“শ্রাবণ মাসের সকালবেলায় মেঘ কাটিয়া গিয়া নির্মল রৌদ্রে কলিকাতার আকাশ ভরিয়া গিয়াছে। রাস্তায় গাড়িঘোড়ার বিরাম নাই, ফিরিওয়ালারা অবিশ্রাম হাঁকিয়া চলিয়াছে …..”
“গোরা” উপন্যাসের শুরুতেই পাই কলকাতার রাস্তায় দৈনন্দিন ব্যস্ততার টুকরো ছবি, আর তার মধ্যে রয়েছে ফিরিওয়ালাদের হাঁকডাক।
কালের প্রবাহে প্রগতির গতিতে হারিয়ে গেছে অনেক কিছুই। যদিও কবি বলেন, “যা হারিয়ে যায় তা আগলে বসে রইবো কত আর”, তবু যা গেছে তার কিছু কিছু যেন গিয়েও যায় না, অলস অবসরে ফিরে ফিরে আসে, ফিরে ফিরে ডাকে।
দশক ছয় সাত আগে কলকাতার রাস্তায় রাস্তায়, গলিতে গলিতে অনেক রকম ডাক শোনা যেত। সে সময়ের কলকাতায় প্রাত্যহিক জীবনে রাস্তার বিভিন্ন সুর ও শব্দ মিলে যে সিম্ফনি তৈরি হতো, তার মধ্যে দিব্যি মিলে যেত বিভিন্ন ফিরিওয়ালার বিভিন্ন সুরে ডাক।
1880 সালে রায় বাহাদুর শশীচন্দ্র দত্ত The Street Music of Calcutta নামে ইংরেজিতে যে ছোট্ট সুখপাঠ্য নিবন্ধটি লিখেছিলেন, সেখানে আজ থেকে প্রায় 140 বছর আগের কলকাতায় যে সব ফিরিওয়ালার ডাক শোনা যেত তার বর্ণনা আছে। সেগুলোর বেশির ভাগই আজ আর শোনা যায় না।

“কাটাও শিল চাকতি জাঁতার” ডাকের উল্লেখ করে তিনি লিখেছেন, “আমি অবাক হয়ে ভাবি কজনের প্রয়োজন হয় জাঁতা কাটানোর বা সারানোর? তবু এই লোকটি এই হাঁক দিয়ে দিয়ে তার দিন গুজরান করে।” জাঁতার ব্যবহার যখন উঠে গেল, তার পরেও রান্নাঘরে শিলনোড়ার ব্যবহার বহুদিন পর্যন্ত চলেছিল। চার পাঁচ দশক আগেও কলকাতার পাড়ায় পাড়ায় দেখা যেত “শিল্ কা-ট্-হা-ও-ও, শিল্ কা-ট্-হা-ও-ও,” হাঁক দিতে দিতে হাতে ছেনি-বাটালির ছোট পুঁটলি নিয়ে শিলকাটানোওয়ালা চলেছে।
“ইঁটের খাঁচায় লোহার পাঁজরে” বন্দী নগরের পিচ বাঁধানো রাস্তায় শোনা যেত মাটির ডাক, “মা-ট্টি -চা-ই-ই”। মাথায় বড়ো চুপড়ি, তার ওপর ছোট চুপড়িতে ভরা মাটি ফিরি করে চলেছে।
মায়েদের তোলা উনুনে রান্নার সেই সব ধোঁয়াভরা দিনগুলিতে ঝুড়ি করে ঘুঁটে বিক্রির ডাকও শোনা যেত — “ঘুঁটে লেবে গো-ও-ও, ভালো-ও ঘুঁটে-এ”।
হঠাৎই কানে আসত গুরুগম্ভীর গলার ডাক,
হিং চা-ই-ই, হিং !
