বঙ্গদেশ ও ‘হিন্দুত্ব’
আজ গোটা দেশময় ঘুরে বেড়াচ্ছে ‘হিন্দুত্ব’ শব্দটি। আরএসএস ও বিজেপি এই শব্দকে ব্রহ্মাস্ত্র করে তুলে দিল্লির গদিটাকে শক্ত-পোক্ত করতে চাইছে। কে এই শব্দকে প্রথম ব্যবহার করেন? বীর সাভারকর (১৮৩৩-১৯৬৬)? না, এই শব্দ প্রথম ব্যবহার করেন এক বাঙালি। নাম তাঁর চন্দ্রনাথ বসু (১৮৪৪-১৯১০)। ১৯২৩ সালে প্রকাশিত হয় সাভারকরের Essentials of Hinditva এবং ১৯২৮ সালে প্রকাশিত হয় Hinditva : Who is Hindu. সাভারকরের এই দুটি বই প্রকাশের অনেক আগে, ১৮৯২ সালে, প্রকাশিত হয়েছিল চন্দ্রনাথ বসুর ‘হিন্দুত্ব’ বইটি।
চন্দ্রনাথ বসুর বইটির আলোচনা আগে উল্লেখ করা দরকার যে ১৮৯২ সালের অনেক আগে থেকেই বাংলায় হিন্দুত্বের চর্চা শুরু হয়েছে। ১৮৬৬ সালে প্রকাশিত হয় ‘ঊণবিংশপুরাণ’ নামে একটি বই। বইটিতে লেখকের ছদ্মনাম দেওয়া হয়েছে। সে নাম হল : কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস। অনেকে মনে করেন ভূদেব মুখোপাধ্যায় (১৮২৭-১৮৯৪) ছদ্মনামে এই বই লিখেছিলেন। এই বইতে ভারতকে মাতৃরূপে কল্পনা করা হয়েছে। ১৮৬৭ সালে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮১৭-১৯০৫), নবগোপাল মিত্র (১৮৪০-১৮৯৪), রাজনারায়ণ বসু (১৮২৬-১৮৯৯) প্রভৃতিরা গড়ে তোলেন ‘হিন্দুমেলা’। এই মেলার উদ্দেশ্য সম্বন্ধে গগণেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও নবগোপাল মিত্র লিখলেন : —
১. এই মেলাভুক্ত একটি সাধারণ মণ্ডলী হইবে, তাঁহারা হিন্দুজাতিকে উপরোক্ত লক্ষ্য সকল সংসাধন জন্য একদলে অভিভুক্ত এবং স্বদেশীয় লোকগণ মধ্যে পরস্পরের বিদ্বেষভাব উন্মুলন করিয়া উপরোক্ত সাধারণ কার্য্যে নিয়োগকরতঃ এই জাতীয় মেলার গৌরব বৃদ্ধি করিবেন।
২. প্রত্যেক বৎসরে আমাদিগের হিন্দু সমাজের কত দূর উন্নতি হইল, এই বিষয়ের তত্ত্বাবধারণ জন্য চৈত্র সংক্রান্তিতে সাধারণের সমক্ষে একটি সংক্ষিপ্ত বৃত্তান্ত পাঠ করা হইবে।
৩. অস্মদেশীয় যে সকল ব্যক্তি স্বজাতীয় বিদ্যানুশীলনের উন্নতিসাধনে ব্রতী হইয়াছেন, তাঁহাদিগের উৎসাহ বর্ধন করা যাইবে।
৪. প্রতি মেলায় ভিন্ন ভিন্ন স্থানের ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণীর লোকের পরিশ্রম ও শিল্পজাত দ্রব্য সংগৃহীত হইয়া প্রদর্শিত হইবে।
৫. প্রতি মেলায় স্বদেশীয় সঙ্গীতনিপুণ ব্যক্তিগণের উৎসাহ বর্ধন করা যাইবে।
৬. যাঁহারা মল্লবিদ্যায় সুশিক্ষিত হইয়া খ্যাতিলাভ করিয়াছেন, প্রতি মেলায় তাঁহাদিগকে একত্রিত করিয়া উপযুক্ত পরিতোষিক বা সম্মান প্রদান করা যাইবে এবং স্বদেশীয় লোকমধ্যে ব্যায়াম শিক্ষা প্রচলিত করিতে হইবে।
