আচ্ছা যদি আপনার সামনে কেউ একজন একটি শব্দ উচ্চারণ করে আর সেই শব্দটি হচ্ছে ‘নদী’। আপনার চোখের সামনে তাহলে কি ভেসে উঠবে? নিশ্চয়ই মনশ্চক্ষুতে আপনি দেখতে পাবেন বিরাট জলরাশি সমেত একটি ধারা তীব্র বেগে সম্মুখে ধাবমান। তার উপর ছোট বড় স্রোত ভেঙ্গে ভেসে চলছে কিছু নৌযান, ঠিক তেমনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি সম্পর্কে আপনি একটু চিন্তা করলেই নিশ্চয়ই আপনার মনশ্চক্ষুতে ভেসে উঠবে ভোটচুরির মচ্ছব, দিনের ভোট রাতে দেয়া, গুম, খুন, অযোগ্য, অর্থব ও মগজহীন নেতাদের সংসদ নির্বাচন সহ আরো বহু কিছু। কিন্তু আমি ধন্ধে পড়ে গেলাম, এগুলো নিয়ে লেখার কি আছে। এ ধরনের সংস্কৃতি আমাদেরদেশে শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত কারোর-ই তো আর অজানা নয়। আমি বরং এগুলোর উৎস ও মনস্তত্ত নিয়ে আলোচনা সঙ্গত বোধ করছি। আমাদের দেশের রাজনীতিতে একটি বিষয় খুবই বিস্ময়কর। এখানে একটি দল আরেকটি দলকে যে শুধু সহ্য করতেই পারে না এমন নয় বরং একটি দল আরেকটি দলকে ধ্বংস করে দিতে সদা সচেষ্ট। কিন্তু ইতিহাসবোধের অভাবে তাদের জানা নেই যে কোন পরিস্থিতিতে একটি দেশে একাধিক রাজনৈতিক দল গড়ে ওঠে। তাদের হয়তো জানা নেই পাকিস্তান আমলে কেন আওয়ামী লীগের জন্ম হয়েছিল এবং স্বাধীনতা উত্তর কেনই বা জন্ম হয়েছিল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের।
সাধারণত আমাদের অভিজ্ঞতা ও সামাজিক অবস্থার উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় মতবাদ ও দলের জন্ম হয়। অতীতের ইতিহাস আলোচনা করলেই আমরা তা বুঝতে পারি। ইংলণ্ডের সাধু বার্থলোমিউকে হত্যা করার ফলে সেখানকার মানুষের মনে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয় সেই সঙ্গে রাজার শ্বৈরতান্ত্রিক ক্রিয়াকলাপ ও চার্চের ধর্মান্ধমূলক আচরণের মোকাবেলায় সেখানে ১৬৭৮ খ্রিষ্টাব্দে হুইগ মতবাদ (ইংলণ্ডের একটি রাজনৈতিক মত) গড়ে উঠে। এই হুইগ পার্টির একজন সফল ও বিখ্যাত নেতা ছিলেন রবার্ট ওয়ার্লপোল। যিনি ১৭২১ সালে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কিছুকাল পূর্বে দুর্নীতির এক মামলায় অভিযুক্ত দেখিয়ে তাকে গ্রেফতার করে টাওয়ার অব লন্ডনে বন্দী করে রাখা হয় তাকে। তার এই জেলজীবন স্থায়ী হয়েছিল প্রায় ছয় মাস। কারাবাসকালীন সময়টাতেই হু হু করে বাড়তে শুরু করে তার জনপ্রিয়তা। ইংল্যান্ডের জনগণের কাছে তিনি প্রতিভাত হতে থাকেন একজন অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে। তুখোর বক্তা ও প্রজ্ঞাবান এই রাজনীতিবিদ ১৭২১ সালে ইংল্যান্ডের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণ করেন। বাঘা বাঘা রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, ওয়ালপোলের সেই ছয় মাসের কারা নির্যাতনের কারণেই নাকি জনগণের কাছে তার জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা অসম্ভব রকম বেড়ে যায়।
