সবার অলক্ষ্যে এই গ্রন্থাগার আন্দোলনের ধারা অব্যাহত থেকেছে। নদীয়া জেলার অনেক গ্রন্থাগার বর্তমানে প্রায় অবলুপ্ত কর্মীর অভাবে। এগুলো টিকিয়ে রাখার জন্যই এই আন্দোলন। ড. মোহ: আজিজুর রহমান (এডিশনাল লাইব্রেরিয়ান, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রিশাল-২২২৪; ময়মনসিংহ, বাংলাদেশ) এর কলমে উঠে এসেছে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা, গ্রন্থাগার আন্দোলন ইত্যাদি নিয়ে সুচারু বিচার বিশ্লেষণ।১৮৫৪ সালে বাংলাদেশের প্রাচীনতম চারটি গ্রন্থাগার স্থাপনের মধ্য দিয়ে গ্রন্থাগার উন্নয়ন শুরু হয়। উডবার্ণ পাবলিক লাইব্রেরি, বগুড়া; যশোর পাবলিক লাইব্রেরি, যশোর; বরিশাল পাবলিক লাইব্রেরি, বরিশাল এবং রংপুর পাবলিক লাইব্রেরি, রংপুর। তাছাড়া ১৯৫৩ সালে ঢাকা কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরির ভিত্তি স্থাপন করা হয়। সে নিয়েও আলোচনা আছে এই প্রবন্ধে।
বাংলাদেশে চার ধরনের গ্রন্থাগারের অস্তিত্ব অনুধাবন করা যায়। যথা — গণগ্রন্থাগার, জাতীয় গ্রন্থাগার, একাডেমিক গ্রন্থাগার এবং বিশেষায়িত গ্রন্থাগার।এগুলির বর্তমান অবস্থা বর্তমান প্রেক্ষিতে তাদের অবস্থান নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে।
একটি আর প্রবন্ধ নিয়ে আলোচনা শেষ করব — জীবনকুচির সম্পাদক অমৃতাভ দে’র ‘লাইব্রেরি চলমান জীবনপথে সঞ্চয়ের শস্যক্ষেত্র’ প্রবন্ধটি নিয়ে। ছোটবেলা থেকে কীভাবে বই তাঁর সঙ্গী ছিল, কীভাবে লাইব্রেরি তাঁর জীবনের অনেকটা অংশ দখল করে নিয়েছিল তা জানতে পারব স্বল্প দৈর্ঘ্যের এই প্রবন্ধটি পড়ে। প্রাবন্ধিকের বাবা গ্রন্থাগারিক হিসাবে নিযুক্ত ছিলেন বড় আন্দুলিয়ার লোকসেবা শিবিরের শ্রীরামকৃষ্ণ পাঠাগারে। তাই বেশিরভাগ সন্ধেটা তাঁর এই গ্রন্থাগারেই কাটত।
তাছাড়া ‘নদিয়া জেলা গ্রন্থাগারে’ তাঁর বাবার বদলির সুবাদে সেখানে যাওয়ারও সুযোগ ঘটেছিল। সবমিলিয়ে এই সংখ্যাটা পাঠ করলে গ্রন্থাগার যে কী তা সহজেই অনুমান করতে পারবেন সকলে। প্রমথ চৌধুরীর একটি উদ্ধৃতি প্রাবন্ধিক তুলে এনেছেন তাঁর প্রবন্ধে — “লাইব্রেরি হাসপাতালের চাইতে কম উপকারী নয়;তার কারণ আমাদের শিক্ষায় বর্তমান অবস্থায় লাইব্রেরি হচ্ছে একরকম মনের হাসপাতাল।”

‘জীবনকুচি’ পত্রিকার ‘গ্রন্থাগার’ সংখ্যার কভার পেজের ছবি।
