রসগোল্লা খাবার লোভে একজন আসছেন দক্ষিণেশ্বরে, আবার সঙ্গীকে শাসিয়ে রাখছেন যে রসগোল্লা না পেলে তিনি চলে আসবেন এবং কান টান মুলে দিতেও পারেন। বুঝুন কান্ড ছেলের! কি ঔদ্ধত্ব! সে যাই হোক, খেতে এবং খাওয়াতে উভয়েই ভালবাসতেন। আবার রান্নার হাত শিষ্যের অসাধারণ ছিল বলেই জানা যায়। একথাও শিষ্য অনেক জায়গায় পরবর্তী কালে বলেছেন যে যিনি ভাল রাঁধতে পারেন তিনি ভাল সাধু হতে পারেন।
মহেন্দ্রনাথ দত্তের একটি লেখা থেকে গুরু সম্বন্ধে খানিকটা বোঝার চেষ্টা করা যাক। কারণ আমরা কেউ তাঁকে চাক্ষুষ দেখিনি। চক্ষু মুদে অবশ্য তাঁর রূপ কল্পনা করার চেষ্টা করা হয় বটে, তবু যত তাঁর রূপের তাঁর কথা বলার ভঙ্গি, তাঁর চলার ধরণ, তাঁর ভাল লাগার খাবার দাবারের কথা জানতে পারা যায় তত তাঁকে আপন করে পাবো। মনে হবে, আরে! ইনিযে একেবারে ঘরের লোক, আপনজন। সুতরাং তখন চোখ বুজে তাঁকে আর চেষ্টা করে মনে করতে হবে না, আপনিই তিনি এসে ভ্রূমধ্যে বসবেন। বা যিনি হৃদয়ের মাঝে বসাবেন, তিনি সেখানেই বসবেন।
মহেন্দ্রনাথের প্রথম দর্শন এমনি — “আমার প্রথম এইরূপ মনে হইল — দক্ষিণেশ্বর থেকে এই যে লোকটি এসেছে, একেই কি বলে ‘পরমহংস’? দেখিলাম, লোকটির চেহারাতে কোনও বৈশিষ্ট্য নাই, চেহারা সাধারণ পাড়াগেঁয়ে লোকের মতো, বর্ণ খুব কালো নয়, তবে, কলিকাতার সাধারণ লোকের বর্ণ হইতে কিছু মলিন। গালে একটু একটু দাড়ি আছে, কপচানো দাড়ি। চোখ দুটি ছোট — যাহাকে বলে, ‘হাতি চোখ’। চোখের পাতা অনবরত মিট মিট করিতেছে, যেন অধিক পরিমাণে চোখ নড়িতেছে। ঠোঁট দুটি পাতলা নয়। নিচুকার ঠোঁট একটু পুরু। ঠোঁট দুটির মধ্য হইতে, উপরকার দাঁতের সারির মাঝের কয়েকটি দাঁত একটু বাহির হইয়া রহিয়াছে। গায়ে জামা ছিল : তাহার আস্তিনটা কনুই বা কব্জির মাঝ বরাবর আসিয়াছে।… কথাগুলি একটু তোতলার মতো। রাঢ়দেশীয় লোকের মতো উচ্চারণ, ন এর জায়গায় ল উচ্চারণ করিতেছে, যেমন, ‘লরেনকে বললুম’ ইত্যাদি। সম্মুখে একটি রঙিন বটুয়া রহিয়াছে, তাহার মধ্যে কি মশলা আছে, মাঝে মাঝে একটু মশলা লইয়া মুখে দিতেছে।… চুপ করিয়া বসিয়া সব দেখিতে লাগলাম। মনে মনে আবার ভাবিতে লাগিলাম — কেন রামদাদা এই লোকটাকে এত সম্মান ও শ্রদ্ধা ভক্তি করেন?… দেখি যে, লোকটি কথা কহিতে কহিতে স্থির হইয়া গেল। হাত দুটি সিধা ও শক্ত হইয়া গেল।… মিরগি হইলে, মুখে চোখে জল দিতে হয়, বাতাস করিতে হয়, এ কে তো সেরূপ করিতে হইতেছে না।… দেখিলাম যে, লোকটির প্রতি একটা টান আসিল। এ টান ভালবাসা বা স্নেহ, মমতা নয়। শ্রদ্ধা ভক্তি ও নয়। এ টান ভিতরের, লোকটির কাছে থাকিতেই ভাল লাগিতেছে।”

