রঙ্গমঞ্চের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক নিয়ে যেরকম বিস্তৃত কাজ হয়েছে, সিনেমা বিষয়ে ততটা হয়নি। ১৯১৮ সালে বাংলা কাহিনিচিত্র ‘বিল্বমঙ্গল’ মুক্তি পেয়েছিল। প্রচলিত গল্প এবং গিরিশচন্দ্রের নাটক ‘বিল্বমঙ্গল’ অবলম্বনে ম্যাডান থিয়েটারের প্রযোজনায় ‘বিল্বমঙ্গল’ ফিল্ম নির্মাণ হয়। কিন্তু ‘বিল্বমঙ্গল’ ছবির পরিচালক রুস্তমজি ধোতিওয়ালা প্রথমে রবীন্দ্রনাথের ‘বিসর্জন’ নাটক অবলম্বনে ছবি নির্মাণেই উদ্যোগী হয়েছিলেন। তিনি দেখা করেন ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়র সঙ্গে। ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় বা ডিজি ছিলেন রবীন্দ্রনাথের স্নেহধন্য। তিনি কিছুটা টালবাহানাই করেন। কারণ ডিজির ইচ্ছা ছিল ‘বিসর্জন’ করবেন তিনি নিজে। ফলে রুস্তমজি বিল্বমঙ্গল নিয়ে কাজ শুরু করে দেন।
১৯২৫-২৬ সাল নাগাদ তাজমহল ফিল্ম কোম্পানির দায়িত্বভার গ্রহণ করেন নাট্যাচার্য শিশিরকুমার। প্রখ্যাত রবীন্দ্র-জীবনীকার প্রশান্তকুমার পাল দেখিয়েছেন, শিশিরকুমার বিশ্বভারতীকে ৩০,০০০ টাকা দিয়ে বিসর্জন-এর স্বত্ব কেনেন। এই সময় শিশিরকুমার উদ্যোগী হন আরও কয়েকটি রবীন্দ্রনাটকের চিত্রগ্রহণ করতে। শিশিরকুমার রবীন্দ্রনাটকের চিত্রগ্রহণ চেয়েছিলেন না কি ফিল্ম নির্মাণে এগিয়েছিলেন, সেই বিষয় নিয়ে এখনও ধোঁয়াশা যথেষ্ট।
অথচ ১৯২৮ সালের ২৩ ডিসেম্বর হাতিবাগানের ক্রাউন থিয়েটার, যেটি পরবর্তীকালে উত্তরা নামে পরিচিত হয়, সেই প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেলো রবীন্দ্রনাটকনির্ভর ‘বিসর্জন’। আনন্দবাজারের বিজ্ঞাপন অনুসরণ করে বলা যায়, ‘বিসর্জন’ ছবিটি নির্মাণ করেছিলেন তৎকালীন বম্বের ওরিয়েন্ট পিকচার্স কোম্পানি। ডিস্ট্রিবিউশনের দায়িত্বে ছিল ম্যাডান কোম্পানি। ওরিয়েন্ট পিকচার্স-এর পক্ষে ছবিটি পরিচালনা করেছিলেন দুই পার্শি ভদ্রলোক— নাভাল গান্ধী এবং জামশেদ রত্নাকর। তবে কবি এই ছবি দেখেছিলেন কি না সে বিষয় স্পষ্ট জানা যায় না।

এখানে দুটো বিষয় উল্লেখ করা দরকার। বাংলা নির্বাক কাহিনিচিত্রের যখন চার বছর বয়স তখনই তাজমহল ফিল্ম কোম্পানির উদ্যোগে রবীন্দ্রনাথের ছোটোগল্প ‘মানভঞ্জন’ অবলম্বনে একটি ছবি নির্মাণ করা হয়, যে ছবি পরিচালনা করেছিলেন ডিজি, অর্থাৎ ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়। ‘মানভঞ্জন’ মুক্তি পেয়েছিল ১৯২৩ সালের ১৮ জুন। তৎকালীন