শ্রাবণ হল মহাদেবের জন্মমাস। তবে কেবল শিবশম্ভু নয়, এই মাসে মাতা পার্বতীকেও পুজো করতে হয়, তাহলে দাম্পত্য জীবন সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে ভরে ওঠে। শুধু শিব পার্বতী নয়, শ্রাবণ মাস জুড়ে বিভিন্ন স্থানে মনসা পূজা অনুষ্ঠিত হয়। ভক্তরা বিশ্বাস করেন, বর্ষায় সর্পদেবীর পুজো করলে সর্পাঘাত থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।
আসলে বাঙালির দেব-দেবীরা কোনদিনই মন্দিরের সসম্ভ্রম দূরত্বে আবদ্ধ নন, জীবনের প্রতিটি ক্ষণে তাঁদের অবাধ লীলাখেলা। তাই, এতবড় দেবতা হওয়া সত্ত্বেও মহাদেব কোথাও যেন তিনি আমাদের কাছে খুব সাধাসিধে, ছাপোষা, বউকে ভয় পাওয়া ঘরের মানুষটি হয়ে আছেন। দেবী পার্বতী কখনো ঘরের মেয়ে উমা, কখনো মা হিসেবে পূজিতা হন।
মনসা প্রাক-পৌরাণিক দেবী। বাঙালির ঘরে মনসা বাল্যকাল থেকে উচ্চাভিলাষী, ভক্তিবিলাসিনী। নিজের মাহাত্ম্য প্রচার করতে, এমন কোন কাজ নেই তিনি করতে পারেন না। তার বহুদিনের সুপ্ত বাসনা নাগ বংশের হয়েও দেবীদের মতো পুজো পাওয়ার, আর সেই সুযোগের অপেক্ষায় থাকে মনসা।
আজ বলবো পুরাণ, লোকবিশ্বাস আর কিংবদন্তির আড়ালে থাকা বেশ কিছু অচেনা কাহিনি।
পুরানগুলির মধ্যে পদ্মপুরাণ তুলনামূলকভাবে নবীন। এই পুরাণেই শিব পার্বতীর চরিত্র এমনভাবে বিবৃত রয়েছে যা অন্য পুরানের থেকে বেশ কিছুটা আলাদা। এই পুরানে লক্ষ্মী সরস্বতী নয়, নেতা আর পদ্মাবতী হলো শিবের দুই কন্যা। পদ্মাবতী হলেন দেবী মনসা। এখানে শিবের সহধর্মিনী দেবী পার্বতীকে চন্ডী নামে বর্ণনা করা হয়েছে।
নিত্য অভাব থাকলেও কৈলাস পর্বতে শিব পার্বতীর সুখের সংসার। দারিদ্রতার জন্য পার্বতীর কোন আক্ষেপ নেই। কিন্তু স্বামীর সুন্দর রমণীদের দিকে তাকিয়ে থাকা, দেবী পার্বতীর মোটেও সহ্য হয় না। স্বামীর এই চারিত্রিক দুর্বলতার কথা পার্বতী ঠাকুরন জানেন বলেই, কোন নারী শিবভবনে তাঁর পারমিশন ছাড়া প্রবেশ করতে পারেন না। যাতে তার অনুমতি ছাড়া কেউ প্রবেশ করতে না পারেন তার জন্য এক কড়াধাতের দিন রাতের দ্বারপাল বীরককে তিনি নিযুক্ত করেছেন। বীরক শিবের অনুচর হলেও মা ঠাকুরনের কথা শুনে চলে, বিশ্বস্তও বটে।
কড়া শীত কৈলাসে। দিনের বেলায় ছাইভস্ম গায়ে মেখে শীত কাটালেও, রাত্রিতে শিব ঠাকুর বাঘের চামড়া গায়ে চাপা দিয়ে ঘুমান। শিবের স্নানের জন্য পার্বতী ঠাকুরন ভৃঙ্গিকে দিয়ে কতগুলো রিঠে ফল আনিয়ে রাত্রে জলে ভিজিয়ে রেখেছেন।
