মরুভূমির মাঝে ছোট ছোট অনেক গ্রাম রয়েছে যেগুলো পথিকের চোখে ধরা দেয় না। ধরা দেয় ওই সব গ্রামেরই অসংখ্য ছাগল, যারা এই মরুভূমির ঝোপের আশেপাশে চরে বেড়াচ্ছে। মরুভূমিতে গাড়ি থামিয়ে দলবল নিয়ে ছাগলের সংসার দেখতে মন্দ লাগে না। চিকন কালো মসৃণ রাস্তার দুধারে বালিয়ারির ঢেউ আর অসংখ্য উইন্ড মিল। এখানকার বাতাসের তীব্র গতি থেকে টারবাইনের সাহায্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্যই এখানে এত উইন্ড মিল। অনন্ত বালুরাশির মধ্যে এই অসংখ্য উইন্ড মিল একটা বাড়তি শোভা এটা মানতেই হবে। ঘন্টেওয়ালি মাতার মন্দির থেকে কুড়ি পঁচিশ মিনিটের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম আর একটি মন্দিরের প্রধান ফটকের সামনে। গাড়ি থেকে নেমে আশ্চর্য হলাম ভেতর থেকে ভীষণ রকম এক যুদ্ধের ভেরীর আওয়াজ আসছে শুনে এবং চারিদিকে ভারতের ত্রিবর্ণরঞ্জিত পতাকার সমাহারে। সেই আওয়াজের এক আলাদা তীব্র উন্মাদনা চারিয়ে যাচ্ছে আমাদের মধ্যেও। কিন্তু মন্দিরে এমন আওয়াজ কেন! গেটের দুপাশে সেনা সুরক্ষা দল বা বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বিএসএফ)-এর জওয়ান দাঁড়িয়ে রয়েছেন। তবে কি এটা মিলিটারিদের মন্দির!

প্রশস্ত চত্বর ঝকঝকে তকতকে। এদিকে ওদিকে বিএসএফের জওয়ানরা যাতায়াত করছেন। একপাশে সুন্দর একটি মন্দির আর সেখান থেকেই ভেসে আসছে যুদ্ধভেরীর আওয়াজ। দ্রিম দ্রিম দ্রিম দ্রিম। আচমকাই এক জওয়ান পথ আটকে বললেন, “বাঙালি?” আমরা সঙ্গে সঙ্গে একগাল হেসে “হ্যাঁ” বলতেই উনি বললেন “তাড়াতাড়ি যান, আরতি সবে শুরু হচ্ছে।” ওঁকে ব’লে গেলাম যে আরতি দেখে ওঁর সঙ্গে কথা বলতে চাই। উনি হেসে সম্মতি জানালেন। যত এগিয়ে যাচ্ছি তত দ্রিমি দ্রিমি আওয়াজের মত্ততা অনুভবে ঢেউ তুলছে। অদ্ভুত এক উন্মাদনা যেন আকাশ বাতাসে পাক খেয়ে ঘুরছে। এক সতর্কবাণীর মতো যেন শত্রুকে সরে যেতে বলছে।
মন্দিরে প্রবেশের পর বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম। মাতৃমূর্তির সামনে ঘন্টা এবং জয়ঢাক বাজাচ্ছেন দুই বিএসএফের অফিসার। আরতি করছেন আর একজন সৈনিক। আধঘন্টা এই অভূতপূর্ব আরতি রণবাদ্যের সঙ্গে দর্শন করলাম। তারপর যখন আরতি শেষ হল মনে হল সমস্ত জগৎ নিশ্চুপ হয়ে পড়েছে। যিনি ঘন্টা বাজাচ্ছিলেন তিনিই প্রসাদ দিলেন। কোথা থেকে এসেছি জানতে চাইলেন। বললেন যে মাতার কাছে অনেকে মানত করে যান এবং মনস্কামনা পূরণ হলে মানত রক্ষা করে যান সকলে। মন্দিরের