১৬৮৮ সালে ইংলণ্ডের সাধারণ মানুষ শাসকের বিরুদ্ধে যে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল ইতিহাস সেই বিপ্লবকে ‘গৌরবময় বিপ্লব’ বলে অভিহিত করে। দার্শনিক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ‘হব্স্’ সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁর নিজস্ব মতবাদ প্রচার করতে চেষ্টা করেন। দার্শনিক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ‘লক’ প্রচার করেন যে, সাধারণ মানুষ শাসকের প্রতি অনুগত না হলে তাঁরা শাসন-ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারে না। কিন্তু তিনি স্পষ্ট করে বলেননি একজন শ্বৈরশাসক কতদিন পর্যন্ত জনগণের সমর্থন না থাকা সত্ত্বেও ক্ষমতায় থাকতে পারেন। আর এ কারণেই দেখা যায় বেনিটো মুসোলিনি, অ্যাডলফ হিটলার, ষ্ট্যালিন, ইদি আমিন, কম্বোডিয়ার শ্বৈরশাসক পলপট, নিকোলাই চচেস্কু, সাদ্দাম হোসেন, গাদ্দাফি প্রভৃতি শ্বৈরশাসকগণ ক্ষমতায় ছিলেন দশ থেকে বিশ, ত্রিশ বছর পর্যন্ত কিন্তু এখানে উল্লেখ্য যে এইসব স্বৈরশাসকের কারোরই শেষ পরিণতি সুখকর ছিলনা। আমার ব্যক্তিগত অভিমত আমাদের এই উপমহাদেশের রাজনীতিবিদদের এখান থেকে শিক্ষা নেওয়া প্রয়োজন।
বিগত বেশ কিছু বছর ধরে বাংলাদেশের একটি ভয়াবহ রাজনৈতিক সংস্কৃতি হচ্ছে গুম কিংবা রাজনৈতিক অপহরণ। বাংলাদেশে গুমের সংস্কৃতি শুরু হয় ১৯৭২ সালের পর থেকে। ১৯৭২ সালের পরবর্তী সময়ে জাসদের অনেক নেতা গুমের শিকার হয়েছিলেন। তবে এই উপমহাদেশে গুমের সংস্কৃতি প্রথম চোখে পড়ে পশ্চিমবঙ্গে। ষাট ও সত্তরের দশকে পশ্চিমবঙ্গে কমিউনিষ্ট পার্টির উত্থানের সময় সেসময়ের ক্ষমতাসীন কংগ্রেস পার্টি কমিউনিষ্ট পার্টির অসংখ্য নেতাকর্মীকে তারা গুম করেছিল। তবে গুম সংস্কৃতির আদি নিবাস ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোতে। সেখানকার শ্বৈরশাসকগণ ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত বিরোধি মতের শত সহস্র নেতাকর্মীকে গুম করেছিল। এজন্য ২০০০ সালের দিকে চিলির প্রাক্তন শ্বৈরশাসক লন্ডনে রাজনৈতিক আশ্রয় নেয়া পিনোশেকে বিচারের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। এই যে গুমের বিরুদ্ধে দেশে বিদেশে এতো এতো মানবাধিকার সংগঠন গুলো সোচ্চার কিন্তু আমরা এই সংগঠন গুলোকে বাহবা না দিয়ে বরং মাঝে মধ্যে এগুলোর বিরুদ্ধে বিরূপ মন্তব্যে মেতে উঠি। অথচ আমরা একটিবারের জন্যও ভাবিনা এই সংগঠনগুলো কত পরিশ্রম ও ত্যাগ তিতিক্ষার ফসল। এই যে অ্যামিনেষ্টি ইন্টারন্যাশনালের কথাই ধরুন। কেউ গুম হলে আমরা চুকচুক করে আহাজারি করি কিন্তু এর প্রতিকারে কেউ আমরা এগিয়ে আসি না। গুমের শিকারে আক্রান্ত পরিবারটির পাশে দাঁড়াই না। তবে এই লক্ষ কোটি মানুষের মধ্যে কেউ কেউ এগিয়ে আসেন। তাদেরই একজন ছিলেন ব্যারিষ্টার পিটার বেনেনসন।
