৭. হিন্দুত্বের কারখানাঘর
গুজরাটকেই এক সাংবাদিক হিন্দুত্বের কারখানাঘর বলেছেন। সেই কারখানায় হাত পাকিয়েছেন গুজরাটের দুই ভূমিপুত্র। নরেন্দ্র দামোদর মোদি ও অমিত শাহ। ২০০২ সালে মুসলমানদের উপর আক্রমণ করে এই রাজ্য সংবাদের শিরোনামে উঠে এসেছিল। হঠাৎ করে তো এই গণহত্যা হয় নি। সলতে পাকানোর একটা পর্ব ছিল। সেই সলতে পাকানোর পর্বের অনেক তথ্য পরিবেশন করেছেন ‘উজানে’ নামক ইতিহাস ও সমাজবিজ্ঞানবিষয়ক একটি পত্রিকা। যেমন :
১] ১৯৯৭-৯৮ সালের আগস্ট মাস। সেন্ট মেরিজ ও আই পি মিশন স্কুল এবং ৪০টি উপাসনাস্থল ও চার্চ আক্রান্ত হয়। বিশ্ব হিন্দু পরিষদের কর্মীরা স্যামুয়েল নামক এক মেথডিস্ট খ্রিস্টানের দেহ কবর খুঁড়ে বের করে।
২] বিজেপি সরকার আন্তঃধর্ম বিবাহের ব্যাপারে নজর করার জন্য বিশেষ পুলিশ সেল গঠন করে। বিধানসভায় গৃহমন্ত্রী যুক্তি দেখান যে এ ধরনের বিবাহে স্বাধীন মতামতের বদলে হিন্দু মেয়েদের বলপূর্বক বিয়ে দেওয়া হচ্ছে। নারীদের উপর অত্যাচারের তদন্তকারী পুলিশ সেল ভেস্তে দেয়। ১৯৯৮ সালের ২৫ ডিসেম্বর গাডভি গ্রামের চার্চ ও উপাসনা মন্দির আক্রান্ত হয়। ২৭ ডিসেম্বর বরদেলি, সবেরপারা, গৌজেন, মূলচন্দ প্রভৃতি অঞ্চলের চার্চ ভেঙে দেওয়া হয়।
৩] ডিরেক্টার জেনারেল অব পুলিশ (ইনটেলিজেন্স) নির্দেশ দিলেন মুসলমান ও খ্রিস্টানদের সম্বন্ধে তথ্য সংগ্রহ করতে। নির্দেশিকার একদিন পরে যে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয় তাতে মুসলমান সম্প্রদায় সম্বন্ধে আক্রমণাত্মক উক্তি ছিল। ১৯৯৯ সালের ২১ ও ২২ জুলাই কার্গিলের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি করা হয় সাম্প্রদায়িক উন্মাদনা। কার্গিল যুদ্ধের মৃত সৈনিক মেহানিনগরের মুকেশ রাথোড়ের দেহ নিয়ে যে শহর পরিক্রমা হয় তাতে উপস্থিত ছিলেন হারীন পাঠক, লালকৃষ্ণ আদবানি। এই প্রসঙ্গে দেওয়াল লিখন করা হয় :
‘খুন কে তিলক করো, গলিয়োঁ সে আরতি, পুকারতি হ্যায় ইয়ে জমিন, পুকারতি মা ভারতী।’
মুসলমান রেস্তোঁরা ‘ভাগ্যোদয়ে’ আগুন লাগান বজরং দলের দুই কর্মী। বিজেপি ও ভি এইচ পি দলের সদস্যরা দাঙ্গা বাধান দরিয়াপুর, ডাবগারওয়াদ, ভদিগাম, কাল্লুপুরে। বেশ কয়েকজন মুসলমান ছুরিকাহত হন। ধর্মান্তরীকরণের জন্য গুজরাট বিধানসভায় বিল আনা হয়।
৪] ২০০০ সালের জানুয়ারিতে ৬ বার খ্রিস্টান স্কুল আক্রমণ করা হয়। ওই সালের ফেব্রুয়ারিতে যে গোপন দলিল সংগৃহীত হয় তার মূল কথা : ‘যেহেতু এখন আমাদের সরকার তাই ঠিক ঠিক সুবিধাগুলো এর থেকে নেওয়া দরকার এবং আমাদের কাজও এই সরকারকে দিয়ে করানো উচিত।’ এই সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আমদাবাদের পালাড়ি অঞ্চলে অবস্থিত বিশ্বকুঞ্জ সোসাইটির নির্মিত তুলসী অ্যাপার্টমেন্টে বিজেপির পুর প্রতিনিধিদের নেতৃত্বে মুসলমানদের ঘরগুলিতে বোমা বর্ষণ করা হয় যাতে মুসলমানরা পালাড়ি অঞ্চলে ঢুকতে না পারে। মার্চ মাসে ইদ উৎসবের আগে গাভী নিরাপত্তা আইনের উপর জোর দেওয়া হয়। আগস্ট মাসে সুরাট, আমদাবাদ, খের ব্রহ্ম, লাম্বাদিয়া, রাজকোট, মোদাসায় মুসলমানদের সম্পত্তি ধ্বংস করা হয়। ডিসেম্বরে শুরু হয় খ্রিস্টান বিদ্যালয় বাছাইকরণ অভিযান।
