সাধক বামাক্ষেপার মাতৃদেবী রাজকুমারী কিছুদিন রোগভোগের পর হঠাৎই লোকান্তরিত হয়েছেন। এর আগে পিতা সর্বানন্দ যখন লোকান্তরিত হন, তখন বামাক্ষেপার বয়স ছিল মাত্র আঠেরো। আসল নাম তাঁর বামাচরণ—পরবর্তীকালে কেউ বলতেন, বামদেব, কেউ বলতেন বামাক্ষেপা।
মহাসাধক কৈলাসপতির আশ্রয়ে বামাক্ষেপা তখন থাকেন দ্বারকা নদের তীরে শ্মশানে। ঘর-সংসার সবকিছু ছেড়ে দিয়েছেন। সংসারে তাঁর একমাত্র বন্ধন ছিলেন মা—তিনিও চলে গেলেন। গর্ভধারিণী মা চলে গেলেও জগজ্জননী মা তারা-ই তখন তাঁর একমাত্র ধ্যানজ্ঞান। নিজের জন্য কোন পর্ণকুটিরের প্রয়োজনও নেই তাঁর—নীচে তার মায়ের সিদ্ধপীঠ মহাশ্মশান, আর মাথার উপরে উদার অনন্ত আকাশের মহাবিস্তার—মুক্তবিহঙ্গের মতোই ক্ষেপা এখানে স্বেচ্ছাবিহারী। এই অবস্থায় তিনি হারালেন গর্ভধারিণী মাকে।
ওদিকে তাঁর ছোট ভাই রামচরণ দাদার উপর ভরসা না করে নিজের সাধ্যানুযায়ী মায়ের আদ্যশ্রাদ্ধের ব্যবস্থা করতে উদ্যোগী হয়েছেন। কিন্তু সংসারে বড়ই অভাব, দাদা শ্মশানবাসী—তাই কোনরকমে নিয়মরক্ষা করে আদ্যশ্রাদ্ধের কাজ সম্পন্ন করতে চান রামচরণ। শ্মশানে বসেই সবকিছু শুনলেন বামাক্ষেপা। তারপর ডেকে পাঠালেন ছোট ভাইকে, বললেন, ‘শোন ভাই, ফাঁকি দিয়ে মায়ের শ্রাদ্ধ করা যাবে না। মায়ের কাজ বলে কথা, চারপাশের ক’খানা গাঁয়ের লোককে নেমন্তন্ন করে খাইয়ে দে।’
ক্ষেপা দাদার কথা শুনে ছোট ভাইয়ের তো মাথায় হাত। ঘরে একটা কানাকড়িও নেই, কত কষ্ট করে দিন চলছে—এসব খবর কি দাদা জানেন না ? তাহলে এরকম কথা বলার অর্থ কি ? এ-যে ভয়ঙ্কর পাগলামি। বামদেবের কথা শুনে রামচরণ দিশেহারা হয়ে পড়েন। এত লোককে খাওয়াবার মতো তাঁর সঙ্গতি কোথায় ? তিনি মাথায় হাত দিয়ে ভাবতে বসেন।
অথচ দাদার বিরুদ্ধে কথা বলারও সাহস নেই। তাছাড়া দাদার খেয়ালিপনাও তাঁর জানা আছে। ওদিকে, প্রতিবেশীরা যখন বামাক্ষেপার ওই নির্দেশের কথা শুনলেন, তখন সবাই মুচকি হাসি হেসে ওঠেন। আবার কেউ কেউ এটা পাগলের প্রলাপ বলেই তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিলেন। কিন্তু এসব হাসি-ঠাট্টাকে বামদেব কিছুমাত্র গুরুত্ব দিলেন না। তিনি নিজেই তাঁর গ্রাম আলায় গিয়ে পৈত্রিক বাড়ির সংলগ্ন জমি পরিষ্কার করলেন—যাতে লোক খাওয়ানোর কোনও অসুবিধা না হয়। গ্রামের সবাই অবিশ্বাসের হাসি হাসলেও বামদেব কিন্তু নিজের কথা রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
ক্ষেপা আবার ফিরে এলেন তারাপীঠের শ্মশানে।

শ্রাদ্ধের দিন সকাল থেকেই আলা গ্রামের মানুষ বিস্ফারিত চোখে দেখতে থাকেন, কোথা থেকে যেন ভারে ভারে শ্রাদ্ধ ও ভোজনের বিভিন্ন উপচার রামচরণের কাছে এসে জমা হতে থাকে। বিস্ময়ে হতবাক রামচরণও। কতরকম খাদ্যসম্ভার এসে জমা হল—তারও কোনও হিসেব নেই। সাধক বামাক্ষেপার জানা-অজানা অসংখ্য ভক্ত নিজেরাই উদ্যোগী হয়ে এইসব জিনিসপত্র আলায় পাঠাতে থাকেন—যাতে শ্রাদ্ধের কাজ ও গণভোজনের পর্ব সুসম্পন্ন হয়। এ-যেন ভানুমতীর খেল!
