৮. দোষ কারও নয় গো মা
২০০১ সাল থেকে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের অশোক সিংহল ও রামজন্মভূমি ন্যাসের রামচন্দ্র পরমহংস রামজন্মভূমি নির্মাণের ব্যাপারে চাপ সৃষ্টি করছিলেন প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ীর উপরে। তাই প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে অটলবিহারী তৈরি করেন অযোধ্যা সেল। সেই সেলের ভার দেওয়া হয় তরুণ আমলা শত্রুঘ্ন সিংহের উপর। অযোধ্যা সেল মন্দির-মসজিদ বিতর্কের সমাধান হিসেবে তিনটি সূত্র দেয়। কিন্তু সেই সূত্র অল ইণ্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ড, বাবরি মসজিদ অ্যাকশন কমিটি, সুন্নি সংগঠন প্রত্যাখ্যান করে। অযোধ্যা সেলের কোন প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয় নি।
তবে তাৎক্ষণিক সংঘর্ষ এড়াতে সাহায্য করেছিলেন অযোধ্যা সেলের অফিসার। তাঁর অনুরোধে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ বিতর্কিত স্থানে রাম মন্দিরের শিলান্যাস বন্ধ রাখেন।
সংঘর্ষ কিন্তু হল। অযোধ্যায় নয়, গুজরাটে। তখন সে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ১৯৮৩ সালের নেলির দাঙ্গা, ১৯৮৪ সালের দিল্লির দাঙ্গা, ১৯৮৯ সালের ভাগলপুর দাঙ্গা, ১৯৯২-৯৩ সালের মুম্বাই-এর দাঙ্গার চেয়ে গুজরাটের দাঙ্গা আরও ভয়াবহ।
২০০২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারির সকাল। অযোধ্যা থেকে আমদাবাদ আসছিল সবরমতী এক্সপ্রেস। এই ট্রেনের বেশির ভাগ যাত্রী ছিলেন হিন্দু। তাঁরা ফিরছিলেন অযোধ্যা থেকে। অযোধ্যায় ভগ্ন বাবরি মসজিদের কাছে এক ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গিয়েছিলেন তাঁরা। রামলালার অনুষ্ঠান। এটাই যে রামচন্দ্রের বাসভূমি এই বিশ্বাস গেঁথে দেওয়া হয়েছে হিন্দু জনতার মনে। লাগাতার প্রচার করে যাচ্ছেন হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলি। সেই সূত্র ধরে রাজনৈতিক মঞ্চের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বিজেপি।
সকালবেলা সবরমতী এক্সপ্রেস থামল গোধরা স্টেশনে। প্ল্যাটফর্মে যাত্রী ও বিক্রেতাদের মধ্যে বচসার পরিণতি নাকি সংঘর্ষ। ৪টি কোচে অগ্নিসংযোগ। ট্রেনের যাত্রীদের মধ্যে ২৫ জন শিশু, ২৫ জন মহিলা, ৯ জন পুরুষ অগ্নিদগ্ধ। বিশ্ব হিন্দু পরিষদ রাজ্যব্যাপী ধর্মঘট ডাকল। সুপ্রিম কোর্ট এই ধর্মঘটকে অসাংবিধানিক বলেছিলেন। রাজ্যের বিজেপি সভাপতি রানা রাজেন্দ্র সিং সমর্থন করলেন ধর্মঘটকে। তাঁদের বক্তব্য ট্রেনে এই হামলার পেছনে আছে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা। ভারতের হিন্দুদের বিনাশই তাদের কাম্য।
পরের দিন, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হয়ে গেল দাঙ্গা। খাকি শর্টস আর জাফরান পোশাক পরা মানুষ এই দাঙ্গার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীর অভিমত। মূলত আক্রমণ করা হয় মুসলমানদের। তাঁদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়। নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। নারী ও শিশুকেও রেহাই দেওয়া হয়নি। শিশুদের মুখে জোর করে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। নারীদের গণধর্ষণ করে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। পুলিশের গুলিতেও অনেকে নিহত হয়।