দৈনন্দিন কাজ, কপি লিখতে বসেছি। ফোন এলো। সন্দীপ এসে বললো, তোকে নিচে ডাকছে?
কে?
তোর গুরুদেব?
টেরিয়ে তাকালাম।
আজ আমাকে একটু মাল খাওয়াবি?
দিলাম গালাগাল। আমি খাই, যে তোকে খাওয়াবো।
তুই তো চাখিস, আমাকেও একটু চাখতে দিবি।
কেনো চামচে বলার সময় মনে থাকে না।
সন্দীপ হাসলো।
ঠিক আছে এবার থেকে হাতা বলবো।
নিচে এলাম, দেখলাম বৈঠকী মেজাজে শক্তিদা, শ্যামলদা, সুনীলদা, শীর্ষেন্দুদা, আনন্দদা, সবাই বসে আছেন। হাসাহাসি আড্ডায় মশগুল।
কি বাবা কি করছিলে?
শক্তিদা আমায় দেখেই বললেন।
মনটা কেমন শুকনো শুকনো ঠেকছে। শোন, তাড়াতাড়ি কাজ সেরে নে, বিকেলে শ্যামলের বাড়ি চলে যাবি। দরকার আছে।

মাথা নেড়ে ওপরে চলে এলাম।
কাজ শেষ করে ঠিক সন্ধ্যের মুখে রওনা দিলাম। চলেও এলাম তাড়াতাড়ি।
শ্যামলদার বাড়ির ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে একটা বাড়ির বৈঠকখানায় তুমুল আড্ডা বসেছে। পান-আহার সহযোগে। আমি হাজির হলাম। দেখলাম নিচে দুটো খালি বোতল গড়াগড়ি খাচ্ছে।
শক্তিদা, শ্যামলদা হচ্ছেন আড্ডার মধ্যমনি। আর যারা আছেন কেউ অল ইন্ডিয়া রেডিওর এ্যানাউনসার, কেউ সংবাদ পাঠক। ইদানীং তারা আবার বাচিকশিল্পী (আবৃত্তিকার) হিসাবে খ্যাতি লাভ করেছেন। দু-একজন ছোট মাঝারী মাপের লেখকও আছেন।
সকলেই আমাকে টেরিয়ে টেরিয়ে দেখছে, এই ভূতটা আবার কে?
আমাকে দেখেই শ্যামলদা চেঁচিয়ে উঠলো, হারুণ ওকে একটু ঢেলে দে। আর দুটো ইলিশমাছ ভাজা তোর বৌদির কাছ থেকে নিয়ে আয়।
আমার দিকে তাকিয়ে বললো, একেবারে খাঁটি পদ্মার ইলিশ।
কি করে বুঝলে?
জিভ, বুঝলি জিভ।
হাসলাম।
আমাদের রূপনারায়ণে এরকম ইলিশ অনেক পাওয়া যায়।
তুই তো আর এ জম্মে গেলি না, তাহলে বুঝতিস এ বাংলা আর ও বাংলার তফাৎ। ঘটিরা খেতে জানে নাকি। মানকচুর কচি পাতা সরষেবাটা দিয়ে কখনো খেয়েছিস?
কোনদিন তো খাওয়ালে না। সাধ বুঝবো কি করে?
