ফরাসি পর্যটক তাভেরনিয়ের ভারতবর্ষে আসেন ১৬৪০ সালে। তখন মোঘল সম্রাট শাহজাহানের শাসন আমল। ১৬৪০ সালে ভারতে এলেও তাভেরনিয়ের বাংলাদেশে এসেছিলেন ১৬৬৫ সালের ১৪ই জানুয়ারী। ততোদিনে সম্রাট শাহজাহান পরোলোক গত হয়েছেন। ভাইদের মধ্যে যুদ্ধবিগ্রহ শেষে সিংহাসনে বসেছেন সম্রাট আওরঙ্গজীব। আগ্রা থেকে ১৬৫৫ সালের ২৫শে নভেম্বর নৌপথে যাত্রা শুরু করে প্রায় এক মাস বিশ দিন পর তিনি পৌঁছেছিলেন ঢাকায়। তার লিখা ভ্রমন কাহিনিটি ইতিহাসের এক অমূল্য সম্পদ হিসেবে বিবেচিত। তিনি লিখেছেন— ১৪ই জানুয়ারী আমি ঢাকা শহরে পৌঁছেই গিয়েছিলাম নবাব সাহেবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে। তাঁকে উপঢৌকন হিসেবে দিয়েছিলাম সোনার জরিতে তৈরী অর্থাৎ টিস্যু কাপড়ের একটি পোষাক। তার ঝালর ও কিনারা মন্ডিত ছিল স্পেনদেশীয় সোনালী জরির সূতোতে। তাঁকে আরও দিলাম সোনালী রূপালী নক্সাযুক্ত একখানি চাদর বা অঙ্গাবরণ, আর সুন্দর একটি মরকত মণি। নবাবের দশ বছর বয়সের পুত্রকে উপহার দিলাম সোনার জলে মীনে করা বাক্সে একটি ঘড়ি, রৌপ্যখচিত একজোড়া ছোট পিস্তল, অতি সুন্দর একখানি ম্যাগনিফাইং গ্লাস। পিতা পুত্রকে মিলিয়ে যা আমি দিয়েছিলুম তার মূল্য পাঁচ হাজার লিভারেরও বেশী ছিল।
সন্ধ্যার দিকে আমি ওলন্দাজদের কুঠীতে ফিরে আসার পর নবাব আমার জন্য পাঠিয়েছিলেন স্ফটিক পাথর, চিনা কমলালেবু, দু’টি পারসীক ফুটি এবং তিনরকমের নাসপতি। ১৫ তারিখে আমি নবাবকে আমার জিনিসপত্র দেখিয়ে দিলাম। জিনিসপত্রের দাম সম্বন্ধে আমি চুক্তিবদ্ধ হলাম ১৬ তারিখে। অবশেষে তাঁর গোমস্তার কাছে গেলুম আমার বিনিময় মুদ্রার জন্য চিঠি আনার উদ্দেশ্যে যাতে করে আমার প্রাপ্য টাকাগুলো আমি কাশিমবাজার থেকে উঠিয়ে নিতে পারি।
তখনকার দিনে একটি প্রথা প্রচলিত ছিলো। যে কোন পর্যটক, নবাব ও তার পরিবারের জন্য দামি কোন উপঢৌকন নিয়ে এলে সেগুলোর দাম নির্ধারণ করে তা চুকিয়ে দেয়া হতো পর্যটকের হাতে। তাভেরনিয়ের ঢাকায় বসে তার পাওনা টাকা গ্রহণ না করে কেন তিনি সে টাকা কাশিমবাজারে থেকে উত্তোলন করতে চাইলেন। এর পিছনের কারণটি হলো- তাভেরনিয়ের ঢাকা আসার পর দেখলেন ওলন্দাজরা বেশ জমিয়ে ব্যবসা করছে ঢাকায়। কিন্তু সমস্যা হলো তাদের জিনিসপত্র গুলো চুরি হয়ে যায় হরহামেশাই। যখন তারা দেখলেন যে ঢাকার সাধারণ বাড়ীতে জিনিসপত্র রাখা নিরাপদ নয় তখন তাঁরা চোরেদের হাত থেকে জিনিসপত্র গুলো রক্ষা করার জন্য নিজেদের জন্য ভারি চমৎকার