পাঁচ. হিন্দুত্বরথযাত্রার অচেতন সারথি
অবশেষে আমাদের দেশের এক প্রাচীন, স্বতঃস্ফূর্ত মহাকাব্যের ধীরোদাত্তগুণসম্পন্ন নায়ক হলেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ ও ভারতীয় জনতা দলের রথযাত্রার সারথি। সুদূর অতীত ও নিকট বর্তমানের আশ্চর্য মেলবন্ধন। মহাকাব্যের মধ্যে থাকতে পারে ইতিহাসের উপাদান, কিন্তু শাস্ত্রের মতো মহাকাব্যই যে ইতিহাস — এই বোধ ও বিশ্বাস তৈরি করে দেওয়া হল চমৎকারভাবে। তা না হলে হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতি দাঁড়াবে কোন ভিত্তির উপরে? কিভাবেই বা তার বিপণন করা যাবে? আর সেই কাজে এগিয়ে এলেন গত শতাব্দীর দুই নায়ক — লালকৃষ্ণ আদবানি (১৯২৭-) ও অটলবিহারী বাজপেয়ী (১৯২৪-২০১৮)।
১৯৭৫ সালে ইন্দিরা গান্ধী (১৯১৭-১৯৮৪) ঘোষণা করেন জরুরি অবস্থা। অটলবিহারী বাজপেয়ীসহ বহু বিরোধী নেতাকে গ্রাপ্তার করা হয়। এই সময়ে আর এস এসের সর্বক্ষণের কর্মী বা প্রচারকরা গোপনে গোপনে জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে কাগজপত্র বিলি করছিলেন, কোথাও কোথাও আইন অমান্য করছিলেন। অটলবিহারী বাজপেয়ী কংগ্রেসের বিরুদ্ধে একটি মোর্চা গঠনে বিশেষ ভূমিকা নিয়েছিলেন। সেই মোর্চার নাম জনতা পার্টি। ১৯৭৭ সালের ২০ জানুয়ারি সংগঠন কংগ্রেস, ভারতীয় লোকদল, সোশ্যালিস্ট পার্টি এবং জনসংঘের দলের নেতারা একত্রিত হয়ে এই জনতা পার্টি তৈরি করেন। মূল উদ্যোক্তা ছিলেন জয়প্রকাশ নারায়ণ (১৯০২-১৯৭৯)। নির্বাচনে কংগ্রেস পায় ১৫৪টি আসন আর জনতা দল পায় ২৯৮টি আসন, এর মধ্যে জনসংঘের ছিল ৯০টি আসন। প্রধানমন্ত্রীর দাবি জনসংঘের অটলবিহারী জানান নি বয়সের কারণে, তাই প্রধানমন্ত্রী হলেন মোরারজি দেশাই (১৮৯৬-১৯৯৫)। জনসংঘের মন্ত্রী ছিলেন তিন জন। এভাবেই ভারতীয় রাজনীতিতে উথ্থান ঘটল হিন্দুত্ববাদীদের। ১৯৮০ সালে জনতা দলের পতন হলে বাজপেয়ি প্রস্তাব করেন যে জনসংঘকে নতুন মোড়কে একটি মূলধারার রাজনৈতিক দলে পরিণত করতে হবে। এভাবেই জন্ম হল বিজেপি বা ভারতীয় জনতা দলের। ১৯৮৪ সালের নির্বাচনে সেই বিজেপি লাভ করে মাত্র ২টি আসন।
বিজেপি ঠিক করে যে হিন্দুত্বের রাজনীতির বিপণন করে তাকে অগ্রসর হতে হবে।
তাই রামরথযাত্রা। হিন্দুদের পবিত্র শহর সোমনাথ থেকে গুজরাট, মহারাষ্ট্র, অন্ধ্রপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, বিহার হয়ে রথ পৌঁছাবে অযোধ্যা। এই সেই অযোধ্যা, যেখানে জন্মগ্রহণ করেছিলেন রামচন্দ্র। এই সেই অযোধ্যা যেখানে রামের জন্মস্থানের উপর ‘বিধর্মী’রা তৈরি করেছে বাবরি মসজিদ।
১৯৯০ সালের সেপ্টেম্বর থেকে যার শুরু। উদ্দেশ্য বাবরি মসজিদের জায়গায় হিন্দু দেবতা রামের মন্দির স্থাপন। নেতৃত্বে লালকৃষ্ণ আদবানি। একটি টেয়েটো গাড়িকে রথের আকার দান করা হয়েছিল। সেটা অবশ্য শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ছিল। রথে ছিলে আদবানি। পৌরাণিক দেবতাদের পোশাক পরে কর্মীরা পাহারা দিচ্ছেন রথ। রথের পাশে ধর্মীয় গান গাইতে গাইতে চলেছেন আর একদল কর্মী। তৈরি হয়েছে চমৎকার আবহ। বিশ্ব হিন্দু পরিষদ আর বজরং দলের লোকেরা মুসলমানদের নিন্দা করে লিফলেট বিলি করতে করতে পথ চলছে।
