মধযুগের এক ক্রান্তিলগ্নে মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যের আবির্ভাব এক ঐতিহাসিক এবং যুগান্তকারী ঘটনা।
রাজনৈতিক ও সামাজিক বিশৃঙ্খলার মধ্যে তিনি উদারমনস্ক কৃষ্ণপ্রেমকথা প্রচার করেন। সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে যখন রূপান্তরের প্রক্রিয়া ঘটেছিল সাড়ম্বরে তখন ধর্ম-দর্শন-ভক্তির প্রচারে যে মাধ্যমটি সমকালীন সমাজে চৈতন্যদেব উপস্থাপিত করেন, তাহাই ব্যাপক অর্থে কীর্তন।
‘চৈতন্যদেব কীর্তনগানকে গণমুখী করে তুললেন এবং উন্মুক্ত করে দিলেন সর্বসাধারণের জন্য। নামসংকীর্তনে জ্ঞানী-মূর্খ, উচ্চ-নীচ, ধনী-দরিদ্রের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে এক ভেদাভেদহীন সুসংবদ্ধ অনির্বচনীয় সমাজের প্রতিচ্ছবি উদ্ভাসিত হলো। ফলস্বরূপ নবজন্ম লাভ হলো কীর্তনের।
কীর্তনের ইতিহাস সুদীর্ঘ ও প্রাচীন। এর আভিধানিক অর্থ গুণবর্ণনা’ (মহিমা কীর্তন) যশঃপ্রচার। কীর্তন হচ্ছে জাগরণ ও সম্মেলক সঙ্গীত। মহারাষ্ট্রের নামদেব কিম্বা বাংলায় চৈতন্যদেব, সকল ভক্তিবাদী সন্তগণ কীর্তন গানের মাধ্যমে সাধন ভজন ও ধর্মপ্রচার করতেন।
‘ষোড়শ শতাব্দীতে নবদ্বীপের মাটিতে কীর্তন গানকে অবলম্বন করে চৈতন্যদেব রাজশক্তির বিরুদ্ধে যে আইন অমান্য আন্দোলন শুরু করেন তাতে তিনি সফলতাও পান। সমাজে দুর্ভিক্ষ, অনাবৃষ্টি, অসুখ-বিসুখ, মহামারী হলে কীর্তন সঙ্গীতের প্রচলন হলো। সংসারের সুখ-শান্তি-স্থিরতার জন্য লুট গানের প্রসার হলো। আচার বিচারে কঠোরতা না থাকায় সমাজের সর্বস্তরের মানুষ স্বেচ্ছায় এই সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। চৈতন্যদেব বললেন মন্ত্রের সাধনা বা যাগযজ্ঞ নয়, কলিযুগের একমাত্র সাধনা নামগান।

“নামকীর্তন ধর্মান্ধতার বিষয় নয়। এটি একটি আচরণ মাত্র, যে আচরণের সূত্রে জাগে সামাজিক বোধ, জনকল্যাণে গণ-উদ্যোগের প্রেরণা, সমবায় ভিত্তিক সমাজ-সংস্কারের চেতনা, জাতিবর্ণের সংকীর্ণতা এবং হীনমন্যতা থেকে মুক্তি, শুভকর্মে দানব্রতে উদারতা….এবং সর্বোপরি আনন্দের উপভোগ। সমাজ-পরিবেশের কল্যাণের সূত্র ধরে আত্মিক কল্যাণ, আবার আত্মিক অনুভূতির বিনিময় সূত্রে সামাজিক কল্যাণ সাধন। তাই নামকীর্তন হলো কীর্তনের জনপ্রিয় এবং গণমুখী প্রকরণ।”
নিত্যানন্দ চৈতন্যেদেবের খুবই প্রিয়ভাজন ছিলেন।