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী দাঙ্গায় ১০৪৪ জন নিহত, ২৫০০ জন আহত, ২২৩ জন নিখোঁজ হন। নিহতদের মধ্যে ৭৯০ জন মুসলমান ও ২৫৪ জন হিন্দু ছিলেন। সংশ্লিষ্ট নাগরিক ট্রাইবুনাল রিপোর্টের অনুমান ১৯২৬ জন নিহত হতে পারে। অন্যান্য উৎস অনুসারে মৃতের সংখ্যা ২ হাজারের বেশি। নৃশংস হত্যার পাশাপাশি ধর্ষণ, ব্যাপক লুটপাঠের খবর পাওয়া যায়।
ক্ষতিগ্রস্তদের বেশিরভাগ যে মুসলমান সে কথা বলেছেন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, ও শ্রীলঙ্কার মহিলা আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত এক আন্তর্জাতিক তথ্য কমিটি জানিয়েছে যে সন্ত্রাসের কৌশল হিসেবে মহিলাদের উপরে যৌন নির্যাতন চালানো হয়। কল্পনা কন্নবিরন একে সুসংহত, পূর্বপরিকল্পিত কৌশল বলেছেন। হর্ষ মান্দার বলেছেন :
‘There was a distinct, tragic and ghastly feature of the state-sponsored carnage unleashed against Muslim minority in Gujrat — which was the systematic sexual violence committed against young girls and women, Rape was used as an instrument for the subjugation and humiliation of a community.’
দাঙ্গা নিবারণে মুখ্যমন্ত্রী মোদি ও গুজরাট সরকারের ভূমিকা সম্বন্ধে সংবাদ মাধ্যম ও বিরোধীরা প্রশ্ন তুলেছিলেন। মানবাধিকার কর্মীরাও সরকারের ভূমিকা নিয়ে সরব হয়েছিলেন। ভারতীয় সেনাবাহিনীর লেফটেনান্ট জেনারেল জমিরুদ্দিন শাহ তাঁর ‘দ্য সরকারি মুসলমান’ বইতে দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে সরকারের ভূমিকার সমালোচনা করেছেন। তিনি জানিয়েছেন যে ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকলেও বাহিনীকে নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়।
মাননীয় সুপ্রিম কোর্ট SIT নামে যে তদন্ত দল গঠন করেন, সেই দল মুখ্যমন্ত্রীর যে সব ত্রুটির উল্লেখ করেছিলেন সেগুলি :
ক ] মোদির সাম্প্রদায়িক মনোভাব
খ ] মোদির বৈষম্যমূলক আচরণ
গ ] মোদির আক্রমণাত্মক ভাষণ
ঘ ] নিরপরাধদের হত্যাকে ন্যায্যতা দান
ঙ ] গৌরবযাত্রার বিতর্কিত ভাষণ
চ ] অবৈধ বন্ধে হস্তক্ষেপ না করা
ছ ] গুরুত্বপূর্ণ নথি ধ্বংস।
গুজরাট দাঙ্গার বিচারের জন্য ২০০২ সালে কে জি শাহের নেতৃত্বে গঠিত হয় কমিশন। পরে কমিশনের নেতৃত্বে আসেন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি জি টি নানাবতী। তাঁর রায়ে নরেন্দ্র মোদি ও তাঁর সরকার, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, বজরং দল, ভারতীয় জনতা দল নির্দোষ বলে প্রমাণিত হয়।
২০১৪ সালে নানাবতী পেশ করেন ৯ খণ্ডের ২৫০০ পাতার রিপোর্ট। সেখানে বলা হয় গোধরার ঘটনায় হিন্দুরা ক্ষিপ্ত হয়, তবে এটা কোন ষড়যন্ত্র নয়। ঠিক এই ঘটনা ঘটল বাবরি মসজিদ ধ্বংসের মামলায়। লিবেরহান কমিশন যাঁদের দোষী বলেছিলেন, তাঁরা সুপ্রিম কোর্টের বিচারকের রায়ে নির্দোষ হয়ে গেলেন। যে বিচারক এই রায় দিলেন তিনি হাতে হাতে পুরস্কার পেলেন।
দোষ কারও নয় গো মা, দোষ কারও নয়।
সমাপ্ত