একটি বাড়ী তৈরী করে নিয়েছিলেন সেখানে। তাভেরনিয়ের আরো লিখেছেন- ওলন্দাজগণের ব্যবসা বুদ্ধি আমার চেয়ে ঢের বেশী। তাঁরা আমাকে বললেন সঙ্গে টাকাকড়ি নিয়ে কাশিমবাজার যাওয়া নিরাপদ নয়। আবার গঙ্গানদীর পথ ছাড়া যাবার দ্বিতীয় কোন উপায়ও নেই। স্থলপথ যা আছে তাও পাঁকে, জলায় পরিপূর্ণ। তাছাড়া জলপথে আরও বিপদ আছে। যে জাতীয় নৌকোর ব্যবহার হয় তা সামান্য ঝড়বাতাসের উল্টে যাওয়ার আশংকা। কিন্তু তার চেয়েও বড় সমস্যা হলো মাঝি মাল্লাদের যদি জানা থাকে যাত্রীর সঙ্গে যথেষ্ট পরিমাণ টাকাকড়ি আছে তাহলে খুব অনায়াসেই তারা নৌকো উল্টে দিতে পারে। মাঝিমাল্লা গুলো এমন-ই দক্ষ চোর যে তারা ঠিক-ই বুঝতে পারতো নদীর কোন জায়গায় মুদ্রার থলে গুলো নিমজ্জিত হয়েছে এবং সময়মত এসে তারা অবাধে সেগুলো তুলে নিতে সক্ষম ছিলো।
শুধু তাভেরনিয়ের-ই নয় তার সমসাময়িক প্রায় অধিকাংশ ভ্রামনিক যেমন আল বিরুনী (ভারতবর্ষে ছিলেন ১০১৭ থেকে ১০৩০ পর্যন্ত) ইবনে বতুতা ভারতবর্ষে এসেছিলেন ১৩৩৩ সালে বার্নিয়ের (১৬৫৯-১৬৬৬), মানুচি (১৭০৪-১৭১৭), কমবেশী আমাদের চারিত্রিক স্খলনের নানা চিত্র তুলে ধরেছেন। ইবনে বতুতা তার ভ্রমন বৃত্তান্তে লিখেছেন- মালদ্বীপে চুরি করার অপরাধে আমি একবার একটি চোরের হাত কেটে ফেলার হুকুম দিয়েছিলাম, তখন সেখানে উপস্থিত কয়েকজন সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ে।
এবার আমরা একটু পেছনের দিকে ফিরে যাই। ভারতবর্ষে সর্বপ্রথম যে পরিব্রাজক এসেছিলেন তার নাম মেগাস্থেনিস। তিনি এসেছিলেন গ্রিস থেকে। সম্ভবত ৩০২-২৯৮ খ্রিষ্টপূর্বের কোন এক সময়। অর্থাৎ এখন থেকে প্রায় ২ হাজার ৩’শ বছর আগে। গ্রিক সম্রাট সেলুকাসের দূত হিসেবে ভারতে এসেছিলেন মেগাস্থেনিস। তখন মৌর্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্তের রাজত্বকাল। চন্দ্রগুপ্তের রাজধানী পাটলিপুত্র (বর্তমান বিহারের রাজধানী পাটনা)। মেগাস্থেনিস কিন্তু আল বিরুনী, তাভেরনিয়ের, মানুচি কিংবা অপরাপর অন্যান্য পর্যটকদের মতো আমাদের চোর, শঠ, প্রতারক হিসেবে চিহ্নিত করেন নি। মেগাস্থেনিস লিখেছেন— পাটলিপুত্র নগরের সাধারণ মানুষের জীবন সুসংযত ও সুশৃঙ্খল। এখানে চুরি চামারি অতি বিরল। পাটলিপুত্র নগরে চারলক্ষ লোকের বাস। কিন্তু কোনদিনও ত্রিশ মুদ্রার অধিক মূল্যের বস্তু অপহৃত হয়েছে বলে শুনা যায় নাই। ভারতবর্ষে লিখিত আইনকানুনের ব্যবহার নাই। কিন্তু তারপরও কেউ আইন ভঙ্গ করেন না। তারা