কলকাতার এক রাস্তা দিয়ে হেটে চলেছেন এক বৃদ্ধ শিক্ষক। আচমকা একটি গাড়ি ব্রেককষে তাঁর পাশে থামলো। সৌম্যকান্তি, দীর্ঘদেহী, ষোলআনা বাঙালি পোশাকে সজ্জিত এক সুপুরুষ গাড়ি থেকে নেমে বৃদ্ধর পায়ে প্রণাম করে বললেন, ‘মাস্টার মশাই চিনতে পারছেন? আমি আপনার ছাত্র। আপনার আশীর্বাদ আমার জীবনে ষোল আনা সার্থক হয়েছে।’
সালটা ১৯৩৫, ভবানীপুর মিত্র ইনস্টিটিউশনের দশম শ্রেণীর এক ছাত্রকে ক্লাসে গান গাওয়ার অপরাধে শিক্ষকটি ভর্ৎসনা করে বলেছিলেন, ‘লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে গান গেয়ে যাও।’ সেই ছাত্রই প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়ে যাদবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হয়েও পড়াশোনা ছেড়ে গানকেই জীবনের ধ্যান জ্ঞান করেন। আর সেই গান গেয়েই সমাজে নামও করে ফেলেন। ছাত্রটি আর কেউ নন, স্বনামধন্য কিংবদন্তি শিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়।
আজও গোটা দেশে তাঁর ব্যারিটোন ভয়েসের জনপ্রিয়তা ঈর্ষণীয়। কাল ছিলো হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের জন্মদিবস। আজকের প্রতিবেদনে ধুতি, শার্ট আর সুরের অপরূপ রসায়নের বাঙালিটির বর্ণময় জীবনের কিছু দিক তুলে ধরার চেষ্টা করলাম।
হেমন্ত যখন দশম শ্রেণীর ছাত্র তখন তার গান গাওয়া নেশা বা পেশা কোনটিই ছিল না। বরং নেশা ছিল একটু লেখালেখির দিকে। তাঁর লেখা প্রথম প্রকাশিত ছোট গল্প ‘একটি দিন’ (১৯৩৭), এছাড়াও অনুপমা, রক্ষাকবচ, শতাব্দীর আর্তনাদ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।
হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের বন্ধু সুভাষ মুখোপাধ্যায় তাকে নিয়ে গেলেন বেতার কেন্দ্রে গান গাওয়ার জন্য। কমল দাশগুপ্তের সুরে যুথিকা রায় একটি গানের অনুসরণে সুভাষ মুখোপাধ্যায় কথা বসিয়ে দিলেন —
‘আমার গানেতে এলে নব রূপে চিরন্তনী
বানীময় নীলিমায় শুনি তব চরণ ধ্বনি।’
হেমন্তের তখন ছিল না তার কোন সংগীত শিক্ষা, ছিল না একটা হারমোনিয়াম হাতে পেলেন পাঁচ টাকা একেবারে অভাবনীয় উপার্জন। দু’বছর পরেই গ্রামাফোন কোম্পানি থেকে রেকর্ড বেরোলো প্রথম গান, ‘জানিতে যদি গো তুমি পাষাণে কি ব্যথা আছে’ — এরপর ‘আমারে চাহিয়া প্রিয়,’ ‘রজনীগন্ধা ঘুমাও’ ইত্যাদি। এভাবেই সঙ্গীত জগতে তার যাত্রা শুরু হল। ১৯৪০-এ হেমন্ত সর্বপ্রথম চলচ্চিত্র গান করেন — ছবির নাম ‘নিমাই সন্ন্যাস’। ১৯৪৩ সালে ‘প্রিয় বান্ধবী’ ছবিতে সর্বপ্রথম রবীন্দ্র সংগীত ‘পথের শেষ কোথায়’। রবীন্দ্র সংগীতের সুলোলিত বাণী তার স্বর্ণকন্ঠের স্পর্শে ও পরিশীলিত উচ্চারণে হৃদয়গ্রাহি হয়ে উঠল শ্রোতাদের কাছে। সলিল চৌধুরী রচিত সুরারোপিত ‘গাঁয়ের বধূ’ গেয়ে খ্যাতির মধ্যগগনে পৌঁছে যান হেমন্ত। সুরকার হিসেবে তাঁর কৃতিত্ব কিছু কম ছিল না। তার সুরারোপিত প্রথম ছবি পূর্বরাগ মুক্তি পায় ১৯৪৭ সালে। তরুণ মজুমদারের ‘পলাতক’ ছবিতে প্রথম সংগীত পরিচালনা করেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়।
বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অন্যতম মাইলস্টোন ‘পলাতক’। মনোজ বসুর গল্প ‘আংটি চাটুজ্জের ভাই’ অবলম্বনে তৈরি সিনেমার প্রধান ভূমিকায় ছিলেন অনুপ কুমার।
পলাতক সিনেমায় অনুপকুমারের অসাধারণ অভিনয নজর কেড়েছিল আপামর বাঙালির। অভিনয়ের মঞ্চে যাঁর চোখের জল বাঙালিকে কাঁদায়, আবার যাঁর মুখের হাসি দর্শকের ঠোঁটের কোনে মুচকি হাসি আনে — সেই অনুপকুমারেরই আজ জন্মদিন।
হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুরারোপিত পলাতক ছবিটি বাংলা সিনেমার একটি মাইলস্টোন। সিনেমার গানগুলিও খুবই জনপ্রিয় হয়েছিল, ‘জীবনপুরের পথিক রে ভাই,’ ‘দোষ দিও না আমায় বন্ধু,’ ‘আহা কৃষ্ণ কালো আঁধার কালো,’ ‘মন যে আমার কেমন কেমন করে প্রভৃতি।
তরুণ মজুমদার বলেছিলেন, ‘হেমন্তবাবুর পলাতক এত ভালো লেগেছিল হঠাৎ একদিন এসে আমাকে বললেন ‘পলাতক’ হিন্দিতে করলে কেমন হয়!’। ততদিনে প্রায় ছটা বছর গড়িয়ে গেছে। হেমন্তবাবু যখন নিজেই আগ্রহ দেখাচ্ছেন তখন ছবিটি হিন্দিতে করা যেতেই পারে। ছবির নাম হলো ‘রাহগীর।’ সিনেমার গান লিখলেন গুলজার। প্রযোজনা গীতাঞ্জলি চিত্রদীপের ব্যানারে। অনুপকুমারের রোলটা করলেন বিশ্বজিৎ। অন্যান্য চরিত্রের সন্ধ্যা রায় শশীকলা, নিরুপা রায়, বসন্ত চৌধুরী,পাহাড়ি সান্যাল প্রমুখ।
একাধারে ধার্মিক, সাধারণ জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত, ভাগ্যে বিশ্বাসী, ঘরোয়া এই মানুষটির দয়ালু মন ও অনড় মনোভাবের পরিচয় পাওয়া যায় বিভিন্ন ঘটনায়। দুটো ঘটনার কথা বলি।
বর্ধমানে এক রাতের ফাংশানে আয়োজকরা দুপুরে খাওয়ার ব্যবস্থা করেন বর্ধমানের এক বাড়িতে। গৃহকর্তা ও তার স্ত্রীর সাথে গল্প গুজব করে পুরো দুপুরটা কাটিয়ে দেন হেমন্ত। ফাংশন শেষ করে কলকাতার ফেরার পথে হেমন্তবাবু জানতে পারেন, দুপুরে খাওয়া-দাওয়া করছেন যে বাড়িতে সেও বাড়ির ভদ্রলোক হঠাৎ হার্ট অ্যাটাক করে মারা গেছেন। তিনি সঙ্গে সঙ্গে ড্রাইভারকে বলেন, ‘গাড়ি ঘোরাও, আমি ওখানে যাব।’ হেমন্ত মুখোপাধ্যায় কে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন ভদ্রমহিলা। তাকে বোন সম্বোধন করে ওই ফাংশন থেকে পাওয়া পরিশ্রমিকের সমস্ত টাকা তার হাতে তুলে দেন। বলেন, ‘তোমার এই দাদা থাকতে কোন ভয় নেই প্রয়োজনে যোগাযোগ কোরো।’ এমনই বড় হৃদয়ের মানুষ ছিলেন শিল্পী। আরেকটি ঘটনা বলি —
অসুস্থ উৎপলা সেনকে দেখতে তাদের ছোট ফ্ল্যাটে এসেছেন সস্ত্রীক হেমন্ত। যাবার সময় খুব আসতে উৎপলাকে বললেন, ‘পরে তোর বালিশের তলাটা একটু দেখে নিস।’ আশির দশকের প্রথম লগ্নে একটি খামে কুড়ি হাজার টাকা রেখে এসেছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়।
আমজনতার প্রিয় গায়ক তো বটেই, সংগীতশিল্পীদের অভিভাবকদের মতো ছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়৷ কোনও কোনও সঙ্গীতশিল্পীর কাছে তিনি ‘জীবনদেবতা’৷
