ওরা কারা :
সেদিন আমাদের পাড়ার বরখা রাজমিস্ত্রির সহকারি ভজনের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। আমার সঙ্গে ভালোই ভাব। ভজনের জন্ম এই শহরতলীতে এবং এখানেই তার জীবন জীবিকা। ভজনকে বললাম ৫ই জুন পরিবেশ দিবস সন্মন্ধে কিছু জানে কিনা। কেন পালন করা হয়? বিড়ি টানতে টানতে বলল সেটা কি ব্যাপার? কোন নেতার জন্মদিন? কোন বাড়ির উদ্বোধন নাকি! আমাদের কি করতে হবে ওইদিন? খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপার আছে? আসলে এই রকমই ব্যাপার। পরিবেশ দিবস নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিশেষ কোনো তাপ উত্তাপ নেই। আবার যদি কোন গ্রামের কৃষককে বা গ্রামে থাকা কোন রাম বা রহিমকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি হয়ত ইতঃস্তত না করেই বলবেন পরিবেশটা তো বিষিয়ে যাচ্ছে। আগে একরকম পরিবেশ ছিল এখন পরিবেশ পাল্টে যাচ্ছে, দুষিত হয়ে যাচ্ছে। আগে কত পাখি আসত এখন দেখি না, লক্ষী পেঁচা কবে দেখেছি মনে পড়ে না, ধান ক্ষেতে কত রকমের মাছ হত, সড়সড়ে পিঁপড়ে তেমন দেখি না।

আবার যদি শহুরে শিক্ষিত মানুষকে জিজ্ঞেস করলে তাঁরা বলবেন- হ্যাঁ পরিবেশটা খুব দূষিত হয়ে যাচ্ছে। এর জন্য আমাদের লড়তে হবে, প্রতিবাদ মিছিল করতে হবে, মানুষকে সচেতন করতে হবে। অথচ তাঁদের মধ্যে কারুর কারুর ফ্লাট বাড়িতে এসি আছে, ব্যক্তিগত কাজে তেলের গাড়ি চড়েন, অবশ্যই গাড়িতে এসি আছে। লং ড্রাইভেও যান, রাস্তায় বড় নামী ধাবায় কোল্ড বিয়ার ও ম্যকডোনাল্ডেসর সানডুইচ নিয়ে থাকেন। স্টেটাস সিম্বলটাও বজায় রাখতে হবে। তিনি ধূমপান করেন, প্লাস্টিক ব্যবহার করতে সঙ্কোচ বোধ করেন তবে বেশীর ভাগ সময়ে নিয়েই থাকেন। প্রতি রবিবার মুরগীর মাংসের স্টু খান। বাচ্চাদের বাতাস বিশেষ ভরা আলু ভাজা, কুরকুরে কিনে দেন। নিজেও খান। রবিবার পায়জামা পাঞ্জাবী বা হাফ প্যান্ট (বারমুডা) পরে নিজে ড্রাইভ করে বাজার করেন। বিশেষ ব্রান্ডের ২৫ কেজির সরু চালের বস্তাই পছন্দ। টিভির বিজ্ঞাপনের সঙ্গে মিলিয়ে নেন। বাড়িতে আকোয়াগার্ড বসিয়েছেন অনেক দিন আগেই, রাস্তায় বের হলে বোতলের জল কিনে নেন। রান্নাঘরটাকে বেশ কর্পোরেট ধাঁচে সাজিয়েছেন। কি নেই! রান্না ঘরে নানা ধরনের যন্ত্রপাতি চলে। মাইক্রোআভেনও আছে। কিন্ত খাদ্য তালিকাতে তিনি কখনও ভাবেননি যে পরিবেশ দূষণকারী রাসায়নিক সার কীটনাশক দিয়ে চাষ করা ফসল তিনি খাবেন না। সিলেবাসে পরিবেশ বিষয় থাকার জন্য স্কুলের ছাত্র ছাত্রীরা পরীক্ষায় পাশের পড়াটা করে নেয়। আবার কিছু মানুষ বলবেন ওত পরিবেশ পরিবেশ ফাটিও না তো! ওতে আমাদের পেটের ভাত জুটবে! কারখানার শ্রমিক হয়ত বলে বসবেন এই স্পঞ্জ আয়রন কারখানাটা ছিল বলেই পেটের ভাত জুটছে। আগে তো এই জন্মে বাঁচি পরে অন্য কথা। কৃষক বলবেন রাসায়নিক সার বিষ না দিলে কি চাষ হবে? না খেতে পেয়ে মরে যেতে হবে।