সরলচিত্ত ও মিতাচারী বলে সুখেই দিন যাপন করেন। তাদের বিধি ও পরস্পরের প্রতি অঙ্গীকার সকলই সরল। তার সবচেয়ে বড় প্রমান, তারা কখনও রাজদ্বারে অভিযোগ নিয়ে উপস্থিত হয় না। তারা অন্যের কাছে যে সকল মূল্যবান সম্পদ গচ্ছিত কিংবা আমানত রাখে তৎসম্পর্কেও কারো কাছে কোন অভিযোগ করতে হয় না। সে সবের জন্য কোন সাক্ষীরও প্রয়োজন হয় না। তারা পরস্পরকে বিশ্বাস করেই সম্পদ গচ্ছিত রাখে। তারা সচরাচর তাদের গৃহ অরক্ষিত রেখেই প্রাত্যাহিক কাজকর্মে বেড়িয়ে পড়ে। শুধু মেগাস্থেনিস-ই নয় চিনা পরিব্রাজন ফা হিয়েন (৩৯৯-৪১৪) হিউয়েন সাঙ (৬২৯-৬৪৫ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত) প্রভৃতি পর্যটকগণও আমাদের সততা, আতিথিয়তা ও ন্যায়পরায়নতার সুখ্যাতি করেছেন। হিউয়েন সাঙ এসেছিলেন নালান্দা বিশ্ববিদ্যালয়ে (নালান্দা জেলা, বিহার, ভারত) একজন আচার্য হিসেবে। হিউয়েন সাঙ লিখেছেন— ভারতবর্ষের দুর্গম ও অরণ্যসংকুল অঞ্চলে ডাকাতির কিছু আশংকা থাকলেও চোরের তেমন কোন উপদ্রব নেই। গৃহস্থ্য লোকজন সাধারণত রাতে গৃহের দরজায় খিল না এঁটেই ঘুমায়।
ভারতের লোকজন রাতে গৃহের দ্বার খোলা রেখে ঘুমায় এটা দেখে হিউয়েন সাঙ যে অবাক হবেন সেটাই স্বাভাবিক। কারণ পৃথিবীতে যীশুখ্রিষ্টের জন্মেরও ২ হাজার বছর আগে সর্বপ্রথম তালার আবিস্কার হয় মিশর ও চিন দেশে। এ থেকেই বোঝা যায় চিনে ও মিশরে ফারাওদের রাজত্বকালে কি প্রকার চোরের উপদ্রব ছিলো সেখানে! সে যা হোক আমার প্রশ্ন হচ্ছে মেগাস্থেনিস, ফা হিয়েন কিংবা হিউয়েন সাঙের মতে এ দেশের মানুষ সে সময় চুরি করতে জানতো না। আমরা সত্যি সত্যি একসময় ছিলাম সৎ, উদার ও ন্যায়পরায়ন কিন্তু চার, পাঁচ’শ বছরের ব্যবধানে কি রূপে আমরা সাংঘাতিক রকম চোর হয়ে উঠলাম সেটা সত্যি একটা আশ্চর্য বিষয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টের মতো সুরক্ষিত একটি স্থান হতে সোনা হয়ে যায় তামা। লক্ষ লক্ষ টন কয়লা কিংবা পাথর লোপাট হয়ে যায় চোখের সামনে থেকে। এ কোন এক বিচিত্র দেশে বাস করছি আমরা।
এককালে নাকি এ পেশাটির বেশ নামডাক ছিলো। প্রাচীন শাস্ত্রে চৌষট্টি কলার একটি অন্যতম কলা ছিলো চুরিবিদ্যা। সেকালে রাজকুমারদের নানা বিদ্যা শিক্ষার পর চুরিবিদ্যা শেখানো হচ্ছে এমন বর্ণনা ‘দশকুমার চরিত’ প্রভৃতি গ্রন্থে পাওয়া যায়। সংস্কৃতে লেখা পুথিরও হদিশ মেলে— ‘চৌর চর্যা’ বা ‘চৌর্য স্বরূপ’ নামে। এও শোনা যায়, প্রথম পুথির লেখক মূলদেব