‘হিন্দুমেলা’র প্রথম অধিবেশনে দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর যে সংগীত পরিবেশন করেন তা হল : —
‘মলিন মুখ-চন্দ্রমা মা ভারত তোমারই’
উনিশ শতকের সত্তরের দশকের শেষদিকে বঙ্কিমচন্দ্র রচনা করেন ‘বন্দেমাতরম’, সেটি ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসের অন্তর্ভুক্ত হয় ১৮৮২ সালে। এই সংগীতের প্রথমাংশে বর্ণনা করা হয়েছে দেশমাতার রূপ। দেশমাতা হলেন সুখদা ও বরদা। সন্তানদলের সম্মিলিত শক্তিতে তিনি বাহুবলধারিণী, রিপুদলনাশিনী মাতা। এই দেশমাতৃকা হলেন দশপ্রহরণধারিণী দুর্গা, কমলদলবিহারিণী কমলা এবং বিদ্যাদায়িনী বাণী। তিনি সন্তানদের সকল কর্মপ্রয়াস ও কৃতিত্বের প্রেরণা। তাঁরই মূর্তি প্রতিষ্ঠিত হবে সমগ্র দেশের মন্দিরে মন্দিরে। ১৯০৫ সাল থেকে এই সংগীত দেশপ্রেমিকদের কাছে রণসংগীতের মর্যাদা লাভ করেছিল। কিন্তু ১৯৩৭ সালে আপত্তি উত্থাপন করেন মুসলমান সমাজ, কারণ এই সংগীতে আছে হিন্দু দেব-দেবীদের উল্লেখ। সুভাষচন্দ্র বসু (১৮৯৭–?) ও জওহরলাল নেহেরু (১৮৮৯-১৯৬৪) রবীন্দ্রনাথের মতামত প্রার্থনা করেন। রবীন্দ্রনাথ সুভাষচন্দ্রকে একটি চিঠিতে জানান : —
‘বাঙালি হিন্দুরা এই আলোচনা নিয়ে চঞ্চল হয়েছেন, কিন্তু ব্যাপারটা একলা হিন্দুর মধ্যে আবদ্ধ নয়। উভয় পক্ষেই ক্ষোভ যেখানে প্রবল, সেখানে নিরপেক্ষ বিচারের প্রয়োজন আছে। রাষ্ট্রীয় সাধনায় আমাদের শান্তি চাই, ঐক্য চাই, শুভবুদ্ধি চাই। কোনও এক পক্ষের জিদকে দুর্দম করে হারজিতের অন্ত্যহীন প্রতিযোগিতা চাইনে।‘
রবীন্দ্রনাথ মনে করেন যে এই সংগীতের প্রথমাংশ জাতীয় সমাবেশে গাওয়ার উপযুক্ত। কিন্তু দ্বিতীয়াংশে যে ‘ত্বং হি দুর্গা দশপ্রহরণধারিণী কমলা কমলদলবিহারিণী’ ইত্যাদি আছে, তাতে মুসলমানদের আপত্তি ওঠারই কথা। বঙ্কিমচন্দ্রের প্রতি মুসলমানদের বিরূপতার কারণ শুধু ‘বন্দেমাতরম’ নয়। ১৮৮২ সালে ‘বাঙ্গালার ইতিহাস সম্বন্ধে কয়েকটি কথা’ প্রবন্ধটিও বিরূপতা সৃষ্টি করেছিল। বঙ্কিম ভারতে মুসলমান শাসকদের শাসনকালকে বাংলার ইতিহাসে অন্তর্ভুক্ত করতে অনীহা প্রকাশ করেন। বাঙালি হিন্দুকে তিনি বাংলার যথার্থ ইতিহাস লিখতে পরামর্শ দেন; সে ইতিহাস হবে হিন্দুর ইতিহাস।
স্বদেশি আন্দোলনের পটভূমিতে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৭১-১৯৫১) আঁকলেন ‘ভারতমাতা’, হিন্দুত্বের অচেতন ভাবনা যেখানে প্রতিফলিত। ছবিতে দেখি গৈরিক বসন পরিহিতা এক নারীকে। তাঁর চারটি হাত। এই চারটি হাতে আছে যথাক্রমে একটি বই, ধানের আঁটি, সাদা কাপড়ের টুকরো, একটি জপমালা। ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় ছবিটি প্রথম প্রকাশিত হয়। তখন তার নাম ছিল ‘বঙ্গমাতা’। ভগিনী নিবেদিতা এই চিত্রকর্মের প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট হন। তিনি এর ‘ভারতমাতা’ নামকরণ করেন।