দাড়ান, আরো আছে। আরে বাবা পরিবেশের জন্য ভালো ভালো কথা সেমিনারে বলতে হয়; তাই বলে কি নিজে করতে হবে নাকি-এসব কথাও হজম হয়ে যায়। পুকুর বুজিয়ে ফ্লাট করা এখন জলভাত। কিছু মানুষের সহজেই কাড়ি কাড়ি টাকা রোজগার হয়। কংক্রীটের জঙ্গল তেরী হলে পরিবেশতো গরম হবেই। ডোবার কোন অস্তিত নেই। আবার ডেঙ্গি নিয়ে কত বিজ্ঞাপন। ডোবায় জন্মানো মশার লার্ভার সঙ্গে ব্যাঙের খাদ্য-খাদক সম্পর্ক আমরা ভুলে গেলাম, বরং ভুলিয়ে দেওয়া হল। পাঠক ভাবছেন আমি কোন শ্রেনীতে পড়ব!। না, এর মধ্যেও সত্যি পরিবেশ প্রেমী আছে সেটা অন্তর থেকেই। তাঁরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। গঙ্গার নদীকে দূষন মুক্ত রাখা ও বড় বাঁধ দেওয়ার বিরুদ্ধে পরিবেশ বাস্তুকার জ ডি আগরওয়াল ৮৬ বছর বয়েসে ১১১ দিন টানা অনসন করে দেহত্যাগ করেন। বড় মর্মান্তিক ঘটনা, কিন্ত সবাই নির্বিকার।
পরিবেশ দিবসের গুরুত্ব :
পরিবেশ দিবসের সূত্রপাত সেই ১৯৭৪ সালে। সংযুক্ত রাষ্ট্রপুঞ্জ বললেন যে পৃথিবীতে পরিবেশ ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, পরিবেশ দূষিত হয়ে যাচ্ছে সেই জন্য তারা একটা দিন মানুষকে সচেতন করবেন। তারিখটা হল ৫ ই জুন। সেই থেকে বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালিত হয়ে যাচ্ছে। প্রতি বছর একটি করে বিশেষ স্লোগান থাকে । এই বছরের স্লোগান “Only One Earth” একটাই মাত্র পৃথিবী। ১৯৭৪ সালেও ওই স্লোগান ছিল। প্রকৃতির সঙ্গে সামজ্ঞস্য রেখে আমাদের বাঁচতে হবে। আচ্ছা তাতে আমাদের কি করনীয়? আমরা কি করতে পারি? কিন্ত বিজ্ঞাপনে দেখা যায় শুধু লোহার রড আর সিমেন্টের। মনে হয় ও ছাড়া বাড়ি হবে না। কিন্ত ভারতে মাটি, কাঠ, ছিটে বেড়া ও বাঁশের বাড়ি আছে অনেক। সেটাই কিন্ত পরিবেশ বান্ধব। আাবার ওই পাকা বাড়ির জন্য এসি মেসিন লাগবে। সরকারি প্রকল্পে মাটির বাড়ির জন্য অর্থ বরা্দ করা হয় না। এতে খরচ ও কম হয়। অবশ্য কিছু জায়গায় লোহা সিমেন্ট লাগতে পারে। নিয়ামকরা তাঁদের সীমিত বিচার ধারায় লোহা সিমেন্টকেই ঠিক মনে করেন। রাজস্থানের তাপমাত্রা ৪৯ ডিগ্রী হলেও মরুভুমির কাছে থাকা মাটির বাড়িতে কোন অসুবিধা নেই।

রবীন্দ্রনাথের কথায় “যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু/ নিভাইছে তব আলো/ তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ/ তুমি কি বেসেছ ভালো”? যদি মনে করি পরিবেশ দুষন তাহলে ক্ষমা করার প্রশ্ন নেই। অবশ্য রবীন্দ্রনাথ ১৯৪১ সালে, জীবনের অন্তিম প্রান্তে এসে লিখেছিলেন “সভ্যতার সংকট”। পাশ্চাত্য সভ্যতা কি ভাবে আমাদের গ্রাস করেছে এবং তার ফল কি ভয়াবহ সেই নিয়ে আশংকা ব্যক্ত করে ছিলেন। আর আমরা?
