই অ্যামেচার থিয়েটার থেকেই নয়, বরং বলা যায় জন্মসূত্রেই। জহর রায়ের বাবা সতু রায় সেইসময়ের বেশ কয়েকটি নির্বাক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছিলেন। এই নির্বাক যুগেরই বিশ্বখ্যাত অভিনেতা “চার্লি চ্যাপলিন” জহরের মননে-চিন্তা ভাবনায় মিশে গিয়েছিল। স্কুল জীবন থেকেই চার্লি চ্যাপলিন অভিনীত প্রায় প্রত্যেকটি ছবিই জহর দেখতেন। আর প্রতিটি ছবি বহুবার করে দেখে তিনি নিখুতভাবে রপ্ত করার চেষ্টা করতেন চার্লির অভিনয় ধারা।

পাটনা থেকে আই এ পাশ করার পর সংসারের প্রয়োজনে উচ্চশিক্ষা বেশিদূর এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেননি জহর। পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রুফ রিডারের চাকুরি পেয়ে যান। স্বল্প বেতনের সেই কাজ বেশিদিন করেননি জহর। ছেড়ে দিয়ে মেডিকেল রিপ্রেসেনটেটিভ-এর চাকরি করেন কিছুকাল। সেটাও ছেড়ে দিয়ে দর্জির দোকান দিয়েছিলেন জহর। কোন কাজেই থিতু হতে পারছিলেন না জহর, এবার মাথায় চিন্তা খেলে গেল চলচ্চিত্রে অভিনয় করার। কাউকে কিছু না জানিয়ে গোপনে এক বরযাত্রী দলের সঙ্গে কলকাতা পাড়ি দিলেন। চিত্রপরিচালক অর্ধেন্দু মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন জহর। অর্ধেন্দুবাবু ভাগলপুরের লোক, আর জহর নিজেও পাটনার মানুষ।
সেটা ১৯৪৬ সালের কথা, তখন বাংলা চলচ্চিত্রের বয়স মাত্র ১৫ বছর অর্ধেন্দু বাবুর ‘পুর্বরাগ’ ছবিতে জহর সুযোগ পেলেন, সেটিই তাঁর প্রথম চলচ্চিত্রাভিনয়। এরপর বিমল রায়ের ‘অঞ্জনগড়’ ছবিতে অভিনয়ের পর জহর রায়ের ব্যাপক পরিচিতি গড়ে ওঠে। বাংলা চলচ্চিত্রে জহর রায় হয়ে উঠলেন অপরিহার্য অভিনেতা, আর ততদিনে চলচ্চিত্রাভিনয়ে চলে এসেছেন জহর রায়ের জুড়িদার ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়। বাংলা চলচ্চিত্রে জহর রায় এবং ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় এতোটাই জনপ্রিয় ছিলেন যে তাঁদের নামেই রচিত কাহিনীর চলচ্চিত্রায়ন হয়েছে অনেকগুলি, ‘এ জহর সে জহর নয়’, ‘ভানু গোয়েন্দা জহর এসিস্টান্ট’, ‘ভানু পেল লটারি’ এইসব।