এক সময় শিয়ালদাহ অঞ্চলের বড় মস্তান ছিলেন ভানু বোস। প্রতিবছর ক্রিক রো–এ বিরাট বড় ফাংশনের আয়োজন করতেন। সেই মঞ্চে মহানায়ক উত্তম কুমার থেকে সুচিত্রা সেন সকলেই উপস্থিত হতেন। তবে মজার ব্যাপার হলো কোন শিল্পীকে তিনি ন্যায্য পারিশ্রমিকটুকুও দিতেন না। কালীপুজোর এক জলসায় হেমন্ত মুখোপাধ্যায় কে ফোন করলেন ভানু আসরে গান গাওয়ার জন্য। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় বললেন, ‘আপনার ফাংশনে নিশ্চয়ই যাবো, তবে আমার পারিশ্রমিক হিসেবে এই টাকা লাগবে। ফোনের অন্যপ্রান্তে ভানু বললেন, ‘আমি তো কাউকে টাকা দিই না।’
হেমন্তবাবু বললেন, ‘টাকা না পেলে আমি গাইব না।’
ভানু বোস তখন বলেছিলেন, ‘আমি কে জানেন?’ হেমন্তবাবু বলেছিলেন, ‘জানার দরকার নেই আপনি কে? পারিশ্রমিক পেলেই তবে যাব।’ সেই প্রথম উচিত শিক্ষা পেলেন ভানু বোস। এমনি প্রতিবাদী কন্ঠস্বর ছিলো তাঁর। কৈশোরের সূচনালগ্ন থেকে আমৃত্যু হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের আস্থা ছিল বামপন্থী আদর্শ ও মূল্যবোধের। সমাজের প্রতি ছিলো তাঁর চরম দায়বদ্ধতা। আত্মবিশ্বাসে ভরপুর এই মানুষটি প্রচুর সংগ্রামের পর গায়ক ও সুরস্রষ্টা হিসেবে শ্রদ্ধা ও সম্মান পেয়েছেন সকলের কাছে। নিঃসন্দেহে ‘হেমন্ত যুগ’ ভারতীয় সংগীতে এক বর্ণময় অধ্যায়।
তথ্যসূত্র: সুমন গুপ্তের বই সঙ্গীত সাধকের অন্তরঙ্গ জীবনকথা ‘হেমন্ত মুখোপাধ্যায়’ এবং অন্যান্য।
অসাধারণ প্রতিবেদন সনামধন্য গায়কের
আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই আপনাকে ????
কাল,যুগ,দশক ইত্যাদির সীমানা কতটা কে জানে;*হেমন্ত মুখোপাধ্যায়*সময়ের
সব সীমা ছাড়িয়ে এক জীবন্ত নক্ষত্রের আলোর মতো সুর গানে আলোকিত আজও*প্রতিবেদনে হেডলাইনে বলা হয়েছে “ব্যারিটোন ভয়েস”র কথা আর এই
ভয়েসের আবেদন এমনি যে মন,চেতনাকে স্পর্শ করে নিয়ে যায় অসীম অনন্ত-
কালে! আমরা প্লাবিত হই সুর সৌরভ।প্রতিবেদন মনে করিয়ে দিচ্ছে “হেমন্ত মুখো.”র গান গেয়ে প্রথম পঁচিশ টাকা পেয়েছিলাম,আর শ্রোতাদের আওয়াজ
“Once more” ধ্বনিতে গেয়েছিলাম পরপর পাঁচটি হেমন্ত বাবুর গান আর এই
সুন্দর কন্ঠস্বর নকল করা থেকে আমাকে বিরত করেছিলেন পরম শ্রদ্ধেয় সুভাষ মুখোপাধ্যায়* আমি দুজনের সান্নিধ্য’র কথা আজও গৌরবের সাথে বলে বেড়াই।
পেজ ফোর আর ম্যাডাম “রিঙ্কি সামন্ত” ইতিহাসের গান গাইলেন যেন সেই মন
কেমন করা ব্যারিটোন ভয়েসে।হেমন্ত বাবু আর সলিল চৌধুরী*র যুগলবন্দীর দান
আজও উদাস করে “কোনো এক গাঁয়ের বধু”,উদাস চঞ্চল করে- ও নদীরে একটি
কথা”র জিজ্ঞাসায়*”রানার” মনে করিয়ে দেয়-“ঘরে তার প্রিয়া একা সজ্জায় বিনিদ্র
রাত জাগে” ব্যকুল হই রবীন্দ্রনাথের “মন মোর মেঘের সঙ্গী” সঙ্গীতের মাধ্যমে
যখন হেমন্ত বাবু” নিয়ে যান মেঘলোকে সুর গানের পাল্কিতে।চমৎকার সুন্দর সুরে
সুরে এই শ্রদ্ধাঞ্জলি আমাকে বাঁচিয়ে রাখুক আরও কটা দিন। ভালোলাগা ভালোবাসা।
কমেন্ট বক্সেও এত সুন্দর করে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করা যায়, আপনার লেখা পড়ে জানলাম। অসংখ্য ধন্যবাদ জানাই আপনাকে শ্রদ্ধেয়।
অনন্য সাধারণ প্রতিবেদন। আগ্রহী পাঠকের কাছে অত্যন্ত মূল্যবান।
আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই ❤️