সেদিন খবরের কাগজের পাতা উল্টাতেই চোখে পড়ল, এ বার দুর্গাপুজোর সময় রেকর্ড মদ বিক্রি হয়েছে বঙ্গে। দুর্গাপুজো মানেই আনন্দের আয়োজন। আয়োজন মানেই ভুরিভোজ আর দেদার আড্ডা। আর সেই আড্ডায় দেদার পানীয়ের ব্যবস্থা না থাকলেই নয়!
যদিও দশমী আর গান্ধী জয়ন্তী একই দিনে পড়ায়, সেই দিনটি ‘ড্রাই ডে’ হওয়ায় মদ বিক্রি বন্ধ ছিল। কিন্তু তাতে কি আনন্দে ফাঁকি পড়বে? একদমই না। আগে থেকেই সমস্ত বন্দোবস্ত করে রেখেছিলেন সুরপ্রেমীরা। গোটা পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে পুজোর চার দিনে ১৫০ কোটি টাকার মদ বিক্রি হয়েছে বলে জানা গিয়েছে আবগারি দফতর থেকে। উমা বিদায়ের কষ্টে গ্যালন গ্যালন মদ্যপান করেছে বঙ্গবাসী!
তবে আধুনিক বঙ্গবাসীদের দিকে শুধু আঙ্গুল তুললে চলবে না, এই বাংলার অনেক মনীষীগণই ছিলেন নেশার দাস। গিরিশচন্দ্র ঘোষ, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর, রাজনারায়ণ বসু, ভুদেব মুখোপাধ্যায়, … এরা প্রত্যেকেই ছিলেন মদের নেশায় আসক্ত।
নট ও নাট্যকার গিরিশ ঘোষ কোন নেশাই বাদ দেননি। মদ গাঁজা অফিং চরস ভাঙ — কোন কিছুই বাদ ছিলো না তার। শোনা যায় ২২ বোতল বিয়ার পর্যন্ত একদিন খেয়েছিলেন। গিরিশ ঘোষ এতটাই মদ্যপানে আসক্ত ছিলেন যে সমাজের বারাঙ্গনারাও তাঁকে চট করে গ্রহণ করতে চাইত না। তিনি নিজের শহরে “মাতাল” নামে পরিচিত ছিলেন।
অমৃতলাল বসুও সুরারসিক ছিলেন। ‘অমৃত মদিরায়’ রাখঢাক না করেই তিনি লিখেছিলেন —
আমি আর গুরুদেব যুগল ইয়ার
বিনির বাড়িতে গিয়ে খেতাম বিয়ার।
বিয়ার ফুরায় পর পুনঃ বিয়ার
তিনশত্রু বধ তবু জানে না চিয়ার।’
এখানে গুরুদেব হলেন স্বয়ং গিরিশচন্দ্র ঘোষ আর বিনি হলেন নটী বিনোদিনী।
রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের সান্নিধ্যে আসার পরও প্রথমদিকে গিরিশচন্দ্র তাঁর সামনে অম্লান বদনে সুরাপান করতে লজ্জিত বোধ করেননি। নানান ঘটনার মধ্যে দিয়ে শ্রীরামকৃষ্ণের সান্নিধ্যতা তাঁর জীবনে আমূল পরিবর্তন আনে। শ্রীরামকৃষ্ণকে তিনি সাক্ষাৎ ভগবান বলতেন। শ্রীরামকৃষ্ণের সান্নিধ্যে আসার পর তাঁর প্রতি ভক্তিতে তিনি মদ্যপানের নেশা থেকে “ঐশ্বরিক নেশায়” (আশার নেশা) উত্তরণের পথ খুঁজে পান।
চরিত্রহীনের স্রষ্টা শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় জীবনের শুরুতে যখন ন্যাড়া ডাকনামে খ্যাত তখন থেকে নেশা-ভাং করতে আরম্ভ করেছিলেন। দুবার বিবাগী হয়ে সন্ন্যাসী পর্যন্ত হয়েছিলেন, আবার ফিরেও এসেছেন। শরৎচন্দ্র শুধু মদই খেতেন না, আফিংয়ের পরম ভক্তও ছিলেন। বাল্যবন্ধু প্রথমনাথ ভট্টাচার্য যখন শরৎচন্দ্রের দেবদাস উপন্যাসটি প্রকাশের জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়েছেন, তখন শরৎচন্দ্র ২৫/৬/১৯১৩ তারিখের একটি চিঠিতে লিখেছেন, ‘শুধু যে ওটা আমার মাতাল হয়ে লেখা, তাই নয়, ওটার জন্য আমি নিজেও লজ্জিত।’
