হরিসাধন মুখোপাধ্যায়ের ‘কলিকাতা সেকালের ও একালের’ বইটি থেকে জানতে পারছি, ১৭৮৫ খ্রিস্টাব্দের ৯ জুন বিজ্ঞপ্তি মারফত কলকাতা শহরকে ৩১টি থানায় ভাগ করা হয়। সাহেব পল্লিতে ৭টি থানা ও দেশীয় পল্লিতে ২৪টি থানা।
ওয়ারেন হেস্টিংসের সেই আমলে কলকাতা শহরের থানাগুলির নাম উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক হবে বলেই মনে হয়, — আর্মেনিয়াম চার্চ, ওল্ড ফোর্ট, চাঁদপাল ঘাট, লালদীঘির দক্ষিণ দিক, ধর্মতলা, ওল্ড কোর্ট হাউস, ডোমতলা, আমড়াগলি-পঞ্চাননতলা, চিনাবাজার, চাঁদনিচক, তুরুলবাজার, গৌমাপুকুর, চড়কডাঙা, শিমলাবাজার, নুনলঙ্কাবাজার, মলঙ্গাপটলডাঙা, কুবেরডাঙা, বৈঠকখানা, শ্যামপুকুর, শ্যামবাজার, পদ্মপুকুর, কুমারটুলি, জোড়াসাঁকো, মেছুয়াবাজার, জানবাজার, ডিঙাভাঙা, সুতানুটি-হাটখোলা, দয়েহাটা, হাঁসপুকুরিয়া, কলিঙ্গা, জোড়াবাজার। হরিসাধন মুখোপাধ্যা বলেছেন — এর মধ্যে কয়েকটি থানা ভবিষ্যতের মিউনিসিপ্যালিটির ম্যাপ থেকে বিলুপ্ত হয়েছে। যথা তুরুলবাজার, নুন-লঙ্কাবাজার, ডোমতলা, গৌমাপুকুর ও কুবেরডাঙা। জায়গাগুলির অবস্থান নির্ণয়ও অধুনা দুঃসাধ্য৷
যতই অবাক হই না কেন, একথা মানতেই হবে যে কুবেরডাঙা বলে একটি জায়গা খোদ কলকাতার বুকে বিদ্যমান ছিল। এখনকার কলকাতায় রুবি হাসপাতালের কাছে কবরডাঙা খুঁজে পাওয়া যায়, কলকাতার উপকণ্ঠে গোবরডাঙা আছে, তবে কুবেরডাঙার চিহ্ন নেই।
তবে বঙ্গে কুবের-যুক্ত স্থাননাম আছে। উত্তর চব্বিশ পরগনার বারাসাত মহুকুমার বারাসাত এক নম্বর ব্লকের কদম্বগাছির বাদুর কাছে কুবেরপুর নামে একটি স্থানের দেখা মেলে। জায়গাটি কালীমন্দিরের জন্যে বিখ্যাত, নাম মহাকালীতলা। এখানকার কালীপ্রতিমাকে ছোট মা পাষাণী বলে ডাকা হয়।
মধ্যমগ্রাম চার মাথার মোড় থেকে বাদু যাওয়ার রাস্তা দিয়ে গিয়ে কুবেরপুর মহাকালীতলা যাওয়া যায়। মহাকালীতলায় এক নিঝুম পরিবেশে পাশাপাশি দুটো মন্দির। একটি বড় দালান রীতির, অন্যটি ছোট। দুটি মন্দিরেই রয়েছেন দুই জাগ্রত কালী।
বড় মন্দিরটির কালীমাতাকে বলা হয় বড় মা মুক্তকেশী। এটি মৃন্ময়ী মূর্তি। তিনি চতুর্ভুজা, আলুলায়িতকেশ, ছাপার শাড়ি পরা, পদতলে মহাকাল, এক হাতে খড়্গ, এক হাতে মুন্ডু। প্রতি বছর অঙ্গরাগ করা হয়। মায়ের মৃন্ময়ী মূর্তি বদল করা হয় না। খুব নিষ্ঠার সঙ্গে পুষ্পাঞ্জলি হয়।
ছোট মন্দিরের মাকে বলা হয় ছোট মা। চতুর্ভুজা, এলোকেশী, বস্ত্র পরিহিতা। আগে ছাগ বলি হত, কিন্তু এখন বলি আর হয় না। এখন আখ বলি, চালকুমড়ো বলি হয়। ছোট মা পাথরের তৈরী, তাই নাম পাষাণী।
কুবেরপুর কালী বাড়ির প্রধান পুরোহিত মহারাজ সোমনাথ ব্রহ্মচারীর মতে মা কাউকে খালি হাতে ফেরান না। সকলের সকল মনোবাঞ্ছা তিনি পূর্ণ করেন। নদিয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র এই কুবেরপুর কালী মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। প্রায় ৪০০ বছরেরও বেশি প্রাচীন ঐ কালীবাড়িতে পুজো দিতে দূর দূরান্ত থেকে ভক্ত সমাগম হয়, চড়ক পুজোর সময় বসে এক বিশাল মেলা।
আবার নদীয়ার নাকাশিপাড়া ব্লকে আছে কুবেরনগর নামে একটি জায়গা। অথচ কুবেরের কোনও মন্দির খুঁজে পাওয়া যায় না এখানে।
প্রাচীন স্থাননামে কুবেরের উল্লেখ করা হয়েছে মানে, কুবের এসব জায়গায় পূজিত হতেন কোনও না কোনও সময়।
পাথরপ্রতিমার কাছে একটি টেরাকোটামণ্ডিত কুবেরমন্দির আছে বলে শুনেছি। তবে সত্যাসত্য জানি না।
কোনও এক বিদ্বেষের বশে বঙ্গীয় আস্তিকগণ কুবেরের পূজা একসময় বন্ধ করে দেয়। কিন্তু স্থাননামে রয়ে যায় কুবেরমাহাত্ম্যের চিহ্ন।
বঙ্গপুঙ্গবদের এই কুবেরবিদ্বেষ কিন্তু ভারতের অন্যান্য প্রদেশের সঙ্গ সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বছরকুড়ি আগে উত্তরাখণ্ডের জাগেশ্বরে দেখেছিলাম বিশালাকায় কুবের। মন্দিরটিও বহু পুরনো। ওখানে তাঁকে ডাকা হয় খাজাঞ্চিবাবা নামে।
ভারতের নামকরা কুবেরমন্দির
হিন্দু পুরাণে কুবের দেবতা ধন, সম্পদ, ঐশ্বর্য ও উত্তর দিকের অধিপতি হিসেবে পূজিত। তিনি “ধনদ দেবতা” বা “লোকপাল” হিসেবেও পরিচিত। ভারতবর্ষে কুবেরের উপাসনা প্রাচীনকাল থেকেই প্রচলিত, বিশেষত ধনতেরাস, দীপাবলি ও লক্ষ্মী–কুবের পূজার সময় তাঁর আরাধনা সর্বাধিক হয়। দেশের নানা প্রান্তে কুবের দেবতাকে নিবেদিত একাধিক বিখ্যাত মন্দির রয়েছে, যেগুলি শুধু ধর্মীয় নয়, ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতের কিছু উল্লেখযোগ্য কুবেরমন্দিরের পরিচয় —
১. কুবেরেশ্বর মন্দির, কাঞ্চিপুরম (তামিলনাড়ু)
দক্ষিণ ভারতের কাঞ্চিপুরম শহর “দেবনগরী” নামে পরিচিত। এখানকার কুবেরেশ্বর মন্দিরটি প্রাচীন শৈব উপাসনার সঙ্গে যুক্ত হলেও কুবের দেবতার বিশেষ পূজা হয়। বিশ্বাস করা হয়, ভগবান শিব কুবেরকে এখানেই ধনরক্ষার দায়িত্ব দেন। প্রতি বছর দীপাবলি ও বৈশাখ মাসে এখানে কুবের–লক্ষ্মী উৎসব পালিত হয়।
২. কুবের মন্দির, শ্রী কালহস্তী (অন্ধ্রপ্রদেশ)
শ্রী কালহস্তী মন্দির মূলত শিবের বিখ্যাত “বায়ু লিঙ্গ” মন্দির, তবে এর একটি অংশে কুবের দেবতার পূজা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভক্তরা বিশ্বাস করেন, এখানে কুবেরের দর্শন করলে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও জীবনে স্থিতি আসে। অনেক ব্যবসায়ী নতুন উদ্যোগ শুরু করার আগে এখানে প্রণাম করতে আসেন।
৩. কুবেরনাথ স্বামী মন্দির, তাঞ্জাভুর (তামিলনাড়ু)
এই মন্দিরে শিবের সঙ্গে কুবের দেবতারও বিশেষ স্থান রয়েছে। কুবেরনাথ নামে পরিচিত এই মন্দিরে ভক্তরা “কুবের হোমম” বা ধনবৃদ্ধির যজ্ঞ করেন। দক্ষিণ ভারতের ধনসম্পর্কিত উপাসনার ক্ষেত্রে এটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