খবরটা গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে পড়তেও সময় লাগল না। তাই, শ্রাদ্ধের দিন সকাল থেকেই এই অবিশ্বাস্য কাণ্ড দেখতে ও পরম আনন্দে ভোজন করতে দলে দলে মানুষ এসে জড় হলেন রামচরণের অঙ্গনে। মহাসমারোহে শ্রাদ্ধের কাজ শেষ হয়ে গেল—এবার শুরু হবে ব্রাহ্মণ ভোজন।
আর ঠিক তখনই দেখা দিল বিপত্তি। গোটা আকাশটা কখন যে কালো মেঘে ছেয়ে গেছে, সেটা কেউই খেয়াল করেননি। হঠাৎ বর্ষার আকাশে প্রচণ্ড মেঘগর্জন শুনে সবাই চমকে উঠলেন। আতঙ্ক সকলের মনে—এতবড় আয়োজন সবই কি নষ্ট হয়ে যাবে ? নিমন্ত্রিত অতিথিরা কি অন্নগ্রহণ করতে পারবেন না ? ক্ষেপা-জননীর শ্রাদ্ধ কি অসম্পূর্ণই থেকে যাবে ? রামচরণ হতাশায় ভেঙে পড়লেন।
ওদিকে তারাপীঠ মহাশ্মশানে শিবকল্প বামদেব গভীর ধ্যানে মগ্ন। হঠাৎ প্রচণ্ড মেঘগর্জনে তাঁর ধ্যান গেল ভেঙে। আকাশের দিকে তাকিয়ে তিনি বুঝলেন তাঁর জননীর পারলৌকিক কাজ অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। প্রকৃতি বিরূপ। তিনি আর কালবিলম্ব না করে তারাপীঠ থেকে ছুটে চললেন আলায়।
ঘোর সঙ্কটের সামনে দাঁড়িয়ে আলায় তখন রামচরণ অসহায়। দাদাকে আসতে দেখেই তিনি হাউ হাউ করে কেঁদে ফেললেন, বললেন, ‘দাদা, তুমি তারামায়ের কৃপায় আমাদের গর্ভধারিণী মায়ের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনায় এতবড় শ্রাদ্ধের আয়োজন করলে, কিন্তু যেভাবে ঝড়-বৃষ্টি ধেয়ে আসছে, তাতে তো সবকিছুই পণ্ড হয়ে যাবে।’ রামচরণের কান্না আর থামেনি।
বিশালদেহী বামাক্ষেপা যেন রুদ্ররূপী শিবের মতোই মাথা উঁচু করে দাঁড়ালেন, বললেন, ‘ভয় নেই, আমার তারামায়ের কৃপায় কোনও আয়োজনই নষ্ট হবে না। অতিথি সেবাও হবে নির্বিঘ্নেই।’ তারপরই তিনি মেঘের গর্জনকে ছাপিয়ে সম্বুকণ্ঠে তারা-মন্ত্র উচ্চারণ করতে করতে শ্রাদ্ধের আসরেই গভীর ধ্যানে ডুবে গেলেন। যেন ধ্যানগম্ভীর হিমালয়। তাঁকে ঘিরে তখন অসংখ্য মানুষ। আর সকলের বিস্ময়াবিষ্ট চোখের সামনে ঘটল এক তরুণ সাধকের অলৌকিক যোগ-বিভূতির প্রকাশ।
সবাই দেখলেন, আলা গ্রামের আশে-পাশে, দূরে-অদূরে সর্বত্র ঝড়-বৃষ্টির প্রবল তাণ্ডব শুরু হয়ে গেল। অথচ শ্রাদ্ধ-বাসরের আশে-পাশে এক বিন্দু বৃষ্টি নেই, নেই ঝড়েরও লক্ষণ। এই অবিশ্বাস্য দৃশ্য দেখে অভিভূত অতিথিরা যখন নিশ্চিন্তে ভোজনে বসলেন, তখন তাঁদের নির্বাক চোখের সামনে সাধক বামাক্ষেপার এক নতুন মহিমা হল উদ্ভাসিত। ক্ষেপার মাতৃ-আরাধনা হল সার্থক।
শাক্ত ও বৈষ্ণব সাধনার লীলাভূমি বীরভূম জেলার আলা গ্রামে বাংলা ১২৪৪ সালের ১২ ফাল্গুন বামাচরণ ভূমিষ্ঠ হন। শৈশবে তিনি এতাই সরল ছিলেন যে, প্রতিবেশীরা তাঁকে বলতেন ‘হাউড়া’ অর্থাৎ নির্বোধ। লেখাপড়ায় তাঁর কোনদিনই মন ছিল না—অভিনয় করতে ভালবাসতেন। তাঁর দিদি জয়কালী দেবীও অল্পবয়সে বিধবা হয়ে সন্ন্যাসিনী হন।
