মনসা সন্তুষ্ট হলেও শিবের মনের কোণে মেঘ জমে ওঠে। তিনি মনে মনে ভাবেন কৈলাসে মা পার্বতীর সঙ্গে দেখা হওয়ার আগে মনসা তার ভক্তকে দংশন করল, তারপর তাকে আবার নিজের ভক্ততে পরিণত করল। এই ঘটনা পার্বতীর অজানা থাকবে না আর সে যখন জানতে পারবে, তখন কি মনসাকে কন্যা রূপে স্বীকার করবে!
পাহারাদার বীরকের নজর এড়িয়ে ঝোলা নিয়ে ঘরে ঢুকে বেমালুম ভালোমানুষ সেজে ঘোরেফেরা করতে লাগলেন শিবঠাকুর। উগ্রচন্ডী গৃহিণীর মেজাজ বুঝে সব বুঝিয়ে বলবেন।
কিন্তু গোয়েন্দা পার্বতীর চোখে স্বামীর আচরণের অস্বাভাবিকতা ধরা পড়ে গেল। সন্দেহের বশে তিনি ঝোলা খুলে দেখলেন রূপবতী এক কন্যাকে। ব্যস, আর যায় কোথায়!
মনসাকে চুল ধরে ঝোলা খুলে হিড়হিড় করে টেনে আনলেন পার্বতী। মনসা অনুরোধ করতে লাগলো, ‘ছেড়ে দাও মা। শিবঠাকুর আমার বাবা’।
বিকৃত কন্ঠে মনসার নকল করে পার্বতী ঠাকুরন বলতে থাকেন — ম্যা! শিব ঠাকুর আমার ব্যাবা! বিপদে পড়লে ওরকম সবাই মা, বাবা বলে। ঠাকুরদার বয়সি বুড়োর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করতে তোর লজ্জা করে না! নির্লজ্জ কোথাকার! আজ দেখাচ্ছি তবে!
বলেই সপাটে চড় চাপড় চালাতে থাকেন পার্বতী। মনসা দেখলো ভালো কথায় কাজ হবে না, সেও নিজ মূর্তি ধরল । চুলোচুলি শুরু হলো। এসব দেখে সবাই অবাক!
পার্বতী ঠাকুরন এবার ভীষণ রেগে গেল। রাগে কাঁপতে কাঁপতে বললেন,’এত আস্পর্ধা তোর! যে চোখে তুই আমার স্বামীর উপর কু দৃষ্টি দিয়েছিস, সেই চোখ দুটো তোর গেলে দেব।’ এই বলে নখ চালিয়ে দিলো মনসার বাঁ চোখে। গড়গড় করে সে কি রক্ত!
যন্ত্রণাকাতর মনসা পার্বতীর হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য কামড় দিল পার্বতীর কাঁধে। মুহূর্তে পার্বতী গোঁ গোঁ করে মাটিতে পড়ে চিৎপটাং হয়ে গেলো। ঘটিতে থাকা পুজোর জল উল্টে গেলো গোটা ঘরমায়। অশান্তির আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠলো চারিদিকে।
এদিকে শিব ঠাকুর বাড়ির একটু দূরে এক পাতাঝড়া বেল গাছের নিচে চুপ করে বসে ছিলেন। নন্দি-ভৃঙ্গি দুজন ছুটে গিয়ে শিব ঠাকুরকে বললেন — তাড়াতাড়ি বাড়ি চলুন বাবা ঠাকুরঘরে রক্তারক্তি কান্ড হচ্ছে।
শিব ঠাকুর ঘরে এসে দেখেন ঘরময় রক্ত ভেসে যাচ্ছে। মেয়ের চোখের অবস্থা ভালো নয় বুঝে আগে তার রক্ত বন্ধের ব্যবস্থা করলেন। ভৃঙ্গি দূর্বো ঘাস থেঁতো করে এনে দিল, উঠোনে লাগানো বিশল্যকরণের পাতা বেটে এনে দিল নন্দী। দাম্পত্য কলহে এই পাতা খুব উপকারে আসে শিবের।
চোখ থেকে রক্তপাত আপাতত বন্ধের ব্যবস্থা করা হলো শিব ঠাকুর হাত জড়ো করে মনসাকে বললেন আমার গিন্নীকে বাঁচিয়ে দাও মা! এই বয়সে বিপত্নীক হলে মহা বিপদে পড়বো।
কিন্তু কোন অনুনয় বিনয় কিছুতেই কাজ হলো না। মনসা রাগে ফুঁসছে, ফোসফোঁস করছে। অবশেষে মনসার হাত দুটো ধরে কাতর কণ্ঠস্বরে শিব ঠাকুর বললেন, ‘তুমি যা বলবে, আমি তাই করবো আমার গিন্নিকে বাঁচাও মা।’
মনসা একটু নরম হয়ে বললেন, মর্ত্যে আমার পুজো প্রচলণের ব্যবস্থা করে দিতে হবে। শিব বললেন — তথাস্তু!