শিব ঠাকুরের ব্রাহ্মমুহূর্তে স্নান করা বহুদিনের অভ্যাস। অভ্যাস মত ভোর হতেই নন্দীর সেজে দেওয়া দু’ছিলিম বড় তামাক খেয়ে রিঠের জল আর এক খাবলা সাজিমাটি দিয়ে শিব চললেন মানস সরোবরে স্নান করতে। স্নান সেরে ফেরার পথে তার নিত্যকার কাজ ফুল তোলা, তাই সাজিটিও নিলেন সঙ্গে। রিঠের জল আর সাজিমাটি মেখে স্নান করার পরে নিজের রজতগিরির মত গাত্রবর্ণ দেখে শিব ঠাকুর নিজেই অবাক। এমন যে তাঁর গায়ের রং তা তিনি নিজেই ভুলে গিয়েছিলেন। হঠাৎ তার মনে হলো জটার দুর্গন্ধ দূর করা দরকার। তাই তিনি মাথায় এবং জটাতে সাজিমাটি আর রিঠের জল দিলেন।
পঞ্চাননের পাঁচটি জটা। জটাগুলি খুব ভালো করে ধুতে ধুতে পাঁচটি পদ্মফুল জলে ভেসে উঠলো। শিব ঠাকুর তো অবাক! মানসসরবরে ব্রহ্মকমলের বদলে পদ্মফুল! এলো কোথা থেকে? যাই হোক ফুলগুলি সংগ্রহ করে সাজিতে রাখলেন। স্নান সমাপানন্তে খুটিয়ে দেখে বুঝতে পারলেন, পদ্মগুলি আসলে অসাধারণ রূপবতী যুবতী পাঁচ কন্যা। একসঙ্গে পঞ্চ রূপবতী যুবতী প্রাপ্তিতে পঞ্চাননের পঞ্চ আননে স্মিত হাসির বিদ্যুৎ খেলে গেল, মন উঠল খুশিতে ভরে।
ওই পঞ্চকন্যাদের মধ্যে একটি চটপটে মেয়ে বলে উঠলো, ‘হে দেবাদিদেব মহাদেব! আমাদের প্রণাম গ্রহণ করুন। হে আশুতোষ, আপনি আমার পিতা। আমি আপনার কন্যা। আমার নাম মনসা। আমি আপনাকে পুজোয় সন্তুষ্ট করে আপনার কাছে থেকে প্রাপ্তবরে দেবতাদের মতো মর্ত্যে পুজো পেতে চাই। আমি আপনার সঙ্গে বাড়ি যেতে চাই।’
এদিকে মহাদেব তার কথায় মোটেও বিশ্বাস করলেন না। বরং তার রূপে মুগ্ধ হয়ে তাকে বিবাহের প্রস্তাব দিয়ে বসলেন। বললেন, ‘দেখো এসব ছলনা ছাড়ো, আমার ভার্যা চন্ডী বিদ্যমান। তুমি হবে দ্বিতীয় জন।’

পিতার মুখে এমন অশাস্ত্রীয় কথা শুনে পদ্মাবতী একবারে লজ্জিত অন্যদিকে ক্ষুব্ধ হয়ে গেলেন। নাগ কন্যা তখন নিজেকে রক্ষা করার জন্য বিষ দৃষ্টিতে শিবের দিকে তাকালেন। সঙ্গে সঙ্গে বিষে জর্জরিত হয় শিব ঢলে পড়লেন।
দেবীর বিষে শিব প্রাণ ত্যাগ করেছেন এই সংবাদ পেয়েই দেবগণ ছুটে চলে এলেন। তারা এসে দেবী মনসা কে বললেন, ‘হে দেবী! জন্ম মাত্রই দেখি তুমি পিতাকে বধ করলে! দেব সমাজে এখনো ভালো করে স্থান পাওনি, তোমার ভক্তকূলও নেই, এর মধ্যেই এত গর্বের প্রকাশ তো ভালো নয়। শিব অচৈতন্য হয়ে গেলে জগত সংসার রুদ্ধ হয়ে যাবে। তুমি তোমার বিষ তুলে নিয়ে তাকে আবার জীবন দান করো’।
দেবতাদের কথায় মনসা পড়ে গেলেন দ্বন্দ্বে। তাঁর চোখে জল চলে এল। সত্যি তো, দেব সমাজে এখনো ভালো করে স্থান পাননি তিনি। এমনকি এখনো তাঁর ভক্তকুলও তৈরি হয়নি, এর মধ্যেই তিনি পিতৃঘাতিনী রূপে দেবসমাজে অপযশের ভাগ পেয়ে গেলেন।
তার চোখে জল দেখে প্রজাপতি ব্রহ্মা তার কাছে গিয়ে বলল, ‘হে দেবী, তুমি পিতার প্রাণ রক্ষা করে সকলের প্রিয় হয়ে ওঠো।’ ব্রহ্মার কথা শুনে মনসার ক্রোধে যেন ঘি পড়ল। পিতার মুখে এমন অশাস্ত্রীয় কথা শুনলে এক নারীর মনের অবস্থা যে কি হতে পারে, তা পিতামহ বুঝবেনই বা কি করে! অভিমানী মনসা তাই ব্রহ্মাকে বললেন, ‘যার যখন কাল পূর্ণ হবে তাকে তখনই চলে যেতে হবে। এতে কার কি করার আছে। হে প্রজাপতি ব্রহ্মা, আমাকে অনুরোধ করবেন না।’
