রক্ষণশীল হিন্দু সমাজের কুসংস্কার ও আচার বিচার, ব্রাহ্মসমাজের উত্থান ও প্রগতিশীলতার মাঝখানে তখন বঙ্গসমাজের হাঁসফাঁস দশা। সময়টা ঊনবিংশ শতকের প্রথম ভাগ। ঠিক এই সময় নিরপেক্ষতা বজায় রেখে বাংলা সংবাদপত্র প্রকাশ, প্রচার ও প্রসারের কাজ খুব সহজ ছিল না। আর এই কাজটিই খুব সহজে করে কৃতিত্বের দাবিদার ছিলেন কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত।
১৮১২ সালের ৩রা মার্চ উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার কাঞ্চনপল্লিতে (বর্তমানে কাঁচরাপাড়া) তিনি জন্মগ্রহণ করেন। পিতা ছিলেন কবিরাজ হরিনারায়ণ গুপ্ত। ঈশ্বর দশ বছর বয়সেই মাতৃহারা হন। পিতা হরিনারায়ণ দ্বিতীয়বার দার পরিগ্রহ করলে ঈশ্বরের জীবনে সমস্যা ঘনিয়ে আসে। সৎমায়ের স্নেহের অভাবে ঈশ্বরকে মাতুলালয় জোড়াসাঁকোতে আশ্রয় নিতে হয়। এর ফলে ঈশ্বরের শৈশব খুব সুখের হয় নি। মামারবাড়িতেই অল্পস্বল্প শিক্ষার শুরু। টালমাটাল শৈশবের জন্য উচ্চশিক্ষা লাভ ঈশ্বরের সম্ভব হয় নি। তবে পরবর্তীতে তিনি নিজ চেষ্টায় বাংলা ও সংস্কৃত ভাষাতে ব্যুৎপত্তি লাভ করেন এবং বেদান্তদর্শন আয়ত্ত করেন। এছাড়া কাজ চালিয়ে নেওয়ার মতো ইংরাজি ও ফারসি শিখে নিয়েছিলেন। কিন্তু যেহেতু তাঁর উচ্চশিক্ষা ছিল না সেই কারণে রামমোহনের ব্রাহ্মসভার অদ্বৈতবাদ ও ডিরোজিওর ইয়ং বেঙ্গলের পাশ্চাত্যমুখী আধুনিক চিন্তাভাবনার সঙ্গে তাঁর একটা দূরত্ব স্বভাবতই তৈরি হয়েছিল।
ঘটনাচক্রে এইসময় সংস্কৃত কলেজের অধ্যাপক প্রেমচন্দ্র তর্কবাগীশকে মিত্র হিসাবে পান। মূলত তাঁরই প্রেরণায় ও পাথুরিয়াঘাটার রাজবাড়ির যোগেন্দ্রমোহন ঠাকুরের সহায়তায় ১৮৩১ সালে ‘সংবাদ প্রভাকর’ পত্রিকার সম্পাদনার ভার নেন। ঈশ্বরের কর্মনৈপুণ্যে সংবাদপত্রের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যে সাপ্তাহিক পত্রিকাটি দৈনিক পত্রিকায় রূপান্তরিত হয়। শুধুমাত্র সম্পাদক হিসাবেই নয় একজন সাংবাদিক হিসাবেও তিনি ছিলেন যথেষ্ট সফল। সাংবাদিক প্রতিবেদন লেখার সূত্রেই শুরু হয় তাঁর সাহিত্যরচনা। বাংলার প্রত্যন্ত গ্রামে গঞ্জে ঘুরে ঘুরে তিনি তাঁর অভিজ্ঞতা ধারাবাহিকভাবে ‘সংবাদ প্রভাকরে’ লিখতেন ‘ভ্রমণকারী বন্ধুর পত্র’ শিরোনামে। তাঁর লেখাতে কখনও ইংরেজ স্তাবকতা, কখনও বিদ্রোহী সিপাহীদের প্রতি কটাক্ষ আবার কখনো নীলকর সাহেবদের বিরুদ্ধে বিদ্রুপাত্মক মন্তব্য পাওয়া যেত। আবার ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বিধবা বিবাহের বিরোধিতাও তিনি করেছিলেন।
