৬. যুদ্ধজয়ের হাসি
যুদ্ধ? কিসের যুদ্ধ? বাবরি মসজিদ ভেঙে দিয়ে সেই জায়গায় রামমন্দির প্রতিষ্ঠার যুদ্ধ। জনমানসে হিন্দুত্ববাদী বিজেপির ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠার যুদ্ধ। কংগ্রেসি জমানায় বিজেপির শক্তি প্রতিষ্ঠার যুদ্ধ। সেই যুদ্ধ হল ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর। প্রকাশ্য দিবালোকে।
আজ কংগ্রেস হিন্দুত্ববাদী বিজেপির বিরোধিতা করছে। কিন্তু হিন্দুত্ববাদী দৈত্যটিকে কে অচেতনভাবে বাড়তে সাহায্য করেছে?
১৯৪৯ সালের ২২ নভেম্বর যেদিন বাবরি মসজিদের ভেতরে গভীর রাতে অটটি ধাতুর তৈরি রামলালার ৭ ইঞ্চি মূর্তি স্থাপন করা হল, সেদিন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু তার গুরুত্ব বুঝতে পারেন নি। শশী থারুর লিখেছেন, — ‘Hindutva has become a credible political movement precisely because of the nature of the strategy pursued by the Indian States since Independence in relation to its religious communities.’ হিন্দু তোষণে সফল না হয়ে রাজীব গান্ধী বাবরি মসজিদের তালা খুলে দিলেন হিন্দুদের জন্য, যাতে তাঁরা রামলালার পুজো করতে পারেন। আর রামায়ণ সিরিয়ালের অনুমতি দিলেন। ১৯৯২ সালে যখন বাবরি মসজিদ ভাঙা হচ্ছে, তখন প্রধানমন্ত্রী কংগ্রেসের নরসীমা রাও। সাংবাদিক কুলদীপ নায়ার বলেছেন যে যখন করসেবকরা একের পর এক গম্বুজ ভেঙে ফেলছেন, তখন প্রধানমন্ত্রী আপন বাসভবনে পুজো করছিলেন।
বাবরি ধ্বংসের পূর্ব পরিকল্পনা ছিল। ৫ জুন তার মহড়া দেখেছিলেন ফটোজার্নালিস্ট প্রতিভা জৈন। তিনি লিখেছেন, — ‘১৯৮৭ সালে আমি পাইওনিয়ার পত্রিকায় যোগ দিই। পত্রিকার তরফে কয়েক বছর আমি অযোধ্যা আন্দোলন কভার করেছি। ১৯৯২ সালে ৬ ডিসেম্বরের আগে আমি কয়েকবার সেখানে গিয়েছিলাম। সুতরাং পরিবেশটা আমার চেনা ছিল। পত্রিকা সম্পাদক আমকে ৪ ডিসেম্বর অযোধ্যা যেতে বলেন। তদনুযায়ী আমি ৪ তারিখে অযোধ্যা চলে যাই। উঠি একটা হোটেলে। পরের দিন সে হোটেলে অন্যান্য সাংবাদিকরাও উঠেছিলেন। চারপাশের ঘটনা দেখে আমার কেমন যেন মনে হয়, শুধু আন্দোলন নয়, বাবরি মসজিদ ধ্বংস করার পরিকল্পনা আছে। সেদিন এক প্রেস কনফারেন্সে আমরা বিশ্ব হিন্দু পরিষদের নেতা অশোক সিংহলকে তাঁদের পরিকল্পনার কথা জাতে চাইলে তিনি ধূর্ত হাসি হেসে বলেন, অপেক্ষা করুন আর দেখতে থাকুন।
‘বিশ্ব হিন্দু পরিষদের নেতা বি এল শর্মার সঙ্গে আমার পূর্ব পরিচয় ছিল। তাঁর সঙ্গে ৪ ডিসেম্বর দেখা করতে তিনি বলেন, আগামী কাল আমার সঙ্গে দেখা করুন, আপনাকে একটা জিনিস দেখাব।
‘শর্মা আমাকে সমাবেশের ভেতরে ঢোকার জন্য একটা পরিচয়পত্র দিলেন। বিশ্ব হিন্দু পরিষদের পরিচয়পত্র। যেন আমি তাঁদের ফটোগ্রাফার।
‘৫ ডিসেম্বর গিয়ে দেখি পরের দিন অর্থাৎ ৬ ডিসেম্বর কিভাবে বাবরি মসজিদ ভাঙা হবে তার মহড়া চলছে। সেখানে অন্য কোন সাংবাদিক বা ফটোগ্রাফার ছিলেন না। শর্মার পাশে দাঁড়িয়ে মহড়ার ফটো তুলেছি। কেউ কিছু বলে নি বা সন্দেহ করে নি।
‘সন্ধেবেলায় সান-ই-আওধ হোটেলে ফিরে অন্য সাংবাদিকদের যখন আমার অভিজ্ঞতার কথা বললাম, তাঁরা কেউ বিশ্বাস করেন নি। পাইওনিয়ার সম্পাদক বিখ্যাত বিনোদ মেহেতাও বিশ্বাস করেন নি। পরের দিন আমার কথা যখন অক্ষরে অক্ষরে সত্য হল, তখন সম্পাদক বললেন ৫ ডিসেম্বরে আমি মহড়ার যে ছবি তুলেছি তা যেন যত্ন করে রেখে দিই, অনুকূল সময়ে তা প্রকাশ করা হবে।’
৫ তারিখে মহড়া হল, ৬ তারিখে আসল কাজ হল, প্রশাসন, গোয়েন্দাবিভাগ ও নিরাপত্তারক্ষাকর্মীরা কেউ কিছু বুঝতেই পারলেন না।