তখন পর্তুগালে স্বৈরতন্ত্রী নেতা সালাজারের শাসন। দুঃশাসনে অতিষ্ঠ হওয়ার পরও দুটি ছেলে কোনো সরকার বিরোধী ষড়যন্ত্রে যুক্ত হয়ে পড়েনি। শুধু একটা রেস্টুরেন্টে বসে দুজনে যখন পান ভোজন করছিল সে সময় দুজনে তাদের পানপাত্র ঠেকিয়ে নিজেদের মধ্যে বলেছিল ‘সালাজারি দুঃশাসনের অবসান কামনায় চিয়ার্স।’ পাশের টেবিলে বসা কোনো গোয়েন্দা বা চরের কানে গিয়েছিল কথাটা। তারা যথাস্থানে রিপোর্ট করেছিল। পরদিনই ছেলে দুটিকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায় পুলিশ। ১৯৬১ সালে ব্রিটেনের এক আইনজীবী ব্যারিষ্টার পিটার বেনেনসন এক সকালে খবরের কাগজ খুলে দেখেন পর্তুগালের রাজধানী নিসবন শহরে দুটি কলেজের ছাত্রকে পুলিশ দেশদ্রোহিতার অভিযোগে গ্রেফতার করেছে।
এই ছোট্ট খবরটি পিটার বেনসনের মর্মে গিয়ে বিঁধেছিল। তিনি ভেবেছিলেন শুধু সালাজারের পর্তুগালে কেন? এমন ঘটনা তো সব দেশেই ঘটছে। গণতান্ত্রিক দেশগুলি থেকেও প্রতিনিয়ত এমন খবর আসে। জনগণের ভোটে নির্বাচিত জনগণের নেতাই ক্ষমতায় গিয়ে রাতারাতি পালটে যান। তখন সরকারের সামান্যতম সমালোচনাও তিনি বরদাস্ত করতে পারেন না। তাঁর ক্ষমতার পথ নিরঙ্কুশ করার জন্য তিনি বিরোধীদের পুলিশ লেলিয়ে দেন। বিনা বিচারে বন্দী করে রাখেন।
ক্ষমতায় কে কীভাবে আসছেন, ব্যালটে কিংবা বুলেটের মাধ্যমে সেটা বড় কথা নয়। ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য মানুষের অধিকার তাঁরা একইভাবে লঙ্ঘন করছেন এটাই বড় কথা। ক্ষমতায় আসীন কিছু মানুষ বৃহত্তর মানব সমাজকে ভয় দেখিয়ে অথবা নানা লোভ দেখিয়ে নিজেদের তাঁবেতে রেখে দিয়েছে এটাই খুব ভয়ানক কথা।
পিটার বেনেনসন ঠিক করেন তিনি একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা তৈরি করবেন যাঁরা রাষ্ট্রের এই স্বৈরাচারী প্রবণতার বিরুদ্ধে জনমত সংগ্রহ করবে। না, কোনো গুপ্ত সন্ত্রাসী আন্দোলন নয়, সুশীল সমাজের কাছে শুধু তারা প্রমাণ-সহ রাষ্ট্রিয় সন্ত্রাস আর স্বৈরাচারের বিবরণগুলি তুলে ধরবে।
তিনি ওই উদ্দেশ্যেই তৈরি করেন Amnesty International. আজ যার শাখা প্রশাখা সারা বিশ্বে বিস্তৃত। মূল দফতর লন্ডনে।
বাংলাদেশের রাজনীতির আরেকটি দিক হচ্ছে একটি দলকে নিজে এককভাবে কুক্ষিগত করা। শুধু কুক্ষিগত করেই ক্ষান্ত হন না তারা। বরং যোগ্য নেতাদের টপকে নিজেই হয়ে ওঠেন সেই দলের সর্বসেরা। সেই দলের মধ্যে তাঁর জনসমর্থন আছে কি নেই সেটা বিবেচ্য নয়। এই সংস্কৃতি গুলোও এসেছে পাশ্ববর্তী দেশ ভারত থেকে। নেহেরুর প্রধানমন্ত্রীত্বের সময় সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল (উপপ্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) যতদিন বেঁচেছিলেন (১৯৫০, ডিসেম্বর) ততদিন নেহেরুর সঙ্গে তার চুলোচুলি লেগেই ছিল। তেমনি প্রেসিডেন্ট রাজেন্দ্র প্রসাদের সঙ্গেও নেহরুর বনিবনা ছিল না। ১৯৫০ সালে প্যাটেলের প্রার্থী পুরুষোত্তম দাস ট্যান্ডন কংগ্রেস সভাপতি হন নেহরু সেটি পছন্দ করেননি। ১৯৫০-এর ডিসেম্বরে প্যাটেলের মৃত্যু হলে নেহেরু একরকম জোর করে ট্যান্ডনকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেন ও নিজেই সভাপতি হয়ে বসেন।
