‘জীবনকুচি’ পত্রিকা
নদিয়া জেলার কৃষ্ণনগর থেকে প্রকাশিত একটি মননশীল লিটল ম্যাগাজিন ‘জীবনকুচি’। ২০০০ সাল থেকে নিয়মিত প্রকাশিত হয়ে আসছে। ম্যাগাজিনটির প্রথম সম্পাদক ছিলেন অমৃতাভ দে ও শুভজিৎ দত্ত। পরবর্তীকালে অমৃতাভ দের সঙ্গে গালিব মণ্ডল পত্রিকা সম্পাদনার দায়িত্ব নেন। পত্রিকাটি প্রকাশিত হয় নদিয়া জেলার সদর শহর কৃষ্ণনগর থেকে। সাধারণ সংখ্যার পাশাপাশি বিভিন্ন সময় বিশেষ সংখ্যাও প্রকাশ পেয়েছে। ‘একরাশ স্বপ্নিল প্রাণের আকাশ ছোঁয়ার ছাড়পত্র’ ‘জীবনকুচি’ সবসময় অন্বেষণ করেছে তরুণ কবি ও প্রাবন্ধিকদের। পাশাপাশি বাংলা সাহিত্যের প্রথিতযশা কবি লেখকদের লেখা। ‘নদিয়া জেলার সাহিত্য ও সাহিত্যিক’, ‘শিল্পকলা’, ‘ছড়া’, ‘রেডিও’ ইত্যাদি বিশেষ বিশেষ বিষয় নিয়ে সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে। হ্যাণ্ডমেড পেপারে প্রচ্ছদ ছাপা হয়েছে বেশির ভাগ সংখ্যায়। প্রচ্ছদে ব্যবহার করা হত লাতিন আমেরিকার কবি পাররার একটি কবিতার অনুবাদ ( অনুবাদক : মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ) —
“লেখো তোমাদের যা খুশী/
যে কায়দায় লিখতে ইচ্ছে করে তাতেই/ অনেক রক্ত বয়ে গেছে সেতুর তলা দিয়ে /
এই কথায় বিশ্ব করে /
যে কেবল একটা রাস্তাই ঠিক/
কবিতায় সবকিছুই চলে/
একটাই শুধু শর্ত, বলাই বাহুল্য/
শাদা পাতার চেয়েও উৎকৃষ্ট হতে হবে/
তোমাদের”

‘জীবনকুচি’ পত্রিকার একটি সাধারণ সংখ্যার ছবি
আসলে এই কবিতাটি ছিল ‘জীবন কুচি’ পত্রিকার মনের কথা। প্রথম বর্ষ প্রথম সংখ্যার নান্দীপাঠ-এ লেখা হয়েছিল —
“জীবনের প্রাত্যহিক টানাপোড়েনের মাঝেও জন্ম নেয় স্বপ্নাঙ্কুর। বাঁচার তাড়না তাকে চরম অপেক্ষায় মাড়িয়ে যেতে পারে না, বরং জারিত করে অনুর্বর পথের আবেশ সব মানুষকেই স্বপ্ন দেখায় উর্বর প্রতিবেশের। তাই পৃথিবীর সমস্ত জঘন্যতাকে নগ্ন করে এগিয়ে আসে অমোঘ সৃষ্টি।
এক ফালি সাদা পাতাকে সঙ্গী করে কয়েকটা স্বপ্নিল প্রাণ জাগিয়ে তুলুক এক পৃথিবী মানুষকে। তাদের পড়তে পড়তে নিভে আসা এক পৃথিবী ভাবনাকে। এসবের সম্মেলনে আগুন হোক বর্ণমালা, ঝলসে উঠুক জীবনকুচি।প্রসঙ্গত জানাই এই পত্রিকার প্রথম সংখ্যা ছিল একটা ফোল্ডার। দ্বিতীয় সংখ্যা থেকে রূপে-আঙ্গিকে পাল্টে যেতে লাগল। শিল্পী আশিস চৌধুরীর প্রচ্ছদ ও অসম্পূর্ণ অলঙ্করণে দ্বিতীয় সংখ্যা একেবারেই অন্য মাত্রা পেয়ে যায়। গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ, পুস্তক পর্যালোচনা, মুক্তগদ্যে সেজে উঠতে থাকে পত্রিকা। পরবর্তীকালে পত্রিকার অবয়ব বেড়েছে। ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ পেয়ে চলেছে এই পত্রিকা। শুরুর দিকে ত্রৈমাসিক পত্রিকা হিসাবে প্রকাশ পেলেও পরবর্তী সময়ে বার্ষিক পত্রিকা হিসাবেই প্রকাশ পেতে থাকে। সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে ‘জীবনকুচি’-র “গ্রন্থাগার সংখ্যা”। — তথ্যসূত্র : অমৃতাভ দে, সম্পাদক,”জীবনকুচি’।
‘জীবনকুচি’-র ২১ বছরে বিংশতিতম সংখ্যার মূল বিষয়ভাবনা ‘গ্রন্থাগার’। আজকের যুগ বিশ্বায়নের যুগ। এই বিশ্বায়নের যুগে মিডিয়া বা মাধ্যম একটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে তাতে সন্দেহ নেই। মিডিয়া সাধারণত দুই প্রকার। যথা — Electronic Media বা বৈদ্যুতিন মাধ্যম ও Print Media বা মুদ্রণ মাধ্যম। সংবাদপত্র, সাময়িকপত্র, বইপত্র, বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিন-সহ বিভিন্ন ছাপা জিনিসই মুদ্রণ মাধ্যমের মধ্যে পড়ে। আর ইলেকট্রনিক মিডিয়া হল ইন্টারনেট, ই-মেল, দূরদর্শন, কম্পিউটার ইত্যাদি।
একসময় বই- ই ছিল পড়ার অন্যতম মাধ্যম। আমরা যখন ক্লাস নাইন বা টেনে পড়ি তখন বাজারে রেফারেন্স বই এর খুব বেশি আনাগোনা দেখা যায়নি। বাংলার অমল পালের সহজ-সরল লেখা, অপরদিকে চক্রবর্তী চক্রবর্তী রচিত দাঁতভাঙা ভাষার বাংলা রেফারেন্স ছাড়া কিছু ছিল বলে আমার মনে পড়ে না। আর ইতিহাসের জীবন মুখোপাধ্যায়, ভূগোলের বসু মল্লিক, মাইতির জীবনবিজ্ঞান আর ভূঁইয়া ধরের ভৌতবিজ্ঞানের টেক্সট্ ছাড়া আমরা আর কিছুই পড়িনি। ওগুলোই আমাদের টেক্সট আর ওগুলোই রেফারেন্স। টেক্সট আর রেফারেন্সের তফারেন্স আমরা বুঝতাম না। কোনো কোনো বই অবশ্য লাইব্রেরীতে গেলে পাওয়া যেত। কিন্তু তখনও লাইব্রেরীর সদস্য হতে পারিনি, তাই বই নিয়ে যেতে পারতাম না। শুধু পড়ার সৌভাগ্যটা হত মাঝে মাঝে। আমাদের বেতাইতে ‘সুকান্ত স্মৃতি গণ পাঠাগার’ টিমটিম করে চলত।তবুও আমরা যেতাম বই পড়ার লোভে।ফাইনাল পরীক্ষা যেদিনই শেষ হত সেদিনই বাবার বকাবকিতে পড়ায় বের হতে হত নতুন ক্লাসের পুরোনো বই কার কাছে আছে তা খুঁজতে। এক-দুদিন যে রেস্ট নেব,তার উপায় ছিল না।সুতরাং বই খুঁজে নিয়ে এসে সেদিন থেকেই আবারও সেই একঘেঁয়ে পড়তে বসা ! তারপর নতুন ক্লাসে উঠে বুকলিস্ট পেলে মিলিয়ে যেটা যেটা মিলত সেটা নিয়ে এক তৃতীয়াংশ দাম চুকিয়ে পুরোনো না মেলা বইগুলো ফেরত দিয়ে আসতাম।কোনো নতুন বই কিনতে হলে শুরু হত বাবার কাছে ঘ্যানঘ্যানানি। বাবা নতুন বইগুলো কবে কিনে দেবেন- তা আমার জানার অগোচর ছিল।