নিজেই নাকি ছিলেন একজন ডাকসাইটে চোর। তাহলে কি এটাই ধরে নিতে হবে যে প্রাচীনকালের পর্যটকগণ সৎ হিসেবে যতই আমাদের সুখ্যাতি করুক চৌর্যবৃত্তিটাই আসলে আমাদের অনিবার্য পরিনতি! আমাদের শিক্ষা ও সংস্কৃতিতেই কি তাহলে ছিলো চৌর্যবৃত্তির বীজ। তা না হলে চারদিকে কেন আজ শুধুই চৌর্যবৃত্তি আর চোরদের মহাউৎসব। কবিবর কাশীরাম দাস তো কোন কালে বলেছেন— ‘চোরা নাহি শোনে কভু ধর্ম্মের কাহিনী’ চোর ধর্মকথা বোঝে না, বুঝতে চায়ও না। তারা স্বধর্ম-চৌর্যবৃত্তি। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর আমাদের স্পষ্টই জানিয়েছেন চুরি হল একটি বদ অভ্যাস। লোভ থেকে যার জন্ম। অন্যদিকে অক্ষয় কুমার দত্ত লিখেছেন— “চৌর্যবৃত্তি-র মতো নিকৃষ্ট প্রবৃত্তির অন্যতম কারণ হল অর্জনস্পৃহা অর্থাৎ লাভের ইচ্ছা— অর্জনস্পৃহা বৃত্তি অতি প্রবল হইলে লোভ অত্যন্ত বৃদ্ধি হইয়া প্রতারণা ও চৌর্যবৃত্তিতে মানুষ প্রবৃত্ত হয়।”
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও অক্ষয়কুমার দত্ত চৌর্যবৃত্তিকে বদঅভ্যাস, কুঅভ্যাস, অর্জনস্পৃহা প্রভৃতি অভিধায় অভিহিত করেছেন ভালো কথা কিন্তু এই বদঅভ্যাস কিংবা এই কাজে ঐ নির্দিষ্ট মানুষটি কেন প্রবৃত্ত হয় যে বিষয়ে কোন আলোকপাত করেননি কিংবা সেগুলোর কোন মনোস্তাত্বিক ব্যাখ্যাও তাঁরা কেউ প্রদান করেননি। আমার মনে হয় এর শেকড় আরো গভিরে প্রোথিত। পাঠকবৃন্দ একটু লক্ষ করুন, প্রাচীনকালে সে হোক রাজা মৌর্য চন্দ্রগুপ্ত কিংবা সম্রাট অশোকের শাসন আমল। তখনকার সময়ে রাজ-রাজড়াগণ তাদের রাজ্য সীমানা বৃদ্ধি করতে যুদ্ধ বিগ্রহে হয়তো লিপ্ত হতেন ঠিক-ই কিন্তু সে সময় প্রজাদের উপর নিপিড়ন হতো কম। তার যথেষ্ট প্রমান পাওয়া যায় চিনা পরিব্রাজন হিউয়েন সাঙের ভ্রমণবৃত্তান্তে। হিউয়েন সাঙ রাজা হর্ষবর্ধনের রাজসভায়ও ছিলেন কিছুদিন। হর্ষবর্ধন ছিলেন পাটলিপুত্রের পাশের শহর কৌনজের সম্রাট। রাজা হর্ষবর্ধনের সুবিচার এবং দানশীলতা সম্বন্ধে বিস্তর প্রশস্তি লিখে গেছেন তার লেখা ভ্রমণকাহিনীতে। কালক্রমে রাজা-বাদশাগণ তাদের রাজ্য বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে প্রচন্ড লোভী হয়ে উঠতে থাকেন। তাদের অর্থ-সম্পদ ও ঐশ্বর্য বৃদ্ধি করার জন্য প্রজাগণের উপর আরোপিত হয় অতিরিক্ত করের বোঝা। দেশ থেকে উধাও হতে থাকে সুশাসন, ন্যায়বিচার, মানবতাবাধিকার প্রভৃতি বিষয়গুলো। এখানে একটি দৃষ্টান্ত দিচ্ছি। ফরাসি পর্যটক বার্নিয়েরের কথা আমি পূর্বেই উল্লেখ করেছি। ফ্রাসোঁয়া বার্নিয়ের পেশায় ছিলেন একজন চিকিৎসক। তিনি ভারতে এসেছিলেন ১৬৫৯ খ্রিষ্টাব্দে ফরাসি সম্রাটের দূত হয়ে।
১৬৬৬ সালে স্বদেশে ফিরে গিয়ে বার্নিয়ের ভারতবর্ষের অর্থনৈতিক অবস্থা ও সম্পদ, আচার-ব্যবহার, সেনাবাহিনী, সমজাব্যবস্থা ইত্যাদি সম্বন্ধে মঁশিয়ে কলবার্টের কাছে একখানি দীর্ঘ পত্র লেখেন। বার্নিয়েরের সময় ফ্রান্সের সম্রাট ছিলেন চতুর্দশ লুই এবং মঁশিয়ে কলবার্ট ছিলেন ফ্রান্সের অর্থসচিব। বার্নিয়েরের ভ্রমণবৃত্তান্তের অন্যান্য অংশের মধ্যে এই পত্রখানির ঐতিহাসিক মূল্য ও গুরুত্ব তার ভ্রমণবৃত্তান্তের চেয়ে কোন অংশে কম নয়।
বার্নিয়েরের ভ্রমণ বৃত্তান্তের চমৎকার একটি অনুবাদ করেছেন লেখক ও সাহিত্যিক বিনয় ঘোষ ‘বাদশাহী আমল’ নামে। বার্নিয়ের কলবার্টের কাছে লিখেছেন— ভারতবর্ষে সম্রাট-ই দেশের সমস্ত সম্পদের মালিক, বিশেষ করে ভূসম্পত্তির। সামরিক কর্মচারীদের বেতন হিসাবে তিনি ভূসম্পত্তির ভোগাধিকার দান করেন তাকে ‘জায়গীর’ বলে। এই জায়গীর থেকে তাঁরা তাঁদের ন্যায্য বেতন আয় করেন। প্রাদেশিক সুবাদারদেরও জায়গীর দেওয়া হয়, শুধু বেতনের জন্য নয়, সৈন্যসামন্তদের জন্যও। একমাত্র শর্ত হল এই যে, বাৎসরিক বাড়তি রাজস্ব যা আয় হবে সেটা সম্রাটকে দিতে হবে। যে সব ভূসম্পত্তি জায়গীর দেওয়া হয় না, সেগুলি সম্রাটের নিজস্ব আয়ত্তে থাকে এবং তিনি রাজস্ব-আদায়কারী (জমিদার ও চৌধুরী) নিয়োগ করে তার রাজস্ব আদায় করেন।
এইভাবে ভূসম্পত্তির অধিকারী যাঁরা হন— সুবাদার, জায়গীরদার ও জমিদার, তাঁরা প্রজাদের একমাত্র হর্তাকর্তাবিধাতা হয়ে যান, চাষীদের উপর তাঁদের পরিপূর্ণ কর্তৃত্ব বজায় থাকে, এমন কি নগর ও গ্রামের বণিকশ্রেণী ও কারিগরদের উপরেও। এই কর্তৃত্ব ও আধিপত্য তাঁরা যে কি নির্মমভাবে প্রয়োগ করেন নিষ্ঠুর অত্যাচারীর মতন, তা কল্পনা করা যায় না। এই অত্যাচার ও উৎপীড়নের বিরুদ্ধে অভিযোগ করারও কোনো উপায় নেই। কারণ যিনি রক্ষক, তিনিই ভক্ষক। এমন কোনো নিরপেক্ষ কর্তৃপক্ষ কেউ নেই, যাঁর কাছে তার অভিযোগ পেশ করা যায়। আমাদের দেশের (ফ্রান্স) মতন হিন্দুস্থানে পার্লামেন্ট নেই, আইনসভা নেই, আদালতে বিচারক নেই- অর্থাৎ এমন কিছু নেই যার সাহায্যে এই নিষ্ঠুর অত্যাচারীদের বর্বরতার প্রতিকার করা যেতে পারে। কিছু নেই, কেউ নেই। আছেন শুধু কাজী সাহেব, কিন্তু কাজীর বিচারও তেমনি, কারণ কাজীর কাছে জনসাধারণের সুবিচারের কোনো আশা নেই।