৫] ২০০১ সালের জানুয়ারিতে ভূমিকম্পের পরে উদ্ধার ও পুনর্বাসনের ব্যাপারে সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধি দেখা যায়। এই মাসে রাজ্য শিক্ষা দপ্তর এক বিজ্ঞপ্তি জারি করে নির্দেশ দেয় যে প্রতিটি বিদ্যালয়কে আর এস এসের ‘সাধনা’ পত্রিকার গ্রাহক হতে হবে।
৬] ২০০১ সালের নভেম্বর মাসে পাটনে জেলার চান্নাম্মার ৫৫০ জন মুসলমানকে ঘর ছাড়তে বাধ্য করা হয়। মুসলমানদের মৃতদেহ কবর থেকে বের করে দেওয়া হয় এবং কবরখানার জমি গেরুয়া পতাকা দিয়ে মুড়ে দেওয়া হয়।
এবার আমরা উল্লেখ করব গুজরাটে সাম্প্রদায়িক উস্কানিমূলক কিছু পুস্তিকা ও প্রচারপত্রের কথা, যা বিলি করে মানুষকে উত্তেজিত করা হয়েছিল।
১] বিশ্ব হিন্দু পরিষদের রাজ্য নেতা চিনুভাই প্যাটেলের চিঠি : ‘ যে কোন সময়ে আপনি খুন হতে পারেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলেছিলেন—অস্ত্র ধারণ করো, অধার্মিকদের হত্যা করো।’
২] ‘একজন প্রকত হিন্দু দেশভক্ত’ আর একটি পুস্তিকায় হিন্দুদের অনুরোধ করেছেন —
ক] কোন মুসলমান দোকানদারের কাছ থেকে কিছু কিনবেন না।
খ] মুসলমানদের কোন জিনিস বিক্রি করবেন না।
গ] মুসলমান হিরো-হিরোইনদের সিনেমা দেখবেন না।
মুসলমানদের যেমন কোন কাজ দেবেন না, তেমনি তাদের কোন কাজও করবেন না।
৩] আর একটি পুস্তিকার শিরোনাম ‘ ওঠো, জাগো, ঐক্যবদ্ধ হও, ঢিলের বদলে পাটকেল নাও’।
হিন্দুদের আহ্বান জানিয়ে বলা হয়েছে তাঁরা যেন রামনাম নিয়ে সৈন্যবাহিনী প্রস্তুত করেন। যেভাবে বাবরি ধ্বংস করা হয়েছে সেভাবে জামালপুর জ্বালাতে হবে, দরিয়াপুর খালি করতে হবে।
এই পুস্তিকায় নরেন্দ্র মোদির প্রশস্তি করে বলা হয়েছে :
‘নরেন্দ্র মোদিকে ধন্যবাদ। সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের পর একজন হিরো জন্মেছেন, গুজরাট গর্বিত। ভারতের গরিমা আপনার হাতের মুঠোয়।’
৪] আর এক পুস্তিকার শিরোভাগে আছে : শুধুমাত্র হিন্দু যুবাদের জন্য বজরং দলকে ওদের তির-ধনুক প্রস্তুত করতে দিন যুদ্ধই একমাত্র মুক্তির পথ।
৫] ‘জেহাদ’ নামক একটি পুস্তিকায় মুসলমানদের বিরুদ্ধে অশ্লীল বিষোদগার করা হয়েছে fuck শব্দটি ব্যবহার করে।
৬] আর এক পুস্তিকায় আর এস এসের সদস্যদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে :
ক] দিনে দুবার — সকাল ও সন্ধ্যায় মন্দিরে যাও।
খ] নেতা যখন তোমাদের সাহায্য চাইবেন, তখনই সাহায্য করতে প্রস্তুত থেকো।
গ] যখন সেনাবাহিনী যাবে তখন বোমা নিষ্ক্রিয় করো।
ঘ] খাকি প্যান্ট ও সাদা সার্ট পরো, হাতে একটা দড়ি বাঁধো।
ঙ] মুসমানদের পেছন থেকে আক্রমণ করো।
চ] পুলিশকে সত্য পরিচয় দিও না।
ছ] প্রতি সদস্য অন্তত একবার ১০ জন লোকের সঙ্গে লড়াই করার প্রশিক্ষণ নাও।
জ] অস্ত্রশস্ত্রসহ পুলিশের হাতে পড়ো না।
ঝ] বেশিরভাগ রাতের দিকে আক্রমণ করো। [ক্রমশ]