কথা চলছে খাওয়া চলছে। মনে মনে ঠিক করলাম আজ মওকা আছে দুজনকে আমার উদ্ভট চিন্তা ভাবনার একটা সঠিক ব্যাখ্যা চাইবো।
একটু সন্ধ্যা হতেই ঘরের ভিড়টা পাতলা হয়ে গেলো।
যে দু-একজন আছে তাদের ঠিক চিনি না। উসখুস উসখুস করছি।
কিরে তুই বাথরুমে যাবি? শক্তিদা হুঙ্কার দিলো।
না।
তাহলে ওরকম ছটফট করছিস কেনো। প্রেমিকা গাছের তলায় দাঁড়িয়ে আছে।
আমি এবার চলে যাবো। ঝাঁঝিয়ে উঠলাম।
বাবা — ছেলের রাগও আছে। শ্যামলদা বললো।
ঠিক আছে আর একটু অপেক্ষা কর, আমাকে ছেড়ে দিয়ে যাবি। শক্তিদা বললো।
কয়েকদিন ধরে আমার মাথায় একটা পোকা নরছে একটু বলে দেবে।
নিরামিষ না আমিষ সাবজেক্ট। শক্তিদা বললো।

বলতে পারবো না। মনে এলো, সুযোগ খুঁজছিলাম বলবো, এখনতো ফ্রি আছো একটু শুনে বলো।
বল শুনি।
আজ বিশ্বকর্মা পূজো, কয়েকদিন পর দেবীপক্ষ শুরু। মানে মহালয়া। শুক্ল পক্ষের শুরু। ছ-দিনের মাথায় ষষ্ঠী তারপর দশমী মায়ের বিসর্জন, তারপর কোজাগরী লক্ষ্মী পূজো। ওই দিনটা পূর্ণিমা।
তুইতো একবারে তিথি নক্ষত্র মিলিয়ে বলছিস।
হ্যাঁ।
তারপরে কৃষ্ণ পক্ষ শুরু এবং অমাবস্যায় কালীপূজো।
একেবারে ঠিক।
আমি তারও আগে থেকে শুরু করছি।
কতদিন আগে।
ঠিক তিন মাস আগে থেকে।
বল।
অম্বুবাচি।
ওতো বিধবারা তিনদিন উপোস করে।
হ্যাঁ। তন্ত্র মতে শাক্তপিঠ বলে কামাখ্যাকে। শুনেছি অম্বুবাচির তিনদিন কামাখ্যাতে যাঁরা তন্ত্রসাধনা করেন তারা ভিড় করে। আম্বুবাচি পালন করা হয় এই কারণে যে ওই তিন দিন মা ঋতুমতী হন। হিন্দু ঘরাণায় যত দেবী আছেন এই তিনদিন তাদের মন্দিরের দরজা বন্ধ থাকে। মাকে পূজো দিতে গেলে বাইরে থেকে দিতে হয়। মাতৃ মুখ দেখা বন্ধ।
শ্যামলদা শক্তিদার চোখ স্থির। আর যারা বসে আছেন, তারাও কেমন যেন স্থবিরের মতো।
এর ঠিক পরে পরেই বলতে পারো পনেরো দিনের মাথায় জগন্নাথ দেবের স্নানযাত্রা, তার সাতদিনের মাথয় রথ জগন্নাখ দেব তাঁর মন্দির থেকে মাসিপিসির বাড়িতে যান। আটদিনের মাথায় উল্ট রথ মাসি পিসির বাড়ি থেকে ফিরে আসেন। ঠিক তিন মাসের মাথায় — দেবীপক্ষ মানে মহালয়া এবং দুর্গাপূজা। পঞ্জিকা মতে দিনটা কম বেশি হতে পারে।
মোদ্দা কথাটা কি বলতে চাইছিস বল। শক্তিদা খিঁচিয়ে উঠলো।
খেঁচাবে না।
ঠিক আছে বল।
আমাদের দুর্গোৎসব, পূজো প্যান্ডেলে যতটা নিষ্ঠা ভরে হয়, তার থেকে বহুগুণ নিষ্ঠা আমি তথাকথিত এই সব বনেদী বাড়িতে দেখেছি। আমি নিজে চোখে দেখেছি।
যেখানে দুর্গাপূজা হয় সেই ঠাকুর দালান অম্বুবাচির কয়েকদিন আগে ঝাড় পোঁছ হয়। অম্বুবাচির ওই তিনদিন ঠাকুর দালানে একটা বড়ো মাটির হাঁড়িতে একটা প্রদীপ রেখে জ্বালানো হয়।