কাবুলিওয়ালা চলচ্চিত্র দেখার অনেক আগেই চোখে পড়ত সত্যিকারের রহমতদের, পিঠে মস্তো ঝুলিতে হিঙের রকমারি । অমন ভয়ানক লম্বা চওড়া চেহারার কাবুলীদেরও
দেখা যেত ছোটখাট নরমসরম চেহারার বাঙালি গিন্নিদের কঠোর দরকষাকষির কাছে অসহায় হয়ে পড়তে।
মাঝে মাঝে ভেসে আসতো “দাঁতের পোকা- বার কোরবে” বা “বাত ভালো করবে” — কিছু বেদিনি ঝুলিতে জড়িবুটি নিয়ে ঘুরত, তাই দিয়ে নাকি দাঁতের পোকা বার করা যায়, বাত সারানো যায়।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এর একটি ছোটগল্প আছে, যার নাম “ফিরিওয়ালা”। নামহীন একটি লোকটি একটা চ্যাপটা মাটির হাঁড়িতে ক্ষীরমোহন বিক্রি করতে আসত কলকাতার মেসবাড়িতে।
‘কাগজ বিক্রি’ কবিতায় প্রেমেন্দ্র মিত্র অমর করে রেখেছেন কলকাতার এক অতি পুরোন ও পরিচিত ফিরিওয়ালাকে ।
“হাঁকে ফিরিওয়ালা, কাগজ বিক্রী/পুরোন কাগজ চাই ।/ ঘর ভরি যত মিছে জঞ্জাল/জমানোর নাই ঠাঁই।”
শশীচন্দ্রের আমলেও পুরোন খবরের কাগজের ফিরিওয়ালারা ছিলো। তাদের কথা তিনি বেশ রসিয়ে সবিস্তারে লিখেছেন। “এক দিস্তে পুরনো কাগজের দাম চোদ্দো পয়সা! আমি একবার খুব দরাদরি করেছিলাম চার আনা চেয়ে। কিন্তু মুসলমানটি আল্লার কসম খেয়ে বলল সাড়ে তিন আনার এক কড়ি বেশী দিতে পারবে না”। আজও পুরোন কাগজওয়ালাদের দর বাড়াতে না চাওয়ার “সেই ট্রাডিশন সমানে চলিয়াছে!”
শুধু পুরোন কাগজ নয়, শোনা যেত ‘পুরোন লোহা বিক্রি’, ‘পুরোন ছাতা বিক্রি’, ‘পুরোন শিশি বোতল বিক্রি’র হাঁকও। শোনা যেত ‘খালি পাউডারের কৌটো, খালি ঘিয়ের টিন বিক্রি’র হাঁক। আর ছিল ছুরি বঁটি শান দেওয়ার হাঁক দেওয়া শানওয়ালা।
এইসব হাঁকডাকের সুরতরঙ্গ পাল্টে পাল্টে যেত বছরের ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে। গরমকালের বিকেলে বা সন্ধ্যায় প্রাণমন জুড়িয়ে যেত কুলফি মালাইয়ের ডাকে। ভিজে লাল শালু জড়ানো মাটির হাঁড়িতে ছোট্ট ছোট্ট কৌটোয় সুস্বাদু শীতলতার আশ্বাস ভ্যাপসা গরমকেও মনোরম করে তুলত। ‘চাই বরফ’ হেঁকে চাকা লাগানো কাঠের ঠেলাগাড়ি ঠেলে নিয়ে যেত বরফওয়ালা। বরফ গুঁড়ো করে তার ওপর ঢেলে দিত লাল, সবুজ, হলুদ রঙের লোভনীয় সিরাপ। তার কাছে কোথায় লাগত দামী ব্র্যান্ডের আইসক্রিম !