সেই সময় তারাপীঠ মন্দিরের পরিচালনভার ছিল নাটোর রাজের হাতে। তাঁর কর্মচারী দূর্গাদাস সরকার সব কাজ দেখাশোনা করতেন। এই দূর্গাদাসের মাধ্যমেই তারাপীঠের তন্ত্রসাধক কৈলাসপতির সঙ্গে বামাচরণের পরিচয় হয়। কৈলাসপতি বাবা এবং মন্দিরের প্রধান কৌলাচার্য মোক্ষদানন্দের পদতলে বসেই চিরকুমার বামদেবের তন্ত্রসাধনা শুরু হয়। শেষপর্যন্ত ক্ষেপাবাবাই তারাপীঠের প্রধান কৌলপদে বৃত হন। বাংলা ১৩১৮ সালের শ্রাবণ মাস পর্যন্ত তিনি তাঁর নরলীলায় জগৎকল্যাণ করেছেন।
দেবতা ও মানুষে, মানুষ ও পশুতে, জাত ও বেজাতে এবং ধনী ও দরিদ্রে বামদেবের কোনও ভেদজ্ঞান ছিল না। তিনি ছিলেন বাকসিদ্ধ—তাঁর মুখের কথাই ছিল সত্য। ফলে তিনি কখনও কখনও এমন কথা বলে ফেলতেন, যেটা অন্যের পক্ষে ভয়ের বা আতঙ্কের কারণ হয়ে উঠত। এখানে সেরকমই একটা ঘটনার কথা বলছি।
তারাপীঠের নগেন পাণ্ডা সে-সময়ে খুবই খ্যাতিমান হয়ে উঠেছিলেন। তাঁরই খুব পরিচিত স্থানীয় একজন জমিদার—নাম পূর্ণচন্দ্র সরকার হঠাৎই খুব অসুস্থ হয়ে পড়লেন। সবরকম ডাক্তার কবিরাজ দেখিয়েও রোগীর কিছুমাত্র উন্নতি হল না। এবার নগেন পাণ্ডা এসে ধরলেন বামদেবকে। তাঁর অনুরোধ, ওই জমিদারকে রোগমুক্ত করে দিতেই হবে। একবার যদি ক্ষেপা মুখ ফুটে বলেন সে কথা, তাহলেই রোগী সুস্থ হয়ে যাবে। কারণ, ক্ষেপা হচ্ছেন বাকসিদ্ধ।
খুব আদর করে পাল্কিতে চাপিয়ে নগেন পাণ্ডা বামদেবকে নিয়ে গেলেন জমিদার বাড়িতে। যাওয়ার পথে নগেন পাণ্ডা ক্ষেপাকে বোঝাতে লাগলেন, ‘বাবা, আপনাকে বিশেষ কিছু করতে হবে না—শুধু রোগীর কাছে গিয়ে জোর গলায় বলবেন, এই উঠে বোস্, তোর রোগ ভাল হয়ে গেছে। আপনি মুখ দিয়ে ওইটুকু বললেই কেল্লা ফতে।’
বামাক্ষেপা সরল শিশুর মতোই বললেন, ‘তুমি যখন বলছ, তখন তা-ই বলব। যদি ভুলে যাই, তুমি আমাকে একটু মনে করিয়ে দিও নগেন কাকা।’ ক্ষেপার কথা শুনে নগেনের আনন্দ আর ধরে না।
তারপর একসময় পাল্কি গিয়ে ঢুকল জমিদার বাড়িতে। সবাই মিলে দারুণ খাতির করে ক্ষেপাকে নিয়ে গেলেন রোগশয্যায় শায়িত জমিদারের কাছে। কিন্তু রোগীর ঘরে ঢুকেই ক্ষেপা যা বললে তাতে সকলের আক্কেল গুড়ুম। রোগীকে দেখে ক্ষেপা বললেন, ‘ও নগেন কাকা, এ শালা তো এখনি ফট।’ ফট মানে শেষ। অর্থাৎ, এ রোগীর আর আশা নেই, এখনই প্রাণান্ত হবে একথা বলেই ক্ষেপা, এসে পাল্কিতে উঠে বসলেন। ওদিকে রোগীও শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। এতে নগেন পাণ্ডা রাগতস্বরে ক্ষেপাকে বললেন, ‘এ আপনি কি করলেন। এরকম করবেন জানলে, আমি আপনাকে এখানে নিয়েই আসতাম না।’
সরল বালকের মতোই ক্ষেপা উত্তর দিলেন, ‘আমি তো তোমার শেখানো কথাই বলতে গিয়েছিলাম, কিন্তু মা তারা যে বাধা দিলেন, বললেন, ওকথা বলিস না, বলে দে ফট। আমি তো তাই বললাম। এই হলেন সাধক বামাক্ষেপা।’