একবার আমাদের গ্রন্থাগারের গ্রন্থাগারিক দেবব্রত চক্রবর্তী (আমার শিক্ষকও বটে) বললেন এবারের অর্থবর্ষে বই কেনার জন্য আমাদের লাইব্রেরী বেশ কিছু টাকা পেয়েছে।তোদের পছন্দমতো কিছু বই এর তালিকা তোরা তৈরি কর,যেগুলো সকলের উপকারে লাগবে। ২০০৬-০৭-র ঘটনা। যাইহোক ব্যক্তিগত পছন্দমতো খান ২০ বই-এর তালিকা আমি তৈরি করেছিলাম। সে সব বই কেনাও হয়েছিল। তখন মানুষ গ্রন্থাগারমুখী ছিল। কারণ বই পড়ার একটা তাগিদ ছিল মানুষের মধ্যে। কিন্তু মানুষ ধীরে ধীরে বই পড়ার অভ্যাস হারাচ্ছে। তাই এখনকার শতকরা ৯০-৯৫ ভাগ মানুষ গ্রন্থাগারমুখী নয়। তবুও এমন কিছু মানুষ আছেন যারা ধুলো ঝেড়ে পুরোনো বই পড়ার অভ্যাস ত্যাগ করতে পারেননি। উপরিউক্ত প্রথম শ্রেণির মানুষদের জন্যই আজকালকার গ্রামীণ গ্রন্থাগারগুলির বেহাল দশা চোখে পড়ছে। তবে সবচেয়ে বড়ো কথা গ্রন্থাগারিকের অভাবে গ্রন্থাগারগুলো রীতিমত ধুঁকছে।
আজকের মানুষ হাতের মুঠোয় পৃথিবীটাকে পুরে নিয়েছে। নিয়েছে স্মার্টফোন আর কম্পিউটারে পৃথিবীকে পুরে। কী বই চায়? শুধু গুগুলে টাইপ করো আর পেয়ে যাও পিডিএফ। শুয়ে শুয়েই পড়া হয়ে যায় আস্ত একটা বই। তবে আর লাইব্রেরী কেন? ঠিক এমতাবস্থায় এহেন গ্রন্থাগার সংখ্যা যথেষ্টই তাৎপর্যপূর্ণ। সম্পাদক নান্দীপাঠে লিখছেন —
“অবশেষে ‘জীবনকুচি’র গ্রন্থাগার সংখ্যা প্রকাশিত হল। একুশ বছরের যাত্রাপথে ‘জীবনকুচি’ পাঠকের সমাদর পেয়েছে। কুড়ি বছর পূর্তিতে আমরা প্রকাশ করেছিলাম বিশেষ কবিতা সংখ্যা। যে সময়ে গ্রন্থাগার সংখ্যাটি প্রকাশ পাবার কথা ছিল সেই সময় থেকে বেশ অনেকটা পরেই আমরা পত্রিকা প্রকাশ করতে পারলাম। আসলে অতিমারি আমাদের অনেকটা পিছিয়ে দিয়েছে। আমাদের মনে হয়েছিল, গ্রন্থাগার নিয়ে আমাদের ভাববার সময় এসেছে। ছাত্রছাত্রীরাও এখন গ্রন্থাগারমুখী নয় — একথাটা মেনে নিতেও বোধ হয় খুব একটা অসুবিধা নেই। একটি গ্রামের স্কুলে শিক্ষকতা করি। স্কুলে গ্রন্থাগার গড়ে তোলবার চেষ্টা অনেকদিন ধরেই করে চলেছি। ছোটবেলায় যে স্কুলে পড়তাম, গ্রামের সেই স্কুলে অসাধারণ একটি গ্রন্থাগার ছিল, ছিলেন গ্রন্থাগারিক।আজও অনেক স্কুলে গ্রন্থাগার আছে। গ্রন্থাগারিকও আছেন, ছাত্রছাত্রীদের উৎসাহ কমেছে। পাশাপাশি অনেক বিদ্যালয়ে গ্রন্থাগার থাকলেও গ্রন্থাগারিক নেই অথবা গ্রন্থাগারের গুরুত্ব কতখানি সেটা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বুঝেও হয়তো বোঝেন না। বিভিন্ন সূত্রে যেটুকু জেনেছি তাতে পশ্চিমবঙ্গের সরকার — পোষিত গ্রন্থাগারগুলিতে বই আছে অনেক; পরিকাঠামো আগের থেকে উন্নত কিন্তু কর্মীসংখ্যা খুবই কম। তাছাড়া আজকের স্মার্ট ফোনের যুগে একটা বোতাম টিপলেই যেখানে সমস্ত তথ্য পাওয়া যায়,পাওয়া যায় বিভিন্ন বই – এর ডিজিটালাইজড্ রূপ, তাতে অনেকেই গ্রন্থাগারে গিয়ে সময় নষ্ট করতে চান না। অথচ গ্রন্থাগারকে নিয়ে কত আবেগ আমাদের মনের ভিতর। বিভিন্ন লেখায় উঠে এলো গ্রন্থাগার নিয়ে ব্যক্তিগত অনুভূতির কথা; উঠে এলো গ্রন্থাগার আন্দোলনের ইতিহাস। লেখকদেরকে জানাই আমাদের শ্রদ্ধা। গ্রন্থাগার তার পুরনো ছন্দ ফিরে পাক — এই প্রত্যাশা আমাদের। বর্তমান এবং আগামী প্রজন্মকে গ্রন্থাগার সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ধারণা আমরা দিতে চেয়েছি।”
