তুইতো সব খিচুরী পাকাচ্ছিস।
একবারে নয়, আমি ব্যক্তিগত ভাবে এই ব্যাপারটা যা উপলব্ধি করতে পেরেছি তা গল্পের আকারে বলছি, আর তোমাদের কাছ থেকে তার উত্তর চাইছি।
নেক্সট বল।
দেখো অম্বুবাচির তিনদিন বাদ দিলে ঠিক পনেরো দিনের মাথায় জগন্নাথ দেবের স্নান যাত্রা। সেইদিন গড়ান কাঠের পূজো করা হয়। তারমানে দুর্গা মা তাঁর মাতৃজঠরে স্থান পেলেন।
দেখো মাতৃগর্ভে একটা ভ্রুণ বেড়ে ওঠার সময়কাল একুশ দিন। তারমানে যেকোন মহিলা নেক্সট মাসে তার প্রিয়েড না হলে ডাক্তার ইউরিন পরীক্ষা করতে বলে। মানে আগের মাসের প্রিয়েডের থেকে ঠিক চল্লিশ থেকে পঁয়তাল্লিশ বাদে।
পজিটিভ হলে ডাক্তাররা একটা দিনক্ষণ স্থির করে বলে দেন আপনার এই মাসে ডেলিভারি হবে।
এখানেও তুমি দেখো রথ, উল্টোরথ ঠাকুরের কাঠমা তৈরি করে মাটির প্রলেপ লাগানো শুরু হয়ে গেলো।
দেখবে, হিন্দু ঘরের মেয়েদের সাতমাসে একটা সাধ ভক্ষণ করা হয় আর একটা আটমাসে সাধভক্ষণ করান হয়। মানে সেই মাতৃমতী মেয়েকে ভালো মন্দ খাওয়ানো হয়। তারপর তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
আমি ধরে নিচ্ছি। বিশ্বকর্মা শুধু আর্কিটেক্ট ছিলেন না। তিনি ডাক্তারও ছিলেন। তাঁর নার্সিংহোমে কিংবা প্রাসাদে সেই গর্ভবতী মেয়েকে নিয় আসা হলো সন্তান জন্মের জন্য। মহালয়াতে দুর্গামায়ের জন্ম। ষষ্ঠীতে মায়ের বোধন।
কেনো?
দেখবে হিন্দু ঘরে যে কোন সন্তানের জন্মের পর, ছয়দিনের মাথায় একটা পূজো হয়, তাকে বলে ছয় ষষ্ঠী।
এই দিনটাকে নিয়ে অনেক লোক গাথাও আছে। আমি আমার গ্রামের অনেক বৃদ্ধার কাছে শুনেছি।
যেমন, আট কড়াই বাট কড়াই / ছেলে (সন্তান সে মেয়ে হোক ছেলে হোক) আছে ভালো / ছেলের বাবার কাছা ধরে টানা টানি করো…. ইত্যাদি ইত্যাদি।
দেখো এই কবিতা কে লিখেছে সেই কবির নাম তুমি কোথাও খুঁজে পাবে না। মুখে মুখে চলে আসছে। হয়তো তার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু ফ্লেভারটা এখনো রয়েগেছে। লোকগাথা…
দুর্গাপূজোর চারদিনকে তুই কি ভাবে ব্যাখ্যা করবি।
তোমার সন্তানকে তুমি সঠিক ভাবে যত্ন করো।
সেই মাকে বলা হচ্ছে। যাতে সে কোন ভাইরাসে আক্রান্ত না হয়। তুমি নিষ্ঠা সহকারে হাতমুখ ভালো করে পরিষ্কার করে তোমার শিশুর গায়ে হাত দাও। তাকে স্তনদান করো।
আমরা প্রত্যেকে মায়ের সন্তান।
দেখবে যে কোন শিশু বাহাত্তর থেকে ছিয়ানব্বই ঘন্টা পৃথিবীর এনভায়রনমেন্টের সঙ্গে লড়াই করে। তারপর তার স্টেবিলিটি আসে। তারপর শব্দ গন্ধ স্পর্শের সঙ্গে তার মিলন হয়।
বিসর্জনটা?