আমরা কি দেখছি :
পয়সা থাকলেই আমার গাড়ি কিনছি ২ চাকা বা চার চাকার। প্রয়োজনের থেকে লোভ আর লোক দেখানোটা বেশী। এর জন্য কোন নিয়ন্ত্রন নেই। আমরা ভোগবাদী, অযথা ভোগ্যপন্য কিনছি। বলতে শুরু করেছি এখন এসি ছাড়া বাঁচা যাবে না। আমরা এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি গরম কতটা বেড়ে গেছে। এসি ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বলছি “যা গরম পড়েছে”! এ বছরই ২০২২ সালে এপ্রিল মাসে যা গরম পড়েছে মোটামুটি স্মরণাতীত কালে এত গরম এপ্রিলে পড়েনি। ৪০ ডিগ্রী অনেক জায়গাতেই হয়েছিল। আবার গত বছরটা গরমটা বেশি বোঝা গেল না। ঝড়-ঝাপটা বৃষ্টিতেই কেটে গেল। আমার ভাবছি বিশ্ব উষ্ণায়ন কোথায়, বেশ ঠান্ডা ঠান্ডা। আসলে এটাই বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাব। আবার আমেরিকাতে প্রবল শৈত্য প্রভাব চলেছিল ২০২১ এ। ২০১৯ এর জুলাই মাসে লন্ডনে তাপমাত্রা উঠেছিল ৩৮ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড। ভাবুন অবস্থাটা।
এখনো মেরু প্রদেশ, কানাডার অনেক জায়গাতে প্রায় ৩৮/৩৯ ডিগ্রী তাপমাত্রা পৌঁছে যাচ্ছে। বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে সমুদ্র স্রোতের পরিবর্তন হয়েছে, জলের তাপমাত্রা বেড়েছে, বজ্রপাত বেড়েছে। বৃষ্টিপাত ওলট-পালট হয়ে গিয়েছে, বর্ষার বৃষ্টি মোটামুটিভাবে একটা সমতা থাকছে না, বর্ষার শেষদিকে প্রবল বৃষ্টি হচ্ছে, অসময়ে প্রবল বন্যা হচ্ছে। ফসল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। গত বছরই দেখুন না পৌষ-মাঘ মাসে ধান কাটার সময় প্রবল বৃষ্টি হলো তাতে ধান যেমন নষ্ট হলো আবার আলু ও নষ্ট হলো। আবার আমন মরশুমে এমন বৃষ্টি হয়েছে অনেক জায়গাতে কৃষকরা ধান লাগানো ছেড়ে দিয়েছেন। এমন অনেক জায়গায় ধান রোপন করা যায় নি গতবছর। মানুষের রোগ ভোগও বাড়ছে। ফসলের পুষ্টিও কমে যাচ্ছে। এগুলো মুল প্রভাব আমরা প্রত্যক্ষ করছি। বলা বাহুল্য তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কোভিডের ভয়। বিশ্ব অর্থনীতির পরিবর্তনের জন্য সেটাও একটা পরিকল্পনা এমনটা বলা হচ্ছে।
পরিবেশ ও গাছ :
জঙ্গলের প্রত্যেকটা ছোট বড় গাছ এবং মাটি, অনুজীব ইত্যাদি সবকিছু নিয়েই সংশ্লিষ্ট বাস্তুতন্ত্র তৈরি হতে বহু বছর সময় লাগে। সেখানে তৈরী হয় মাটির জৈব পদার্থ কেঁচো, জীবাণু, ছত্রাক, লাইকেন, গাছে বসবাসকারী বিভিন্ন পরগাছা, লাইকেন, পাখি, সাপ ইঁদুর, জীবাণু, পতঙ্গ আরো কত কি। একটা গাছ কেটে একটা গাছ লাগানো হলে সেটা কি ৫০ বছরের গাছের পরিপূরক হতে পারে? কখনই নয়। কারন একটা ৫০ বছরের গাছের যে বাস্তুতন্ত্রের সঙ্গী ছিল এবং তার প্রভাব এই একটা গাছ লাগিয়ে অবার পূর্ণ করা যাবে না। ছোট গাছটির সেই কাজটা করতে তার আরও ৫০ বছর লাগবে। অবশ্যই বৃক্ষ নিধন বন্ধ করতে হবে, সেই সঙ্গে গাছ লাগাতেই হবে। স্লোগান সর্বস্য হলে চলবে না। আবার সব জায়গায় সব গাছ লাগালে চলবে না।