বাহাত্তর ঘন্টা প্রদীপ জ্বলে তা নেভানো হয় না। বাড়ির যাঁরা বিবাহিত মেয়ে তারা সকাল সন্ধ্যে সেখানে এসে প্রণাম করে।
অম্বুবাচির শেষে পূর্ণিমা সেই ঠাকুর দালানে সত্য নারায়ণ পূজো হয়।
জগন্নাথ দেবের স্নান যাত্রার দিন একটা গড়ান কাঠ ঠাকুরের মূল বেদীতে রেখে পূজো হয়।
যাকে দেশী পরিভাষায় বলে কাঠমা পূজো। রথের দিন সেইকাঠে খড়ের বাঁধন দেওয়া হয়। উল্টো রথের দিন সেই খড়ের বাঁধনে মাটির প্রলেপ পরে। এরপর তিনমাস ধরে চলে মাটির প্রলেপ লাগানো, মূর্তি বানানো।
মহালয়ার দিন ভোররাতে মায়ের চক্ষুদান হয়, বস্ত্র অঙ্গে চড়ানো হয়। সেইদিন থেকে একচ্যুয়েলি সেই সব বনেদী বাড়িতে পূজো শুরু হয়ে গেলো। প্রত্যেকটা অনুষ্ঠান নিষ্ঠা সহকারে পূজাপাঠ পদ্ধতির মধ্যে দিয়ে হয়।
এরপর ষষ্ঠী, সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী, দশমী। তারপর মায়ের বিসর্জন।

এটা বাস্তব সত্য, এই প্রথা যুগ যুগ ধরে চলে আসছে।
শাস্ত্রে এর কি ব্যাখ্যা আছে আমি জানি না। বোঝার চেষ্টাও করি নি। তবে আমার মনে হয়েছে যিনি এই সব ঋীতি নীতির আবিষ্কারক ছিলেন তিনি নেহাত সাধারণ লোক নন, তিনি যথেষ্ট বুদ্ধিমান।
তুই ঝেড়ে কাস তাতে বোঝার সুবিধে হবে। শ্যামলদা বললেন।
হারুণ।
বলুন।
ও ব্যাটা নেশাটা একবারে চটকে দিলো, গ্লাসে একটু ঢেলে দে।
আমি এই তিনমাসের সাইকেলকে একটা শিশুর জন্ম হিসাবে দেখতে পাচ্ছি। যদিও তোমরা বলবে একটা শিশুর জন্ম গ্রহনের সময় হচ্ছে নয়মাস দশদিন।
আমি যুক্তি তক্কে যাবো না। আমার মনে হয়েছে তাই জানতে চাইছি।
ঠিক আছে বল শুনি।
দেখো একটা সাধারণ মেয়ে ঋতুমতী হলে তার প্রিয়েড চলে তিনদিন। ডাক্তারী পরিভাষায় মেয়েদের মান্থলি সাইকেল হয় আঠাশ দিন অন্তর। যেদিন একটি মেয়ে ঋতুমতী হচ্ছে সেই দিনটাকে ধরে তিনদিন মাইনাস কর, তাহলে হাতে থাকে পঁচিশ দিন।
এবার পঁচিশ দিনকে যদি সঠিক ভাগে ভাগ করি তাহলে বারোদিন করে দুভাগে পরবে। মাঝে একদিন থাকবে। তারমানে প্রথমের তিনদিন আর মাঝের একদিন ধরে ষোল দিনের দিনটা একজন ঋতুমতী মেয়েদের ক্ষেত্রে ভাইটাল। সাইন্সও তাই বলছে। পনেরো, ষোলো, সতেরো এই তিন দিন যদি নারী পুরুষ ঠিক মতো মিলিত হতে পারে তাহলে সেই নারী গর্ভে সন্তান ধারন করতে পারে। (আগামীকাল)
DADA KAJALDIDHI TA KI 240 ER POR R PABONA R JODI KOTHAO BOOK HISABE BERIYE THAKE SETAO EKTU KINDLY BOLUN
অনবদ্য লিখেছেন স্যার। নতুন কিছুর জন্য উদ্গ্রিব হয়ে রইলাম। কাজলদিঘীর পরবর্তী আপডেট পেলে খুশী হব। ধন্যবাদ