নান্দীপাঠ থেকেই এই বিশেষ সংখ্যাটি প্রকাশ করার আসল উদ্দেশ্য সম্পর্কে আমরা অবহিত হলাম।এবার আসি মূল আলোচনায়।গ্রন্থাগার সংখ্যাটির প্রকাশক ডা.সুবীর কুমার দে, আর প্রচ্ছদ এঁকেছেন মৌমিতা পাল। সূচিপত্রটি সেজেছে সম্পূর্ণটাই বিভিন্ন প্রবন্ধে। দেবদাস আচার্য,বিদ্যুৎ হালদার, অসিতাভ দাশ,অভিজিৎ কুমার ভৌমিক, সুনীল পাল,কৌশিক চট্টোপাধ্যায়,তরুণ মুখোপাধ্যায়, বহ্নিশিখা ঘটক, সুশান্ত রাহা,অভীক মুখোপাধ্যায়, মোঃ আজিজুর রহমান সহ বিভিন্ন প্রাবন্ধিক কলম ধরেছেন এই সংখ্যায়। প্রত্যেকের লেখায় উঠে এসেছে চিত্র-বিচিত্র ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও এমন কিছু তথ্য যা পরবর্তী সাহিত্যিক গবেষকদের বিশেষ কাজে দেবে।
প্রথমেই কলম ধরেছেন নদিয়া জেলার কৃষ্ণনগরের ‘ভাইরাস’ পত্রিকার সম্পাদক তথা স্বনামধন্য কবি ও প্রাবন্ধিক দেবদাস আচার্য। ‘খোলা চোখ : বন্দি চোখ’ প্রবন্ধে প্রাবন্ধিক তুলে ধরেছেন তাঁর যৌবন কালের বিচিত্র সব অভিজ্ঞতা। তাদের শৈশব থেকে যৌবন কেটেছে খেলাধূলা ও বই পড়ে। সেই সময়কার কথা বলতে গিয়ে প্রাবন্ধিক লিখছেন — “মনের স্বাস্থ্য এবং শরীরের স্বাস্থ্য উভয়েরই বেশ পরিচর্যা হত।” মন হয়ে উঠত অনেক স্বাধীন খোলামেলা। মনের স্বাস্থ্য ভালো রাখার উপাদান ছিল লাইব্রেরী তথা বই। আর শরীরের স্বাস্থ্য ভালো রাখার উপায় ছিল খেলাধূলা। অর্থাৎ মানুষ ছিল গ্রন্থাগারমুখী ও মাঠমুখী। কিন্তু সময় বদলেছে,মানুষ গ্রন্থাগারমুখীও নয় আবার মাঠমুখীও নয়। দৃশ্য বদলেছে। এই বৈপরীত্যই প্রবন্ধটির বিষয়। সেইসঙ্গে মুদ্রণ যন্ত্রের আবিষ্কার ও তার ব্যবহার মানুষের সমাজজীবন; মানসিকতা, রুচি, শিক্ষা এমনকি সাহিত্য ও কাব্য জগতের রূপান্তর ঘটলো। কবিতা থেকে এল গদ্য। কবিতা পেল মুক্তি। মুদ্রণ যন্ত্রের আবিষ্কার প্রসঙ্গে ফোর্টে উইলিয়াম কলেজ; কেরী সাহেব, পঞ্চানন কর্মকার, রামরাম বসু প্রমুখ মানুষের কথা প্রাবন্ধিক উল্লেখ করে ছুঁয়ে গেছেন বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের আধুনিক যুগের প্রারম্ভ পর্যায়টিকে।কারণ বই পড়ার অভ্যাস তৈরি হয়েছে যখন বই ছাপা হল তখন থেকেই।তার
আগে অবশ্য পড়তে হত ‘কান’ দিয়ে। কারণ তখন ভারতীয় শিক্ষাব্যবস্থা ছিল শ্রুতি ও স্মৃতি নির্ভর। সেখান থেকে অনেকটা পথ অতিক্রম করে এল বই, গ্রন্থাগার। কিন্তু মানুষ যদি বই পড়ার অভ্যেস হারায় তবে বইপ্রেমীদের কষ্ট লাগে বই কি! গদ্য প্রবন্ধ পড়ার পাঠক কম থাকলেও “ভরসা এই যে, এখনও শতকরা দশজন পাঠক ও অনুসন্ধিৎসু পাঠক আছেন তার এক ভাগও আশাকরি কবিতার পাঠক থাকবেন। “অর্থাৎ বই, লাইব্রেরী এগুলোর প্রয়োজন কোনোকালেই ফুরিয়ে যাবে না। সুতরাং আজকের দিনে গ্রন্থাগারের গুরুত্ব শূন্য, নিঃস্ব একথা বলার সময় এখনও আসেনি।
প্রাবন্ধিক বিদ্যুৎ হালদারের ‘গ্রন্থাগার এবং আমার বই পড়া’ প্রবন্ধে গ্রন্থাগার সম্পর্কে বিচিত্র সব অভিজ্ঞতা দানা বেঁধে উঠেছে। কৃষ্ণনগরের ‘নদিয়া জেলা গ্রন্থাগার’ — এ যাতায়াত, গ্রন্থাগার প্রেমী বেশ কিছু মানুষের সংস্পর্শ লাভ করেছিলেন প্রাবন্ধিক। সেকথাই তিনি ব্যক্ত করেছেন অকপট ভাবে। তাছাড়া বিভিন্ন কর্মরত ও অবসর প্রাপ্ত গ্রন্থাগারিকরা এ সংখ্যায় কলম ধরেছেন।তাঁদের বিচিত্র সব কর্মকান্ড, গ্রন্থাগারিক হিসাবে তাদের সাফল্য — ব্যর্থতার কথা, গ্রন্থাগার আন্দোলন ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা আছে এই সংখ্যায়। আছে বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন আর বৃহত্তম গ্রন্থাগার ‘বিবলিওথেকা আলেকজান্দ্রিয়া’ বা আলেকজান্দ্রিয়ার লাইব্রেরির কথাও। এটি মিশরের রাজধানী কায়রোর কাছাকাছি মিশরের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর আলেকজান্দ্রিয়াতে অবস্থিত। ইজিপসিয়ান আরবিতে এই লাইব্রেরির নাম ‘মক্তবৎ আল ইস্কান্দারিয়া’ সংক্ষিপ্ত ‘বিও’। বন্যাধারা রায় এর কলমে উঠে এসেছে এই গ্রন্থাগারের খুঁটিনাটি ইতিহাস। মন্ত্রমুগ্ধের মতো পড়তে পড়তে যেন হারিয়ে যাচ্ছিলাম ইতিহাসের ভাব গভীরতায়।

জীবনকুচি’ পত্রিকার গ্রন্থাগার সংখ্যা
যে বিষয়টা দৃষ্টি এড়াই না, তা হল ‘গ্রন্থাগার আন্দোলনে নদীয়া’। গ্রন্থাগারকে নিয়ে আন্দোলন কেন — এ প্রশ্নটা অনেকের মনেই আসতে পারে। তার উত্তর প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক, গবেষক ও প্রাক্তন গ্রন্থাগারিক সঞ্জিত দত্ত নিজেই দিয়েছেন — “গ্রন্থাগার আন্দোলন’ শব্দটা শুনলেই বহু মানুষ ধরে নেন কর্মীদের পেশাগত দাবিদাওয়ার লড়াই আন্দোলন। বাস্তবে তা নয়। কর্মী আন্দোলনের সীমাবদ্ধতার বিপরীতে গ্রন্থাগারকর্মীরা একটি অংশ বিশেষ অবশ্যই। আন্দোলন অর্থে যদি কোন বিষয়কে দোলা দিয়ে বা আন্দোলিত করে কোন স্থবিরতা থেকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়, তবে ‘গ্রন্থাগার’ নামের প্রতিষ্ঠানটির অগ্রগতি বোঝায়। গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠার বিষয়ে সলতে পাকানো পর্ব থেকে গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা, তার শ্রীবৃদ্ধি,পরিকাঠামো ও পরিষেবার মানোন্নয়ন, সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন, গবেষকদের গবেষণার কাজে সহায়তা করা, ছাত্রছাত্রী ও চাকুরি প্রার্থীদের ভবিষ্যৎ পথের দিশা প্রদর্শন সব কিছুকে নিয়েই গ্রন্থাগার আন্দোলন। ঊনবিংশ শতাব্দীর স্বদেশী ও বিদেশী শিক্ষানুরাগী বিদ্বজ্জনেদের সম্মিলিত প্রয়াসে সাধারন গ্রন্থাগার আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে। বিভিন্ন জায়গায় গ্রন্থাগার গড়ে উঠতে থাকে। বিংশ শতাব্দীর প্রথম অর্ধে নদীয়া জেলার বহু জায়গায় গ্রামীণ গ্রন্থাগার গড়ে উঠতে থাকে। এর মূল কারণ ছিল স্বাধীনতা আন্দোলনকে জোরদার করে তোলা। কারণ এগুলি ছিল যোগাযোগকেন্দ্র ও নানা সামাজিক কার্যক্রমের মাধ্যম। ১৯১৯ সালের ১৩ই এপ্রিল জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকান্ডের পর এক মাসের মধ্যে বিপ্লবী যুবকরা গড়ে তোলেন চাকদহে ‘বসন্ত মেমোরিয়াল লাইব্রেরি’।”
‘নদীয়া জেলার গ্রন্থাগার আন্দোলন একটি সংক্ষিপ্ত ইতিবৃত্ত’, সঞ্জিত দত্ত। [ক্রমশ]