এবার আসি ‘বিশেষ শিল্পকলা সংখ্যা’-র আলোচনায়। বাস্তবের দেখা জিনিস আর কল্পনার বুননে যা সৃষ্টি হয় তাইই শিল্প বা আর্ট। আর এই শিল্প প্রকাশ পায় নানা কলার মাধ্যমে। এইসব মিলিয়েই শিল্পকলা। মানুষের মনের সৃজনশীল ক্রিয়াকলাপের সামগ্রিক অবয়ব হচ্ছে শিল্পকলা। শিল্পী মনের আনন্দে কল্পনা ও অনুভূতির মিশ্রণ ঘটিয়ে হাতের ছোঁয়ায় গড়ে তোলেন নানা শিল্প। অর্থাৎ শিল্পের মধ্যে জড়িয়ে থাকে শিল্পীর মনন ও শিল্প রসবোধ, থাকে অনুভূতি, চিন্তাভাবনা। গ্রিক দার্শনিক প্লেটোর মতে —” কর্মের মাধ্যমে ভাবের বিকাশ সাধনই সৌন্দর্য এবং সে সৌন্দর্যই শিল্পকলা।”
মাতিসের বক্তব্য অনুসারে — “Creation is the Artist’s true function, where there is no creation, there is no art.” চিত্রশিল্পী যেমন ছবি আঁকেন ক্যানভাসে, ছবির মাধ্যমেই ফুটে ওঠে তার অনুভূতি, চিন্তাভাবনা ; তেমনি একজন ভাস্কর্যশিল্পী মূর্তি বা ভাস্কর্য তৈরি করেন মনের মাধুরি মিশিয়ে, অনেক যত্নে। আবার সূচিশিল্প, কুম্ভকারের তৈরি মাটির পাত্র বা পটুয়াদের আঁকা পট সবই শিল্প কিন্তু তাদের ধরন আলাদা। অথচ সবগুলিতেই শিল্পীমানসের আলাদা আলাদা চিন্তাভাবনা, অনুভূতি প্রকাশ পায়। শিল্পকর্মের মধ্য দিয়ে শিল্পী হয়তো অনেক কিছু বলতে চান, তা কখনো বিমূর্ত বিষয়কে কেন্দ্র করে হয়, কখনো বা অতিপ্রাকৃত বিষয় কিম্বা কখনো তা হয়ে ওঠে প্রতিবাদের মাধ্যম। মকবুল ফিদা হুসেন ‘নগ্ন সরস্বতী’-র ছবি এঁকে বিতর্কিত হয়েছিলেন; তাঁকে দেশ ত্যাগ পর্যন্ত করতে হয়। শেষ জীবনে তাঁকে কাতারের নাগরিকত্ব গ্রহণ করতে হয়। আসলে তো তিনি দেখাতে চেয়েছিলেন শিল্প আজ বিপন্ন, শিক্ষা তলানিতে, তার নগ্ন, কদর্য রূপ তিনি দেশবাসীকে দেখাতে চেয়েছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে যদি অভিযোগ হয় যে তিনি এ ছবি এঁকে খুব ভুল করেছিলেন তবে নজরুল ও নিশ্চয় খুব ভুল করেছিলেন সরস্বতীকে ‘নটিনী’ বলে — “মাতালদের ওই ভাঁটিশালায় নটিনী আজ বীনাপাণি।”
তিনিও তাহলে সমানভাবে দোষী। আসলে তা নয়। শিল্পী তাঁর শিল্পকর্মের মাধ্যমে প্রতিবাদ ছুঁড়ে দেন। সমাজের মানুষের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে চান ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো। পরাধীন ভারতে যেখানে সাধারণ মানুষের বাক্ স্বাধীনতা নেই, সেখানে বাগদেবীর আরাধনার আয়োজন করা তুচ্ছ মনে হয়েছে নজরুলের। শিক্ষা দীক্ষাকে যেভাবে নীচে নামিয়ে আনা হয়েছে, বেরিয়ে পড়ছে তার কদর্যরূপ সেখানে সরস্বতীর ‘নটিনী’ না হয়ে আর উপায় কী! তিনি আসলে এই কথাটিই বলতে চেয়েছেন। ধর্মে আঘাত দিতে চাননি। ঠিক এজন্যই শিল্পীদের বারবার বিতর্কিত হতে হয়েছে, অপমানিত হতে হয়েছে। কিন্তু সময় আসলে সবকিছূই শিখিয়ে দেয় ও চিনিয়ে দেয়। তাই শিল্পীরা সব যুগেই সব কালেই নমস্য।