গরমের সন্ধ্যা কাব্যময় হয়ে উঠত ফুলওয়ালার হাঁকে। অবনীন্দ্রনাথের কথায় “সন্ধ্যাবেলার শব্দ হচ্ছে ঐ বেলফুল। বেলফুল, চাই বেলফুল হাঁকতে হাঁকতে শব্দ গলির এদিক থেকে ওদিকে চলে যায়”। বাতাসে রয়ে যেত বেল-জুঁইয়ের সুরভির আবেশ।
শীত পড়ার সঙ্গে সঙ্গে মিষ্টি রোদ্দুরের সঙ্গী হয়ে আসত এক মিষ্টি মধুর ডাক — “জয়নগরের মোয়া, নলেন পয়রাগুড়”। কিনতে চাইলে হাঁড়ির ভেতর থেকে মোয়া বের করে শালপাতায় মুড়ে হাতে তুলে দিত। শালপাতার গন্ধ, মোয়ার স্বাদ আর রোদ্দুরের মৃদু উষ্ণতা — মনে হতো শীতকালের চেয়ে সুস্বাদু আর কোনও ঋতু নেই? শীতে আর এক অতিথি ছিল ধুনুরি। হাতের ধুনুরিতে ‘তুঁহু তুঁহু’ আওয়াজ তুলতে তুলতে হেঁকে যেত ‘লেপ তোষক বানাবে”। তখন রেডিমেড লেপ তোষকের চল তো এত ছিল না।
শুধু ঋতু নয়, দিনের সময়ের সঙ্গে সঙ্গেও পাল্টে যেত রাস্তার সিম্ফনির সুর। বিকেলে হেঁকে যেত বাদামওয়ালা, ঝুড়িতে খোসাশুদ্ধ চিনেবাদাম, ছোলা আর মটরভাজা নিয়ে। বাড়তি আকর্ষণ ছিল ছোট্ট কাগজের এক চিলতে মোড়কে কাঁচালঙ্কা বাটা আর নুন, ছোলা বাদামের সঙ্গে ‘ফ্রী’।
সন্ধ্যা হলেই আসত জিভে-জল-আনা ডাক, “গরম ঘু-গ-নি-ই আলুর দ-অ-ম্”। কাঁচের বাক্সে নালেঝোলে মাখামাখি ঘোরতর লাল ছোট ছোট গোল আলুর দম আর মাখোমাখো ঘুগনি। ছিল ‘ঘটি গরম’ চানাচুর এর সুস্বাদু আহ্বান !
হাঁক নয়, কারো কারো ছিল পেটেন্ট আওয়াজ। হাওয়া মিঠাই ওয়ালা ডাকত ঠুং ঠুং মিষ্টি শব্দে ছোট্ট ঘন্টি বাজিয়ে, হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালার বাঁশীর সুরের মতোই বড়ো মোহময় সে ঘন্টির আওয়াজ।
ডুগডুগির ‘ডুগডুগ ডুগডুগ’ আওয়াজ কানে এলেই বোঝা যেত ভালুকওয়ালা বা বাঁদরওয়ালা এসেছে ভালুকের কিংবা বাঁদরের খেলা দেখাতে। সে খেলার দৃশ্য ধরা আছে ‘বাদশা’ ছায়াছবিতে। সত্যজিৎ রায়ের চারুলতা’য় দেখা যায়, ডুগডুগি বাজিয়ে বাঁদরওয়ালা রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে, আর নিঃসঙ্গ চারু জানালার খড়খড়ির ফাঁক দিয়ে সে দৃশ্য দেখছে।
মাঝে মাঝে সুর জেগে উঠত কলকাতার কিনু গোয়ালার গলিতে গলিতে। ছোট ছোট বেহালার পশরা নিয়ে ফিরিওয়ালা হেঁটে যেত হাতের ছোট বেহালায় সুরের মূর্ছনা ছড়িয়ে দিতে দিতে।
আর ছিল বাসনওয়ালারা। ঢং ঢং ঢং করে এক বিশেষ ছন্দে তালে থালা বাজিয়ে জানাতো তাদের আগমনবার্তা। সহজপাঠের কবির ভাষায় “বাসনওয়ালা থালা বাজায়”। বাসনওয়ালারা যে থালা বাজিয়ে বাসন ফিরি করত, শশীচন্দ্রও তা জানাতে ভোলেন নি।
কলকাতা একসময়ে মুখরিত হতো এইরকম আরো অনেক ফিরিওয়ালার বিচিত্র সব ডাকে, শব্দে। সবার কথা বলতে গেলে শব্দের ডেসিবেল পাঠকের সহ্যসীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা।