চন্দ্রনাথ বসুর ‘হিন্দুত্ব’ প্রকাশিত হয় ১৮৯২ সালে। ২০১ নং কর্নওয়ালিশ স্ট্রিটের মেডিকেল লাইব্রেরি থেকে বইটি প্রকাশ করেন গুরুদাস চট্টোপাধ্যায়। ১০০/১নং মেছুয়াবাজার রোডের বাল্মীকি যন্ত্রে এটি মুদ্রিত করেন বিশ্বনাথ নন্দী। পিতামহ কাশীনাথ বসুকে বইটি উৎসর্গ করেছেন চন্দ্রনাথ। বিষয়সূচিতে আছে :
সোহহং, লয়, নিষ্কাম ধর্ম, ধ্রুব, তুষানল, কড়াক্রান্তি, পুত্র, আহার, ব্রহ্মচর্য, বিবাহ, তেত্রিশ কোটি দেবতা, প্রতিমা বা মুর্তিপূজা, মৈত্রী, ক্রোড়পত্র।
চন্দ্রনাথ বসুর ‘হিন্দুত্ব’ ভূদেব মুখোপাধ্যায় ও বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো লেখকদের ধারণার উপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছিল। তিনি তাঁর চিন্তাভাবনাগুলিকে একটি ঐক্যবদ্ধ দৃষ্টিতে রূপান্তরিত করেছিলেন এবং প্রাচীন ঐতিহ্যে ফিরে যাবার আহ্বান জানিয়েছিলেন। শশধর তর্কচূড়ামণি ধর্মকে এক মহাজাগতিক শক্তি হিসেবে দেখেছিলেন এবং তাঁর এই চিন্তার দ্বারা চন্দ্রনাথ প্রভাবিত হন তিনি মনে করতেন বর্তমান বিশ্বে নৈতিকতার অবক্ষয় ঘটছে, তাকে হিন্দু মূল্যবোধ প্রতিহত করতে পারে; এই মূল্যবোধ ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে সুরক্ষা কবচ হতে পারে। তাঁর কাছে হিন্দুত্ব রাজনীতি বা জাতীয়তাবাদের বিষয় ছিল না, ছিল একটি ‘জীবন্ত রীতিনীতি’। অবশ্য সাভরকরের হিন্দুত্বের রাজনৈতিক জাতীয়তাবাদী ব্যাখ্যা চন্দ্রনাথের হিন্দুত্বের দৃষ্টিভঙ্গির সম্পূর্ণ বিপরীত ছিল।
উনিশ শতকের শেষ দিকে বঙ্গদেশে হিন্দুধর্মের পুনরভ্যুত্থানের আন্দোলন ঘটে। শিবনাথ শাস্ত্রী মহাশয় ১৮৭০-৭৯ কালপর্বকে এর অন্তর্গত করেছেন। এই সময়ে ব্রাহ্মধর্মের প্রভাব কমে আসছিল। খ্রিস্টধর্মের প্রচারকদের ব্যাপক ধর্মান্তরকরণ, এ দেশের ইংরেজি শিক্ষিত মানুষদের হিন্দুধর্মের প্রতি চূড়ান্ত অনাস্থা, স্বদেশে পরবাসী হয়ে থাকার বেদনা ইত্যাদি ছিল হিন্দুধর্মের পুনরভ্যুত্থানের কারণ। যে দুটি পত্রিকাকে কেন্দ্র করে এই পুনরভ্যুত্থানের আন্দোলন গতিবেগ লাভ করে তা হল ১৮৮৪ সালে প্রকাশিত ‘প্রচার’ ও ‘নবজীবন’।
সুনীতিরঞ্জন চৌধুরী হিন্দু পুনরভ্যুত্থানের নায়ক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন শশধর তর্কচূড়ামণি (১৮৫১-১৯২৮), কৃষ্ণপ্রসন্ন সেন (১৮৮৯-১৯০২), চন্দ্রনাথ বসু (১৮৪৪-১৯১০), অক্ষয়চন্দ্র সরকার (১৮৪০-১৯১৭), ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৪৯-১৯১১), যোগেশচন্দ্র বসু (১৮৫৪-১৯০৫)।
