সোমবার দিল্লির রামলীলা ময়দানে কৃষকদের সমাবেশ আরও একবার তিন বছর আগের কৃষকদের আন্দোলনের ছবিটাই মনে করিয়ে দিল। তিন বছর আগে কেন্দ্রীয় সরকার হুটপাট করে তিন কৃষি আইন এনে কৃষকদের ফসল কর্পোরেটের হাতে তুলে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু কৃষকেরা তা মেনে নেননি। বরং তার বিরুদ্ধে একটানা ৩৮৫ দিন দেশের রাজধানী-সহ আশপাশের এলাকা অবরোধ করেছিলেন। সেই অবরোধে দেশের প্রায় সমস্ত কৃষক সংগঠনই সংযুক্ত কৃষক মোর্চায় শামিল হয়েছিলেন। বহু কৃষকের তীব্র যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে সেই লড়াই পরিচালিত হয়। শহীদ হন ৬০০ জনের বেশি কৃষক। সংযুক্ত কৃষক মোর্চার প্রতিনিধিরা কেন্দ্রের সঙ্গে বহুবার আলোচনায় বসেন কিন্তু কেন্দ্রের সদিচ্ছা না থাকায় তা নিস্ফল হয়। তারপর হটাৎ একদিন প্রধানমন্ত্রী আচমকাই ঘোষণা করেন তিন আইন প্রত্যাহার করা হল। একই সঙ্গে তিনি জানান, সরকার জানায় ন্যূনতম সহায়ক মূল্য নিয়ে কৃষকদের সঙ্গে আলোচনায় বসবে। কৃষকদের সঙ্গে আলোচনা না করে বিদ্যুৎ বিল সংসদে পেশ করা হবে না। এমনকি তিনি এও জানান, কৃষক আন্দোলন চলাকালীন যাঁদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল তা প্রত্যাহার করা হবে। প্রধানমন্ত্রীর কথা শুনে কৃষকরা সাময়িক ভাবে আন্দোলন স্থগিত রেখেছিল। যদিও একথা মানতেই হয়, কেন্দ্রের পক্ষে কৃষি আইন প্রত্যাহার করাটা ছিল কৃষকদের লড়াইয়ের বিরাট সাফল্য।
প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া প্রতিশ্রুতির পর ১৪ মাস অতিক্রান্ত। সরকার ২০২১-এর ৯ ডিসেম্বর লিখিত ভাবে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তা সরকার রক্ষা করেনি। এমএসপি নিয়ে কৃষকদের সঙ্গে আলোচনার জন্য এখনও পর্যন্ত কোনও চিঠি দেয়নি। সংযুক্ত কৃষক মোর্চার দাবি, সরকারকে সমস্ত শস্যের ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের আইনি নিশ্চয়তা দিতে হবে। সরকার এমএসপি নিয়ে যে কমিটি গঠন করেছে এবং যে আলোচ্য বিষয় রেখেছে তা কৃষকদের স্বার্থের পরিপন্থী। তাই সেই কমিটি বাতিল করে কৃষকদের তরফে প্রতিনিধি রেখে নতুন কমিটি তৈরি করতে হবে। দেশের ৮০ শতাংশ কৃষক আজ ঋণের দায়ে দেনাগ্রস্ত, কৃষিঋণ মকুব করে তাদের রেহাই দিতে হবে। সরকার লিখিত প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল সংযুক্ত কৃষক মোর্চার সঙ্গে আলোচনা না করে বিদ্যুৎ সংশোধনী বিল সংসদে পেশ করা হবে না, কিন্তু ২০২২ বিদ্যুৎ বিল জেপিসি-তে পাঠানো হয়েছে, সেই বিল প্রত্যাহার করতে হবে। সেই সঙ্গে মোর্চা দাবি করেছে, কৃষির জন্য বিনামূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে হবে, গ্রামীণ এলাকায় ৩০০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিনা মাসুলে দিতে হবে। তার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী ফসল বিমা যোজনার বদলে সর্বজনীন নতুন বিমা প্রকল্প চালু করতে হবে। সমস্ত কৃষক ও খেতমজুরের জন্য মাসিক ৫ হাজার টাকার পেনশন প্রকল্প চালু করতে হবে। এবং লখিমপুর খেরিতে কৃষক হত্যায় মূল ষড়যন্ত্রকারী অজয় মিশ্রকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভা থেকে বরখাস্ত করতে হবে।