ঠাকুর কিভাবে পুজোর সময় সুরেশ মিত্তিরের বাড়িতে ছিলেন তার বিবরণ আছে স্বামী সারদানন্দের লেখায়। ঠাকুরদালানের মার্বেল পাথরের মেঝের ওপর তাঁর আহারের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। বাড়ির মেয়েরা ঘরের জানলা দিয়ে তাঁকে দেখছিলেন। অনেক লোক তাঁকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আহার করাচ্ছিলেন। ঠাকুর উপুড় বা উবু হয়ে বসে আহার করছিলেন। দেশগাঁয়ে এইভাবে উবু হয়ে খাওয়ার রীতি ছিল তখন।
“আমরাও দেখিয়াছি যে, পরমহংস মশাই আসনপিঁড়ি হইয়া বসিয়া আহার করিতেন না, হাঁটু দুইটি উঁচু করিয়া উপু হইয়া বসিয়া আহার করিতেন… পূর্বে তিনি বড় বিভোর থাকিতেন, কাপড় পরার কথা মনে থাকিত না। কিন্তু এখন সে ভাবটি কাটিয়া গিয়াছে… লোকজনের সম্মুখে বেশ সভ্যভব্য হইয়া বসিয়া থাকেন।” কিন্তু দেখা গেল পরমহংস বাঁ বগলে কাপড় জড়িয়ে দিগ্ বসন হয়ে বসে আছেন। আবার অপ্রতিভ হয়ে বলছেন, “আরে ছ্যা! আমার ও-টা গেল না, কাপড় পরাটা আর মনে থাকে না!” সেই স্থানের সকল পুরুষ, অন্দরের সকল মহিলা হাসতে লাগলেন।
আমরা সকলে জানি দক্ষিণেশ্বরে সারদামণি মা অতিথিদের জন্য সারাক্ষণই রেঁধেই চলেছেন। কোন ভক্ত কী পছন্দ করেন তা সব তিনি জানেন। ঠাকুর সমানে অর্ডার দিয়ে যেতেন আর মা রান্না করতেন। তবে শ্রীমা নিজে বলেছেন — “কামারপুকুরে লক্ষ্মীর মা আর আমি রাঁধতুম। একদিন খেতে বসেছেন ঠাকুর আর হৃদয়। লক্ষ্মীর মা ভালো রাঁধতে পারত। সে যেটা রেঁধেছে খেয়ে বললেন, — “ও হৃদু, এ যে রেঁধেছে, এ রামদাস বদ্যি”, আর আমি যেটা রেঁধেছি, খেয়ে বললেন, — “আর এই ছিনাথ সেন”। শ্রীনাথ সেন হাতুড়ে। হৃদয় অবশ্য তখন উত্তর দিলেন, “তা বটে। তবে তোমার এ হাতুড়ে বদ্যি তুমি সবসময় পাবে — গা টিপতে পা টিপতে পর্যন্ত।”

স্বামীর মৃত্যুর পরে স্বয়ং মা অন্নপূর্ণাকে শাক বুনে সেই শাক সেদ্ধ আর ভাত খেতে হয়েছে, তবু ঠাকুরের কথায় তিনি কারো কাছে চিৎহস্ত করেননি, এমনই মনের দৃঢ়তা। শ্যামসুন্দরী বাঁড়ুজ্জের বাড়ি থেকে ধান এনে ঢেঁকিতে কুটে ওই ধানের এক চতুর্থাংশ পারিশ্রমিক হিসাবে পেতেন। জগজ্জননীর কথায়, “এক হাঁড়ি ভাত আর এক ধুচুনি চালের জন্য, অন্যের বাড়িতে ষোলপোকা (এক সারিতে ষোলটা) উনুন জ্বলছে, তাতে রান্না করেছি।”