পাঠক-পাঠিকাবৃন্দ একটু ভালো করে লক্ষ করুন, আমাদের দেশ ও মানুষ সম্পর্কে তিনশত পঞ্চাশ বছর আগে বার্নিয়ের যা লিখে গেছেন বর্তমানে কি তার এতোটুকু বদলেছে। যে কোন রাষ্ট্রে সুশাসন, ন্যায়বিচার, মানবাধিকার বিষয়গুলোর অনুপস্থিতিতে রাষ্ট্রে তৈরি হয় এক ধরনের অনিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক বৈষম্য। এসব প্রেক্ষাপটে দুর্নীতি নেয় এক ভায়বহ রূপ। যেমনটি ঘটছে বর্তমানে।
একজন মানুষ যখন অনিরাপত্তায় ভুগেন তখন তিনি মনে করেন টাকা দিয়েই নিশ্চিত ভাবে সমস্ত সমস্যার সমাধান করবেন তিনি। চৌর্যবৃত্তির অন্যতম একটি কারণ যদি হয় সামাজিক অনিরাপত্তা তাহলে চৌর্যবৃত্তির অন্য আরেকটি বড় কারণ হলো অর্থ সঞ্চয়ের প্রতি আমাদের মাত্রাতিরিক্ত আসক্তি। আমার মতে এই আসক্তি হোরোইন, গাঁজা কিংবা আফিমের চেয়ে কম প্রভাবশালী নয় বরং বেশী।
ঘুষ, ব্যাংক লুট, ঠিকাদারি কাজে দুর্নীতি প্রভৃতি চৌর্যবৃত্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের এক শ্রেণির মানুষ বিপুল পরিমাণ সম্পদ অর্জনের পরও তাদের খিদে মেটে না সহজে। তারা ক্রমাগত দেশের সম্পদ লুণ্ঠনে অব্যাহত থাকেন। পত্র-পত্রিকায় পড়েছি মালয়েশিয়া, আমেরিকা, কানাডা প্রভৃতি দেশে বাংলাদেশের এক শ্রেণির মানুষ নাকি তৈরি করেছেন সম্পদের পাহাড়। কানাডার এক অঞ্চলের নাম হয়েছে ‘বেগমগঞ্জ’। সেখানে বসবাস করেন বাংলাদেশের বেশ কিছু রাজনীতিবিদদের বেগমরা। তাদের সেসব বিলাসবহুল বাড়ির সামনে দিয়ে যখন কানাডার স্থানীয় বাসিন্দারা হেঁটে যান তখন নাকি তারাও লজ্জা পান রাজনীতিবিদদের ঐ সব প্রাসাদোপম বাড়ি দেখে। আমার প্রশ্ন হচ্ছে ভালভাবে জীবন ধারণ করতে একজন মানুষের আসলে কতটুকু সম্পদ প্রয়োজন। সেটা কি খুব বেশি।
রাশিয়ার শ্বৈরশাসক স্তালিন, চিলির পিনোসে, ফিলিপাইনের মার্কোজ কিংবা প্রাচীন যুগের জুলিয়াস সিজার, চেঙ্গিস খান হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক ছিলেন। জীবনে তারা কতটুকু ভোগ করেছিলেন আর কতটুকু তারা কবরে নিয়ে যেতে পেরেছেন সে ইতিহাস হয়তো অনেকেরই জানা আছে। তারপরও সম্পদের প্রতি মানুষের লোভ চিরন্তন। তবে সাধারণ মানুষদের চেয়ে আলোকিত মানুষজন ও লেখক সাহিত্যিকরা চট করেই ধরতে পারেন যে একজন মানুষের বেঁচে থাকার জন্য আসলে বিপুল পরিমাণ অর্থ সম্পদের প্রয়োজন নেই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এ বিষয়ে দুটো গল্প আছে। একটি গল্পের নাম ‘সম্পত্তি সমর্পণ’ দ্বিতীয়টি ‘গুপ্তধন’ নামে।