সাংবাদিকতার মতো সাহিত্যের ক্ষেত্রেও ঈশ্বর গুপ্ত ছিলেন যুগসন্ধিক্ষণের কবি। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের মধ্যযুগ (ভক্তিবাদ ও দেবদেবীর প্রাধান্য) এবং আধুনিক যুগের (যুক্তি, ব্যক্তিচেতনা ও সমাজ সচেতনতা) সন্ধিক্ষণে তিনি বিচরণ করেছিলেন। তাঁর কাব্যে প্রাচীনযুগের ছন্দ অলংকার ও মধ্যযুগীয় মানসিকতার সাথে আধুনিক যুগের দেশপ্রেম, সমাজ সংস্কার এবং বাস্তববাদী দৃষ্টি ভঙ্গির অদ্ভুত মিশ্রণ ছিল। মাইকেল মধুসূদন দত্তের মতো সম্পূর্ণ আধুনিক কবির উন্মেষ হওয়ার আগের পর্বটি তাঁর কবিতায় স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। তাই তো তিনি যুগসন্ধিক্ষণের কবি। তাঁর ভাষা ও ছন্দে ভারতচন্দ্রীয় (কবি ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর) রীতি বজায় থাকলেও বিষয়বস্তু ছিল সাধারণ মানুষের জীবন, সমাজ ও প্রকৃতি। দেবতত্ত্বের বদলে তিনি সমাজের সাধারণ বিষয় যেমন মশা, মাছি, বাজার, তপসে মাছ, পাঁঠা এসব নিয়েও ব্যঙ্গাত্মক কবিতা লিখেছেন।
“রেতে মশা দিনে মাছি,/এই তাড়য়ে কলকেতায় আছি।।”
১৮৩৩ সালে বাবু রূপলাল মল্লিকের গৃহপ্রবেশের সময় এই ছড়াটি রচনা করেছিলেন। কলকাতার তখনকার অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এই রচনায় প্রকাশ পেয়েছিল।
“কষিত-কনক-কান্তি কমনীয় কায়/গালভরা গোঁফ-দাড়ি তপস্বীর প্রায়।।/মানুষের দৃশ্য নয় বাস করো নীরে।/মোহন মণির প্রভা ননীর শরীরে।।/পাখি নও কিন্তু ধর মনোহর পাখা।/সমধুর মিষ্ট রস সব-অঙ্গে মাখা।।/একবার রসনায় যে পেয়েছে তার।/আর কিছু মুখে নাহি ভাল লাগে তার।।” তপসেমাছ সম্বন্ধে তাঁর এই কবিতা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কেও মুগ্ধ করেছিল।
“ভ্রাতৃভাব ভাবি মনে, দেখ দেশবাসীগণে,/প্রেমপূর্ণ নয়ন মেলিয়া।/কতরূপ স্নেহ করি, বিদেশের কুকুর ধরি,/স্বদেশের ঠাকুর ফেলিয়া।।” কবি তাঁর ‘স্বদেশ’ নামক কবিতায় এইভাবে নিজের দেশের সংস্কৃতি ও মানুষকে অবজ্ঞা করে বিদেশের অন্ধ অনুকরণকে তীব্র ব্যঙ্গ করেছেন। সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁকে বাংলা সাহিত্যে এক অদ্বিতীয় প্রতিভার কবি হিসাবে উল্লেখ করেছেন, যিনি মধ্যযুগের শেষপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আধুনিকতার সূচনা করেছিলেন। তাঁর রচনা বিষয়ে বঙ্কিমচন্দ্র বলেছেন ,