চলতি বছরের বাজেট পেশের পর ‘ওয়েবিনার-সিরিজ’-এ প্রধানমন্ত্রী বুক ফুলিয়ে বলেছিলেন যে, ২০১৪ সালের আগে কৃষিতে বাজেট বরাদ্দ ছিল ২৫ হাজার কোটি টাকা। আর তাঁর ক্ষমতায় আসার ৯ বছর পর ৫ গুণ বেড়ে হয়েছে ১ লক্ষ ২৫ হাজার কোটি টাকা। উল্লেখ্য, যেদিন তিনি এই কথাগুলি গর্বের সঙ্গে বলছিলেন, ঠিক সেইদিন বিজেপি শাসিত মহারাষ্টে্রর শোলাপুর জেলার বারশির বড়গাঁও গ্রামের এক কৃষক নিজের জমিতে ফলানো ৫০০ কেজি পেঁয়াজ বিক্রির জন্য ৭০ কিমি দূরের এক বাজারে গিয়েছিলেন। সেখানে প্রতি কেজি পেঁয়াজের দর ওঠে ১ টাকা। ওই কৃষকের পেয়াজ ওজন করার পর মোট দান দাঁড়ায় ৫১২ টাকা ৭০ পয়সা। এর মধ্যে ট্রান্সপোর্টেশন খরচ ও অন্যান্য চার্জ সমেত ৫০৯ টাকা ৫১ পয়সা বাদ গেলে তিনি হাতে পান ২ টাকা ৪৯ পয়সার একটি চেক। তাঁর থেকেই জানা যায় দুই একর জমিতে পেঁয়াজ চাষ করতে তাঁর ঋণ হয়েছে ৪০ হাজার টাকা। তাহলে তিনি ঋণশোধ করবেন কী ভাবে আর বাঁচবেনই বা কী উপায়ে?
প্রধানমন্ত্রী গর্বে অহংকারে কৃষকদের অনেক উন্নতির গল্প শুনিয়েছেন, শোনাচ্ছেনও। কিন্তু কৃষকেরা জানেন প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে, রোগপোকার আক্রমণে এবং নিকৃষ্ট মানের বীজ সরবরাহের কারণে ফসল নষ্ট হওয়াটা আমাদের দেশের কৃষিতে নিত্য দিনের ব্যাপার। বেশ কয়েক বছর আগেই নাম-কা-ওয়াস্তে ফসল বিমা চালু হয়েছিল। নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় এসে কৃষকদের উন্নতির জন্য ওই বিমাটির নামের সামনে ‘প্রধানমন্ত্রী’ কথাটি জুড়ে ‘প্রধানমন্ত্রী ফসল বিমা যোজনা’ করেছেন। গত বছর এই যোজনায় বরাদ্দ ছিল ১৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, চলতি বছরের বাজেটে করা হয়েছে ১৩ হাজার ৬২৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ গত বছরের চাইতে ১,৮৭৫ কোটি টাকা কম। প্রান্তিক চাষিদের আর্থিক সহায়তা দেওয়ার জন্য ‘প্রধানমন্ত্রী কিসান সম্মাননিধি’ তে গত বছর বরাদ্দ ছিল ৬৮ হাজার কোটি টাকা। এ বছর হয়েছে ৬০ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ ৮ হাজার কোটি টাকা কম। খাদ্যে ভর্তুকিতে গত বছর বাজেটে বরাদ্দ ছিল ২ লক্ষ ৮৭ হাজার ১৯৪ কোটি টাকা। এ বছর ১ লক্ষ ৯৭ হাজার ৩৫০ কোটি। অর্থাৎ কমেছে প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকা। এইভাবে কৃষির সব ক্ষেত্রেই বরাদ্দ কমেছে। রাষ্ট্রীয় কৃষি বিকাশ যোজনায় ৩১.৫ শতাংশ, ফসল বিমায় ১২.১ শতাংশ এবং পিএম কিসান সম্মান নিধিতে ১১.৮ শতাংশ।
মোদিজী বলেন তিনি কৃষি ও কৃষকদের উন্নতিতে অগ্রাধিকার দেন। এই হল তার নমুনা। চাষিরা যাতে ফসলের কিছুটা দাম পেতে পারে, তার জন্য মার্কেট ইন্টারভেনশন স্কিম এবং প্রাইস সাপোর্ট এর জন্য গতবছর বরাদ্দ ছিল ১৫ হাজার কোটি টাকা। এ বছর সংখ্যাটা ‘কোটি’ থেকে নামিয়ে মাত্র ১ লক্ষ টাকা বরাদ্দ হয়েছে। এসব নিয়ে কৃষকদের ক্ষোভ দীর্ঘদিনের। আজ দিল্লির বুকে মহাপঞ্চায়েত থেকে কৃষকদের স্বর আরও চড়বে বলেই আশা।