কর্নওয়ালিস থিয়েটার, যেটা পরবর্তীকালে শ্রী থিয়েটার নামে পরিচিত হয়, সেখানে ‘মানভঞ্জন’ মুক্তি পেয়েছিল। রবীন্দ্রনাথের গল্পের সঙ্গে যাঁরা পরিচিত, তাঁদের মনে পড়বে, মানভঞ্জন আসলে থিয়েটারের গল্প। ফলে এই ছবিটির সঙ্গে জড়িয়ে গেলো রবীন্দ্রকাহিনি তো বটেই, সেই সঙ্গে সাধারণ রঙ্গমঞ্চও। এই ছবিতে অভিনয় করেছিলেন সে সময়ের রোমাঞ্চ সৃষ্টিকারী নায়ক দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়।
তৎকালীন বোম্বাইতেও দুটি ভাষায় ‘বিসর্জন’ নির্মিত হয়। এই সময়ই শিশিরকুমারের ভাই ও বিখ্যাত অভিনেতা মুরারিকুমার ভাদুড়ীকে রবীন্দ্রনাথ লেখেন— ‘আমার বিশ্বাস, ছায়াচিত্রকে অবলম্বন করেই যে নতুন কলারূপের আবির্ভাব প্রত্যাশা করা যায়, এখনো তার শিল্পরূপ দেখা যায়নি…। ছায়াচিত্র এখনো পর্যন্ত সাহিত্যের চাটুবৃত্তি করে চলেছে— তার কারণ, কোনো রূপকার আপন প্রতিভাবলে তাকে এই দাসত্ব থেকে উদ্ধার করতে পারেনি।’
ইতিমধ্যে ‘বিচারক’ ছবিটি মুক্তি পেলো। এই ছবিতে ভাদুড়ী পরিবার থেকে অভিনয় করেছিলেন শিশিরকুমার, তাঁর দুই ভাই তারাকুমার ভাদুড়ী এবং বিশ্বনাথ ভাদুড়ী। ক্ষীরোদার ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন শিশির-ছাত্রী কঙ্কাবতী। এর পর রবীন্দ্রকাহিনি অবলম্বনে ‘গিরিবালা’ নির্মাণ করেন মধু বসু। ১৯৩০ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি বক্স-এ বসে ‘গিরিবালা’ ছবিটি দেখে সন্তোষ প্রকাশ করেন রবীন্দ্রনাথ।
১৯৩০ সালের ১১ সেপ্টেম্বর কবি পৌঁছোলেন তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন। এর আগে কবি যখন জার্মানিতে ছিলেন সে সময় রাশিয়ার সংস্কৃতিমন্ত্রী আনাতোল লুনাচারস্কি তাঁকে সোভিয়েত সিনেমা দেখতে আমন্ত্রণ জানান। ১৯৩০ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর কবি দেখেন ‘ব্যাটলশিপ পোটেমকিন’। আইজেনস্টাইন সে সময় রাশিয়ায় ছিলেন না, ফলে তাঁর স্ত্রী পেরা আন্তাকোভা কবির পাশে বসেছিলেন। আন্তাকোভা তাঁর স্মৃতিকথায় জানিয়েছেন, ‘ওডেসা স্টেপ্স’-এর দৃশ্য দেখে কবি থরথর করে কাঁপছিলেন। এই ছবির ভূয়সী প্রশংসা করেন কবি। সে অর্থে ওয়ার্ল্ড সিনেমার মাস্টারপিসের সঙ্গে কবির পরিচয় আইজেনস্টাইনের হাত ধরে। অতি ব্যস্ত কর্মসূচির মধ্যেও ‘ব্যাটলশিপ পোটেমকিন’ দেখেন রবীন্দ্রনাথ।
এদিকে হলিউডও তো ক্রমশ বড়ো আকার নিচ্ছে। সে সময় হলিউডের বেশ কিছু ছবি দেখে কবির মনে হয়েছিল, জাতি বিদ্বেষের ফলে ভারতীয়দের অত্যন্ত কুৎসিত এবং বিকৃতভাবে দেখানো হচ্ছিল।
