পশ্চিমবঙ্গের করোনা পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষক দলের পর্যবেক্ষণের শেষ নেই। এই রাজ্যে কেন্দ্রীয় দলের প্রথম আগমন হল ২০ এপ্রিল, দুটো দলে বিভক্ত হয়ে। মে মাসের প্রথম সপ্তাহে দ্বিতীয় কেন্দ্রীয় দলটি এল। পরের সপ্তাহে পশ্চিমবঙ্গ-সহ দশটি রাজ্যে আরো একটি কেন্দ্রীয় দল পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিল কেন্দ্রীয় সরকার। দ্বিতীয় ও তৃতীয় কেন্দ্রীয় দলকে কেন্দ্র করে বিতর্ক হয় নি। প্রথম পর্যবেক্ষক দলের কাজ নিয়ে বিতর্ক ও কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কে তিক্ততার সৃষ্টি হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গ সরকার অভিযোগ করেছে, রাজ্যকে রাজনৈতিকভাবে অপদস্থ করতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক পর্যবেক্ষক দল পাঠিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ২০ এপ্রিল তারিখে চিঠি লিখে তাঁর তীব্র আপত্তির কথা জানান। পর্যবেক্ষক দলটি দুটো আলাদা দলে বিভক্ত হয়ে যায়। একটি দলের নেতৃত্বে ছিলেন কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রকের অতিরিক্ত সচিব (বর্তমান বিশেষ সচিব) অপূর্ব চন্দ্র। এই দলটি কলকাতা, হাওড়া, পূর্ব মেদিনীপুর ও উত্তর ২৪ পরগণা জেলাগুলিতে গিয়েছিল। অন্য দলটির নেতৃত্বে ছিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের অতিরিক্ত সচিব বিনীত যোশি। এই দলটি উত্তরবঙ্গের তিনটি জেলাতে গিয়েছিল—দার্জিলিং, কালিম্পং এবং জলপাইগুড়ি। করোনা সংকট বিশ্ব সংকট। সমগ্র মানবজাতির অস্তিত্বের লড়াই। সমস্ত রাষ্ট্রকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করতে হবে। আমাদের দেশে কেন্দ্রীয় সরকার ও বিভিন্ন রাজ্য সরকার সাধ্যমতো লড়াই করছে। এখন বিশেষভাবে দরকার কেন্দ্র-রাজ্য ও বিভিন্ন রাজ্য সরকারের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা এবং নির্ভরশীলতা। রাজ্যকে পরামর্শ দিতে ও সাহায্য করতে কেন্দ্রীয় দল আসতেই পারে, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সাধারণ মানুষের মনে কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষক দল-দুটির আসল উদ্দেশ্য নিয়ে বিভ্রান্তি ও সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে। লকডাউনের মধ্যে আমি অনেকের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছি—আমার প্রাক্তন সহকর্মী, প্রাক্তন ছাত্রছাত্রী (যাঁরা বিভিন্ন দায়িত্বশীল পদে আছেন) এবং বিভিন্ন পেশার সঙ্গে যুক্ত মানুষ। এঁরা অধিকাংশই প্রত্যক্ষ রাজনীতির বাইরের মানুষ। প্রায় সকলেই কেন্দ্রীয় দলের উদ্দেশ্য নিয়ে উদ্বেগ ও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন এবং যে কারণগুলি ব্যক্ত করেছেন, আমি একমত। কারণগুলি সংক্ষেপে বিবৃত করা হল—
১। প্রশাসনিক শিষ্টতার প্রশ্ন। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্টমন্ত্রী দুপুর একটার সময় (২০ এপ্রিল) মুখ্যমন্ত্রীকে ফোন করে পর্যবেক্ষক দলের (যার পোশাকি নাম হচ্ছে ইন্টার মিনিস্ট্রিয়াল সেন্ট্রাল টিম) আসার কথা জানান। অথচ প্রায় তিন ঘণ্টা আগে সকাল দশটা দশ মিনিটে একটি টিম বিশেষ বিমানে কলকাতায় নামে, অপর টিমটি একই বিমানে উত্তরবঙ্গের দিকে রওনা দেয়। টিমটি কলকাতায় নামবার মাত্র পনেরো মিনিট আগে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক থেকে রাজ্যের মুখ্যসচিবকে ফোনে জানানো হয়। এটা কোন ধরণের প্রশাসনিক শিষ্টতা? যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় কোনও রাজ্য সরকারের সঙ্গে কেন্দ্রের এই ধরণের আচরণ আপত্তিজনক।
২। কেন্দ্রীয় পরিদর্শক দল রাজ্যে এলে তাদের থাকা-খাওয়া, যাতায়াত ইত্যাদির বন্দোবস্ত রাজ্য সরকারই করে থাকে। একটি ব্যতিক্রমী ঘটনার কথা মনে পড়ছে। নব্বই দশকে দক্ষিণ ২৪ পরগণার আইন-শৃঙ্খলার অবস্থা দেখতে অতিরিক্ত কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব ড. সেনয়ের নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের একটি টিম পশ্চিমবঙ্গে এসেছিল। রাজ্যসরকার এই পরিদর্শক দলের জন্য নিরাপত্তা, গাড়ি, থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করতে অস্বীকার করে। অবশেষে কেন্দ্রীয় সংরক্ষিত পুলিশ বলকে (সি.আর.পি.এফ) প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করতে হয়েছিল। এমনকি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী পরিদর্শক দলটির সঙ্গে দেখা করেন নি। কিন্তু এখানে পরিস্থিতি অন্যরকম। রাজ্যকে অন্ধকারে রেখে পর্যবেক্ষক দল দুটি বিএসএফ (সীমান্ত নিরাপত্তা বল) এবং এসএসবি-র (বিশেষ নিরাপত্তা ব্যুরো) সাহায্য নিয়ে ঘুরে বেড়াতে আরম্ভ করলেন। বিষয়টি পরিষ্কার—রাজ্য সরকারের প্রতি অবিশ্বাস। এই সন্দেহ ও বিশ্বাসহীনতার মনোভাব নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক স্তরের সংকটের মোকাবিলা করা কী সম্ভব?
