সংস্কৃতে ‘প্রহেলক’ মানে এক প্রকারের পিঠা বা মিষ্টান্ন। প্রহেলক শব্দে মিছরি, মোরব্বাও বোঝানো হত।
সত্যিসত্যিই পয়লা বৈশাখে হালখাতার দিনে ময়রারা একরকম মিঠাই তৈরি করত, যার নাম ছিল ‘হালখাতার মিঠাই’। সে মিঠাই তারা বছরে মাত্র একদিনই তৈরি করত। সে মিঠাই এখন আর তৈরি হয় না।
প্রহেলক থেকেই অপভ্রংশে পহেলা তথা পয়লা হয়ে গেছে কিনা পণ্ডিতদের তা ভেবে দেখতে অনুরোধ করি।
প্রহেলক > পহেলক > পহেলা > পয়লা।
শশাঙ্ক যেদিন থেকে বাংলার দায়িত্বভার নিয়েছিলেন সেদিন থেকে শুরু হয় বঙ্গাব্দ। তখন নতুন নিয়ম হল চৈত্র মাসের শেষদিনের মধ্যে সমস্ত কর, মাশুল, খাজনা, শুল্ক ইত্যাদি সব পরিশোধ করে তার পরের দিন নতুন বছরের প্রথম দিবস থেকে আবার নতুন ভাবে খাজনার হিসাব শুরু করা হবে। তখন থেকে বছরের প্রথম দিন ভূস্বামীরা অঞ্চলের অধিবাসীদের আমন্ত্রণ জানিয়ে তাদের মিষ্টান্ন সহযোগে খাওয়াদাওয়ার বন্দোবস্ত করতেন, সঙ্গে থাকত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বছরের পর বছর চলে আসা ঘটনাটি পরিণত হয়েছে এক সামাজিক আচারে। যার পরিবর্তিত রূপ আজকাল আমরা দেখতে পাই। আর এখান থেকেই শুরু হয় হালখাতার রেওয়াজ। পুরনো বছরের সব লেনদেন চুকিয়ে নতুন বছরে নতুন খাতায় আবার হিসেব শুরু হয় নতুন করে।
মনে করা হয়, লাঙল বা হালের দ্রব্যের হিসেব রাখার জন্য যে খাতা ব্যবহৃত হত, তারই নাম দেওয়া হয়েছিল হালখাতা। আবার অনেকে মনে করেন সংস্কৃতে হল মানে লাঙল হলেও, ফার্সিতে হাল মানে নতুন, সেখান থেকে হালখাতা কথাটি এসেছে। নানামতে বহুকাল আগে হালখাতা শব্দটি উঠে এলেও মুসলমান শাসকদের খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে তা নববর্ষের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়। পয়লা বৈশাখ, হালখাতা নিয়ে আছে নানা মুনির নানা মত। তবে হালখাতার খাওয়াদাওয়ার প্রচলন বহু বছর ধরেই চলে আসছে। আগে ভূস্বামীরা এলাকার অধিবাসীদের আমন্ত্রণ জানিয়ে মিষ্টান্ন ভোজ করাতেন। সেই হলখাতাই যখন কালক্রমে অন্য ব্যবসায়ের ব্যবহৃত হওয়া শুরু হয় তখন সেখানেও সেই একই রীতি চলে।
চৈত্র মাসের শেষদিনের মধ্যে মহাজনের সমস্ত বকেয়া মিটিয়ে নতুন বছরে নতুন খাতা চালু করার রেওয়াজ। বেশকিছু বছর আগে অবধি দেখা গেছে, এমনকী এখনও বহু জায়গায় দেখা যায় মানুষ দোকানে দোকানে যান হালখাতা করতে, মানে নতুন বছরে কমবেশি যাইহোক কিছু বেচাকেনা করে নতুন করে ব্যবসার হিসেব চালু করা। ভূস্বামীদের মতো ছোট ব্যবসায়ী, দোকানদার, স্বর্ণকারেরা বসে খাওয়াতে না পারলে একখানি মিষ্টির প্যাকেট যার মধ্যে গোটা কয়েক সন্দেশ, এক-আধটা কম রসের মিষ্টি আর একটি বা দুটি নোনতা খাবার নিমকি বা শিঙাড়া জাতীয় কিছু দিয়ে একটা মিষ্টির প্যাকেট হাতে ধরিয়ে দিতেন, সঙ্গে দিতেন একখানি