প্রায় তিনশো চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছিলেন জহর রায়। শুধু সিনেমাই নয় অসাধারণ নাট্যাভিনেতা ছিলেন জহর। উল্কা নাটকে তাঁর অভিনয় দর্শকমনে স্থা আসান লাভ করেছিল। দীর্ঘদিন চলেছিল সেই নাটক। আমি মন্ত্রী হবো, সুবর্ণ গোলক, অনর্থ প্রভৃতি মঞ্চনাটকে জহর রায় অসামান্য অভিনয় করেছিলেন।কলকাতার রংমহল থিয়েটার যখন মালিক বন্ধ করে দিয়েছিল তখন তিনি ব্যাক্তিগত উদ্যোগ নিয়ে রঙমহল শিল্পীগোষ্ঠী গড়ে থিয়েটার চালিয়ে গিয়েছিলেন। বই পড়ার খুব নেশা ছিল জহর রায়ের পটুয়াটোলা লেনের মেসের দুটো ঘরে ১২টি আলমারিতে ঠাসা ছিল তাঁর কয়েক হাজার বইয়ের ব্যক্তিগত সংগ্রহ।
ঋত্বিক ঘটক, সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, তরুণ মজুমদার, ও তপন সিনহা প্রমুখ সব কৃতি পরিচালকের ছবিতেই জহর রায় অভিনয় করেছেন। কমেডি অভিনয়ে জহর রায়ের প্রধান অস্ত্র ছিল শরীরি অভিনয়। চিত্র পরিচালক তরুণ মজুমদার মত প্রকাশ করেছিলেন “ওঁর গায়ে কমেডিয়ানের তকমা জুড়ে দেওয়া অনুচিত।’’ ঋত্বিক ঘটকের সূবর্ণরেখায় ফোরম্যান মুখার্জী, সত্যজিতের হাল্লারাজার মন্ত্রী, তরুণ মজুমদারের ‘পলাতক’-এ সেই যাত্রাপাগল কবিরাজ, অসামান্য চরিত্রাভিনেতা হিসাবে কখনই ভোলা যায় না জহর রায়-কে। কে ভুলবে ‘বাঘিনী’ ছবিতে চোলাই ঠেকের মালিক চরিত্রে, কিংবা ‘ধন্যি মেয়ে’ ছবিতে সেই ফুটবল পাগল মানুষটিকে, ‘মর্জিনা আবদাল্লার’ অন্ধ দর্জি বাবা মুস্তাফাকে!

শুধু কমেডিতে আটকে না থেকে সিনেমায় এবং থিয়েটারেও নতুন নতুন চরিত্রে রূপায়ন করতেন শক্তিশালী চরিত্রাভিনেতা জহর রায়। তবু জহর রায়ের গায়ে কমেডিয়ানের তকমাই লেগে আছে। কোন অভিনেতাই নিজের গায়ে লেগে থাকা কমেডিয়ানের তকমা ভাঙতে পারেন না, জহর রায়ও পারেননি। সিনেমায় সামান্য কোন অপ্রধান চরিত্রে ক্ষণিকের উপস্থিতি থাকলেও অভিনয়ের গুনে চরিত্রটিকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতেন। ‘দেহপট সনে নট সকলি হারায়’, ১৯৭৪-এ শরীর ভাঙতে শুরু করল। জন্ডিসে আক্রান্ত হলেন বারবার তিনবার। অমন গোলগাল শরীর ভেঙে যেন কঙ্কাল। সিনেমায় কাজ পাওয়া বন্ধ হল। ১৯৭৭-এর ১১ই অগস্ট, চলে গেলেন জহর রায় মাত্র ৫৮ বছর বয়সে।
৩২ বছর ধরে সিনেমা-থিয়েটারের দর্শককে যিনি নির্মল আনন্দ বিলিয়েছেন, আমাদের হাসিয়েছেন, কাঁদিয়েছেন সেই জহর রায়ের শেষ যাত্রা ছিল খুবই অনাদরের, জহর রায়ের মৃতদেহের পাশে শুধু সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় আর পাড়ার কিছু ছেলে-ছোকরা। ভেঙ্গে পড়ে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন ‘জহরের কি দেশের কাছে এইটুকুই পাওনা ছিল সৌমিত্র? অন্য দেশ হলে স্যার উপাধি পেত।’ শেষ যাত্রা কিছুদূর যাবার পর সুচিত্রা সেন শেষ যাত্রায় যোগ দিয়েছিলেন। ভানু-জহর ব্রাকেট ভেঙে জহর চলে গেলেন, ব্রাকেটের অপর জন ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় গেলেন আরো ছ-বছর পরে।
মনোজিৎকুমার দাস, প্রাবন্ধিক, লাঙ্গলবাঁধ, মাগুরা।