৩। কেন্দ্রীয় পরিদর্শক দল তাঁদের কর্মসূচী রাজ্যকে জানালো না। রাজ্যের আধিকারিকদের বক্তব্য ও সমস্যা জানা হল না। কার্যত রাজ্য সরকারের সঙ্গে আলোচনা করার ইচ্ছে তাদের ছিল না। অথচ ২২ এপ্রিল কলকাতায় থাকা দলের প্রধান অপূর্ব চন্দ্র কলকাতায় বিএসএফের অতিথিশালা থেকে রাজ্যের মুখ্য সচিবকে চিঠি লিখে রাজ্যের কাছ থেকে কী কী তথ্য চান এবং কোন কোন জায়গা পরিদর্শনে যেতে চান, তা জানিয়েছিলেন। এই চিঠির কোনও প্রয়োজন ছিল না, যদি কলকাতায় আসবার আগে কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকরা রাজ্য সরকারের সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের সঙ্গে আলোচনা করে নিতেন। তারপর একটার পর একটা পত্রবোমা। রাজ্য সহযোগিতা করছে না। সহযোগিতার ক্ষেত্রটাই তৈরী হল কোথায়? কেন্দ্রীয় দলের আসবার পরের দিনই মুখ্যসচিব বিএসএফের অতিথিশালায় গিয়ে অপূর্ববাবুর সঙ্গে দেখা করেন। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যসচিবকে লেখা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব অজয় ভাল্লার (২২ এপ্রিল) চিঠিতে স্পষ্ট হুমকি, ভাষার মধ্যেও কিছুটা শালিনতার অভাব রয়েছে। যেন অধস্তন রাজকর্মচারীকে কড়া নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। ভাল্লা সাহেবের অবশ্যই মনে থাকার কথা কেন্দ্রের স্বরাষ্ট্রসচিব ও রাজ্যের মুখ্যসচিবের সরকারি পদমর্যাদা সমান।
৪। কিসের ভিত্তিতে পরিদর্শন-স্থল ঠিক হল এবং পশ্চিমবঙ্গকে বেছে নেওয়া হল? ২০ এপ্রিল কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষক দল কলকাতায় এল। ওই একই দিনে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রক জানায়, কালিম্পং জেলায় করোনা আক্রান্ত হওয়ার খবর শেষ পাওয়া যায় ২ এপ্রিল এবং জলপাইগুড়ি জেলায় ৪ এপ্রিল। তবে পরিদর্শনের জন্য এই দুটি জেলাকে কেন রাখা হল? ২০ এপ্রিল তারিখে সমগ্র দেশের করোনা তালিকায় পশ্চিমবঙ্গের স্থান ছিল ১৩ নম্বরে, ৩ নম্বরে গুজরাত এবং ৭ নম্বরে উত্তরপ্রদেশ, শেষ দুটি বিজেপি শাসিত রাজ্য। পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে মহারাষ্ট্রে দুটি, রাজস্থানে একটি এবং মধ্যপ্রদেশে একটি কেন্দ্রীয় দল পাঠানো হল। প্রথম তিনটি রাজ্য অবিজেপি শাসিত। মধ্যপ্রদেশে সম্প্রতি পট পরিবর্তন হয়েছে, বিজেপি সরকার গঠিত হয়েছে। তাই দোষ-ত্রুটির দায় পূর্বতন কংগ্রেস সরকারের উপর চাপানো সহজ হবে। কেন্দ্রীয় সরকারের অভিসন্ধি পরিষ্কার। অবশ্য বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি হওয়ার ফলে গুজরাত ও উত্তরপ্রদেশে কেন্দ্রীয় দল পাঠানো হয়েছিল।
৫। শুধু অভিযোগ এবং দোষ-ত্রুটি ধরার মরিয়া চেষ্টা। রাজ্যকে সাহায্য করার কোনও চেষ্টাই নেই। কেন্দ্রীয় দলের পশ্চিমবঙ্গে আগমনের পরের দিনের সরকারি তথ্য অনুযায়ী রাজ্য সরকার কেন্দ্রের কাছে ১৪ হাজার কিট চাইলেও কেন্দ্র পাঠিয়েছে মাত্র আড়াই হাজার। রাজ্য ৪ লক্ষ ১৯ হাজার পিপিই বিতরণ করেছে। কেন্দ্র পাঠিয়েছে মাত্র ৭ হাজার। আবার অধিকাংশ কিট ত্রুটিপূর্ণ ছিল বলে অভিযোগ। করোনা পরিস্থিতির মধ্যে রাজ্য সরকার কেন্দ্রের কাছে রাজ্যের বকেয়া টাকা (সম্ভবত ৬১ হাজার কোটি টাকা) পাঠানোর দাবি করেছিল। এইসব সমস্যার সমাধানে কেন্দ্রীয় দল কী ভূমিকা নিয়েছে? সব শেষে বলি লকডাউন কার্যকর করার দায়িত্ব রাজ্য সরকারের, কেন্দ্রের নয়।
কেন্দ্রীয় দল পাঠানো এবং তাদের ভূমিকা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। কেন্দ্রীয় সরকারের একদেশদর্শি মনোভাবের প্রতিফলন। কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের উপর এর প্রতিক্রিয়া সুদূরপ্রসারী হতে বাধ্য। এ-ছাড়া এই জাতীয় সংকটে কেন্দ্রের এই ভূমিকা জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী।