মাছ থেকে মুখরোচক, অন্য খাতে বইয়ে দিচ্ছে সবিতা, রহিমা, লক্ষ্মী আর পার্বতীদের জীবনের স্বাদ : সুব্রত গুহ
মাছ থেকে মুখরোচক। জুনপুট সেবিকা মহিলা মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির মহিলাদের তৈরি চিংড়ি মাছের আচার, তেলাপিয়া মাছের পাঁপড়, জ্যাম, জেলি আর ভোলা মাছের ঝুরিভাজা ইত্যাদি ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। কিন্তু সঠিক পরিকল্পনা, উন্নত বিপনন আর মোটা মূলধনের অভাব এই ত্রয়ীর জেরে বর্তমানে কার্যত মুখ থুবড়ে পড়েছে পূর্ব মেদিনীপুরের জুনপুট সেবিকা মহিলা মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির মাছ থেকে মুখরোচক গোটা প্রকল্পটাই।
বছর দশেক আগেও ছবিটা ছিল অন্যরকম। এক মুহূর্তও নিঃশ্বাস ফেলারও সময় ছিল না সমিতির মোহরজান বিবি, লক্ষ্মী পন্ডা, রহিমা বিবি, পার্বতী মাহাড়া আর সবিতা মাল দের। কাঁচা মাছ জোগাড়, ঝাড়াই-বাছাই, অন্যান্য উপকরণ সংগ্রহ থেকে শুরু করে পাঁপড়, আচার আর ঝুরিভাজার প্যাকেট তৈরি, এমনকী বিক্রির বন্দোবস্ত পর্যন্ত কাজের যেন অন্ত ছিলনা। মাছ থেকে মুখরোচক খাবার বানিয়ে আক্ষরিক অর্থেই স্বনির্ভর হয়ে উঠেছিল জুনপুট সেবিকা মহিলা মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি।
দু-হাজার সালের গোড়ার দিকে অভাব, অনটন আর সংসারের যাঁতাকলে পড়ে কার্যত দিশেহারা ও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন কাঁথি-১ ব্লকের মাজিলাপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের বিরামপুট গ্রামের মৎস্যজীবী পরিবারের মহিলারা।
বিকল্প আয়ের পথ খুঁজে পেতে মরিয়া হয়ে মাত্র পঁয়ত্রিশ জন মহিলাকে নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন জুনপুট সেবিকা মহিলা মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি। স্বনির্ভর হওয়ার লক্ষ্যে পূর্ব মেদিনীপুর জেলা মৎস্য দফতর থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে মাছ থেকে মুখরোচক খাবার বানানোর প্রকল্পে নেমে পড়েছিলেন সমিতির সদস্যারা। পরবর্তী কালের সাফল্যের কাহিনীটা অবশ্য একান্ত ব্যক্তিগত। স্বনির্ভর হওয়ার লক্ষ্যে ‘মাছ থেকে মুখরোচক’ মাছের আচার, জ্যাম, পাঁপড়, আর ঝুরিভাজা খাওয়ার বানিয়ে তা বাজার জাত করতে নেমে পড়েছিলেন জুনপুট সেবিকা মহিলা মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সদস্যরা।
বদলে দেওয়ার ইচ্ছা আর পরিশ্রমকে সঙ্গী করে কাঁথির কেন্দ্রীয় মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি থেকে ১১ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে চলতে শুরু করা সমিতির ‘মাছ থেকে মুখরোচক খাবার’ জনপ্রিয় হয়ে উঠে জেলা থেকে রাজ্য আর রাজ্যের সীমানা ছাড়িয়ে দেশের দিল্লি, মহারাষ্ট্র, উত্তরপ্রদেশের বিভিন্ন মেলায় স্টল দেওয়া ও সামগ্রীও বিক্রি চলচ্ছিল। সমিতির সদস্য সংখ্যা পঁয়ত্রিশ থেকে বেড়ে ১০৫ জনে পৌঁছে যায়। বাড়ির পুরুষদের পাশাপাশি সমিতির মহিলাদের রোজগারে সংসারে আর্থিক স্বচ্ছলতা ফিরে আসার সঙ্গে অন্য খাতে বইতে শুরু করেছিল ওদের জীবন।

জুনপুট সেবিকা মহিলা মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির ‘মাছ থেকে মুখরোচক’ খাবার তৈরির উদ্যোগ ও সাফল্যে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন সর্বভারতীয় কংগ্রেসের তৎকালীন সভানেত্রী সনিয়া গান্ধী। দিল্লির একটি মেলায় নিজেদের তৈরি সামগ্রী নিয়ে গিয়েছিলেন সমিতির সদস্যরা। সেই সময়েই তাঁরা সনিয়া গান্ধীর সঙ্গে দেখা করে তাঁর হাতে তুলে দিয়েছিলেন তাদের তৈরি মাছ থেকে মুখরোচক খাবার জ্যাম, জেলি, আচার, ঝুরিভাজা ও পাঁপড়। সমিতির সম্পাদিকা সবিতা মাল জানান, “কাঁথি কেন্দ্রীয় মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি থেকে প্রথম ঋণের সেই ১১ হাজার টাকা শোধ করে ২০০৩-০৪ সালে এনসিডিসি প্রকল্পে ৪ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা ও ২০০৬-০৭ সালে ১ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে শোধ করেছে সমিতি। এরপরেও বদলে দেওয়ার ইচ্ছা আর পরিশ্রমের মেলবন্ধনে সমিতিতে ৪ লক্ষ টাকাও জমাতেও পেরেছিলাম।”
প্রকল্পের জন্য মৎস্য দফতর থেকে সমিতিকে জুনপুটে ড্রাই ফিশ সেন্টার ব্যবহার করার অনুমতি দেওয়ার পাশাপাশি সেন্টারে সৌর বিদ্যুতের সাহায্যে মাছ শুকোনোর জন্য ৫টি সোলার ফিশ ড্রাই মেশিন তুলে দেওয়া হয়। সমিতির সভানেত্রী লক্ষ্মীপ্রিয়া পন্ডার কথায়, “সোলার ড্রাই মেশিনগুলো এত বিশাল ও ভারী যে প্রতিদিন সেন্টার থেকে বাইরে মহিলাদের পক্ষ থেকে বের করা নিয়ে সমস্যা হত।” লক্ষ্মী দেবী আরও বলেন, “যে পাঁচটি সোলার মেশিনে মাছ শুকনো করতে দেওয়া হয়েছিল তাতে প্রতিদিন ৬০ কেজি পরিমাণ কাঁচা মাছের প্রয়োজন হয়। এতটা পরিমাণ কাঁচামাছ মৎস্যখটি থেকে সংগ্রহ করতে যে পরিমাণ টাকার দরকার তা বড় অঙ্কের মূলধন ছাড়া সম্ভব নয়। ফলে সোলার ফিশ ড্রায়ারে মাছ শুকনো করা নিয়ে সমিতির সদস্যারা উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন।”
সম্পাদিকা সবিতা মালের অভিযোগ, মৎস্য দফতর থেকে ফিশ ড্রাই সেন্টার ব্যবহার করা আর পাঁচটা সোলার ফিশ ড্রায়ার ছাড়া আর কোন সুযোগ সুবিধা পাওয়া যায়নি। উপরন্তু ফিশ সেন্টারের বকেয়া মোটা টাকার ইলেকট্রিক বিল সহ অন্যান্য খরচ-খরচা মেটাতে ও প্রতিবছর সমিতির অডিট করাতে গিয়ে সমিতির জমানো টাকার সিংহভাগই খরচ হয়ে গেছে। সমিতির নিজস্ব কোন জায়গা বা সম্পত্তি না থাকার জন্য কোন ব্যাঙ্ক ঋণ দিতে নারাজ। ফলে মূলধন সংগ্রহ করাটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। এমনকী প্রতিশ্রুতি মত উন্নতমানের বিপনন ব্যবস্থা গড়ে উঠেনি। মৎস্য দফতরের সঠিক পরিকল্পনা, উন্নতমানের বিপনন ব্যবস্থা আর মোটা টাকার মূলধন না থাকার জন্য চাহিদা থাকা স্বত্বেও ‘মাছ থেকে মুখরোচক’ গোটা প্রকল্পটাই আজ অস্তিত্ব সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে।”
দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া সমিতির সদস্যরা এখনও মনে করেন ফের ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব সরকারী ভাবে বিশেষ করে মৎস্য দফতর সঠিক কোন পরিকল্পনা নিয়ে তাদের পাশে এসে দাঁড়ায়।
তাই প্রতিদিনই সমুদ্র সৈকতে এসে মাছ বাছাই, ঝাড়াই আর রোদে শুকনো করা থেকে মাছ থেকে মুখরোচক খাবারের ছোট খাটো অর্ডার পরিবেশন করে নিজেদের জীবন-জীবিকা কোন রকমে চালিয়ে আসছেন। এত প্রতিকূলতার মধ্যেও স্বনির্ভরতার ছোঁয়ায় বদলে যাওয়া জীবনকে বজায় রাখতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন সবিতা, রহিমা লক্ষ্মী মোহরজান, পার্বতীরা। আপ্রাণ এই চেষ্টা আদৌ সফল হবে কিনা বলবে সেটা ভবিষ্যৎই।