আমি দুটি বাবুঘাট চিনি। কলকাতার বাবুঘাট আর ভদ্রেশ্বরের বাবুঘাট। কলকাতার বাবুঘাট তৈরি করেন রাণী রাসমণির স্বামী বাবু রাজচন্দ্র দাস। তাঁর নাম থেকেই নাকি বাবুঘাট। আবার ভদ্রেশ্বরের বাবুঘাটের নামের পেছনে কোনও বাবুর নাম পাওয়া যায় না। লোকে বলে নৌকাঘাট। হুগলির ভদ্রেশ্বরের এই বাবুঘাট কেন যে নৌকাঘাট , তা ভাবতে ভাবতে মনে হল বাবুর সঙ্গে নৌকার কোনও যোগ থাকলেও থাকতে পারে। অভিধান ঘেঁটে ‘বাবুট’ বলে যে শব্দটি পেয়ে গেলাম, তা চমকে ওঠার মতো। বাবুট মানে নৌকা। আসছে সংস্কৃত বার্বট থেকে। তখনই মনে হল ‘বাবুট-ঘাট’ ই কি অপভ্রংশে ‘বাবুঘাট’ হয়ে গেছে? অর্থাৎ যে ঘাট মূলত নৌকার ফেরিঘাট ছিল, সে ঘাটই হল বাবুঘাট! সত্যিই কলকাতার বাবুঘাট আদতে ছিল নৌকার ঘাট। জাহাজ ছাড়ত কয়লাঘাট, প্রিন্সেপ ঘাট, চাঁদপাল ঘাট, গার্ডেনরিচ থেকে। মূলত নৌকার ঘাটই ছিল এই ‘বাবুট-ঘাট’ তথা বাবুঘাট।
বাবুঘাট কলকাতার গঙ্গার এক সদাব্যস্ত ঘাট। যেহেতু ঘাটটি নির্মাণ করেছিলেন রাণী রাসমণির স্বামী বাবু রাজচন্দ্র দাস, লোকের বিশ্বাস, বাবু-যুক্ত হয়ে ঘাটটি বাবুঘাট হল। মুশকিল হচ্ছে এই ঘাট ছাড়াও আরও অনেক বাবুঘাট আছে। হুগলির ভদ্রেশ্বরে গঙ্গার তীরে, বাংলাদেশের যশোরের চৌগাছায় কপোতাক্ষ নদের তীরে, জলপাইগুড়ির তিস্তায়,- সর্বত্র আছে একটি করে বাবুঘাট। সবই তো আর রাণী রাসমণির স্বামী করে যাননি। সব ঘাট আবার বাবুদের হাওয়া খাওয়ার ঘাটও নয়।
কলকাতার গঙ্গার ঘাট জুড়ে কত কথা, কত কাহিনী। কোনও ঘাটে সদাগরের দল এসে নামে তো কোনও ঘাটে মানুষজন নিজেদের ধর্মাচরণে থাকে ব্যাস্ত। আবার কোনও ঘাটে শোনা যায় বিলিতি জাহাজের ভোঁ তো কোনও ঘাটের নামই হয়ে যায় অন্য দেশের নামে, কারণ সেই দেশে তখন এ দেশ থেকে পাঠানো হচ্ছে দলে দলে দাস দাসী। যেমন সুরিনাম ঘাট। সে যাই হোক এমনই একটি ঘাটের নাম হল বাবু রাজচন্দ্র দাসের ঘাট ওরফে বাবুঘাট।
বাবুটি ধর্মপ্রাণ, বাবু মহানুভব, তাই এমন বাবুর নামে তৈরি ঘাটকে কলকাতার মানুষ ভালোবেসে ডাকতে লাগলো বাবুঘাট নামে। ইনি কলকাতার জানবাজারের জমিদার শুধু নন, রাণী রাসমণির স্বামীও বটে। রানীমা তাঁর স্বামীর নামে এই ঘাটের নাম রেখেছেন রাজচন্দ্র দাসের ঘাট। বলতে গেলে হিন্দু ধর্মাচারীর কত হরেক প্রকার কাজ থাকে গঙ্গাকে সামনে রেখে। কেবল স্নানযাত্রাতেই হিন্দুর কাজ থেমে থাকে না। পারলৌকিক কাজও থাকে কত হরেক রকম। কিন্তু তাঁর জন্যে সাজানো গোছানো ঘাটের বড়ই অভাব। এবার সেই অভাবই পূরণ হতে চলল।