খুব শখ ছিল নবম-দশমে উঠে K.C.Nag (Keshob Chandra Nag ) এর একটা ‘কোর গণিত’ কিনব। কিন্তু কিনতে পারিনি। তাই ধার করে,চেয়ে চিন্তে বইটা মাঝে মাঝে নিয়ে আসতাম এক বন্ধুর কাছ থেকে। বইটা হাতে পেলেই অদ্ভূত এক অনুভূতি হত। যেটুকু পারতাম একদিনের মধ্যেই প্র্যাকটিস করে খাতায় টুকে নিতাম। কারণ পরের দিন তাকে বইটা ফেরত দিতে হত। যেটুকু পড়েছি সেই বই থেকে, না সে আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেনি। আজ আমার ব্যক্তিগত সংগ্রহে ‘কোর গণিত’ বইটি আছে। যখনই বইটা চোখে পড়ে নস্টালজিক হয়ে পড়ি পুরোনো দিনের কথা ভেবে।
কথায় বলে “Good books are the Store house of Knowledge and wisdom, অর্থাৎ ভালো এই হচ্ছে জ্ঞান ও প্রজ্ঞার ভাণ্ডার। তাই বই পড়ার কোনো বিকল্প নেই। মনে রাখুন একটি ভালো বই একশত বন্ধুর সমান।বই পড়লে জ্ঞানের পরিধি বাড়ে, মন উদার হয়, সকল সংকীর্ণতার অবসান ঘটে। কিন্তু আজকের যন্ত্র যুগে মানুষের বই পড়ার অভ্যাস কমছে।নতুন বই এর সুগন্ধে মাতোয়ারা হয়ে যেতাম আমরা।মনে পড়ে প্রথম শ্রেণীর ‘কিশলয়’ বই-এর একটি ছড়া —
“বছর বছর কি মজা ভাই
নতুন নতুন বই খাতা পাই।”
বলাবাহুল্য এখনও নতুন কোনো বই কিনলে প্রথমেই তার সুঘ্রাণ নিই। কালি আর কাগজের সুগন্ধে মনটা এখনও ভরে ওঠে। বই যে কতবড়ো বন্ধু তা আমরা জানতাম ভালোভাবেই। বই-এর সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ছিল ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আর এখন বই এর বদলে নবীন পাঠক হাতে তুলে নিচ্ছে বই এর পিডিএফ। বই-এর সঙ্গে তৈরি হচ্ছে দূরত্ব। তবে হ্যাঁ এমন কিছু দুষ্প্রাপ্য বই আছে যেগুলি হয়তো হাতে পাওয়া দুরূহ, সেগুলির ডিজিটাল কপি পড়া ছাড়া কোনো উপায় নেই।
নোটস্ কেন্দ্রিক শিক্ষা ছাত্রছাত্রীদের পুঁথিগত শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলেছে। তাই বলি বই পড়ুন এবং অন্যকে বই পড়ার সুযোগ করে দিন। আমার বই কেনার শখ ষোলো আনা। ধরুন কারো বাড়িতে গেলাম, আলমারিতে বই সাজানো থাকলেই আমার ভীষণ দেখতে ইচ্ছে করে এর মধ্যে আমার সংগ্রহে কোন কোনটি নেই। চেষ্টা করি সেটা সংগ্রহ করার।কিন্তু একসময় পয়সার অভাবে সব বই সংগ্রহ করতে পারতাম না। সেটা আগেই বলেছি। তাই গ্রন্থাগারই ছিল আমাদের একমাত্র ভরসা। সে কলেজ লাইব্রেরীই হোক আর ভিলেজ লাইব্রেরীই হোক। তবুও লাইব্রেরীতে সেরকম সংগ্রহ ছিল না। যেটা চাইছি সেটা পাওয়া যেত না। [ক্রমশ]