২০১৯-এ ব্রজিলের আমাজন নদী সংলগ্ন আমাজন জঙ্গলের প্রায় লক্ষ হেক্টর ইচ্ছাকৃতভাবে আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হল। মারা গেল অসংখ্য বন্য প্রাণী। ওখানকার আদিবাসীদের জীবন বিপন্ন হল, বাসস্থানও পুড়ে ছাই হল। এরা প্রকৃতি ধ্বংস না করে জঙ্গল নির্ভর করে শত শত বছর ধরে জীবনধারণ করেছেন। আগুনের গ্রাসে বাস্তুতন্ত্র শেষ হয়ে গেল। মনে করা হচ্ছে কিছু দিন পরেই ওখানে কারখানা তৈরি হবে আর শুয়োরের খাদ্য ভুট্টা চাষ করবে বহুজাতিক সংস্থা। উল্লেখ্য মাংস উৎপাদন করতে প্রচুর জায়গা ও জল লাগে। গাছ কাটা ছাড়াও যুদ্ধ, সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ, কারখানার ও গাড়ির সংখ্যা বৃদ্ধি, নগরায়নের জন্য পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি হয়েছে।

গ্রীন এনার্জীর গল্প :
ইদানীং বলা হচ্ছে বিকল্প বিদ্যুত শক্তির কথা। সৌর শক্তি এর মধ্যে অন্যতম। সোলার প্যানেল ও ইদানিং কালের উইন্ড মিলে তৈরি করতে বেশ কিছু বিরল মৌলের (রেয়ার আর্থ) প্রয়োজন হয় যেমন নিওডারবিয়াম, টেরবিয়াম, ইন্ডিয়াম, ডায়স্পরিয়াম। ওই সব মৌল নিষ্কাশন পদ্ধতি পরিবেশ বান্ধব নয়, পরিবেশ দূষনের বড় কারন। ব্যাপারটা এই রকম এক চিমটে লবন দিয়ে আটা মাখার পর যদি ওই লবনকে আবার বের করে নিয়ে আসার মত। এর জন্য আসিড যুক্ত দ্রবন হাজার হাজার লিটার মাটিতে মেশে। বিকল্পের নামে যা প্রবর্তন করা হচ্ছে, সেটাও পরিবেশবান্ধব নয়। আসলে মানুষকে অতিরিক্ত ভোগবিলাসী জীবনযাত্রা ছাড়তে হবে। সামান্য হলেও কিছু আত্মত্যাগ দরকার।

কৃষি ক্ষেত্রে দূষন :
পরিবেশ দূষণের প্রভাব কৃষিতে পড়েছে দু ভাবে। জীবাশ্ম জ্বালানি দিয়ে তৈরি হয় রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ইত্যাদি। সুতরাং সেই সার কারখানা ও অন্য কারখানা থেকেও দূষণ হচ্ছে। বাতাসে মিশছে কার্বন ডাই অক্সাইড, নাইট্রোজেনের অক্সাইড, মিথেন, ও অনান্য গ্যাস ও মাটিতে যাচ্ছে নানা রাসায়নিক ও আসিড। পরিসংখ্যানে না গিয়েই বলা যায় কলকাতা শহরে হাঁটতে কত কষ্ট হয়। দ্বিতীয়ত এই রাসায়নিক সার এবং কীটনাশক জমিতে দেওয়ার জন্য জমির প্রথমদিকে উৎপাদন বাড়লেও পরের দিকে উৎপাদন কমেছে এবং মাটি দূষিত হয়েছে জল দূষিত হয়েছে। খাবারের মধ্যে সেই কীটনাশক এবং রাসায়নিক দূষণ ছড়িয়ে পড়েছে। মানুষের রোগ বেড়ে গিয়েছে। ক্যানসার তো প্রায় ঘরে