অবাক কাণ্ড। বিবিসির দক্ষিণ এশিয়ার সাংবাদিক মার্ক টুলি লিখেছেন, — ‘১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর আমি একটা বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়েছিলাম। সেখান থেকে বাবরি মসজিদ পরিষ্কার দেখা যায়।
‘ওই দিন বিজেপি ও তার সহযোগীরা মন্দির নির্মাণের কাজ শুরু করবেন বলে ঘোষণা করেছিলেন। তবে সরকার ও আদালতকে তাঁরা জানিয়েছিলেন যে ব্যাপারটা প্রতীকী হবে আর কিছু ধর্মীয় অনুষ্ঠান হবে। তাঁরা জানিয়েছিলেন মসজিদের কোন ক্ষতি হবে না।
‘সেখানে জড়ো হয়েছিলেন দেড় লক্ষ মানুষ। তাঁরা বিজেপি ও ভি এইচ পি নেতাদের বক্তৃতা শুনছিলেন। গোলমাল শুরু হল যখন মাথায় হলুদ ফেট্টি বাঁধা স্বেচ্ছাসেবকরা পুলিশ বেষ্টনী ভাঙার চেষ্টা করলেন।
‘তারপর শুরু হল টিভি সাবাদিকদের উপর আক্রমণ। তাঁদের ক্যামেরা ও টেপ রেকর্ডার ভেঙে ফেলা হয়। এতে উৎসাহিত হয়ে স্বেচ্ছাসেবকরা পুলিশ বেষ্টনী ভেঙে ছুটে যান মসজিদের দিকে। ইঁট ছুঁড়তে শুরু করেন পুলিশের দিকে। মসজিদের কেন্দ্রীয় গম্বুজের উপর উঠে যান দুই যুবক। তাঁদের দেখাদেখি আরও অনেকে গম্বুজের উপরে উঠে পড়েন।’
আনন্দবাজারের সাংবাদিক সঞ্জয় সিকদার বলেছেন যে — রথ যত এগিয়েছে, ততই তেতে উঠেছেন করসেবক ও রামভক্তরা। তাঁদের বিভিন্ন কৌশলে তাইয়েছেন নেতারা রামরথ যখন লক্ষ্মৌ পৌঁছাল তখন রামভক্তদের নিনাদে আকাশ-বাতাস কেঁপে উঠছে। ঝাণ্ডেওয়ালা ময়দানে (রাবড়ি পাক) তাঁরা নেতাদের গরম বক্তৃতা শুনলেন তারপর ছুটে গেলেন বাবরি মসজিদের দিকে।
শীতের শান্ত সকালে অশান্ত হয়ে উঠল অযোধ্যা।
বাবরি মসজিদের লঘু নিরাপত্তা বলয় ভেদ করে করসেবকরা উঠে গেলেন মসজিদের উপরে। তাঁদের হাতে ছিল কোদাল, শাবল, হাতুড়ি। প্রবল বিক্রমে মন্দির ভাঙার কাজ শুরু হল।
কি করছিলেন তখন প্রধানমন্ত্রী নরসীমা রাও?
কেন্দ্রীয় মন্ত্রী মাখনলাল ফতেদারে তাঁর আত্মকথায় (The Chinar Leaves, 2015) লিখছেন : — ‘আমি প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করেছিলাম বিমানবাহিনীকে নামাতে। ফৈজাবাদ শহরে বিমানবাহিনীর যে কটা চেতক হেলিকোপ্টার ছিল তা থেকে করসেবকদের ওপর কাঁদুনে গ্যাসের গোলা ছোঁড়ার পরামর্শ দিয়েছিলাম। তিনি বলেছিলেন, এটা আমি কি করে করব? আমি তাঁকে বলেছিলাম এ রকম জরুরি পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় সরকার যে কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারে, সে ক্ষমতা আছে। কাতর আর্তি জানিয়ে বলেছিলাম, রাওসাহেব, ধ্বংসের হাত থেকে অন্তত একটা গম্বুজ তো বাঁচান, সেই গম্বুজটাকে আমরা একটা কাচের ঘরে রেখে ভারতের মানুষকে যাতে বলতে পারি, বাবরি মসজিদ রক্ষা করতে আমরা সব রকম চেষ্টা করেছিলাম। কিছুক্ষণ চুপ করে থাকবার পর প্রধানমন্ত্রী বললেন, ফোতেদারজি আমি কিছুক্ষণ পরে আপনাকে ফোন করব।
‘প্রধানমন্ত্রীর অকর্মণ্যতায় ভীষণ নিরাশ হয়ে পড়েছিলাম আমি। রাষ্ট্রপতি শঙ্করদয়াল শর্মাকে ফোন করে তাঁর সঙ্গে দেখা করার সময় চাই। তিনি আমাকে বিকেল ৫.৩০-এ দেখা করতে বলেন। আমি যখন রাষ্ট্রপতি ভবনে যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বেরোচ্ছি, তখন প্রধানমন্ত্রীর ফোন এল, বলা হল সন্ধ্যা ৬টায় মন্ত্রীসভার বৈঠক ডাকা হয়েছে। তা সত্ত্বেও আমি রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। আমাকে দেখেই তিনি শিশুর মতো কেঁদে ফেললেন, বললেন, পিভি এটা কি করল? আমি তাঁকে বললাম, রেডিয়ো আর টিভির মাধ্যমে আপনি দেশবাসীর উদ্দেশ্যে কিছু বলুন। তিনি রাজি হলেন। কিন্তু তাঁর তথ্য উপদেষ্টা তাঁকে জানালেন, এর জন্য প্রধানমন্ত্রীর অনুমতি দরকার।’ [ক্রমশ]