ওটা প্রতিকী। ধরে নাও নার্সিংহোম থেকে ঘরে ফেরা।
জিনিসটা তুই গুছিয়ে ধরেছিস। তবে ভাববার সময় দে। উত্তর তোকে দেবো।
শ্যামলদা গম্ভীর কণ্ঠে বললেন।
আসর ভাঙলো। আমার গল্প নিয়ে অনেক হাসাহাসি হলো।
শক্তিদা মাথায় চাঁটা মেরে বললেন, মাথায় বুদ্ধি রাখিস, তোর দ্বারা হবে।
দুজনে বেরিয়ে এলাম। রিক্স করে শ্যামলদার ব্রহ্মপুরের ভাড়া বাড়ি থেকে গড়িয়া বাস স্ট্যান্ড সেখান থেকে ট্যাক্সি ধরলাম। অনেকটা পথ পার হলাম, শক্তিদা একটা কথাও খরচ করেন নি।
হঠাৎ শক্তিদা বললেন, অনি।
উঁ।
তোর নল দময়ন্তীর কাহিনীটা মনে আছে।
আছে।
নল নামটা হলো কেনো।
মহাভারতে লেখা আছে একটা নলের মধ্যে তার জন্ম, তাই তার নাম নল।
তারমানে কি টেস্ট টিউব বেবি? আমরা তো টেস্ট টিউব বেবিকে নলজাতক বলি।
চমকে তাকালাম শক্তিদার মুখের দিকে। একচিলতে হাসি বিদ্যুতের মতো ঝিলিক মেরে চলে গেলো।
আপাত দৃষ্টিতে তোর ভাবনাটার কোন গাছ পাথর নেই। কিন্তু তুই খুব কংক্রিট ভাববার চেষ্টা করেছিস।
শক্তিদা থেমে থেমে কথা বলছেন আমি শ্রোতা।
ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক মহম্মদ, খ্রীষ্ট ধর্মের প্রবর্তক যীশু, জৈন ধর্মের প্রবর্তক মহাবীর, বৌদ্ধ ধর্মের প্রবর্তক গৌতম বুদ্ধ, আচ্ছা হিন্দু ধর্মের প্রবর্তক কে? ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর না তেত্রিশ কোটি দেবতা?
আমি শক্তিদার দিকে হ্যাঁ করে তাকিয়ে আছি।
তুই সঠিক উত্তর পাবি না।
আমি খুব ভালো করে ভেবে দেখেছি, হিন্দুধর্মকে নিয়ে যে যেভাবে পেরেছে ব্যাখ্যা করে গেছে। বাক স্বাধীনতা সেখানে চরম পর্যায়ে পৌঁচেছে কারুর কোন হেলদোল আছে?
আমার ব্যক্তিগত অভিমত হিন্দুধর্মের মতো গণতন্ত্র সব ধর্মেই কিছু না কিছু আছে।
নোংরামী করে ওই রিজিড লোক গুলো। হিন্দুধর্মে এটা মাত্রা তিরিক্ত।
সুনীল ওর একটা লেখায় মা কালীকে সাঁওতাল মেয়ের সঙ্গে তুলনা করলো, কয়েকজন তার প্রতিবাদ করলো, আমি ব্যক্তিগত ভাবে বেশ কয়েকজন বুদ্ধিজীবীর সঙ্গে কথা বলেছি।
তার কি বললো জানিস?