১৭/৭/১৯১৩ তারিখে আবারও শরৎচন্দ্র প্রথমনাথকে লিখেলেন, ‘ওই বইটা একবারে মাতাল হইয়া, বোতল খাইয়া লেখা — লেখাগুলি পর্যন্ত আঁকাবাঁকা। যা মনে আসিয়াছিল তাই লিখিয়াছি।’ শুধু আফিং বা মদ নয়, তাম্রকূট সেবনেও তিনি কম ছিলেন না। আলবোলা মুখে তার ফটো আছে। মদ মাঝে মাঝে ছাড়লেও আফিং খাওয়া শত চেষ্টাতেও ছাড়তে পারেননি।
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জীবনের একটি বড় অংশ জুড়ে আছে বার্মায় থাকাকালীন নানান ঘটনা। সাংসারিক ব্যর্থতার যন্ত্রণা ভুলতে হাতে পয়সা পেলেই শরৎচন্দ্র বেজায় মদ্যপান করে বেহুঁশও হয়ে পড়তেন। একদিন শরৎচন্দ্রের বাড়িতে সব মদ শেষ হয়ে গেছিল। তিনি তাঁর এক বাঙালি বন্ধুকে নিয়ে এক বর্মি বন্ধুর বাড়ি গেলেন মদ আনতে। কিন্তু বর্মি বন্ধুটির হার্টের রুগী হওয়ায়, মদ খাওয়া সম্পূর্ণ নিষেধ ছিল। অনেক কাকুতি মিনতি করার পর শরৎচন্দ্রের অবস্থা দেখে তার স্ত্রী ভাঁড়ার থেকে একটি মদের বোতল এনে দেন।
বর্মি বন্ধুটি প্রতিজ্ঞা করলো, সে এক ফোঁটাও মদ ছোঁবেন না কিন্তু তাদের আসরে যোগ দেবে।
প্রথমদিকে মদ না খেলেও, স্ত্রী ঘুমিয়ে পড়ার পর বর্মি বন্ধুটি মদ পান করলো। খানিক বাদে হঠাৎ বর্মি বন্ধুটি বুক চেপে আর্তনাদ করে উঠলো এবং তার মৃত্যু হল।
এরপর শরৎচন্দ্র মদ ছে়ড়ে আফিম ধরেছিলেন। ২২/২/১৯০৮ তারিখে শরৎচন্দ্র বিভূতিভূষণ ভট্টকে লিখলেন, ‘মাস কয়েক মদ খাই নাই শরীরটা যেন সুস্থ বোধ করি। আর যদি না খাই তো বোধ হয় বেশ সারিয়া যাইবো’ এরপর ২৮/৩/১৯১৪ তারিখে রেঙ্গুন থেকে প্রমথনাথকে লিখলেন, ‘জানো বোধহয় আমি ভয়ানক ওপিয়াম ইটার।’ মাঝে মাঝে অবশ্য তিনি আফিং ছাড়বার চেষ্টা করেছেন। ছেড়ে দিয়ে মনে ভেবেছেন যে শরীর ভালো না হয় খারাপই হয়েছে। তাই এই নেশা তাঁর জীবনের শেষ দিন অবধি ছিল।
ডাকসাইটে নাট্যকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায় স্ত্রী বিয়োগের পর পরিচিত অপরিচিত সকলের সামনেই অবাধে মদ্যপান করতেন। পুত্র দিলীপকুমার রায় ‘উদাসী দ্বিজেন্দ্রলাল’ গ্রন্থে লিখেছিলেন তার পিতার প্রকাশ্যে সুরাপান নিয়ে। মজা করে দ্বিজেন্দ্রলাল লিখেছিলেন —
সুরায় যদি চালায় তোমায় — তালে সুরা মহাঅরি
সুরায় যদি চালাও তুমি — তালে সুরা শুভঙ্করী।।
তবে দিলীপকুমার বলেছেন সুরা তাকে চালাতো এ কখনো কেউ দেখেনি। এমনকি সুরা পান করে তার পা টলমল করতে বা অসংলগ্ন কথা বলতে কেউ দেখেনি। দ্বিজেন্দ্রলাল তিন পেগের পর আর খেতেন না বলে জানিয়েছেন তাঁর পুত্র।