শেষ করি অন্য এক ফিরিওয়ালার কথা দিয়ে, যাকে ঠিক প্রচলিত অর্থে ফেরিওয়ালা বলা যায় না। নানা রকম কাপড়ের তালি দেওয়া জোব্বা পরা, কাঁচাপাকা দাড়িওলা দরবেশ আসত বাড়ির দরজায় দরজায়। হাতে একটি থালায় ধরা ছোট একটা চেরাগদান, আর চামর। “মুশ-কিল আস-আন” বলে ডাক দিতেই হিন্দু মায়েরা তাঁদের ছোট ছেলেপিলেদের হাতে কিছু পয়সা দিয়ে পাঠিয়ে দিতেন দরবেশের কাছে। সে গায়ে চামর বোলাতে বোলাতে বিড়বিড় করে কি সব মন্ত্র পড়ে ফুঁ দিয়ে দিত, আর চেরাগদানের কালি দিয়ে দিত কপালে ছোট টিপ। মায়েরা নিশ্চিন্ত হতেন যে তার ফুঁয়ে সব রোগ বালাই, বিপদ আপদ দূরে থাকবে।
সেও তো ছিল এক ধরনের ফিরিওয়ালা — আশা, আশ্বাস, ভরসা, বিশ্বাস ফেরি করে বেড়ানোর ফিরিওয়ালা ।
(রাস্তার ফিরিওয়ালার ডাক যে লেখার বিষয়বস্তু হতে পারে, সেটা প্রথম জানতে পারি শ্রদ্ধেয় প্রয়াত রাধাপ্রসাদ গুপ্তের লেখা “কলকাতার ফিরিওয়ালার ডাক আর রাস্তার আওয়াজ” বইটি থেকে। বিচিত্র বিষয় নিয়ে রাধাপ্রসাদ বাবুর চর্চা আমাকে বারে বারেই উদ্বুদ্ধ করেছে।)
এই লেখাটিতে সাহায্য নিয়েছি যে সমস্ত সূত্র থেকে :
The Street Music of Calcutta : Shoshee Chunder Dutt., ঘরোয়া : অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নির্বাচিত কবিতা : প্রেমেন্দ্র মিত্র, গল্পসংকলন : বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, রবীন্দ্র রচনাবলী
ফোটোগুলি অন্তর্জালের সৌজন্যে
Thanks for reminiscence.
so nicely cast.
Like a smell of dust permeating.
from a summer rain first
ভীষণ ভালো লাগলো, নস্টালজিক হয়ে গেলাম, সত্যি মনে হচ্ছে এই সেদিনের সব ছবি, অনেক অনেক কিছু পেয়েছি আমদের ছোট বেলায়, এখন যেনো মনে হয় সব কিরকম হয়ে গেছে, মানুষ সেই প্রাণ খুলে হাসতে ভুলে গেছে, রাস্তায় দাড়িয়ে চেনা অচেনা মানুষের sathe কত কথা হতো, সব যেনো কেমন হয়ে গেছে। ছোটবেলার সেই পাড়ায় আসা কলের গানের সিনেমা ওয়াল ice cream ওয়ালা, সেই মাটির হাড়িতে আর টিনের বাক্সে নিয়ে আসা সনপাপ্রিওয়ালা, মালাই বরফ ওয়ালা, সেই বাঁদর খেলা দেখা, গলায় চেইন লাগিয়া ভাল্লুক নিয়ে পাড়ায় খেলা দেখানো, সব কোথায় যেন হারিয়ে গেলো, তাও ভেবে ভীষণ তৃপ্তি পাই আমরা ছোট বেলায় এইসব পেয়েছি, তখন হাতাহাতি মারামারি হত বন্ধুদের মধ্যে ঠিকই কয়েকদিন কথা বন্ধ থাকতো আবার বন্ধুরা সব ভাব করে দিত, তখন মোবাইল ছিলনা ঠিকই কিন্তু সকাল বেলা ইস্কুল যাওয়ার পথে বন্ধুদের সবাই একসাথে না থাকলে ভালো লাগতো না, যোগাযোগ টা ছিল হৃদয় দিয়ে ফোনের বা ফেস বুক হোয়াটসঅ্যাপে নয়।আর কি হবে ভেবে এখন আমরা senior citizen রা back-dated হয়ে গেছি এখনকার ছেলে মেয়েদের কাছে।
উজ্জ্বল, শাড়িওয়ালা আসতো শান্তিপুরে-ধনেখালির শাড়ি নেবে… হাঁক দিয়ে। চাই মাটি… বলে যে আসতো তার কাছে পাঁচটা ঝুড়ি মাটি থাকতো বড় থেকে ছোট। মাথায় পিরামিড বানিয়ে নিয়ে যেতো। বিকেলে ঘুগনি-আলুদম বিক্রী করতে আসতো সেও ঘন্টি বাজিয়ে। বটি শানবালা
আসতো। আর রাতে এগারোটা নাগাদ আসতো এক বেহালা বাজিয়ে। গান তুলতো “য়হ প্যারকা নগমা হৈ”।
খুব ভালো লিখেছিস।
সময় করে পড়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ জানাই
ভালো লেগেছে জেনে আনন্দ পেলাম