শ্রীমা কি ধরণের খাবার খেতে পছন্দ করতেন বা কি তাঁর প্রিয় ছিল খুঁজতে গিয়ে অনেক বিবরণ সামনে সাজানো পাওয়া যাবে। ছোলার শাক, মূলোর শাক তাঁর ভীষণ প্রিয় ছিল। খুউব পছন্দ করতেন ফুলুরি, আলুর চপ, বেগুনি আর ঝাল বড়া। বাঁকুড়ার মেয়ে আমাদের মা। মুড়ি তো তাঁর বিশেষ প্রিয় হবেই। আর কে না জানে মুড়ির সঙ্গে আলুর চপ, ঝাল বড়া মেখে কি স্বাদ লাগে মুখে। মা আসলে একটু টক টক, ঝাল ঝাল খাবার পছন্দ করতেন বেশি। ভালবাসতেন মুগের নাড়ু আর ঝুরিভাজা। মিষ্টি বোধহয় খুব প্রিয় ছিল না। মিষ্টির মধ্যে রাতাবি সন্দেশ আর রাঙাআলুর রসপিঠে পছন্দের ছিল। আম খুব ভালবাসতেন। তবে একটু টক মিঠে আম। ল্যাংড়া, পেয়ারাফুলি, মাঝেমধ্যে বম্বে থেকে ভক্তদের পাঠানো আলফানসো আম খেয়ে খুশি হয়েছেন। একবার এক ভক্তের পাঠানো আম এত টক যে কেউ মুখে দিতে পারল না। মা কিন্তু সেই আম ছাড়িয়ে খেয়ে বললেন, “বেশ খেতে”। আরও জানা যায় যে সেকালের চিকিৎসা অনুযায়ী আমাশয়ে ভোগা মা একটু করে আফিম খেতেন। তাই আফিমের কারণে দুপুর ও রাতে একটু করে দুধ তাঁর পানীয়ের মধ্যে ছিল। তবে ভক্ত সংখ্যা বেশি হলে অনেকদিনই দুধ অন্য কারোর পেয় হত, মায়ের জন্যে আর থাকত না। তাঁর সন্ন্যাসী পুত্রদের জন্য গাঁয়ের ঘরে ঘরে গিয়ে তিনি দুধের জোগাড় করে আনতেন, যাতে তাঁর সন্তানের খেতে কষ্ট না হয়।

ঠাকুর এবং মা উভয়েই ছিলেন খাঁটি এদেশী। অর্থাৎ পোস্ত আর কলায়ের ডাল ভালবাসবেন এতো অতি স্বাভাবিক। পোস্ত হাতায় করে পুড়িয়ে খাওয়ার রেওয়াজ ছিল তখন। এছাড়া ডাল, শুক্তুনি (শুক্তো), ডাঁটা দিয়ে ঝোল এগুলো উভয়েই ভালবাসতেন। মা পরবর্তী কালে রাতের খাবার বলতে দু তিনটি লুচি, একটু তরকারি ও একটু দুধ ছাড়া আর কিছু খেতেন না।
দক্ষিণেশ্বরে থাকতে অগণিত ভক্তদের আনাগোনা লেগেই থাকত। ছোট্ট নহবত খানায় হেড অফিস থেকে বার্তা যেত খোদ অন্নপূর্ণার কাছে।
“ওগো, আজ নরেনের জন্য বেশ করে রাঁধো।”
মা সঙ্গে সঙ্গে মুগের ডাল আর রুটি করলেন। খাবার পরে ঠাকুর নরেনকে জিজ্ঞেস করলেন,
“ওরে কেমন খেলি?”
নরেন বললেন, “বেশ খেলুম যেন রোগীর পথ্য।”
ঠাকুর একথা শুনে গিয়ে মাকে বললেন,
“ওকে ওসব কি রেঁধে দিয়েছ? ওর জন্য ছোলার ডাল আর মোটা মোটা রুটি করে দেবে।”
মা আবার তাই করে দিলেন, নরেন খেয়ে তুষ্ট হলো।
মা গল্পের ছলে বলছেন : একবার নরেনের খুব ক্ষিদে পেয়েছে। বোসপাড়ায় এসেই সামনে গোলাপ মাকে দেখে বলছে, গোলাপ মা, বড় খিদে পেয়েছে। গোলাপ মা কয়েকটি মিছরির টুকরো দিলেন। নরেন রেগে গেলেন খুব। মা জানতে পেরে ভেতর থেকে একথালা খাবার পাঠিয়ে দিলেন। নরেন্দ্র তখন খায় আর বলে, “একেই বলে মা। পুজুরি বামুনের মেয়ে মা কেমন করে এমন হল আমি বুঝতে পাচ্চি না।”

ঠাকুর এবং তাঁর মিসেস সবসময় বলেছেন “খাবে গরম, শোবে নরম।” কেউ খুব গরম চা বা অন্য কিছু খেলে মা বারণ করতেন। বলতেন, “ঠাকুর আমাকে শিখিয়েছিলেন শরীরকে সানশীতলে রাখতে, কেবল গরম জিনিস না খেয়ে মিছরির পানা, ডাবের জল এসব খাওয়া ভালো।”