মধ্যেই যুদ্ধের অনেক কিছু সাজানো আছে। অনেক গ্রেনেড, বোমা প্রায় তিনশ মত সাজানো রয়েছে। সৈনিকদের আঁকা, হাতের কাজও এখানে সাজানো রয়েছে। আবেশে কিছুক্ষণ সময় কোথা দিয়ে কেটে যায়। আলাপ হয় এক স্থানীয় বৃদ্ধ দম্পতির সঙ্গে। ওঁরা বললেন, “এখানে যা চাইবেন তাই পাবেন, মানত করে যান। এখানে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ টাকা মানত পূরণের জন্য জমা পড়ে মাতা তানোট এর ভান্ডারে।”

বাইরে খোলা আকাশের নীচে এসে দেখলাম নদীয়ার সৈনিকসন্তান অপেক্ষমান। ওঁর মুখে মন্দিরের ইতিহাস যেটুকু জানা গেল তার অনেকটাই কল্পকাহিনীর মতো। তবু এক ভারতীয় হিসাবে সবটুকু বিশ্বাস করতে ইচ্ছা হল এবং বিশ্বাস করলাম। বহুযুগ পূর্বে মামাদজি চারণ (গন্ধবী) নামে একজন এই স্থানে বসবাস করতেন। তিনি নিঃসন্তান ছিলেন। সন্তানলাভের মানসে তিনি পায়ে হেঁটে পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের হিংলাজ মাতার মন্দিরে সাত আটবার যান পূজা দিতে, মানত করতে। অবশেষে হিংলাজ মাতা তাকে স্বপ্নে জিজ্ঞাসা করেন — তুমি কি চাও? ছেলে না মেয়ে? চারণ আবদার করে — তুমিই আমার মেয়ে হয়ে আমার ঘরে এসো। হিংলাজ মাতার কৃপায় চারণের সাত কন্যা (অন্য মতে পাঁচ কন্যা) ও এক পুত্রের জন্ম হয়। সকলেই দেবী মাতার অংশস্বরূপা। এঁদের মধ্যে এক কন্যা ছিলেন আওয়াদ মাতা, যিনি পরবর্তীকালে তানোট গ্রামের নামানুসারে তানোট মাতা নামে খ্যাত হন।
৮২৮ খ্রিস্টাব্দে স্থানীয় শাসক ভাটি রাজপুত রাজা তনু রাও একটি মন্দির প্রতিষ্ঠা করে তাতে মাতার মূর্তি স্থাপন করেন। সেই থেকেই মন্দিরটিতে ভাটি রাজপুত এবং জয়সলমীরের জনগণের দ্বারা তানোট মাতা পূজিতা হয়ে আসছেন। ১৯৬৫ তে এই কাহিনীর সঙ্গে যুক্ত হল এক নতুন অধ্যায়। পাকিস্তান ওই গ্রামের সীমান্তবর্তী স্থান আক্রমণ করে। ২০শে আগস্ট থেকে ৫ই সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই সীমান্তে যুদ্ধ চলেছিল। সীমান্তের সাদেওয়ালা পোস্টের কাছে হামলা করে পাক বাহিনী। তানোট গ্রাম ও মাতার মন্দির লক্ষ্য করে তারা তিন হাজার গ্রেনেড ও বোমা বর্ষণ করে। কয়েকদিন ধরে অবরুদ্ধ অবস্থায় থাকার ফলে ভারতীয় সেনাদের খাবার ফুরিয়ে এসেছিল। ভারতীয়দের প্রয়োজনীয় অস্ত্রও অন্য চৌকি থেকে এসে পৌঁছয়নি। এক ভারতীয় জওয়ান হতাশ মনে দেবীকে আরতি করার সময় দেবীর আদেশ পান। দেবী ওই মন্দির চত্ত্বর ছেড়ে কাউকে বের হতে বারণ করেন। একজন জওয়ান মায়ের আদেশ অমান্য