বম্বে টকিজের কর্ণধার হিমাংশু রায়ের ‘দ্য লাইট অব এশিয়া’ ছবিটি তিনি দেখেন এবং অকপটে তাঁর ভালো লাগার কথা বলেন। এর পর ‘নটির পূজা’তে কবি অভিনয় করেন। সম্ভবত ‘নটির পূজা’র তিনটি ভার্সান হয়েছিল। সৌরীন্দ্রমোহন ঠাকুরের নাতি অবনীমোহন ঠাকুর একটি আর্ট সিন্ডিকেট চালু করেন। তাঁরাই ‘নটির পূজা’র মঞ্চ ভার্সানটি ক্যামেরায় তোলেন, যেটা পরে দেখা যাবে সত্যজিৎ রায়র তথ্যচিত্রে। এখানে রবীন্দ্রনাথ উপালির ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন।
১৯৩৫ সালে নিউ থিয়েটার্স প্রযোজিত ‘মুক্তি’ ছবিতেও রবীন্দ্রনাথ রয়েছেন। এই ছবিতে প্রথম রবীন্দ্রসংগীত ব্যবহার করা হলো। সে সময়ের সুপারস্টার কানন দেবীর গলায় ‘আজ সবার রঙে রঙ মিশাতে হবে’ গানটি দারুণ জনপ্রিয় হয়। অন্য দিকে পঙ্কজ কুমার মল্লিকের গলায় ‘দিনের শেষে ঘুমের দেশে’ গানটি তো আজ কিংবদন্তির চেয়েও বেশি কিছু হয়ে উঠেছে বাঙালির আধুনিক সাংস্কৃতিক পরিসরে। ১৯৩২ সালে প্রেমাঙ্কুর আতর্থী এবং ১৯৫৬ সালে দেবকীকুমার বসুর পরিচালনায় ‘চিরকুমার সভা’— এই রবীন্দ্রনাটক থেকে ফিল্ম নির্মাণ হয়। দেবকী বসুর ছবিতে অভিনয় করেছিলেন উত্তমকুমার।
সত্যজিৎ রায়ের স্ত্রী বিজয়া রায় ‘শেষ রক্ষা’য় অভিনয় করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের শতবর্ষে (১৯৬১ সালে) ‘তিন কন্যা’ নির্মাণ করেন সত্যজিৎ রায়। এছাড়া ‘রবীন্দ্রনাথ’ শিরোনামে একটি তথ্যচিত্রও সত্যজিৎ নির্মাণ করেন। ১৯৬৪ সালে নির্মিত হয় রবীন্দ্রনাথের ‘নষ্ট নীড়’ গল্প অবলম্বনে সত্যজিৎ রায়ের ‘চারুলতা’। পরবর্তীকালে ‘ঘরে বাইরে’ উপন্যাস অবলম্বনেও ছবি করেছেন সত্যজিৎবাবু। ঋত্বিক ঘটকের প্রায় প্রত্যেকটি ছবিতে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আছেন রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথের কবিতা-গদ্য ফিল্মের সংলাপে অবলীলাক্রমে ব্যবহার করেছেন ঋত্বিক। এ ছাড়া মৃণাল সেনের ‘ইচ্ছাপূরণ’ পূর্ণেন্দু পত্রীর ‘স্ত্রীর পত্র’, ‘মালঞ্চ’, অরুন্ধতী দেবীর ‘মেঘ ও রৌদ্র’ এবং তপন সিংহের ‘কাবুলিওয়ালা’, ‘ক্ষুধিত পাষাণ’, ‘অতিথি’— এই ছবিগুলির কথাও বলা দরকার। ১৯৯৭ সালে রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস ‘চার অধ্যায়’ নিয়ে ছবি করেন কুমার সাহানি। এ ছাড়া ঋতুপর্ণ ঘোষের ‘চোখের বালি’, ‘নৌকাডুবি’ উল্লেখযোগ্য।