মনসা দেবীর কথা শুনে ব্রহ্মা আরো নরমভাবে দেবীকে বোঝাতে চেষ্টা করলেন, ‘দেখো দেবী রাগ করোনা, দেবতাদের মধ্যে নানান ঘটনা ঘটে, কে আর নির্দোষ বল! তুমি শুধু পিতৃহন্তার কু-যশ বইবে কেন? পিতার জীবন রক্ষা করে যশ লাভ কর।’
তখন দেবী গণ্ডক নদীর জল তুলে এনে অমৃত কলস দিয়ে অমৃত বর্ষণ করলেন এবং গণ্ডকির জল সিঞ্চন করে দেবাদিদেবের প্রাণ ফিরিয়ে দিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যে শিব সুস্থ হয়ে উঠলেন।
প্রজাপতি ব্রহ্মা তার কাছে উপস্থিত হয়ে জানালেন, ‘হে দেবাদিদেব! তুমি দেবী মনসার কথা অবিশ্বাস কোরো না, সে সত্যই তোমার কন্যা। আমরা দেবকূল তাঁর জন্মক্ষণের সাক্ষী। তুমি তাকে কন্যা রূপে স্বীকৃতি দাও।’ ব্রহ্মার কথায় শিব দেবী মনসাকে কন্যা রুপে স্বীকৃতি দিলেন এবং তাকে কৈলাসে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ করতে লাগলেন।’
কন্যাসহ কৈলাসে যাবেন শিব কিন্তু কন্যাকে নিয়ে যাবেন কিভাবে! তিনি পার্বতীকে চেনেন ও জানেন। মহা অশান্তির আশঙ্কায় শিব ঠাকুর কি করবেন বুঝে উঠতে পারলেন না। যদি দোলায় নিয়ে যান তবে দূর থেকে পার্বতী দেখে ক্ষুব্ধ হবেন। কারণ তিনি জানেন না মনসা হলেন শিবের কন্যা, তার মনে হবে শিব আবার একটি বিবাহ করে কৈলাসে ফিরেছেন। ফলে গৃহ প্রবেশের আগেই পদ্মাবতীর অভিশপ্ত হওয়ার আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে।
আর যদি দেবী হেঁটে কৈলাসে যান তবে দেবকূলে তাঁর অমর্যাদা হবে। তাই সে ঠিক করলে তার ঝোলার ভেতর লুকিয়ে নেবেন পদ্মাবতীকে। অবশেষে দেবী শিবের ঝোলায় ঢুকে চললেন কৈলাসে।
কৈলাসে পথ যখন শিব বেশ খানিকটা অতিক্রম করেছেন তখন মা চন্ডীর সেবক বছাই নামে এক কৃষকের সঙ্গে দেখা হলো। সে হাল চাষ করতে বললে লোকে তাকে ডাকতো ‘হালি বছাই’ বলে। শিবকে দেখে বিশ্রামের জন্য আসন এনে দিল। বিশ্রামের জন্য বসতেই শিবের ঝোলার মধ্যে থেকে বেরিয়ে এলো নাগেশ্বরী মা মনসা। শিবের ঝোলায় পরমা সুন্দরী কন্যাকে দেখে বছাই কৌতূলি হয়ে উঠলো। এ নারীকে? শিব একে লুকিয়েই বা নিয়ে যাচ্ছে কেন?
ঝোলার মধ্যে উঁকিঝুঁকি দিতে গিয়ে দেবী নাগরূপে বছাইকে দংশন করলেন। বছাইকে মৃত দেখে শিব প্রমাদ গুণলেন। চণ্ডীর সেবকের মৃত্যু হলে চন্ডি তা সহজভাবে মোটেও মেনে নেবেন না। এদিকে কন্যা মনসাকে কিছু বলতে পারছে না।
অবশেষে বছাইয়ের মায়ের করুন ক্রন্দনে দেবী মনসার মন গললো। তিনি বছাইয়ের মাকে বললেন, ‘তুমি আজ থেকে যদি আমার ঘট প্রতিষ্ঠা করে পূজা করতে থাকো, তবে আমি তোমার পুত্রের প্রাণ রক্ষা করব। বছাইয়ের মা তৎক্ষণাৎ রাজি হয়ে গেলেন। বছাই প্রাণ লাভ করে দেবী মনসার ভক্ত হয়ে উঠল। দেবীও পূজা পেয়ে সন্তুষ্ট। কিন্তু… [ক্রমশ]