বাংলা ক্যালেন্ডার। ছোটবেলায় হালখাতা মানে এটাই বোঝানো হত, দোকানে গিয়ে কিছু কিনলে মিষ্টির প্যাকেট আর একটা ক্যালেন্ডার দেবে। পয়লা বৈশাখের সন্ধেবেলায় রাস্তায় বেরোলে দেখা যেত একেকজন বুক ফুলিয়ে পাঁচ-ছটা করে মিষ্টির প্যাকেট আর ক্যালেন্ডারের রোল নিয়ে রাস্তা দিয়ে হেঁটে বাড়ির দিকে যাচ্ছেন। বেশ একটা গর্বের ব্যাপার ছিল তাদের কাছে। আবার তাদের দেখেই কিছু মানুষ বিদ্রুপ করে বলতে, পাঁচ দোকানে বাকি খায়, তার আবার ফুটানি। এই রীতিটা মানুষ যেভাবেই নিক না কেন, শৈশবের দৃষ্টি সবসময় ওই মিষ্টির প্যাকেটের দিকেই থাকত, আজও সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে।ছেলেবেলার পয়লা বৈশাখ, হালখাতার গল্পের সঙ্গে মিষ্টির প্যাকেটের কিছু স্মৃতি তুলে ধরা যাক। কালীঘাটে পয়লা বৈশাখ পুজো দিতে গেলে সেখানে প্রথমে ঝুড়ি কেনা হত, তারপর লাল শালু কাপড়, সঙ্গে লক্ষ্মী গণেশের মূর্তি আর ফুল মালা যা লাগে। পাশের দোকান থেকেই কেনা হত লাল রঙের হালখাতা। যার ব্যবসা যত ভালো চলেছে সে নতুন বছরে তত মোটা খাতা কিনত। এরপর সকলের প্রিয় পেড়া সন্দেশ। কালীঘাটের মায়ের প্রসাদ থেকে শুরু করে পয়লা বৈশাখের লক্ষ্মী গণেশের পুজো সবেতেই ব্যবহার হত এই পেড়া সন্দেশ।
এর পিছনে একটা গল্প আছে, ঠাকুরকে নাকি ছানার মিষ্টি প্রসাদ হিসেবে দিতে নেই। আমাদের সংস্কৃত গ্রন্থে দুধ দিয়ে তৈরি ক্ষীর ননি পায়েস এসবের উল্লেখ থাকলেও কোথাও ছানার নাম অবধি উচ্চারণ করা হয়নি। ছানাকে সবসময় দুধের বিকৃত রূপ বলেই ধরা হত, দুধ নষ্ট হয়ে ছানা হয় বলে। ভারতীয়রা পর্তুগিজদের আসার আগে অবধি ছানার ব্যবহার কী করে করতে হয় জানত না। যদিও অনেকে বলেন, মধ্যপ্রাচ্য থেকে অনেক আগেই ভারত পনির ঢুকেছে। সে ঢুকুক, কিন্তু বাঙালিরা পর্তুগিজদের আসার পরই ছানা নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করা শুরু করে। বাঙালি মিষ্টি নির্মাতাদেরও এ নিয়ে অত মাথা ব্যথা ছিল না। কারণ ক্ষীরের মিষ্টি অনেকদিন টেকে, ফলে ব্যবসায়ে ক্ষতি বা অপচয় কম হত, তাই কেউ অত মাথা ঘামায়নি।
নবীনচন্দ্র, ভীম নাগের মতো মানুষেরা এসে মিষ্টিতে ছানার ব্যবহারকে এক অন্যপর্যায়ে নিয়ে গেছেন। আর স্বাদ ভালো ছিল বলে মানুষ সেটাকে সানন্দে গ্রহণ করেছেন। ফলে, পুজোয় যেখানে ক্ষীরের মিষ্টি ব্যবহৃত হত, সেখানে জায়গা করে নিল ছানার সন্দেশ। এই ছানার সন্দেশ যখন বাজারে প্রথম এল, তখন লোকে বলত একে, ফিকে সন্দেশ। কারণ, বাজারে সেইসময় যেসব মিষ্টি পাওয়া যেত সবই কড়া পাকেরই হত। এটা ভাবা ভুল হবে, ছানা আসার পরই আমাদের কারিগররা সন্দেশ বানানো শুরু করেছে। ছানার ব্যবহারের আগেই তারা বেসন, মুগডাল, নারকেল, গুড় প্রভৃতি উপকরণ দিয়ে সন্দেশ বানিয়ে এসেছে। সন্দেশ শব্দটি বড়ই জেনেরিক, কাঁচাগোল্লাও সন্দেশ, কালাকাঁদও সন্দেশ, আবার জলভরাও সন্দেশ, এমনকি বিয়ের তত্ত্বে আমরা একটা সময় আপেল সন্দেশ, রাজহাঁসের সন্দেশ, শঙ্খ সন্দেশ, ইলিশ মাছের পেটি সন্দেশ থাকতে দেখা যায়। সন্দেশ শব্দটি মিষ্টির ক্ষেত্রে বহুলব্যবহৃত লব্জ।