না খেয়ে থাকা, সাধন ভজন করা, মা পছন্দ করতেন না। সন্ন্যাসী সন্তানদের তিনি বলেছেন, “বাবা তোমরা কাজ করে খাও। কাজ না করলে যে কেউ খেতে দেবে না … কাজ করো, ভাল করে খাওদাও, ভগবানের ভজন করো। “অর্থাৎ খালি পেটে ভজন সাধন করার দরকার নেই।
মায়ের খাওয়া পরার জন্য সর্বত্যাগী ঠাকুরের চিন্তা ছিল বৈকি। তাই তো তিনি অসুস্থ অবস্থায় মাকে জানতে চেয়েছিলেন যে মায়ের কটা রুটি খেলে পেট ভরে… ক-টাকা হলে হাত খরচ চলে। অপচয় করা স্বামী স্ত্রী কেউই পছন্দ করতেন না। আর অপচয় করার মত অর্থ ও ছিল না।
আবার ছেলেমানুষের মত ঠাকুরের খাবার গল্পে আসি। ঠাকুর মিষ্টি ভালবাসতেন খুব। বিশেষ করে চ্যাঙারি ভর্তি গরম জিলাপি। তেমন ভক্ত জিলিপি এনে দিলে তিনি খুব খুশি হয়ে খেতেন। আবার বালকের মতো স্বভাব ছিল বলে অন্য কোন শিশুকে দেখলে চ্যাঙারি লুকিয়ে ফেলার চেষ্টা করতেন। আবার তাঁর সন্ন্যাসী সন্তানদের ক্ষিদে পেলে তাদের খাওয়ানোর জন্য অস্থির হয়ে উঠতেন। একবার দক্ষিণেশ্বরে, রাখাল মহারাজ তখন ছোট, ঠাকুরের খুব আদরের। তা একদিন রাখাল এসে বললেন যে তার খিদে পেয়েছে খুব। ঠাকুর অস্থির হয়ে উঠলেন। ছুটে গঙ্গার ধারে গিয়ে চিৎকার করে বলতে লাগলেন, “ও গৌরদাসী, আয় না, আমার রাখালের যে বড় ক্ষিদে পেয়েছে।” সেই সময় দক্ষিণেশ্বরে কোন খাবার পাওয়া যেত না। খানিক পরে গঙ্গার ঘাটে একটা নৌকা এসে লাগল। নৌকা থেকে নামলেন বলরামবাবু আর গৌরদাসী এক গামলা রসগোল্লা নিয়ে। ঠাকুর আনন্দে রাখালকে ডাকতে লাগলেন, “ওরে, আয় না রে, রসগোল্লা এসেছে, খাবি আয়। খিদে পেয়েছে বললি যে।” সকলের সামনে এমনি করে বলায় রাখালের রাগ হল।
“আপনি অমন ক’রে সকলের সামনে খিদে পেয়েছে বললেন কেন?”
“তাতে কিরে? খিদে পেয়েছে, খাবি তা বললে দোষ কি?”
তাঁর স্বভাব জলের মত স্বচ্ছ ছিল কি না।
যাতে যে ফোড়ন তা না দিলে তিনি অসন্তুষ্ট হতেন। যেমন তেমন করে রান্না তাঁর এবং তাঁর প্রিয় শিষ্যের একেবারেই পছন্দের ছিল না। ঠাকুরের অন্তিম পর্বে সুজির পায়েস ও ভাতের গলা মন্ড ছাড়া আর কিছুই দেওয়া যেত না। সেই সময় কাশীপুরে নীচের ঘরে খিচুড়ির গন্ধ পেয়ে তিনি বলেছিলেন – তাঁর হাঁড়ি হাঁড়ি খিচুড়ি খেতে ইচ্ছে করে। সেদিন সামান্য খিচুড়ি তিনি গ্রহণ করে সকলকে খুশি করে গেলেন। সেই খিচুড়ি ভোগ এখন লক্ষ লক্ষ মানুষের মুখ দিয়ে তিনি গ্রহণ করে চলেছেন। অনন্তকাল গ্রহণ করবেন, যাতে সকলের মঙ্গল সাধন ঘটে।
তথ্যঋণ : স্বামী গম্ভীরানন্দ, শ্রী শ্রী মায়ের কথা, শঙ্কর