“ঈশ্বর গুপ্তের কাব্য চালের কাঁটায়, রান্নাঘরের ধুঁয়ায়, নাটুরে মাঝির ধ্বজির ঠেলায়, নীলের দাদনে, হোটেলের খানায়, পাঁঠার অস্থিস্থিত মজ্জায়। তিনি আনারসে মধুর রস ছাড়া কাব্যরস পান, তপসে মাছে মৎসভাব ছাড়া তপস্বীভাব দেখেন, পাঁঠার বোকা গন্ধ ছাড়া একটু দধীচির গন্ধ পান।… আমার বিশ্বাস যে, তিনি যদি তাঁহার সমসাময়িক লেখক কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় বা পরবর্তী ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ন্যায় সুশিক্ষিত হইতেন, তাহা হইলে তাঁহার সময়েই বাঙ্গালা সাহিত্য অনেকদূর অগ্রসর হইত। বাঙ্গালার উন্নতি আরও ত্রিশ বৎসর অগ্রসর হইত। তাঁহার রচনায় দুইটি অভাব দেখিয়া বড় দুঃখ হয় — মার্জিত রুচির অভাব এবং উচ্চ লক্ষ্যের অভাব। অনেকটাই ইয়ারকি। আধুনিক সামাজিক বানরদিগের ইয়ারকির মত ইয়ারকি নয় — প্রতিভাশালী মহাত্মার ইয়ারকি। তবু ইয়ারকি বটে। “
এইসব দুর্বলতা সত্ত্বেও ঈশ্বর গুপ্ত বাঙালির ইতিহাসে এক বিরল বহুমুখী প্রতিভা এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। যদিও অনেক পন্ডিত ব্যক্তিত্ব ঈশ্বর গুপ্তকে ‘কবি’ বলতেও নারাজ। কিন্তু সাহিত্য সম্রাট যাঁর কাব্যপ্রতিভাকে স্বীকার করেছেন তাঁকে কি অত সহজে নস্যাৎ করা যায়? তিনি প্রধানত ব্যঙ্গাত্মক কবি হিসাবে সমধিক পরিচিতি লাভ করলেও সামাজিক ও রোম্যান্টিক ধারার কবিতাও তিনি লিখে গেছেন। তাঁর বিখ্যাত কবিতাগুলি হল ‘মাতৃভাষা’, ‘আফিস’, ‘পাথরঘাটা’, ‘সত্যধর্ম’ ইত্যাদি।
শৈশব যেমন তাঁর কন্টকময় ছিল তেমনি সাংসারিক জীবনেও তিনি সুখী হতে পারেন নি। সেটা তাঁর গুণের জন্য কি দোষের জন্য তা বিতর্কের বিষয়। তাঁর স্ত্রী সম্ভবত ঘোর কৃষ্ণবর্ণা ছিলেন। শুধুমাত্র এই কারণে কবি স্ত্রীর সঙ্গে বাক্যালাপ করেন নি কোনোদিন। যদিও তাঁর ভরন পোষণের দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করেন নি। এটিও শোনা যায় যে তিনি মনে মনে অন্য কোথাও বাঁধা পড়েছিলেন। এগুলি সবই সম্ভবত সেই সময়ের সামাজিক অবস্থা এবং তাঁর স্বল্প শিক্ষাজনিত মানসিকতার প্রতিফলন। ১৮৫৯ সালের ২৩শে জানুয়ারি মাত্র সাতচল্লিশে গুপ্ত কবি নীরব হলেন।
“নশ্বর ঈশ্বর আমি, বুঝাইব কায়।/ঈশ্বর যাবার নয় ঈশ্বর কি যায়?/ছিল গুপ্ত, হোলো গুপ্ত, গুপ্ত কোথা আছে?/সকলই হইল গুপ্ত ঈশ্বরের কাছে। /… ভোগ যেন কর্মভোগ, ভুগিতে না হয়।/যোগে যেন অনুযোগ, কখনো না রয়।।/কিরূপে মনের ভাব, করিব প্রকট।/বলিবার কিছু নাই তোমার নিকট।।/চলিবার বলিবার, শেষ হোলো সব।/বলে কয়ে একেবারে, হলেম নীরব।।” (প্রার্থনা)
তথ্যঋণ : রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ, ঈশ্বর গুপ্ত রচনাবলী, উইকিপিডিয়া।