নেহেরু কড়া হাতে কংগ্রেস নেতৃত্বকে হাতে রেখে দিয়েছিলেন। ষাটের দশকে তিনি বিভিন্ন রাজ্য থেকে চারজন বিশ্বস্তকে বাছাই করে ওয়ার্কিং কমিটিতে নিয়ে আসেন (১৯৬৪)। ১৯৬৩ সালে তামিলনাড়ু কংগ্রেস নেতা, কামরাজ নাদারকে (তিনি তামিলনাড়ুর প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী) নিখিল ভারত কংগ্রেসের সভাপতি করেন। কামরাজ ব্যক্তিগত জীবনে সৎ ও স্বল্প কথার মানুষ। তাঁর সম্পর্কে জোক আছে তিনি সবার কথা শুনতেন ও উত্তরে একটা কথাই বলতেন : পাক্কালাম-অর্থাৎ দেখা যাবে। বা দেখছি কি করা যায়।
ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠতে নেহরু কন্যা ইন্দিরাও কম যাননি। কট্টর গান্ধীবাদী হওয়া সত্ত্বেও মোরারজি দেশাই, লালবাহাদুর শাস্ত্রীর মৃত্যুর পর থেকেই (১১ জানুয়ারি ১৯৬৬) ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর দাবিদার হয়ে বসেন। সে সময় প্রধানমন্ত্রীর পদের দাবিদার ছিলেন সাতজন। মোরারজি দেশাই, ইন্দিরা গান্ধী ওয়াই বি চ্যবন, এস. কে. পাতিল, সঞ্জীব রেড্ডি আর কামরাজ নাদার।
লালবাহাদুরের মৃত্যুর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়াই বি চ্যবন জানান, এই পদের তিনি যোগ্যতম দাবিদার। দুদিন পরে মঞ্চে হাজির হতে থাকেন উত্তরাধিকারের আরও দাবিদাররা। মোরারজি দেশাই, গুলজারিলাল নন্দ, এস. কে. পাতিল। সঞ্জীব রেড্ডি ও কামরাজ নাদার স্বয়ং কামরাজকে এক কথায় উড়িয়ে দিলেন সিন্ডিকেটের কর্তারা- হ্যালো মি: কামরাজ, নো ইংলিশ, নো হিন্দি, হাউ? অর্থাৎ, তুমি ইংরেজি জানো না, হিন্দি জানো না তাহলে কিভাবে প্রধানমন্ত্রী হবে? কামরাজ সব বুঝে সরে পড়লেন।
কিন্তু গুলজারিলাল নন্দ আর মোরারজি দেশাই সহজে ছাড়ার পাত্র নন। গুলজারিলাল নন্দ আগের দিন অস্থায়ী প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ নিয়েছেন। তার আগে তিনি ছিলেন দক্ষ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
কামরাজ সরে দাঁড়ানোয় মোরারজি ভরসা পেয়ে তাঁর প্রধানমন্ত্রী হবার দাবি আরও শক্ত করে তুলে ধরলেন। কংগ্রেস সংসদীয় দলে মোরারজির সমর্থক কম ছিল না। ভোটাভুটিতে মোরারজিই বেরিয়ে যেতে পারতেন কিন্তু কংগ্রেসের তথাকথিত সিণ্ডিকেট যাদের মধ্যে এক নম্বরে কামরাজ তারা কেউ মোরারজিকে দেখতে পারতেন না। কারণ মোরারজি কারও কথা শোনেন না। নিজে যা ভাল বোঝেন তাই করেন। তাঁকে সিদ্ধান্তে থেকে সরানো যায় না। তারা সবাই এক কাট্টা হয়ে ইন্দিরাকে মোরারজির বিরুদ্ধে খাড়া করলেন। ইন্দিরা নেহেরু তনয়া। বয়স কম। দারুণ স্মার্ট। ভাল ইংরাজি বলেন। রাজনীতিতে অভিজ্ঞতাও যথেষ্ট। তদুপরি কিছুদিন মন্ত্রিগিরিও করেছেন লালবাহাদুর মন্ত্রিসভায়।