আমি মূলত শিল্পী নই, তাই শিল্প সম্পর্কে অনধিকার চর্চা অনেকেই ভালো চোখে নেবেন না। তাই কথা না বাড়িয়ে শুরু করি ‘জীবন কুচি’-র ‘বিশেষ শিল্পকলা সংখ্যা’ নিয়ে আলোচনা। এই সংখ্যাটির প্রকাশকাল ডিসেম্বর ২০০৯, দ্বাদশ সংখ্যা। প্রথমেই ‘নান্দীপাঠ’। এখানেই তুলে ধরা হয়েছে এত গুরুগম্ভীর একটা বিষয় নিয়ে সংখ্যা করার যৌক্তিকতা — “শিল্পের নিজস্ব একটা ভাষা আছে। শিল্পকর্মও কথা বলে। শিল্পীর ভাবনাচিন্তা, অনুভূতি, উপলব্ধি আমাদের চেতনায় ঘা দেয়, আমাদের আলোড়িত করে। চিত্রশিল্প, ভাষ্কর্য, মৃৎশিল্পের অন্দর মহলে প্রবেশাধিকার সবসময়। তাই ‘জীবনকুচি’ এবার পৌঁছে গিয়েছিল শিল্পকলার জগতে। শিল্পীর শিল্পভাবনায় ভাবিত হলাম আমরা। বিশিষ্ট শিল্পীদের সাক্ষাৎকারে উঠে এল শিল্পীর গহন মনের ছবি, শিল্প আলোচকদের চোখে দেখে নিলাম আধুনিক শিল্পচর্চার ইতিহাস। পাশাপাশি কবিরা কীভাবে দেখেন ছবিকে — তাও উঠে এল এবারের সংখ্যায়। আর্ট কলেজের অধ্যক্ষ, অধ্যাপক, অধ্যাপিকাদের সহযোগিতাও পেয়েছি বিশেষভাবে। তাঁরা জানিয়েছেন উত্তর-আধুনিক শিল্পচর্চায় তাঁদের প্রতিষ্ঠানগুলির ভূমিকার কথা। কৃষ্ণনগর, কোলকাতা ও শান্তিপুরের শিল্পীদলের ভাবনাও উঠে এসেছে পত্রিকার পাতায়। কমার্শিয়াল আর্ট-এর দুনিয়াতেও চোখ রেখেছি আমরা। শিল্প-লেখকরা দিয়েছেন তাঁদের ছবি। যাঁরা লেখা পাঠাতে পারেননি, তাঁরা ছবির মধ্যে দিয়ে জানিয়েছেন তাঁদের শিল্পভাবনা। জীবনকুচি একটি সাহিত্য পত্রিকা। গল্প, কবিতা, প্রবন্ধের কাগজ হয়েও জীবনকুচি কেন শিল্পকলা সংখ্যা করল? এ প্রশ্নের উত্তর হয়তো মিলবে সংখ্যাটি পড়লেই। জীবনকে খুঁজে পাওয়া যায় ক্যানভাসে, রং-তুলির আঁচড়ে-একজন শিল্পীর যাপনচিত্রে, চেতনা প্রবাহে, কল্পনায়। ছবির মধ্যেও ধরা পড়ে জীবন। টুকরো টুকরো এই জীবনই জ্বেলে দেয় আলো।”
আবার পরের অনুচ্ছেদের শেষ বললেন —
“সামগ্রিক ভাবে এই সংখ্যায় তরুণ শিল্পীদের সঙ্গে অভিজ্ঞ শিল্পীদের মেলবন্ধনের একটা চেষ্টা করা হয়েছে। এই মিলন মেলা নানা রঙে রঙিন এক চালচিত্র। ছবি, বা ভাষ্কর্য দুর্বোধ্য, এসব বোঝা যায় না-এরকম ধারণা যাঁরা পোষন করেন, তাঁদের সেই ধারণাকে চুরমার করে দেবার জন্যই আমরা ঘুরে বেড়ালাম শিল্পের অভিযানে — যেখানে খেলে বেড়াচ্ছে জীবনের কুচি।”
এ সকল উদ্দেশ্যকেই পাথেয় করেই ‘জীবনকুচি’-র ‘বিশেষ শিল্পকলা সংখ্যা’-র অবতারণা। তাছাড়া কৃষ্ণনগর নদিয়া জেলার একটি অন্যতম মৃৎশিল্প কেন্দ্র। বিশেষত ঘূর্ণির পুতুলপট্টি এলাকা এর আঁতুর ঘর। সেখানেই সম্পাদকের বেড়ে ওঠা। এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে তাঁর জীবন। কাজেই শিল্প জিনিসটা যে কী, তা তিনি ভালোভাবেই বুঝেছেন। তাই তো এরকম একটা ভাবনা থেকেই এই বিশেষ সংখ্যাটির জন্ম। [ক্রমশ]