হিন্দু পুনরভ্যুত্থানবাদীদের মূল বৈশিষ্ট্য হল : —
১] অহিন্দুদের প্রতি বিরূপ মনোভাব ও ঘৃণা। মুসলমান ও খ্রিস্টান তো বটেই, এমন কি ব্রাহ্মদের বিরোধিতা তাঁরা করেছেন।
২] সমকালের প্রগতিবাদী চিন্তা-চেতনা ও আন্দোলনেরে বিরুদ্ধতা (নারীশিক্ষা ও নারী স্বাধীনতা, সহবাস সম্মতি আইন, বিধবা বিবাহ ইত্যাদি )
৩] প্রাচীন আচার, কুসংস্কারকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ এবং সেসবের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দানের চেষ্টা।
আজ বিজেপি এবং আর এস এস যেমন ‘হিন্দু খতরে মে হ্যায়’ স্লোগান দিয়ে হিন্দুদের ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করছে। ১৯০৯ সালে সে রকম একটা চেষ্টা করেছিলেন কর্নেল উপেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। ১৮৭২-১৯০১-এর জনগণনার উপর নির্ভর করে তিনি লিখে ফেললেন — ‘Hindus : a Dying Race’ . তাঁর বক্তব্য মুসলমানদের সংখ্যা হু হু করে বাড়ছে, ফলে অচিরে হিন্দুরা মৃত জাতিতে পরিণত হবে। কর্নেল লিখলেন : —
‘There are various ways people have dwindled and finally disappeared from their own country and we are in a fair way of sharing their fate…We are also a decaying race. Every census reveals the same fact. We are getting proportionally fewer and fewer… Year after year they [Hindus] are being pushed back, the land once occupied by them is being taken up by Mohamedans and their relatives…’
সেন্সাস বিভাগের সদস্য ই,এ. গেইটস অবশ্য কর্নেল মুখার্জীর বক্তব্যকে সমর্থন করেন নি। তাঁর বক্তব্য :
‘Census returns of the Hindus are misleading as they include millions of people who are not really Hindus at all, who are denied the ministration of Brahams and are forbidden to enter Hindu temples, and, in many cases are regarded so unclean that their touch, or even their proximity causes pollution.’ [ক্রমশ]
অনেক তথ্যপূর্ণ লেখা। অধিকাংশই অজানা ছিল। সমস্ত তথ্যকে সুসংবদ্ধ ভাবে সাজিয়ে একটি মূল্যবান প্রবন্ধ রচনা করছেন। অনেক মানুষের জানা উচিত। গুরুত্বপূর্ণ রচনা।
চমৎকার তথ্যপূর্ণ প্রবন্ধ। অধিকাংশ তথ্য অজানা ছিল। সমস্ত তথ্য কে সুসংবদ্ধ ভাবে সাজিয়ে চমৎকার রচনা। অনেক মানুষের জানা উচিত।