সম্পত্তি সমর্পণ গল্পে যজ্ঞনাথ কুন্ডে তার এত্তো এত্তো সম্পত্তি তো শেষ পর্যন্ত ভোগ করতে পারলেন না। নিজের নাতিকে চিনতে না পেরে সমস্ত সম্পত্তি সমেত নিজের সেই দৌহিত্রকে মাটিচাপা দিয়ে দিলেন মন্দিরের নিচে। ছেলে নিতাই কুন্ডের মুখে যজ্ঞনাথ যখন জানতে পারলেন পথে কুড়িয়ে পাওয়া নিতাই পাল আসলে তার নিজের নাতি গকুলচন্দ্র কুন্ডে তখন তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেললেন। ‘গুপ্তধন’ গল্পে দেখি মৃত্যুঞ্জয় তার পিতামহের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে একটি গুপ্তধনের নক্সা পেয়েছিলেন। অনেক চেষ্টা তদবির করে এক সন্ন্যাসির সাহায্যে বিরাট এক সুরঙ্গের মধ্যে সেই গুপ্তধনের সন্ধান তিনি পান। কিন্তু সেই সুরঙ্গের ভিতর আটকা পড়ে মৃত্যুঞ্জয়ের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন- সেই জীবন, সেই আকাশ, সেই আলোক, পৃথিবীর সমস্ত মণিমাণিক্যের চেয়ে মৃত্যুঞ্জয়ের কাছে দুর্মূল্য বোধ হইতে লাগিল। তাহার মনে হইতে লাগিল, কেবল ক্ষণকালের জন্য একবার যদি আমার সেই শ্যামাজননী ধরিত্রীর ধূলিক্রোড়ে, সেই উন্মুক্ত আলোকিত নীলাম্বরে তলে, সেই তৃণপত্রের গন্ধবাসিত বাতাস বুক ভরিয়া একটিমাত্র শেষ নিশ্বাসে গ্রহণ করিয়া মরিতে পারি তাহা হইলেও জীবন সার্থক হয়।
এমন সময় দ্বার খুলিয়া গেল। সন্ন্যাসী ঘরে প্রবেশ করিয়া কহিলেন, মৃত্যুঞ্জয়, কী চাও। সে বলিয়া উঠিল, আমি আর কিছুই চাই না- আমি এই সুরঙ্গ হইতে, অন্ধকার হইতে, গোলকধাঁধা হইতে, এই সোনার গারদ হইতে, বাহির হইতে চাই। আমি আলোক চাই, আকাশ চাই, মুক্তি চাই।
আমাদের দেশে চৌর্যবৃত্তি প্রসারের আরেকটি অন্যতম কারণ হচ্ছে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির দুর্বলতা। সমাজে চোররা আজ সবচেয়ে বেশি সম্মানিত ও প্রতিষ্ঠিত। বর্তমান সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী, আমলা, কামলাদের দিকে তাকালেই সেটা স্পষ্ট বোঝা যায়। ডান, বাম, আস্তিক, নাস্তিক, কমিউনিষ্ট, ইসলামিষ্ট মিলেমিশে সব আজ চৌর্যবৃত্তিতে নিমজ্জিত। নামাজ পড়ে পড়ে কপালে কালো তিলক ফেলে দিয়েছেন কিংবা বারো মাসে তের বার যারা হজ্জ্ব করেন তারাও চৌর্যবৃত্তিতে পিছিয়ে নেই এতোটুকু। এরাই আমাদের সমাজের বিভিন্ন সভা, সমিতিতে সভাপতি, প্রধান অতিথি ও অগ্রগণ্য ব্যক্তি। চোর হিসেবে যে তাদের অযোগ্য অপাংক্তেয় করবে সে সৎ সাহস আমাদের সমাজের কারো নেই।