৪. কুবের মন্দির, রামেশ্বরম (তামিলনাড়ু)
রামনাথস্বামী মন্দিরের অন্তর্গত এক কোণে অবস্থিত কুবের মন্দিরটি ভক্তদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র। বলা হয়, রামচন্দ্র এখানে লঙ্কা বিজয়ের পর কুবেরের আশীর্বাদ প্রার্থনা করেছিলেন। তাই দীপাবলি ও বিজয়া দশমীর সময় এই মন্দিরে বিশেষ পূজা হয়।
৫. কুবেরেশ্বর মন্দির, উদয়পুর (রাজস্থান)
রাজস্থানের উদয়পুরে অবস্থিত এই মন্দিরটি স্থানীয় রাজপরিবারের পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠে। কুবের দেবতার সোনালী মূর্তি ও বিশাল ধনভাণ্ডারকক্ষ এখানে দর্শনীয়। রাজস্থানে ব্যবসায়ীরা বিশেষ করে দীপাবলির দিনে কুবের–লক্ষ্মী পূজা করেন।
৬. কুবেরেশ্বর মন্দির, বারাণসী (উত্তরপ্রদেশ)
বারাণসী কেবল শিবনগরী নয়, কুবের পূজারও এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। কাশী বিশ্বনাথ মন্দিরের উত্তর দিকেই অবস্থিত কুবেরেশ্বর মন্দির। বিশ্বাস করা হয়, শিবের ধনরক্ষক হিসেবে কুবের এখানে অবস্থান করেন। বারাণসীর তীর্থযাত্রীরা কুবের মন্দির দর্শন না করলে পুণ্যফল হয় না বলে ভক্তরা মনে করেন। উত্তরাখন্ডের জাগেশ্বরের কুবেরমন্দিরও বিখ্যাত।
৭. কুবেরেশ্বর মন্দির, ময়িলাদুথুরাই (তামিলনাড়ু)
এই মন্দিরে কুবেরের পাশাপাশি দেবী লক্ষ্মীরও পূজা হয়। বিশেষ করে ধনতেরাসের সময় হাজার হাজার ভক্ত এখানে এসে “কুবের দীপম” জ্বালান, যা ধনসম্পদ বৃদ্ধির প্রতীক।
৮. এছাড়া গুজরাটের নর্মদা নদীর তীরে আছে কুবের ভাণ্ডারী মন্দির।
কুবের ভাণ্ডারী মন্দির ভারতের গুজরাট রাজ্যের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী হিন্দু তীর্থস্থান। এই মন্দিরটি ধন-সম্পদের দেবতা কুবের-এর উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃত। কুবেরকে হিন্দু পুরাণে দেবতাদের কোষাধ্যক্ষ এবং ঐশ্বর্যের অধিপতি বলা হয়। “ভাণ্ডারী” শব্দের অর্থ — ধনের ভাণ্ডার রক্ষাকারী। ফলে “কুবের ভাণ্ডারী” মানে হয় — ধনসম্পদের অধিপতি কুবের।
কুবের ভাণ্ডারী মন্দিরটি গুজরাটের বারুচ জেলার কাছে চাঁদোদ নামে একটি স্থানে, নর্মদা ও ওরসাং নদীর সঙ্গমস্থলে অবস্থিত। এই স্থানটি অত্যন্ত পবিত্র বলে গণ্য, কারণ এখানে নর্মদা নদীর ঘাট রয়েছে, যেখানে বহু ভক্ত স্নান করে পুণ্য অর্জন করেন।
লোককথা অনুসারে, এই স্থানে স্বয়ং কুবেরদেব ধ্যান করতেন। একসময় ভগবান শিব কুবেরকে আশীর্বাদ দেন যে, তিনি এই স্থানে অবস্থান করবেন ও ভক্তদের ধনসম্পদে সমৃদ্ধ করবেন। আরও একটি প্রচলিত কাহিনিতে বলা হয়, যখন পার্বতী মাতার দর্শনে অশুভ শক্তি বাধা সৃষ্টি করেছিল, তখন কুবের দেবতা তাঁর ঐশ্বর্যে সেই দুষ্ট শক্তিকে ধ্বংস করেন। তখন থেকেই এই স্থানটি কুবের ভাণ্ডারী ধাম নামে পরিচিত হয়।