করে মন্দিরের বাইরে বের হতে গেলে তিনি বোমার আঘাতে মৃত্যু বরণ করেন। টানা দুদিন গ্রেনেড হামলার মধ্যে ভারতীয়রা চুপচাপ বসে ছিলেন। ওই চত্ত্বরে ফেলা একটিও গ্রেনেড ও বোমা ফাটেনি। ফলে মন্দির চত্বরে কারো প্রাণহানি ঘটেনি। দুদিন পর অন্য চৌকি থেকে অস্ত্র ও খাদ্য এসে পৌঁছয় এবং ভারতীয়রা লড়াই শুরু করলে পাকিস্তান পিছু হটতে বাধ্য হয়। এই যুদ্ধের পর থেকেই বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের জওয়ানরাই এখানের পূজা ও আরতি-সহ মন্দির রক্ষণাবেক্ষণের ভার গ্রহণ করেন।

১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসেও ভারত পাকিস্তান যুদ্ধের সময় লংগেওয়ালা পোস্টের দিক থেকে আবার তানোট মাতার মন্দির আক্রমণ করা হয়। কিন্তু এবার পাকিস্তানের ট্যাঙ্কগুলি আচমকা বালিতে আটকে যায়। পাঞ্জাব রেজিমেন্টের মেজর কুলদীপ সিং চাঁদপুরী তাঁর সঙ্গী সৈনিকদের সহায়তায় পাকিস্তানের বিশাল বাহিনী পুরো একদিনের জন্য রুখে দেন। তারপর ভারতীয় বিমান বাহিনী এসে পাকিস্তানের ট্যাংক ও অস্ত্রসম্ভার ধ্বংস করে দেয়। এই সত্যি ঘটনা নিয়েই বর্ডার সিনেমা তৈরি হয়েছিল। এটি স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে অন্যতম সেরা যুদ্ধ এবং প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে বিজয়ের নিশান হিসাবে বিবেচিত হয়। ১৯৭১এর পর ভারতীয় সেনাবাহিনী লংগেওয়ালার যুদ্ধ বিজয় স্মরণে মন্দির প্রাঙ্গণের মধ্যে একটি বিজয় স্তম্ভ (বিজয় টাওয়ার) তৈরি করে দেন।
এই কাহিনী শোনার পর আপনা হতেই মায়ের কাছে মাথা নত হয়। আমার দেশ আমার দেশের সৈনিক ভাইদের তিনি আজও রক্ষা করুন এই প্রার্থনা মনে মনে প্রতিটি ভারতবাসী করবেন। নদীয়ার সন্তান জানালেন তাঁকে এবার কাশ্মীর রওনা দিতে হবে। হুকুম এসে গিয়েছে। আমাদের বিদায় জানাবার আগে তিনি মন্দিরের ভোগ প্রসাদ খেয়ে যেতে অনুরোধ করলেন। ওনার মঙ্গল কামনা করে এবার বেরিয়ে আসার পালা।
তানোট মাতা মন্দিরটি স্বর্ণনগরী নামে পরিচিত জয়সলমীর থেকে জাতীয় সড়ক-৬৮ বরাবর ১১৯ কিলোমিটার বা ৭৬ মাইল দূরে এই তানোট গ্রামে অবস্থিত। জয়সলমীর থেকে টানা তনোট পৌঁছতে দু’ঘন্টা লাগে। তবে মধ্যে তানোট মাতার ভগিনীমাতা ঘন্টেওয়ালির সঙ্গে কিছু দেখাসাক্ষাৎ কথাবার্তা সারতে বেশকিছু সময় কেটে যাবে। মাইলের পর মাইল জুড়ে বালিয়ারির মধ্যে মা তানোট তাঁর বোনদের সঙ্গে নিয়ে সীমানা রক্ষাকারী ভারতীয় সন্তানদের রক্ষা করে চলেছেন আজও।