ঘরে। জিগিরতোলা হয়েছিল ওটা ছাড়া যেন কৃষি কাজ হবেনা মানুষ খেতে পাবে না। আসলে পুঁজি ভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় সেখানে কৃষিক্ষেত্র কেন চিকিৎসাক্ষেত্র, বসবাস, শিক্ষাব্যবস্থা সবটাতেই নিয়ামক ও তার সহযোগীরা মুনাফা খুঁজছেন। কিছু মানুষের মুনাফা হচ্ছে তাতে পরিবেশ চুলোয় যাক। এই পরিবেশ দূষণের কারণে অর্থাৎ আবহাওয়া পরিবর্তনের জন্য ফসল উৎপাদন কমেছে, ফসলের পুষ্টিগত মান কমে গিয়েছে এবং অনেক জায়গায় অনেক ফসলের চাষ করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই এখন বলছে কৃত্রিমভাবে খাদ্য তৈরি করতে হবে, কৃত্রিমভাবে তৈরি হবে দুধ ও মাংস। উদ্ভট ভাবনা । সেটা কখনোই প্রাকৃতিক খাবারের সমকক্ষ হতে পারে না।
সুমদ্রতটের মানুষ ও সুন্দরবনের অবস্থা :
এখন সমুদ্রের জল বাড়েছে তাই নদীর তীরবর্তী জায়গায়ও জল বেড়েছে। যে জায়গায় জোয়ারের জল উঠত না সেখানেও এখন জল চলে আসছে। ওখানকার মানুষের ইকোলজিক্যাল ফুটপ্রিন্ট খুবই সামান্য, তাঁদের পরিবেশ দূষণ করার মত কিছুই তাঁদের কাছে নেই। না আছে গাড়ী, না আছে এয়ারকন্ডিশন। উড়োজাহাজেও যাতায়াত করেন না। তাঁরা প্রচুর জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার করছেন তাও নয়। অথচ কলকারখানা, মানুষের বর্ধিত ভোগ- বিলাসিতা ও লোভ, যুদ্ধ, নগরায়ন ও শহুরে মানুষের ভোগ বিলাসী জীবন যাপনের জন্য জন্য এই পৃথিবী উত্তপ্ত হচ্ছে, দূষণ হচ্ছে, জলতল বেড়ে যাচ্ছে, মেরু অঞ্চলের বরফ হু হু করে গলে যাচ্ছে। নদীর তীরে ৫০ বছর ধরে বসবাস কারী মানুষ ঘরবাড়ি সরিয়ে নিয়ে আসতে বাধ্য হচ্ছেন। ঘোড়ামারা দ্বীপের অনেক অংশই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গিয়েছে। ইকোসিস্টেম উদ্বাস্তুর সংখ্যা কিন্তু বাড়ছে। কৃষি কাজে অনেক ঝুঁকি, অনিশ্চয়তা আছে। মানুষ এখন জনমজুর খেটে বেশী আয় করছে। কিন্ত কৃষি ব্যবস্থাকে কতটা মজবুত করা যায়, বেশী লাভদায়ক করা যায়, পরিবেশ বান্ধব ও টেকসই করা ও কৃষিকাজকে উৎসাহিত করা নিয়ে কারুর মাথাব্যাথা নেই। কৃষি থেকে সরে আসছেন বহু মানুষ। অনেক গ্রামে পুরুষশূন্য হয়ে যাচ্ছে। নিজের জমি, নিজের গ্রাম ছেড়ে ভিন রাজ্যে চলে যাচ্ছেন জনমজুর খাটতে। শহরে বিভিন্ন নির্মান কাজে ও কারখানার কাজে যুক্ত হচ্ছেন। অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা কৃষি কাজের বিপক্ষে, ডেমোগ্রাফিক ট্রানজিসানের পক্ষে। তাঁরা শহরকে ভালো করা, কারখানা তৈরীকে অনেক বেশী কার্যকরী মনে করেন। কৃষককে শ্রমিকে পরিনত করাই তাঁদের উদ্দেশ্য।