একদিন নগরের প্রতি ঘরে ঘরে নামসংকীর্তন প্রচার করতে গিয়ে জগাই ও মাধাই নামক নদীয়ার দুই মাতাল ব্রাহ্মণকুমারের হাতে নিগৃহীত হন নিত্যানন্দ। বারে বারে হরিনাম সংকীর্তন করতে বলায়, বিরক্ত ও ক্রোধান্বিত হয়ে নিকটস্থ একটি ভাঙ্গা কলসির টুকরা দ্বারা নিত্যানন্দকে আঘাত করে। চৈতন্যদেব পাষন্ডদ্বয়কে উচিৎ শিক্ষা দিতে চেয়েছিলেন কিন্তু নিত্যানন্দের অনুরোধে তাদের ক্ষমা প্রদান করেন।
নিত্যানন্দের উদারতা ও মহত্ব দেখে জগাই-মাধাইয়ের বোধোদয় হয়এবং অবশেষে চৈতন্যদেবের পরশে জগাই-মাধাই শুদ্ধ বৈষ্ণবভক্তে পরিণত হয়।
শুধুমাত্র বৈষ্ণবরাই নয়, শাক্ত শৈবরাও শ্রদ্ধার সাথে নামগানকে গ্রহণ করলো। ফলে বৈষ্ণব আন্দোলন সংগঠিত হতে আরম্ভ করলো।
যদিও ব্রাত্য অন্ত্যজ সমাজের মানুষগুলোকে নিয়ে কীর্তন, নাচানাচি করাকে অভিচারী তন্ত্রসাধকেরা, কৌলাচারী ব্রাহ্মনেরা, শিষ্টসমাজ গর্হিত কাজ বলে মনে করেছিল। ফলস্বরূপ তাঁরা নানাভাবে চৈতন্যদেবকে বাধাদান করতে থাকদন। অপ্রতিরোধ্য কৃষ্ণনাম প্রচারকে দমাতে না পেরে তাঁরা গেলেন কাজির দরবারে অভিযোগ জানাতে। কাজি নবদ্বীপে সংকীর্তন বন্ধের আদেশ জারি করলেন। চৈতন্যদেব গর্জে উঠলেন, বললেন—
‘সর্ব নবদ্বীপে আজি করিমু কীর্তন।/দেখি মোরে কোন কর্ম করে কোনজন।।’

শুধুমাত্র কীর্তন গানকে অবলম্বন করে কাজির আদেশ অমান্য করেছিলেন চৈতন্যদেব। গণরোষ প্রত্যক্ষ করে প্রাণভয়ে ভীত হযে কাজি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেন। নবদ্বীপের ধর্মপ্রাণ বৈষ্ণবগণ নিশ্চিন্তে নামসংকীর্তন করতে লাগলেন।
‘নিরবধি করে প্রভু হরি সঙ্কির্তন।/আপন ঐশ্বর্য প্রকাশয়ে সর্বক্ষণ।।’
ষোড়শ শতকের শেষভাগ হতে প্রায় আড়াইশো বছর পর্যন্ত কীর্তন গানে ভাঙাগড়া চলেছিল। তবুও কীর্তন গানের প্রসারে নবদ্বীপের যথেষ্ট ভূমিকা ছিলো।
চৈতন্যদেবের ভক্তিধর্ম প্রচারের দরুণ বাংলা সাহিত্য, শিল্পকলায়, সমাজে এক অভিনব স্ফুরণ ঘটেছিল। প্রাক-চৈতন্যযুগে কীর্তন যা ছিলো উপাসনা সঙ্গীত, চৈতন্যদেব সেই কীর্তনকে বন্দীদশা থেকে মুক্ত করে সর্বসাধারণের সঙ্গীত করে তুললেন। প্রকৃত অর্থে তিনি ছিলেন সমাজ সংস্কারক।।
‘‘তৃণাদপি সুনীচেন তরুরেব সহিষ্ণুনা।/অমানিনা মানদেন কীর্তনীয়া সদাহরি’’।।
তথ্যসূত্র : বাংলার কীর্তন গান—ডাঃ মৃগাঙ্গশেখর চক্রবর্তী। তদেব ২/১৩, নবদ্বীপের ইতিবৃত্ত—মৃত্যুঞ্জয় মন্ডল।।
অপূর্ব । মুগ্ধতা একরাশ ।
ধন্যবাদ????
অসাধারণ
থ্যাংক ইউ????
চমৎকার! খুব ভালো লাগলো।
ধন্যবাদ????