ইরাবথম মহাদেবনের (Iravatham Mahadevan) মত বিখ্যাত সিন্ধুসভ্যতা বিশেষজ্ঞ লিখেছেন হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারোর প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্য চালাতে গিয়ে অসংখ্য পাথরের ও পোড়ামাটির গুলি পাওয়া গিয়েছে। এগুলি আকারে গোলাকার ও একহাতের তালুর আকারের বা আরও ছোট আকৃতির। এগুলি যে গুলতির সাহায্যে উৎক্ষেপণযোগ্য, তার অনেক প্রমাণ পাওয়া গেছে। বিশেষত সামরিক বা প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় যে এগুলি ব্যবহার করা হত, তার প্রমাণ এটাই যে এগুলি বিশেষ ধরনের গুদামে সংরক্ষিত অবস্থায় পাওয়া গেছে। আজকালকার ভূগর্ভস্থ অস্ত্রভাণ্ডার যেমন হয়, সেরকমের গুদামে।
প্রাচীন সভ্যতাগুলোর মধ্যে সিন্ধু সভ্যতা একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও সমৃদ্ধ সভ্যতা। এই সভ্যতার সময়কাল আনুমানিক ২৬০০ খ্রিস্টপূর্ব থেকে ১৯০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল এবং এটি বর্তমান পাকিস্তান ও উত্তর-পশ্চিম ভারতের একটি বিশাল অংশ জুড়ে বিস্তার লাভ করেছিল। হরপ্পা, মহেঞ্জোদাড়ো, চানহুদাড়ো, ধোলাভিরা, কলিবঙ্গান, রাখিগড়ি, লোথাল, সুটকাগেনদর এবং আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ নগর এই সভ্যতার অন্তর্গত ছিল। এই সভ্যতায় মানুষ কৃষিকাজ, স্থাপত্য, বাণিজ্য, শিল্পকলা, প্রযুক্তি ইত্যাদি বিষয়ে বিশেষভাবে উন্নত ছিল। এরই ধারাবাহিকতায় তারা বিভিন্ন অস্ত্র ও যন্ত্রেরও ব্যবহার করত, যার মধ্যে ‘গুলতি’ বা স্লিং (sling) একটি উল্লেখযোগ্য উপাদান হিসেবে বিবেচিত হয়। সিন্ধু সভ্যতায় গুলতির ব্যবহার, এর সম্ভাব্য উদ্দেশ্য, নির্মাণ প্রক্রিয়া, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এবং এর সামরিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য সত্যিই অবাক করার মতো।
গুলতি একটি প্রাচীন অস্ত্রবিশেষ যা মূলত নিক্ষেপযোগ্য অস্ত্র হিসাবে ব্যবহৃত হতো। এটি দুটি দড়ি বা চামড়ার ফিতার সঙ্গে একটি পাথর রাখার পকেট বা থলি নিয়ে তৈরি হতো। ব্যবহারকারী একটি হাতে দুটি দড়ির একটি ধরে এবং অন্যটি ছেড়ে দিয়ে পাথরটি প্রচণ্ড গতিতে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুর দিকে ছুঁড়ে মারতে পারত। এই যন্ত্রটি দেখতে সরল হলেও এটি ব্যবহার করা একটি দক্ষতার কাজ, এবং সঠিকভাবে ব্যবহার করলে দূর থেকে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারত।
সিন্ধু সভ্যতার বিভিন্ন স্থানে খননের সময় গুলতির প্রয়োগযোগ্য অনেক পাথরের গুলি পাওয়া গেছে। এগুলো সাধারণত গোলাকৃতি বা ডিম্বাকৃতি এবং আকারে ছোট, হাতের তালুর মাপে হয়ে থাকে। এই ধরনের পাথরের গুলি মহেঞ্জোদাড়ো, লোথাল, ধোলাভিরা, চানহুদাড়ো ইত্যাদি স্থান থেকে পাওয়া গেছে।
বিশেষ করে মহেঞ্জোদাড়ো ও হরপ্পা অঞ্চল থেকে উদ্ধার হওয়া গোলাকৃতি পাথরের নিদর্শনগুলো গুলতি ব্যবহারের দিকে স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়। এগুলোর আকৃতি এমনভাবে নির্ধারিত করা ছিল যাতে ছোঁড়ার সময় বাতাসে কম প্রতিরোধ তৈরি হয় এবং এগুলো নির্ভুলভাবে লক্ষ্যে পৌঁছায়।
সিন্ধু সভ্যতায় গুলতি মূলত কয়েকটি উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হতো বলে মনে করা হয়।
সামরিক কারণ — গুলতি একটি কার্যকর প্রতিরক্ষা ও আক্রমণের অস্ত্র ছিল। যেহেতু এটি সহজে বহনযোগ্য এবং দূর থেকে আঘাত হানতে সক্ষম, তাই প্রতিরক্ষা কাজে এর ব্যবহার ছিল খুবই যৌক্তিক। নগরের প্রতিরক্ষা দেয়ালের উপরে থাকা সৈন্যরা দূর থেকে আক্রমণকারীদের লক্ষ্য করে গুলতি ব্যবহার করত বলে প্রত্নতাত্ত্বিকদের ধারণা।
