চারিদিকে হিমহিম ভাব। ভোরের দূর্বাঘাসে টলমল করা শিশিরবিন্দু জানান দিচ্ছে শীতের বার্তা। আলমারি থেকে আলনায় জায়গা করে নিয়েছে শীতের পোশাক।
বাঙালির শীতকাতুরেপনা নিয়ে অনেক গপ্পো শোনা যায় শুধু নয়, তাদের পেটের রোগের ব্যারাম থেকে মাছের ঝোল, আলুপোস্ত, চিংড়ি-ইলিশ, পিঠে-পায়েস প্রীতি, ‘পিএনপিসি’… নিয়ে এমন ফুরফুরে হাসি-মস্করা আজ আর পাড়ার রোয়াকে, ট্রেনে বাসে আটকে নেই ডিজিটাল আঙ্গিকের জমানায় বাঙালিয়ানার চর্চা এখন দেশ-বিদেশ সর্বত্রগামী।
“গ্যাস আর অম্বল, বাঙালির সম্বল” শুধু এতেই ক্ষান্ত নয়, পান্ত বাঙালির শরীরে হাজারো সমস্যার সূত্রপাত হয় খাদ্যাভ্যাস থেকে। আর সেই সমস্যার সমাধান পেতেই যে কোন মরশুমে পাতলা ঝোলের জুড়ি নেই শিশু থেকে বয়স্ক, এমনকি পেটরোগারদের রসনায়।
মাছের ঝোল নিয়ে প্রথম কবিতাটি পাওয়া যায় আদি মধ্যযুগে প্রাকৃত পৈঙ্গলের এই পঙ্ক্তি ক’টিতে,
“ওগগরা ভত্তা, গাইক ঘিত্তা, মোইলি মচ্ছা, নালিত গচ্ছা দিজ্জই কান্তা খা (ই) পুনবন্তা।” অর্থৎ মধ্যাহ্নভোজনে বসেছেন গৃহকর্তা, পরিবেশন করছে স্ত্রী কলাপাতায় গরম ভাতে গাওয়া ঘি, মৌরোলা বা ময়না মাছের ঝোল, এবং নলিতা (পাট) শাক…..বাঙালির গার্হস্থ্যজীবনের এক সুখময় ছবি।

“পেটের চিন্তায় কাটছে বার মাস/বোরিং জীবন মজার অক্টোপাস /সেই মজায় আমিও আছি/সুযোগ এলো/ সুযোগ আসছে ওই/সবাই চাইছে কিন্তু পাচ্ছে কই?
তাই কেমন চুপসে আছে
কলা পাতা দিয়ে রেখে ঢেকে চল না
রেসিপিতে বেশি কিছু পাওয়া গেল না
নুনে আর হলুদে মিশে স্বাদ আরও বাড়ে কিসে
দূর ছাই
আমি কি পারব বানাতে?
বাঙ্গালি মাছের ঝোল “…

পারবেন বৈকি। রুই মাছের সঙ্গে পেঁপে, কাঁচকলা, খোসা সমেত আলু, বেগুন, শিম, বরবটি, বড়ি … দিয়ে একটা হালকা হলুদ-খয়েরি রঙের ঝোল। মশলায় অল্প ধনে-আদা-জিরে বাটা দিয়ে ফোড়নে পাঁচফোড়ন, তেজপাতা আর কাঁচালঙ্কা। ব্যস, গরম গরম এই ঝোলে প্রাণের আরাম, মনের আনন্দ, আত্মার শান্তি… সব একসঙ্গে। যদি মনে হয় নিরামিষ ঝোল খাবেন, তবে বাদ দিন মাছ। স্বাদটা করে নিতে পারেন একটু মিষ্টি ঘেঁষা।
গৃহস্থ বাড়ির ঘরোয়া অনুষ্ঠানে কোনও কোনও ঝোল স্বাদ মাহাত্ম্যে প্রধান আকর্ষক মেনু হতে পারে। যেমন ধরুন, বাগদা চিংড়ি দিয়ে আলু, পটল, ঝিঙে, বড়ি দিয়ে ঝোল। ফোড়নে সাদা জিরে শুকনো লঙ্কা আর মশলায় আদা-জিরে বাটা। ঝোলের রঙ যদি করতে চান লাল, তবে রান্নার গোড়ায় তেলে সামান্য শুকনো লঙ্কার গুঁড়ো ও চিনি দিলেই কেল্লাফতে।
আবার এমন কিছু উপকরণ আছে যেগুলো অন্যভাবে সাধারণত খাওয়া হয়, সেগুলো দিয়েও দুর্দান্ত ঝোল রান্না করা যেতে পারে। যেমন ধরুন কলমিশাক। শাকভাজা খাওয়াই দস্তুর। কখনো চিংড়ি, লম্বা লম্বা করে কাটা আলু, কুমড়ো, বেগুন সহযোগে পাঁচফোড়ন, শুকনো লঙ্কা, ধনে-আদা বাটা, নুন-চিনি-হলুদ দিয়ে কলমি শাকের ঝোল খেয়ে দেখুন, যেমন উপাদেয় তেমনি স্বাস্থ্যকর। চাইলে একথালা ভাত উড়িয়ে দেওয়া যায় অনায়াসে। ওয়েট কনসাস হলে, ঝোল স্যুপ হিসাবে খান।

বর্তমানে কোভিড পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে। তবে মহামারী আমাদের শিখিয়ে দিয়ে গেছে, ঘরের খাবার খেলে অনেক অসুখবিসুখ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। হোটেল বা রেস্তোরাঁর রান্নায় ব্যবহার করা হয় প্রচুর পরিমাণে স্যস, মশলা ইত্যাদি। দেখতে ও খেতে সুস্বাদু হলেও এমন খাবার নিয়মিত খেলে আমাদের দেহে রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা কমে যাওয়ায় আশঙ্কা থাকে। হজমসংক্রান্ত সমস্যার সৃষ্টি হয়।
মাছের বেকড, ফ্রায়েড, গ্রীলড পদ আধুনিক প্রজন্মের কাছে বেশ জনপ্রিয়। মাছের ঝোল-ঝাল-অম্বলের মেনু বাদ দিয়ে প্রেফার করছে ভেটকি চিংড়ি পপকর্ন, ক্রিসপি ফ্রায়েড মৌরোলা, ইলিশ চিজবল ইত্যাদি রান্না। খাবারগুলো সুস্বাদু বানাতে যে তেল ব্যবহার করা হয় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাড়ির মতো উচ্চমানের হয়না। এই তেলের মধ্যে দিয়ে প্ৰচুর পরিমাণে স্যাচুরেটেড ফ্যাট শরীরে ঢুকে যায়।
একদিকে সময়ের অভাব অন্যদিকে চাই পুষ্টিকর খাবার। এই দুইয়ের কম্বিনেশন পাওয়া যায় মাছের ঝোলে। ধোঁয়া ওঠা গরম গরম ভাত আর সব্জি দেওয়া মাছের ঝোল। স্বাদেও ভালো আবার স্বাস্থ্যসম্মত। এইভাবেই মাছে-ভাতে-ঝোলে বাঙালি বেঁচে থাকুক সুস্থ হয়ে।
Darun darun
থ্যাংক ইউ????
Mach amar khub fav ..khub sundor hoeche lekha ta….thank you so much