এমন সুরাশক্ত মানুষটি কিন্তু এক কথায় ছেড়ে দিয়েছেন সূরাপান, এমনকি আমিষ ভোজনও।
মাত্রাতিরিক্ত সুরাশক্তি আর বিলাস ব্যাসনে আমির থেকে ফকির হয়েছিলেন মেঘনাথ কাব্যের রচয়িতা মাইকেল মধুসূদন দত্ত। হিন্দু কলেজে পড়ার সময় থেকেই তার মধ্যে পাশ্চাত্যপ্রীতি বৃদ্ধি পায়। খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করার পর থেকেই মধুসূদনের কবিত্বশক্তি স্ফূরনের সঙ্গে সঙ্গে সুরাশক্তিও বেড়ে গেছিল। সেকালে কলেজে অনেক ছাত্র সুরা পান করাকে বাহাদুরি বলে মনে করত। মধুসূদন তাদের মধ্যে অগ্রগণ্য ছিলেন। হিন্দু কলেজে পড়বার সময় রাতে ঘুমাবার আগে মধু একপাত্র মদ খেতে খেতেন। শিবপুরের বিশপস কলেজে পড়ার সময় একাধিকবার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ঝামেলায় জড়িয়ে পড়েছিলেন — তার অন্যতম কারণ মদ্যপান।
হিন্দু কলেজে (বর্তমানে প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়) পড়ার সময় মাইকেল মধুসূদন দত্তের সহপাঠী, অভিন্ন হৃদয় বন্ধু গৌরদাস বসাক মধুকে বাবার সঙ্গে একসঙ্গে বসে আলবোলায় তামাক টানতে দেখেছেন। গরমের দিনে কলকাতায় গ্লাসের পর গ্লাস বিয়ার বা কখনো শেরি খেয়েছেন । আসলে মদ্যপান করলে তিনি সীমা রাখতে পারতেন না। পৈতৃক বাড়ি থেকে সরে আসার পর মাইকেল এম এস ডাট তাঁর প্রসাদপম ৬ নম্বর লাউডন স্ট্রিটের বাড়িটিকে মনের মত সাজিয়েছিলেন মনের মত শিল্পকলা দিয়ে। সেই সঙ্গে তার সুরাগারের শোভা পেত চেরি শ্যাম্পেন হুইস্কি বিয়ার। বন্ধুবান্ধবরা এলে উঠতো মদের ফোয়ারা।
অবশ্য লেখার সময় তার মদের দরকার হতো না লেখার নেশায় বুঁদ হয়ে থাকতেন তিলোত্তমা সম্ভব কাব্য তিনি নেশার ঘোরে লেখেননি বলে জানিয়েছেন স্বয়ং কবি। ব্যারিস্টারি সফল হতে পারেনি মধুসূদন হতাশায় ডুবে গিয়ে আকন্ঠ মদ্যপান করেছেন। ব্যারিস্টার মনমোহন ঘোষ একদিন দিনের বেলা এসে দেখেন মধুসূদন হুইস্কি খেয়ে চলেছেন। জিজ্ঞাসা করলে মনমোহনকে মধুসূদন জানিয়েছেন, এ হলো আত্মহত্যার নিশ্চিত উপায়। আর সত্যিই মাত্রারিক্ত মদ্যপানের পরিণতি হল যকৃত আর প্লিহার রোগ এবং অবশেষে মৃত্যুও হয় মধুসূদনের লিভার সিরোসিস রোগে।
মাত্রারিক্ত সুরাপানের জন্য অনেক প্রতিভাবান মানুষকে আমরা অকালে হারিয়েছি জীবনের শেষ প্রান্তে এসে শরৎচন্দ্রেরও মহাভঙ্গ হয়েছিল। তিনি সুরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় কে বলেছিলেন, ‘দেখ কি ভুলই জীবনে করেছি এই নেশা করে। যদি আমি নেশা না করতুম এরচেয়ে ঢের বড় লেখক হতে পারতুম।’
তাই, সাধু সাবধান।।
অসামান্য লেখনী সুরা নিয়ে।
থ্যাঙ্ক ইউ