কিন্তু এই ঘাটের মাথায় যে ফলক লেখা আছে সেটি অন্য কারণে গুরুত্বের দাবী রাখে। সেই ফলকটি সকলের চোখের আড়ালে অন্য রকম একটি বার্তা প্রকাশ করে আসছে। এই বার্তার আড়ালে রয়ে গেল এক লালমুখো সাহেবের দৃষ্টিভঙ্গি। সাহেবের নাম লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক। আঠেরোশ তিরিশের কলকাতা। বেশ গুছিয়ে যখন গ্রেকো রোমান আর্কিটেকচার নকশায় ডোরিক কলাম সঙ্গে করে গড়ে উঠল ঘাটের চাতাল আর ছাঁদ-নকশা, তখন এই সাহেব বিস্তর প্রশংসা করে বললেন, এমন কর্মকাণ্ডের জন্য অর্থ ব্যয়কে দরাজ হস্তে সমর্থন করা দরকার। আর এই প্রশংসার উল্লেখও রইল ঘাটের ফলকের শরীরে। এমন প্রশংসা সে যুগে বিরল বললে কম বলা হবে। এটি কলকাতার এমন একটি ঘাট, যেখানে প্রথম যুগে বসানো ছিল এমন একটি কল যা দিয়ে গঙ্গা থেকে জল তুলে কলকাতার ওই অঞ্চলের রাস্তাকে পরিষ্কার করা হত। এমন খবর পেয়ে কে না সাধুবাদ জানাবেন।
তা ছাড়া সতেরো শ চুরাশির কলকাতার মানচিত্র বলে দেয় যে এই ঘাটের এলাকা থেকেই গণ্য করা হত ডিহি কলকাতার দক্ষিণের সীমানাকে। অন্তত কর্নেল উডের মানচিত্র সেরকমই কথা বলে আমাদের। সব মিলিয়ে কলকাতার একটি ঘাটের আড়ালে ধরা আছে ব্রিটিশ পতাকা যুগের বাঙালির কর্মকাণ্ডের এক বিশেষ বার্তা। যা সাহেবের মন জয় করেছিল অচিরেই। আর এই মন জয় করার হিসেব ধরা আছে ঘাটের পেডিমেন্টের ঠিক নীচে। বাবুঘাটে আজও লোকের ঢল নামে। কিন্তু ফলক নামায় লিখিত ইতিহাসটুকু ক’জনের আর পড়ে দেখার সময় আছে, তা বলা বিস্তর মুশকিল।
গঙ্গার পাড়ে আছে, রাজা নবকৃষ্ণ দেবের ঘাট, রাজা রাজকৃষ্ণ দেবের ঘাট, রঘু মিত্তিরের ঘাট, শোভারাম বসাকের ঘাট, কাশী মিত্র ঘাট, প্রসন্নকুমার ঠাকুরের ঘাট, প্রিন্সেপ ঘাট, আউট্রাম ঘাট, ব্যারেটো ঘাট, ব্লাইথ ঘাট। কালের করাল প্রবাহে অনেকগুলি ঘাট আজ অবলুপ্ত।
কিন্তু কোনও ক্ষেত্রেই রাজাঘাট, লর্ডঘাট বলে পরিচিত হয়নি সেগুলো। শুধু বাবুঘাটের বেলায় রাজচন্দ্র দাস বাদ পড়ে গেলেন কেন, শুধু বাবুঘাট নামটিই রয়ে গেল কেন, তা বোঝা শক্ত। তাই মনে হচ্ছে, বাবুটঘাটের অপভ্রংশে বাবুঘাট হওয়ার পেছনেই যুক্তিটা জুতসই। বাবুঘাট নামাঙ্কিত ঘাটগুলি যে আদতে নৌকার ফেরিঘাট ছিল, তা একশোভাগ নিশ্চিত।
খুব ভালো লাগলো
অনেক ধন্যবাদ আপনাকে পাঠপ্রতিক্রিয়ার জন্যে। ভালো লাগল।
অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। সম্মানিত বোধ করছি।
বাহ , বেশ ভালো লাগলো????????
– প্রবীর ঘোষ , লন্ডন
অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। সুদূর প্রবাসে বসে আপনি যে আপনার সুচিন্তিত মতাামত দিয়েছেন, তাতে আমি অভিভূত।
চমৎকার লাগলো লেখাটা। খুব ভেবেচিন্তে পড়াশোনা করে লেখা এই প্রতিবেদন।
অনেক ধন্যবাদ। আপনিও রীতিমতো পড়াশোনা করেন। তাই আমার লেখার প্রতিপাদ্য আপনি ঠিকই ধরেছেন।
অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। সুদূর প্রবাসে বসে আপনি যে আপনার সুচিন্তিত মতাামত দিয়েছেন, তাতে আমি অভিভূত।
অনেক না জানা কথা জানলাম।
অনেক ধন্যবাদ।