এছাড়া সিন্ডিকেট ভেবেছিল এক ঢিলে দু পাখি মারবে তারা। মোরারজিকে হঠানো যাবে অন্যদিকে ইন্দিরা ক্ষমতার রাজনীতিতে পাকা পোক্ত নন। তাকেও তাঁরা পুতুল হিসাবে ব্যবহার করবেন। ১৯৬৬ সালের ১৯ জানুয়ারি কংগ্রেস পার্লামেন্টারি নির্বাচনে গোপন ভোটে ইন্দিরা মোরারাজিকে ১৫৫-১৬৯ ভোটে হারিয়ে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হলেন। পাঁচদিন পরে এই নির্বাচন নিয়ে টাইম ম্যাগাজিন লিখেছিল- Troubled India in a Woman’s Hand. প্রায় নেগেটিভ ভেটে জিতে গিয়েছিলেন ইন্দিরা। মোরারজি দেশাইর তাতেও কিন্তু প্রেসটিজ ক্ষুন্ন হয়নি।
মোরারজি যখন ইন্দিরার ডেপুটি হলেন তখন মোরারজির বয়স ৭০ আর। ইন্দিরার ৪৮। ২২ বছরের ছোট এক নবীনা নেত্রীর কাছে প্রবীণ গান্ধীবাদী ক্ষমতা ভিক্ষা করছেন এই ঘটনা ভারতের রাজনীতিতে আগে ঘটেনি। মোরারজি জানতেন ইন্দিরার কাছে তিনি পদে পদে অপমানিত হবেন। কাজ করতে পারবেন না। তাও তিনি ক্ষমতার মোহে ডেপুটি তো ডেপুটিই সই হলেন। মাত্র দুবছর তিনি কাজ করতে পেরেছিলেন (১৯৬৭-৬৯)। প্রধানমন্ত্রী পদের জন্য সে সময় ইন্দিরার চেয়ে মোরারজির দাবিই যথার্থ ছিল।
অন্যদিকে ইন্দিরা মন্ত্রিসভার প্রবীণতম সদস্য প্রণব মুখার্জী রাজীব গান্ধীর কাছে তাঁর অস্থায়ী প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেবার অভিপ্রায় প্রকাশ করে তার চাকরিটা খুইয়ে ছিলেন। ইন্দিরা মন্ত্রিসভার সবচেয়ে সিনিয়র সদস্য প্রণব কুমার মুখোপাধ্যায় (অর্থমন্ত্রী)। তিনিই প্রধানমন্ত্রী হবার দাবিদার। সেদিন রাজীব প্রবণবাবু ও রেলমন্ত্রী বরকত গনি খান চৌধুরীকে নিয়ে মেদিনীপুরে সভা করছিলেন। ইন্দিরা নিহত হবার খবর পেয়ে তারা তিনজন বিশেষ বিমানে দিল্লি ফিরছিলেন। ওই প্লেনের মধ্যেই প্রণববাবু নাকি ওই অভিমত দেন যে সিনিয়র মন্ত্রী হিসাবে তারই অন্তবর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হওয়া উচিত। এই মন্তব্য করার জন্য রাজীব গান্ধী আর তাঁকে মন্ত্রিসভায় নেননি। এর পিছনে অন্য কোনো রহস্য থাকলেও থাকতে পারে। কিন্তু রাজীব গান্ধী সে সময় শুধু কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক। তিনি মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন না। তিনি বলতেন, তিনি কখনই প্রধানমন্ত্রী হতে চান না। সেই রাজীব হঠাৎ প্রধানমন্ত্রীর দাবিদার হয়ে এই পদে বসতে পারেন সেটা হয়তো প্রণব বাবুরও সেদিন সে ধারণা ছিল না। পরবর্তীকালে এই ঘটনার মাধ্যমে তিনি আরও পরিণত হয়েছিলেন তাই দু’তিনবছর আগে থেকেই বলতে শুরু করেছেন পরের প্রধানমন্ত্রী যে রাহুল গান্ধী এ নিয়ে যেন কারও সন্দেহ না থাকে।
