তিন. আসল গুরুজি ও তাঁর বাণী
রাজনৈতিক স্বার্থে আর এস এস ও বিজেপি সাভারকরের কথা বলেন বটে, কিন্তু তাঁদের আসল গুরুজি হলেন মাধব সদাশিবরাও গোলওয়ালকর। ইনি মহারাষ্ট্রের নাগপুরের নিকটস্থ রামটেকে এক মারাঠি ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করে তিনি মিশনরি সম্প্রদায় পরিচালিত হিসলপ কলেজে ভর্তি হন। সেই কলেজে হিন্দুধর্মের অবমাননা সহ্য করতে না পেরে চলে আসেন বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে। এখান থেকে তিনি বিজ্ঞানে স্নাতক হন, পরে জীববিজ্ঞানে তিনি লাভ করেন স্নাতকোত্তর ডিগ্রি। মেরিন বায়োলজিতে ডক্টরেট করার জন্য তিনি মাদ্রাজ (চেন্নাই) গিয়েছিলেন কিন্তু পিতার মৃত্যুর পরে তাঁকে গবেষণা ফেলে চলে আসতে হয়। বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি কিছুকাল প্রাণিবিদ্যা পড়িয়েছিলেন। তাঁর দাড়ি আর লম্বা চুলের জন্য ছাত্ররা তাঁকে ‘গুরুজি’ বলে ডাকতেন। নাগপুরে রামকৃষ্ণ সম্প্রদায়েরও সংস্পর্শে আসেন তিনি। ১৯৩৭ সালের ১৩ জানুয়ারি রামকৃষ্ণের শিষ্য ও বিবেকানন্দের গুরুভাই স্বামী অখণ্ডানন্দের দ্বারা রামকৃষ্ণ সম্প্রদায়ে দীক্ষিত হন এবং সন্ন্যাসীর মর্যাদা লাভ করেন।
বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং আর এস এসের সরসঙ্ঘচালক কে বি হেডগেওয়ারের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ভাইয়াজি দানি এই বিশ্ববিদ্যালয়ে আর এস এসের একটি শাখা স্থাপন করেন। দানির নির্দেশে গোলওয়ালকর আর এস এসের সংস্পর্শে আসেন। পরে হেডগেওয়ারের সঙ্গেও তাঁর পরিচয় হয়। তাঁর নিষ্ঠায় মুগ্ধ হয়ে হেডগেওয়ার তাঁকে নাগপুরে আর এস এসের কর্মীদের প্রশিক্ষণ শিবিরে আমন্ত্রণ জানান। গোলওয়ালকর হয়ে ওঠেন হেডগেওয়ারের উত্তরসূরী। ১৯৪০ সালে হেডগেওয়ারের মৃত্যু হলে গোলওয়ালকর হন সরসঙ্ঘচালক। দীর্ঘ তিন দশক ধরে তিনি নেতৃত্ব দেন আর এস এস বা রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘকে।
ধীরেন্দ্রকুমার ঝা-এর ‘গোলওয়ালকর : দ্য মিথ বিহাইন্ড দ্য ম্যান, দ্য ম্যান বিহাইণ্ড দ্য মেশিন’ বইটির সমালোচনা প্রসঙ্গে অপূর্বানন্দ লিখেছেন যে গোলওয়ালকর এক ঘৃণা ও সন্ত্রাস ছড়ানোর যন্ত্রনির্মাতা। সেই যন্ত্র হল আর এস এস। হেডগেওয়ার আর এস এস প্রতিষ্ঠা করলেও গোলওয়ালকরই তাকে বহু মাথাওয়ালা দানবে রূপান্তরিত করেন। [‘Golwalkar is the name of the person who created a machine of hatred and violence . RSS is the machine. It can be said that RSS was founded by Hedgewar, but it is true that the credit or responsibility for the form in which this organization exists today goes to Golwalkar. Golwalkar transformed a single body to a hydra-headed beast or a satanic machine with hundreds of faces but with a single purpose : manufacturing a Hindu who is supremacist, exclusivist and hateful of others’ — Golwalkar : The Father of Indian Fascism]
গোলওয়ালকরের যে দুটি বই থেকে আমরা এমন কিছু উদ্ধৃতি পরিবেশন করব যার থেকে বোঝা যাবে তিনি কিভাবে হিন্দুত্ববাদের রাজনৈতিক রূপ দিয়েছিলেন ; যার সূত্র ধরে পরবর্তীকালে বিজেপি তাদের কর্মপদ্ধতি তৈরি করেছে। প্রথম বইটি হল ‘We or Our Nationhood Defined’. ১৯৩৯ সালে প্রকাশিত এই বইকে আর এস এস তাদের ‘বাইবেল’ বলে মনে করে। দ্বিতীয় বইটি তাঁর বক্তব্যের সংকলন ‘Bunch of Thoughts’
বিভিন্ন বিষয়ে গোলওয়ালকরের বক্তব্যের কিছু কিছু অংশ :