মন্দিরটি প্রাচীন হলেও বহুবার সংস্কার করা হয়েছে। এটি একটি পাহাড়ের উপর অবস্থিত, প্রায় ৮০০টিরও বেশি সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে হয়। মন্দির থেকে নর্মদা নদীর দৃশ্য অত্যন্ত মনোরম। ভিতরে কুবের দেবতার মূর্তি স্থাপন করা আছে, যা স্বর্ণাভ আভায় জ্বলজ্বল করে। ধনতেরাস এবং দীপাবলির সময় এখানে বিশেষ পূজা অনুষ্ঠিত হয়, কারণ কুবের দেবতা ধনসম্পদের রক্ষক।অনেক ভক্ত এখানে এসে নর্মদায় স্নান, দীপদান, ও দক্ষিণা দান করে থাকেন।কুবের ভাণ্ডারী যাত্রা নামে একটি বার্ষিক তীর্থযাত্রাও আয়োজন করা হয়।
কুবের ভাণ্ডারী মন্দিরকে কেবল ধন-সম্পদের উৎস হিসেবে নয়, বরং মানসিক শান্তি ও আধ্যাত্মিক সমৃদ্ধির স্থান হিসেবে দেখা হয়। স্থানীয়দের বিশ্বাস, যাঁরা নিষ্ঠাভরে কুবের দেবতার আরাধনা করেন, তাঁদের জীবনে অর্থনৈতিক উন্নতি ও সৌভাগ্য আসে।
কুবের ভাণ্ডারী মন্দির কেবল গুজরাট নয়, সমগ্র ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান। নর্মদা নদীর তীরে অবস্থিত এই মন্দির ঐশ্বর্য, শান্তি ও বিশ্বাসের প্রতীক হিসেবে আজও অগণিত ভক্তকে আকর্ষণ করে।
ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা এই কুবেরমন্দিরগুলো শুধু ধর্মীয় উপাসনার কেন্দ্র নয়, বরং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও ধারক। কুবের দেবতার পূজা মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে ধন শুধু ভোগের বস্তু নয়, তা সৎভাবে অর্জন ও সমাজকল্যাণে ব্যবহার করা উচিত। তাই আজও কুবের উপাসনা ভারতীয় ধর্মজীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
বাংলা কুবেরের আরাধনা থেকে বিচ্যুত হয়েছিল একসময়। বঙ্গে লক্ষ্মীপূজার বাড়বাড়ন্তের সঙ্গে সঙ্গে কুবেরের পূজা কমে যায়। কারণ কুবের কুৎসিতদর্শন, উপরন্তু তিনি রাবণের ভাই। তাই যতই ধনের দেবতা হন, বঙ্গরমণীদের তিনি মন পাননি কখনও। কুবের উত্তমকুমার নন, কার্তিক ঠাকুরটিও নন। বঙ্গজননীরা তাঁকে পুজো করতে যাবেনই বা কেন!
এখন উত্তর ভারতীয় সংস্কৃতির হাত ধরে ধনতেরাসের মধ্যে দিয়ে কুবের পুজোর রেওয়াজ হয়েছে আবার।
অথচ বাংলাসাহিত্যে কিন্তু ধনকুবের, কুবেরের ধন ইত্যাকার কথা বরাবর ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। এটাই বাঙালির অ্যাপোক্যালিপ্স মানসিকতার পরিচয়। পূর্ণ বিনাশের সঙ্গে সৃষ্টির আবাহন। এবারের সাহিত্যে নোবেলজয়ী সাহিত্যিক লাজলো ক্রাসনাহোরকাই বাঙালির এই অ্যাপোক্যালিপ্স মানসিকতার পরিচয় পাননি এখনো। পেলে আর একটি ক্লাসিক উপন্যাস লিখে ফেলবেন নির্ঘাত। আর এক নোবেলজয়ী সাহিত্যিক গুন্টার গ্রাসের বরানগর-বাসের কথা আমাদের অনেকেরই জানা আছে। কীভাবে দীর্ঘ তিন বছর তিনি এখান থেকে উপন্যাসের রসদ সংগ্রহ করেছিলেন, তাও আমরা শুনেছি।