বিশ্ব বানিজ্য চুক্তিতে স্বাক্ষর, রাসায়নিক কৃষি ব্যবস্থাপনা ও বিশ্ব উষ্ণায়ন কৃষক উচ্ছেদ প্রক্রিয়াকে তরান্বিত করছে। গান্ধীজি বলেছিলেন ভারতের গ্রামগুলোকে সঠিক ভাবে গড়ে তুলতে যাতে কুটির শিল্পের পুনরুদ্ধার হয়, কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা গ্রামের সম্পদের ব্যবহার করে হয়, খাদ্য প্রকিয়াকরন ইত্যাদি হয়। এর উদ্দেশ্য গ্রামের মানুষের একটা সম্মান জনক কর্মসংস্থান হয় গ্রাম থেকে শহরে মানুষকে চলে না যেতে হয়। কিন্ত সেই দিকে কেউ আলোক পাত করেনি। এখন সবাই শহরে বাস করতে চায়। ওখানে থাকাই যেন মোক্ষলাভ। টিভি বা খবরের কাগজে শহরের ফ্লাটের মনমোহিনী বিজ্ঞাপন থাকে। কিছু বিবাহিত পুরুষ কেরালা বা ভিন রাজ্যে শ্রম দিতে গিয়ে ওখানেই পুনঃবিবাহ করছেন। এখানে আর আসতে চাইছেন না। এখানে বসবাসকারী পরিবার এক জটিল সমস্যায় পড়ছেন। জমি থাকা সত্বেও চাষ করার লোক নেই। প্রায় পুরুষ শূন্য গ্রামে মেয়ে পাচার চক্র সক্রিয় হচ্ছে। এক জটিল আর্থসামাজিক বৈষম্যে ভুগছে বিভিন্ন গ্রাম। ফলত সামাজিক অবক্ষয় শুরু হয়েছে। সুন্দরবন অত্যন্ত পরিবেশ সংবেদনশীল জায়গা। আবহাওয়ার খামখেয়ালীপনায় অন্য জায়গার থেকে বেশী ক্ষয়ক্ষতি হয়, কৃষি ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। রুজি রোজগারের জন্য মানুষ চলে যাচ্ছে ভিন রাজ্যে। হিঙ্গলগজ্ঞের কৃষকদের নিয়ে নেবুখালি থেকে বাস এখন সরাসরি চেন্নাই যায়। ঝাড়খন্ডের কিছু জায়গায়ও এই ব্যবস্থা শুরু হয়েছে। এটা যথেষ্ট উদ্বেগজনক। সুন্দরবন নিয়ে প্রচুর রিপোর্ট লেখা হয় । কিন্তু আজকে সুন্দরবন যে ধীরে ধীরে বসবাসের অযোগ্য হয়ে যাচ্ছে সেই উদ্বেগের কথা মেইনস্ট্রিম আলোচনায় ঠাঁই পায় না।

আমার কি করতে পারি :
যদি কল্পনা করা হয়, গরিব দেশগুলির সবাই তথা কথিত উন্নত দেশগুলির মত উন্নত হয়ে যায়, সেই সঙ্গে ভোগ–লালসাও বেড়ে যায়, তা হলে কেমন হয়! চীনের ১৩০ কোটি মানুষ যদি আমেরিকার মত ভোগবিলাসী জীবন যাপন শুরু করে তাহলে পৃথিবীর অবস্থা কি হবে সহজেই অনুমেয়। সহজ কথায় এক জন আমেরিকান একজন ভারতীয় থেকে ৩ গুন বেশী ভোগবাদী।
ভবিষৎ প্রজন্মের কথা ভেবে পরিবেশের প্রতি সামান্য আন্তরিক হলেই চলবে। জৈব খাবার খাওয়া, মাংস খাওয়া কমানো, প্লাস্টিকের জলের বোতল ও প্লাস্টিক ব্যবহার না করা বা সীমিত, পরিবেশ আন্দোলনের সঙ্গে নিজেকে সংযুক্ত ও সংপৃক্ত করা। সর্বোপরি আমাদের ভোগ ও লালসা কমাতে হবে। আসুন না এই পৃথিবীটাকে নবজাতকের জন্য বাসযোগ্য করে রখার চেষ্টা করি।
লেখক : জৈব কৃষি ও কৃষকের সমর্থক। anupampaul99@gmail.com
খুব সুন্দর লেখা স্যার, আপার কাছে থেকেই শিখেছি কিভাবে সহজ ভাবে, প্রকৃতির সাথে বাঁচা যায়। গ্রামের ভালো ভাবে বাঁচা যায়। শহরে বাড়ি করার ইদুর দৌড়ে পা দেইনি।।