১] ভারত হিন্দুদের দেশ। শিখ, জৈন, বৌদ্ধ অথবা আদিবাসীদের নিয়ে কোন সমস্যা নেই। ভারতের সমস্যার মূলে আছে মুসলমান ও খ্রিস্টানরা। এদের বিরুদ্ধে হিন্দুদের ক্ষমাহীন যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে।
২] যারা বলে ‘হিন্দু-মুসলমান ঐক্য ছাড়া স্বরাজ সম্ভব নয়’, তারা আসলে দেশদ্রোহী :
৩] হিন্দু ভারতে সমতা বা সম-অধিকারের ভিত্তিতে মুসলমানদের স্থান থাকবে না। মুসলমানরা নিজেদের মতো উপাসনা করতে পারবে। তবে হিন্দুদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কাছে মাথা নত করলে তারা ভারতে থাকার অধিকার লাভ করবে।
৪] হিন্দু মানসে অক্ষমতার বীজ বপনের জন্য দায়ি হলেন নেতৃবৃন্দ। যে জাতি শিবাজির মতো বীরের জন্ম দিয়েছে, তাদেরকে অক্ষম বলে তাদের স্পিরিট নষ্ট করে দেওয়া হচ্ছে। ঐতিহাসিক যদুনাথ সরকার ঠিকই বলেছেন, ‘সারা দুনিয়ার কাছে প্রমাণিত হয়েছে যে হিন্দুরা অমরত্বের ঝরনা থেকে পান করেছেন মৃতসঞ্জীবনী।’
৫] মুসলমানরা অস্পৃশ্য, বহিরাগত এবং লুঠেরা।
৬] নিজেদের জীবন রক্ষার্থে অথবা স্বার্থলোভে হিন্দুরা মুসলমান ধর্ম গ্রহণ করেছে। এই দুর্বলচেতা হিন্দুদের বংশধর বা তাদের পরবর্তী প্রজন্ম হচ্ছে এখনকার মুসলমান। এদের রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রশ্রয় দেওয়া উচিত নয়।
৭] হিন্দুদের মারাত্মক দুর্বলতার ফলে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে।
৭] আওরঙ্গজেব এক কুখ্যাত হিন্দু-বিরোধী ফ্যানাটিক। তার যে সব হিন্দু জেনারেল ছিল তারা আসলে হল গদ্দার। মানসিংহ আকবরের হয়ে ধাওয়া করেছিল রানা প্রতাপকে, তেমনি রাজা জয় সিং; যশোবন্ত সিং আওরঙ্গজেবের হয়ে তাড়া করেছিল শিবাজিকে। দেশের মানুষ হয়ে দেশের মানুষকে আক্রমণ যারা করে তারা গদ্দার ছাড়া কিছুই নয়। এইজন্য গীতায় বলা হয়েছে — ‘আমরাই আমাদের বন্ধু এবং আমরাই আমাদের শত্রু।’
৮] বখতিয়ার খিলজি এক রক্তপিপাসু মানুষ। সে রক্তের নদী বইয়ে দিয়ে গেছে, মাস কনভারশন করিয়েছে, নারী অপহরণ করেছে, নালন্দা বিহারের হাজার হাজার ছাত্র ও শিক্ষককে কসাই-এর মতো জবাই করেছে, শহরের জনগণের মাথা কেটে ফেলেছে, গ্রন্থাগারে আগুন দিয়ে হাজার হাজার বছরের জ্ঞানসাধনার ক্ষেত্রকে বনফায়ার বানিয়েছে।
৯] হিন্দুদের মারাত্মক দুর্বলতার সুযোগে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে।
১০] পঞ্জাব আর বাংলা হল বেদের জন্মস্থান। এখানে ছিলেন সাধু, কবি আর বিপ্লবীরা। এই পঞ্জাব আর বাংলার অর্ধেক অংশ হস্তগত হয়েছে হিন্দুর শত্রু মুসলমানদের।
১১] তাজমহল নিয়ে গর্ব করে না এমন হিন্দু দুর্লভ। তাদের মনোভাব এমন যে ইসলামি স্থাপত্য যেন ভারতের অংশ, ভারতীয় গর্বের প্রতীক, অথচ যাদের হাতে এসব প্রতিষ্ঠিত তারা ইসলামের অনুসারী ; সেই মুসলিমরা হাজার বছর ভারতে বাস করলেও আসলে তারা বহিরাগত।
১২] ভারতের ইতিহাসকে বিকৃত করা হচ্ছে। হিন্দুদের স্বর্ণযুগ রামায়ণ-মহাভারতের সমকালকে উল্টে-পাল্টে দেওয়া হচ্ছে। এসবকে মাইথলজি, গল্পগাথা আর অন্ধকার যুগ বলা হচ্ছে। হিন্দুদের ইতিহাস সোনার অক্ষরে লেখা হলেও তাকে অন্ধকার যুগ বলা হচ্ছে।
১৩] ভারতে হিন্দুজাতি ছাড়া অন্য কোন জাতির গৌরবগাথা থাকতে পারে না। ভারতের আদিতেও হিন্দু, অন্ত্যেও হিন্দু। মাঝামাঝি আর কিছু নেই।
১৪] খ্রিস্টান কনভেন্টগুলি এ দেশের হিন্দুদের মগজ ধোলাই করছে।
১৫] ইংরেজি শিক্ষিত হিন্দুরা অতীতের হিন্দুযুগকে অজ্ঞতা আর অন্ধকারের যুগ বলে মনে করছে। এটা তাদের মগজ ধোলাইএর ফলে হয়েছে।
লক্ষ্য করলে দেখা যাবে গোলওয়ালকরের এই সব বক্তব্য সাম্প্রতিককালের বিজেপি নেতাদের কণ্ঠে উচ্চারিত হচ্ছে। গোলওয়ালকরই তাঁদের আসল গুরুজি। [ক্রমশ]