আগেকার দিনে কেউ কারওর বাড়ি কোনও সুসংবাদ নিয়ে গেলে লোকে মিষ্টি নিয়ে যেত। সেই মুখের সন্দেশ (বার্তা) থেকে হাতের মিষ্টির নাম হয়ে গেল সন্দেশ। এখন তেমন কারিগরও নেই, আর বানাতেও সময় লাগে বলে এগুলো ক্রমশ সরে গিয়ে জায়গা করে নিয়েছে চকোলেট দেওয়া ফিউশন মিষ্টি। তবে হ্যাঁ, বাংলার জেলাভিত্তিক একটা মিষ্টির চল আছে। হালখাতার মিষ্টির প্যাকেটে এর প্রভাব আমরা দেখতে পাই। কয়েকটা উদাহরণ দেওয়া যাক, পান্তুয়া এখন মোটামুটি সব জায়গাতে পাওয়া গেলেও, নদীয়ার জও ময়রা প্রথম শুরু করেন পান্তুয়া, দেশভাগের পর কানসাট থেকে ময়রা বিজয়কুমার সাহা মালদহে এসে নিজস্ব মিষ্টি বানিয়ে নাম দিলেন কানসাট, মালদহের আরেকটি মিষ্টি নিমাই সন্ন্যাসীর উদ্দেশে বানানো রসকদম্ব, বর্ধমানের জমিদার বিজয়চাঁদ মোহতাবকে লর্ড কার্জন ১৯০৪ সালে মহারাজ উপাধি দিতে আসবেন, সেই উপলক্ষ বিজয়চাঁদের আদেশে ভৈরবচন্দ্র বানালেন সীতাভোগ আর মিহিদানা, জনাইয়ের মন হরণকারী মনহরা, মুর্শিদাবাদ জেলার লালবাগের ময়রা নিমাই মণ্ডলের। লেডিকিনির নাম নাকি হয়েছে লর্ড ক্যানিংয়ের স্ত্রী লেডি ক্যানিং-এর নাম থেকে।
ছানা থেকে তৈরি ছানাবড়া বা কালোজাম, ঠাকুর শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ দেবের প্রিয় সাদা বোঁদে, মল্ল রাজাদের প্রিয় মেছেদার মেচা সন্দেশ ইত্যাদি সবই জেলা বা অঞ্চল ভিত্তিক মিষ্টি। আর এই সব মিষ্টিগুলো এতই বিখ্যাত যে, এই মিষ্টির নামে জায়গাটি সাধারণ মানুষের কাছে অতি পরিচিত হয়ে গেছে। ফলে, হালখাতার মিষ্টির প্যাকেটে এইসব মিষ্টি অঞ্চল বিশেষে তাদের জায়গা করে নেবে এটা ধরে নিতে বেশি কষ্ট করতে হয় না। যে কটা মিষ্টির নাম করা হল, সেগুলো ছাড়াও আরো অনেক মিষ্টি আর তাদের গল্প আছে। বাঙালির নববর্ষ, হালখাতা এবং হালখাতার মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে অনেক সাহিত্যিকের লেখাপত্র আছে।
শ্রীচৈতন্যদেবের সমসাময়িক কবি পরমানন্দ সেন কবিকর্ণপুর বেশ কিছু পুরানো মিষ্টান্নের নাম লিখে গেছেন। হংসকেলি, শোভারিকা, বেণী, চন্দ্রকান্তি, ললিতা হল সেইসব মিষ্টান্ন।
প্রাচীন বাংলাসাহিত্যে পিঠা, পায়েস, ক্ষীর ছাড়া যেসমস্ত মিষ্টির উল্লেখ মেলে, সেগুলি হল, মতিচুর, মোদক (মোয়া), মণ্ডা, খাজা, গজা, ফেনি (বাতাসা), কদমা, লড্ডুক (নাড়ু) ও খাঁড় (খণ্ড)।
প্রহেলক বলে কোনও মিষ্টান্নের কথা কেউ কোথাও লিখে গেছেন কিনা জানি না। তবে প্রহেলক নাম পিঠা তথা মিষ্টান্ন থেকে যে পয়লা কথাটি আসতে পারে, তা বলাই যায়।