এবার মনসা কি সব গাছ-গাছড়ার নাম বলে দিলেন, নন্দী ভঙ্গি চলে গেল এগুলো সংগ্রহ করতে। এদিকে মনসা চোখের অবস্থা ভালো নয় দেখে শিব ডাকলেন দেবর্ষি নারদকে। কাশ্যপ পুত্র নারদ মনসার বৈমাত্রেয় দাদা। ধ্যানযোগে বোনের সমস্ত কষ্ট জেনে তিনি বিষ্ণুলোক থেকে সোজা ঢেঁকি করে দ্রুত কৈলাসে চলে এলেন। শিব ঠাকুর জানলেন তার নামে স্বর্গে ‘শঙ্কর নেত্রালয়’ নামে একটি বড় চক্ষু চিকিৎসালয় আছে।
দাদার সঙ্গে ঢেঁকি চড়ে মনসা উপস্থিত হলেন সেই চিকিৎসা কেন্দ্রে। অশ্বিনীকুমারদ্বয় যথাসাধ্য চেষ্টা করেও কিছু করতে পারলেন না কারণ চোখ ততক্ষণে সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। সেই সময় কনীনিকা প্রতিস্থাপনের কোন পদ্ধতি আবিষ্কার হয়নি। তাই বাধ্য হয়েই পাথরের চোখ বসানো হলো। সেই থেকে মনসা এক চোখি, কানি।

ইতিমধ্যেই মনসা মহাদেবের কাছে জেনে গেছিলেন কিভাবে তার পুজোর প্রচলন হবে মর্ত্যে। স্বর্গে এক শিব ভক্তের নাম ছিল চাঁদ। তার সঙ্গে পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া করে চাঁদকে মর্ত্যে জন্মানোর অভিশাপ দিলেন মনসা। চাঁদও মনসার মতলব বুঝতে পেরে বললেন, আমি না পুজো করলে মর্ত্যে তোমার পূজো প্রচলিত হবে না।
যাইহোক মর্ত্যে চাঁদ বিজয়সাধু বেনের ছেলে হয়ে জন্মালো চম্পকনগরে। শর্ত অনুযায়ী, বণিক চাঁদ সওদাগর যদি মনসা পূজো করে তবেই মনসার পূজা মর্ত্যে প্রচারিত হবে। কিন্তু পরম শৈব চাঁদ সওদাগর মনসা বিদ্বেষী। এই সূত্র ধরেই চাঁদ সওদাগর মনসার দ্বন্দ্ব শুরু হল মর্ত্যে। সেই দ্বন্দ্ব একসময় অসম লড়াই এ পরিণত হয়েছিল।
চাঁদ সওদাগরের স্ত্রী সনকা মনসার পূজা করে। মনসা আসে চাঁদকে মনসার পূজা করতে বলে কিন্তু শিবভক্ত চাঁদ অটল থাকে, পুজো পায়না মনসা। মনসার প্রতিহিংসায় চাঁদ সওদাগরের একে একে পুত্র সন্তানগুলি মারা যায়। তার বাণিজ্যতরীর ভরাডুবি হয়। এক সময় চাঁদ সদাগর সর্বশ্রান্ত হয়ে যায়। এমনকি চাঁদের মহাজ্ঞান চুরি করে নেয় মনসা কিন্তু তবুও তার পুজো পেলো না।
একদিন সুযোগ পেয়ে চাঁদ তার হেতালের লাঠি দিয়ে সপাটে মারলেন মনসার কোমরে। মনসা বাবা গো, মা গো বলে চিৎকার করে একবারে এক ছুটে কৈলাসে হাজির হলেন শিব ঠাকুরের কাছে। মনসার এই অবস্থা দেখে তার চিকিৎসার জন্য পুনরায় ডেকে পাঠালেন নারদকে। আবার ঢেঁকিতে চড়িয়ে নারদ মনসাকে নিয়ে চললেন স্বর্গে।
অশ্বিনী কুমারদ্বয় বিভিন্ন শল্য চিকিৎসক পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত এলেন মনসার কটিদেশীয় কশেরুকার তিন সংখ্যক অস্থিটি চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেছে। ওটিকে বাদ দেওয়া ছাড়া উপায় নেই। সুচিকিৎসা হলো বটে তবে মনসার কোমর চিরতরে গেল বেঁকে। স্বর্গের সার্বিক চিকিৎসা কেন্দ্র থেকে ছুটি পেয়ে মনসা পুনর্দ্যমে লাগল চাঁদকে দিয়ে পুজো করানোর চেষ্টাতে।
এদিকে চাঁদ সওদাগরের ঘরে জন্ম নেয় লকাই বা লখিন্দর। তার বিয়ে হয় উজানীর মেয়ে বেহুলার সাথে। লোহার বাসর ঘরে মনসা প্রেরিত কালনাগিনী দংশনে মারা যায় লখিন্দর। তারপর থেকে কাহিনীর বাঁক নেয়। মৃত স্বামীকে নিয়ে কলার মান্দাসে বেহুলা ভেসে চলে স্বর্গের উদ্দেশ্যে। একসময় স্বর্গে পৌঁছে যায় নানা বাধা বিপদ থেকে অতিক্রম করে। দেবসভায় মৃত স্বামীর প্রাণ ফিরে পাওয়ার আশায় নাচুনি বেহুলা মুগ্ধ করে দেবতাদের। ফলে প্রাণ ফিরে পেলো স্বামীর।
কিন্তু শর্ত একটাই, যেভাবেই হোক চাঁদ সওদাগরকে মনসা পূজো করতেই হবে। বেহুলা ফিরে আসে শ্বশুরবাড়িতে। চাঁদ সওদাগর স্নেহের কাছে পরাজিত হয়ে বাম হাত দিয়ে অবজ্ঞা ভরে মনসা পূজা করলে মর্ত্যে মনসা পূজোর শুরু হয়। অনেক কাঠ খড় পুড়িয়ে শেষে অবমাননার পূজো পেয়ে মনসা দেবী হলেন।