বলেছে বলেছে কার কি বয়ে গেছে, আগামী বছর থেকে কি কালীপূজো বন্ধ হয়ে যাবে, না পাঁঠা বলি বন্ধ হয়ে যাবে।
তুই একবার ভাব।
অন্য কোন ধর্মে হলে কাটা কাটি না হলেও একটা মারি মারি বাধতই।
বিবেকানন্দ একটা কথা ঠিক বলেছেন, ওরে রামায়ণ, মহাভারত, গীতা ঠাকুরের সিংহাসনে রেখে পূজো না করে ভালো করে মন দিয়ে পর। তাহলেই পূজো করা হবে।
এখানে পূজো বলতে বিবেকানন্দ কি বলেছে বলতো।
জ্ঞাণ অর্জন।
এই তো তোর মাথা কাজ করতে শুরু করেছে।
একচ্যুয়েলি এই গ্রন্থগুলি সব সেই সময়কার সমাজ চিত্র। সে বেদব্যাসই লিখুক কিংবা বাল্মীকি লিখুক। তখনতো আমাদের মতো অত্যাধুনিকতা ছিল না। তবে আমার দৃঢ় বিশ্বাস সাইন্স অনেক এগিয়ে ছিলো।
ঘড়ির আবিষ্কার হয় নি। তাই শুক্ল পক্ষ, কৃষ্ণপক্ষ হিসাবে দিন কাউন্ট করতো।
আর সাধারণ মানুষ যাতে এই দিনক্ষণ সঠিক ভাবে মনে রাখতে পারে, তার জন্য এক এক দেব-দেবীর আগমন ঘটিয়ে পূজো পার্বন।
আমার মনে হয় সেই সময় ক্যালেন্ডারও আবিষ্কার হয় নি।
আমি এতোক্ষণ তোর কথাটা ভাবছিলাম বুঝলি। বেসলেশ তবে নানা চিন্তার খোরাক জোগায়।
তুই এক দিক থেকে ঠিক কথা বলেছিস। অম্বুবাচিটা হয় জুনের শেষের দিকে নয় জুলাইয়ের প্রথম দিকে। সেই সময়টা ভরা বর্ষা। প্রচণ্ড গরমের পর স্বস্তির আনন্দ।
আমাদের ব্রিদিং টাইমের সর্বোৎকৃষ্ট সময়। দেখ ঠিক সেই সময়টা অম্বুবাচি। তুই যা বললি।
তবে টাইম ফ্রেমের ব্যাপরটা গন্ডগোল থাকতে পারে।
না। তুমি দেখো ন-মাস দশ দিনের মাথায় অন্নপূর্ণা পূজো। দুর্গা মায়ের আর এক রূপ।
এটা ভাববার বিষয়। তাহলে এই অসুর বিসুর ব্যাপরটা কি বলতো।
প্রত্যেকেই দাদা হতে চায়। দেবতারা খালি অমৃত খাবে আর অসুররা গড়ল খাবে তা হয় না।
তাছাড়া দেখবে ছেলেরা মেয়েদের সঙ্গে ঠিক যুদ্ধ করতে পছন্দ করে না। আর মেয়েদের এগিয়ে দিলে এ্যাডভান্টেজ দেবতা। এর মধ্যে গল্প কি আছে ছেড়ে দাও। আমি ব্যাপারটাকে ভাববার চেষ্টা করেছি। আমার ভাবনাটাকে তো কেউ কেড়ে নিতে পারবে না।
শক্তিদা চুপ করে জানলার দিকে তাকিয়ে রইলো। রাস্তা দেখছে। চোখ স্থির।
আমিও চুপচাপ বসে আছি।
বাড়ির রাস্তায় এসে নামলাম।
ট্যাক্সি বিদায় নিলো। দুজনে হাঁটতে হাঁটতে শক্তিদার বাড়ির পথে। দুজনেই নিস্তব্ধ।
বাড়ির গেটের কাছে এসে শক্তিদা আমার হাতটা চেপে ধরলো।
দুগ্গা তোর আমার ঘরের মেয়ে, কারুর কারুর মা। ঘরের মেয়েকে মা বলে ডাকতে অসুবিধে কোথায়?
সমাপ্ত
DADA KAJALDIDHI TA KI 240 ER POR R PABONA R JODI KOTHAO BOOK HISABE BERIYE THAKE SETAO EKTU KINDLY BOLUN
লেখাটায় অন্যরকম একটা ফ্লেভার আছে। ভালো লাগলো।