শিকার বা মৃগয়া — সেই সময় মানুষ পশুপাখি শিকারের জন্য বিভিন্ন অস্ত্র ব্যবহার করত, যার মধ্যে গুলতি ছিল একটি সাধারণ ও কার্যকর মাধ্যম। বিশেষ করে ছোট পাখি বা প্রাণী শিকারে এটি খুবই উপযোগী ছিল, কারণ এটি নিঃশব্দে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারত।
ক্রীড়া — অনেক প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষক মনে করেন, গুলতি কেবলমাত্র যুদ্ধ বা শিকারের জন্য ব্যবহৃত হতো না, বরং তা বালকদের খেলাধুলার অংশ হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারত। আজও অনেক জায়গায় গুলতি শৈশবের খেলার সামগ্রী হিসেবে প্রচলিত রয়েছে।
সিন্ধু সভ্যতার মানুষ বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপকরণ থেকে গুলতির অংশ তৈরি করত। এর জন্য তারা সাধারণত নীচের উপাদানগুলি ব্যবহার করত।
পাথর : গুলতির গুলি হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এগুলোকে ঘষে গোলাকার বা ডিম্বাকৃতি করে তোলা হতো। টেরাকোটা বা পোড়ামাটির গুলিও পাওয়া গিয়েছে।
চামড়া বা দড়ি : গুলতির ফিতা বা দড়ি হিসেবে পশুর চামড়া, নারিকেলের তন্তু বা গাছের আঁশ থেকে তৈরি দড়ি ব্যবহার করা হত।
কাঠ বা হাড়: মাঝে মাঝে গুলতির হাতল বা সাপোর্ট হিসেবে কাঠ বা পশুর হাড় ব্যবহৃত হতো।
উপাদানগুলোর প্রক্রিয়াজাতকরণেও সিন্ধু সভ্যতার কারিগরদের দক্ষতা ছিল। তাদের ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি ও কৌশল এসব অস্ত্রকে কার্যকর এবং টেকসই করত।
সিন্ধু সভ্যতার সমাজ ছিল সুসংগঠিত ও উন্নত। গুলতির মতো অস্ত্র এই সমাজের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার উন্নত দিক তুলে ধরে। এটি তাদের কৌশলগত চিন্তা-ভাবনার একটি নিদর্শন। বালকদের খেলার মধ্যে এই ধরনের সরঞ্জামের উপস্থিতি সমাজে অনানুষ্ঠানিক শিক্ষার প্রচলনেরও ইঙ্গিত দেয়। গুলতির ব্যবহার এক ধরনের শারীরিক দক্ষতা, লক্ষ্যনির্ধারণ ও মানসিক স্থিরতা গঠনের সহায়ক হতে পারে, যা সামরিক প্রশিক্ষণের একটি প্রাথমিক ধাপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
বর্তমানে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা ও বিভিন্ন প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রাচীন অস্ত্র ও যন্ত্রপাতির ব্যবহার আরও স্পষ্টভাবে বোঝা সম্ভব হচ্ছে। গুলতি নিয়ে আধুনিক পরীক্ষায় দেখা গেছে যে, একটি দক্ষ ব্যক্তি ৩০০ থেকে ৪০০ মিটার দূরেও লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। এই তথ্য থেকে বোঝা যায়, সিন্ধু সভ্যতার মানুষরা যদি এই অস্ত্র যথাযথভাবে ব্যবহার করতেন, তবে তা তাদের প্রতিরক্ষা কৌশলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত।
এছাড়া ৩ডি মডেলিং ও মেটালার্জিকাল বিশ্লেষণের মাধ্যমে গুলতির গুলিগুলোর ঘর্ষণ ও গতি বিশ্লেষণ করে এর কার্যকারিতা বোঝার চেষ্টা চলছে। এসব গবেষণা সিন্ধু সভ্যতার প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ এবং তাদের বাস্তবজ্ঞান ও কৌশলগত চিন্তাকে আরও ভালোভাবে উপস্থাপন করে।
গুলতির মতো প্রিমিটিভ অস্ত্র যে সিন্ধুসভ্যতার অস্ত্রভাণ্ডারকে ঋদ্ধ করেছিল, তা বলাই বাহুল্য। এই গুলতির সাহায্যেই আক্রমণকারী সৈন্যদের প্রতিহত করা হত দুর্গপ্রাকার থেকে।
তামিলনাড়ুর কিজহাদির প্রত্নতাত্ত্বিক খননে প্রাপ্ত জিনিসের মধ্যে গুলতি ও গুলতির গুলি বা বর্তুল পাথরের সন্ধান পাওয়া গেছে। এগুলি খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের। আরও আগেকার গুলতির গুলির সন্ধান পাওয়ার সম্ভাবনা আছে সেখানে। খননকার্য এখনও চলছে। সঙ্গে পাওয়া গেছে ব্রাহ্মীলিপিতে লেখা টেক্সট। হরপ্পা বা সিন্ধুসভ্যতার অধিবাসীরা যে প্রোটোদ্রাবিড়ীয়, তা গুলতি দিয়েই চেনা যায়।