উপহার দেওয়া হচ্ছে আদবানিকে। কি উপহার? গেরুয়া পতাকা, তরবারি, তির-ধনুক। ধর্মীয় স্তোত্রের পাশাপাশি উচ্চারিত হচ্ছে যুদ্ধের ধ্বনি।
এই যাত্রা যেন নতুন এক গণ আন্দোলন। আদবানি প্রতিদিন গড়ে ৩০০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করছেন, প্রতিদিন কমপক্ষে ৬টি ভাষণ দিচ্ছেন। গুজরাটের প্রায় ৬০০ গ্রামের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করেছিল রথ। প্রায় ৫০টি সমাবেশ হয়েছে সেখানে। জেতপুর গ্রামে রোমাঞ্চকর ঘটনা। হিন্দু জাতীয়তাবাদী কর্মীরা আদবানিকে দিলেন তাঁদের শরীরের রক্তে পরিপূর্ণ একটি পাত্র। মহারাষ্ট্রেও তীব্র উত্তেজনা শিবসেনা কর্মীদের মধ্যে। তারপর তেলেঙ্গানা, তারপর মধ্যপ্রদেশ, তারপর রাজস্থান।
মানুষ দেখছে সেই বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। অনুপ্রাণিত হচ্ছে। গলা মেলাচ্ছে স্লোগানে। কি সেই স্লোগান? — গর্ব সে কাহো হাম হিন্দু হ্যায় — গর্বের সঙ্গে বলো আমি হিন্দু।
আর আদবানি তাঁর বক্তৃতায় বলে যাচ্ছেন গোলওয়ালকরের কথাগুলি। অযোধ্যা বিরোধকে চিত্রিত করেছেন রাম ও মোগল সম্রাট বাবরের লড়াই হিসেবে। বলেছেন, বাবরি মসজিদের জায়গায় রামের মন্দির নির্মিত না হওয়া পর্যন্ত হিন্দুরা থাকতে পারবে না শান্তিতে।
রামরথযাত্রা যখন উত্তরপ্রদেশের সীমান্তের কাছে তখন প্রধানমন্ত্রী ভি পি সিং বিহারের মুখ্যমন্ত্রী লালুপ্রসাদ যাদবকে (১৯৪৮-) নির্দেশ দেন আদবানিকে গ্রেপ্তার করার জন্য। গ্রেপ্তার হলেন আদবানি। গ্রেপ্তার হলেন বিশ্ব হিন্দু পরিষদের নেতা অশোক সিংহল (১৯২৬-২০১৫)। তবু দমলেন না কর্মী বা করসেবকরা। তাঁরা অগ্রসর হতে লাগলেন অযোধ্যার দিকে। উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী মুলায়ম সিং যাদব (১৯৩৯-২০২২) ১ লক্ষ ৫০ হাজার করসেবককে জেলে পাঠান।
কিন্তু যুদ্ধটা যে ধর্মযুদ্ধ।
উৎসাহী করসেবকদের কে দমাবে। ধরপাকড়ের মধ্যেও প্রায় ৭৫ হাজার করসেবক পৌঁছে গেলেন অযোধ্যা নিরাপত্তারক্ষাকর্মীদের বেষ্টনী ভেদ করে। বাবরি মসজিদের উপরে উঠে গেরুয়া পতাকা লাগালেন, অন্যরা হাতুড়ি আর কুড়াল দিয়ে মসজিদ ভাঙার চেষ্টা করতে লাগলেন। নিরাপত্তারক্ষাকর্মীদের সঙ্গে যুদ্ধ হয় করসেবকদের। বিশ্ব হিন্দু পরিষদের প্রায় ২০ জন স্বেচ্ছাসেবক নিহত হন। তাঁদের শহিদ হিসেবে প্রচার করা হয়। এই মৃত্যুর প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য উদ্বুদ্ধ করা হয় মানুষকে।
জয়পুর, যোধপুর, অমেদাবাদ, বরোদা, হায়দ্রাবাদ প্রভৃতি স্থানে হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গা বেধে যায়। ১ সেপ্টেম্বর থেকে ২০ নভেম্বরের মধ্যে মোট ১১৬টি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় নিহত হন ৫৬৪ জন মানুষ।
রামরথযাত্রা করে, হিন্দুত্বের রাজনীতির বিপণন করে হাতে হাতে ফল পেল বিজেপি। ১৯৯১ সালের সাধারণ নির্বাচনে তারা পেল ১২০টি আসন, হিন্দি বলয়ের গ্রামাঞ্চলে তাদের শক্ত ভিত্তি তৈরি হল। মহাকাব্যের নায়ক রামচন্দ্র হলেন রাজনৈতিক পুঁজি। সাধে কি তুলসীদাস বলেছিলেন, ‘রাম রতন ধন পায়ো’ ! [ক্রমশ]