বর্তমান সময়ের আরেকটি সংস্কৃতি হচ্ছে টাকা দিয়ে পদ কেনা বা টাকার বিনিময়ে পদ বিক্রি করা। পদ পদবীর লড়াইয়ে প্রচলিত নিয়মের বাইরে অর্থ লেনদেনের ঘটনা সমসাময়িক সময়ে বেশ প্রকট। সেক্ষেত্রে নেতা পদ দেওয়ার কথা বলে টাকা দাবী করার ঘটনা যেমন রয়েছে। ঠিক একই ভাবে পদপ্রার্থী টাকা দেবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সেই নেতার পেছন পেছনও ঘুড়ছে এমন ঘটনাও বিস্তর। বিশেষ করে জেলা ও উপজেলা কমিটি গঠনের প্রাক্কালে সংসদ সদস্য প্রার্থীরা মরিয়া হয়ে উঠে মুলদল, অঙ্গ বা সহযোগী সংগঠন নিজ নিজ নিয়ন্ত্রণে রাখার। যে কারণে নিজ আজ্ঞাবহ পদপ্রার্থী যদি যোগ্যতায় কমও হয় তাহলেও সেসব পদলোভীদের অর্থের বিনিময়ে তারা নেতা বানাতে চায়। তবে দু’চারজন ব্যতিক্রমী সংসদ সদস্য প্রার্থীও রয়েছেন।
অর্থ লেনদেনের এই প্রক্রিয়ার ব্যাপ্তি দিনকেদিন ব্যাপক থেকে ব্যাপকতর হচ্ছে এবং আদর্শ চর্চা ভিত্তিক রাজনীতি এখন আর সমাদৃত হচ্ছে না বরং মিছিল মিটিং কেন্দ্রিক যোগ্যতার মাতামাতিকে যোগ্যতার মাপকাঠি হিসেবে দেখা হচ্ছে বিধায় ইদানিং রাজনৈতিক নেতাকর্মী আর মুদি দোকানের ক্রেতার মতো যে যেখানে লাভ বেশি পাচ্ছে সেখানেই চলে যাচ্ছে।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সৎ ছিলেন বলে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলটি স্বাধীনতা উত্তর কালে বেশ জনপ্রিয়তা পায়। অথচ এই দলটির মধ্যেও যখন পদ কেনা বেচার মতো বিষয়গুলো দেখা যায় তখন অবাক হতে হয়। ব্যক্তিজীবনে সততা দিয়ে যে ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে নিজের নাম লেখানো যায় তার উজ্জ্বল উদাহরণ হচ্ছেন মহাত্মা গান্ধী।
গান্ধীজির শারীরিক প্রতিবন্ধকতা ছিল না। বিলেত ফেরত ব্যারিস্টার হয়েও মক্কেলদের আকৃষ্ট করার মতো তাঁর স্মার্টনেস বা বক্তৃতা দেবার ক্ষমতা ছিল না। তিনি চার্চিলের মতো সুবক্তা ছিলেন না। নেহেরুর মতো সুপরুষ ছিলেন না। তাঁর একমাত্র সম্পদ ছিল এক কঠোর ব্যক্তিগত সততা বোধ। মূল্যবোধের প্রতি গভীর অনুরাগ। অথচ আমাদের এই উপমহাদেশে একটি মিথ চালু আছে যে, সততা ও মূল্যবোধকে সম্বল করে রাজনীতিতে বেশিদূর এগুনো যায় না। কিন্তু গান্ধীজি এই সত্য অহিংসাকে মূলধন করেই রাজনীতিতে সফল হয়েছেন। হয়তো তিনি লেনিনের মত একটি নতুন আদর্শবাদী রাষ্ট্রের প্রধান হতে পারেননি। কিন্তু লেনিনের চেয়ে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তাঁর গ্রহণ যোগ্যতা অনেক বেশি।
গান্ধীজির সততা বা সত্যনিষ্ঠা তাঁর রাজনৈতিক কৌশল নয়-এটি তাঁর আবাল্য সংস্কার। এজন্য তাঁকে তাঁর জীবন দিতে হয়েছে। রাজনীতিতে কৌশল ও অসাধুতাকে সাময়িক স্ট্র্যাটেজি হিসাবে গ্রহণ করতে বাধ্য হলেও যে নেতা ছোট বেলা থেকে সততার মূল্যবোধ নিয়ে জন্মেছে সে কিন্তু পাকাপাকি ভাবে অসৎ সুবিধাবাদী ব্যক্তিতে পরিণত হতে পারে না।
রাজনৈতিক বক্তৃতার মঞ্চে তিনি নিজেকে মানিয়ে নিতে সংকোচ বোধ করতেন। তার কারণ তাঁর লাজুকতা। এটি ছাড়াও তাঁর নীতিবোধ এত তীব্র ছিল যে মোটা ফি এর বিনিময়ে সেই নীতিবোধ ত্যাগ করেননি। সততা তাঁর সহজাত বৃত্তি ছিল। সততার মূল্যবোধ ছোটবেলা থেকে তাঁর মধ্যে কাজ করত। আত্মজীবনীতে তিনি সেসব কথা লিখেছেন অকপটে।
লেখক : গল্প, নিবন্ধ, প্রবন্ধকার ও বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী।