প্রথমেই শ্রদ্ধেয় বিদ্যুৎবাবুর (বিদ্যুৎ হালদার) প্রবন্ধ ‘কৃষ্ণনগরের মৃৎশিল্পের সদর-অন্দর’ দিয়ে সংখ্যাটির সূচনা। কৃষ্ণনগরের ঘূর্ণি মাটির পুতুলের জন্য বিখ্যাত — আমরা সকলেই জানি। সেখানকার মৃৎশিল্পীদের সদর-অন্দর, তাদের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, তাদের জীবন-জীবিকা, অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের ছবি আমরা পাই এই প্রবন্ধে। কালের অমোঘ গতিতে মৃৎশিল্পের বিবর্তন ঘটেছে সন্দেহ নেই। পূর্বের তুলনায় বর্তমানে এই শিল্প ক্রমান্বয়ে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। শিল্পী নিমাই পালের কথার সূত্র ধরে বলা যায় — “কে মৃৎশিল্পী এবং কে মৃৎশিল্পী নয়; এটাই এখন কৃষ্ণনগরের শিল্পের বড়ো ভেজাল।” যারা পুরাতনপন্থী, মৃৎশিল্পের অবক্ষয়ের ছবিটা তাদের চোখের সামনে ফুটে উঠছে। ফলে অনেকেই এই শিল্পের প্রতি আস্থা হারাচ্ছেন। পুতুলপট্টির পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে শিল্পীদের নিজের চোখে দেখেছেন প্রাবন্ধিক, তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন, তাঁর কলমে উঠে এসেছে এই শিল্পের টুকিটাকি ইতিহাস। তাদের চোখের কোনে চিকচিক করে উঠেছে জল। তবু অনেকে এই শিল্পকে ভালোবেসে তাকে এখনও আঁকড়ে ধরে আছেন। তারাই এই শিল্পের ধারক ও বাহক। তবে বিশ্বায়নের যুগের চোখ ঝলসানো আলোর মাঝে এখনও যে শিল্পীরা লম্ফ হাতে প্রতিমার চক্ষুদান করেন — এটাই আশার কথা। প্রাবন্ধিক বলছেন — “লম্ফটা তাঁদের চাইই চাই। লম্ফের আলোতেই নাকি তাঁরা সবকিছু স্পষ্ট দেখতে পান।”
তারপর ড. জয়ন্ত চৌধুরীর কলমে উঠে এসেছে ‘আমেরিকার ছবি নামচার দুটি দিন’ নামের প্রবন্ধটি, সাথে অসাধারণ ছবি। উঠে এসেছে ড. স্বাতী ভট্টাচার্য্যের কলমে শিল্পের উত্তর আধুনিকতা বা Post Modernism সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য। উত্তর আধুনিকতা কীভাবে এসেছে শিল্পক্ষেত্রে তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা প্রাবন্ধিক তুলে ধরেছেন তাঁর ‘পাশ্চাত্য শিল্পের ভাষাবদল : উত্তর-আধুনিকতা’ প্রবন্ধে। প্রাবন্ধিক বলছেন — “দুটি বিশ্বযুদ্ধের ফলস্বরূপ তীব্র বিশ্বাসহীনতা, যন্ত্রযুগের আগ্রাসন, ভয়াবহ ধ্বংসলীলা; ভোগবাদী সভ্যতার চটকদারী ও স্বতঃসিদ্ধ সাংস্কৃতিক ও সামাজিক মূল্যবোধ বারেবারেই মানুষের মনকে নানা প্রশ্নে দীর্ণ করেছিল। তার চারপাশের জগতের অন্তঃসারশূন্যতা, বৈষম্য, বৈপরীত্য, লিঙ্গভেদ তার ব্যক্তিসত্ত্বাকে নানা নিরুত্তর প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিচ্ছিল। এই প্রেক্ষিতে ‘চিরন্তন’, ‘শাশ্বত’, ‘প্রথাগত’ শব্দগুলো ধীরে ধীরে প্রাসঙ্গিকতা হারাচ্ছিল। ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে ফরাসী বাস্তববাদ বা রিয়ালিজম আন্দোলন থেকে শুরু করে প্রায় একশ বছরের পাশ্চাত্য শিল্প, শিল্পের মাধ্যম, উপকরণ নিয়ে নানা নিরীক্ষার ইতিহাস। ছবির ভাষা যে একান্তই এক ব্যক্তিগত নির্মাণ, যা শিল্পের উপাদানকে নিজস্ব আঙ্গিকে ‘শিল্পিত’ করে নিজের দাবী প্রতিষ্ঠায় সক্ষম; আধুনিকতাবাদের সঙ্গে সঙ্গে শিল্পের স্বাধিকারের এই যে বোধ দর্শকদের মধ্যে তৈরি হয়ে যাচ্ছিল, খুব সরলীকৃতভাবে বলতে গেলে উত্তর আধুনিকতা তাকেই অগ্রাহ্য করে।”
তাই ‘Post Modernism’ বা উত্তর আধুনিকতা হল বাস্তবের সঙ্গে শিল্পীর মেলবন্ধন। এর ফলে শিল্প দুর্বোধ্যতার জাঁতাকল থেকে মুক্ত হয়ে মানুষের কাছাকাছি এল। বিমূর্ত ভাব ছেড়ে তা হয়ে উঠল মূর্ত। মার্শাল দুঁশো, রবার্ট রওসেনবার্গ, জ্যাকসন পোলক, লিখটেনস্টাইল প্রমুখ শিল্পীরা Post Modernism’-কে পাশ্চাত্য দেশে প্রথম তাদের শিল্পকলায় স্থান দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।
তাছাড়া আছে তপন বাড়ুই-এর ‘বাংলা দেশের আধুনিক ভাস্কর্য’, দেবব্রত চক্রবর্তীর ‘উত্তর আধুনিক ও বিশ্বায়িত শিল্প’, মৃণাল ঘোষের ‘ভারতের বিশ্বায়ন-উত্তর দৃশ্যকলা : বাস্তবতা ও গণতান্ত্রিকতা’ ইত্যাদি। মৃণাল ঘোষ তাঁর ‘ভারতের বিশ্বায়ন — উত্তর দৃশ্যকলা : বাস্তবতা ও গণতান্ত্রিকতা’ প্রবন্ধে শিল্পের বাস্তবতাবোধ অর্থাৎ বাস্তববাদ ও গণতান্ত্রিকতা নিয়ে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে নানা উদাহরণ দিয়েছেন। বাস্তববাদ হল — “দেশ কাল অন্বিত বাস্তব পরিস্থিতি থেকে কখন জেগে ওঠে শিল্প বা তার ভিতর যখন প্রতিফলিত হয় সেই বাস্তবতার সমস্যা, তখনই সেই শিল্পকে আমরা বাস্তববাদী বা রিয়েলিস্টিক বলতে পারি।” আর গণতান্ত্রিক বলতে বুঝিয়েছেন — “একটি নির্দিষ্ট বা সীমাবদ্ধ গোষ্ঠীর বাইরে শিল্প কি অনেক মানুষকে আকৃষ্ট করতে পারছে? অনেক সাধারণ মানুষের মধ্যে দৃশ্যকলা কি কোনও সাড়া জাগাতে পারছে? শিল্পকলা কি অনেক দর্শককে আকৃষ্ট ও অনুপ্রানিত করতে পারছে?”
এ প্রসঙ্গে একের পর এক নানা চিত্র, প্রাচীন ভারতের শিল্পকলা, অজন্তা, ইলোরা, থেকে শুরু করে কালীঘাটের পটশৈলী নিয়েও তিনি ব্যাখ্যা দিয়েছেন সেই ছবিগুলির মধ্যে বাস্তববাদী ধারণা আছে কিনা? সেগুলি কি গণতান্ত্রিক আদর্শকে ছুঁয়ে যেতে পেরেছে? এরকমই একজন একনিষ্ঠ শিল্পী হিসাবে শিল্পের নির্যাসটুকু তুলে ধরেছেন এই প্রবন্ধে-যা সত্যিই অভাবনীয়। দীর্ঘ প্রবন্ধের পরতে পরতে উঠে এসেছে একজন প্রকৃত শিল্পীর ভাবনা, একনিষ্ঠতা, শিল্প সম্পর্কে গভীর প্রজ্ঞা ও জীবন বোধ।বেশ কিছু ছবির প্রতীকধর্মিতা বা সিম্বলিজম্ ব্যাখ্যা করেছেন নিপুণভাবে। আধুনিক ভারতের শিল্পকলার জনক বা নব্যবঙ্গীয় চিত্রকলার জনক অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি বাঘের পতনের চিত্র কিম্বা ‘ভারতমাতা” সেই প্রতীকধর্মিতার কথা বলে। ‘ভারতমাতা’ ভারতবাসীর মনে জাতীয়তাবোধ সৃষ্টিতে সহায়তা করেছিল আর পতিত বাঘের চিত্রটি আসলে ইংরেজ শক্তির প্রতীক।
রয়েছে সম্পাদক অমৃতাভ দে’র ‘আত্মনির্মাণ’ নামক কবিতাটি। নিজেকে নির্মাণ — অপূর্ব এক জীবনবোধ উঠে এসেছে কবিতাটিতে। আসলে আমরা প্রত্যেকেই নিজেকে নিয়ে ভাঙা-গড়া করতে চাই, এই আত্মনির্মাণ সত্যিই এক দার্শনিক অনুভূতি। ছাপা হয়েছে শিল্পী প্রণব ফৌজদার ও সমীর ঘোষের অসাধারণ দুটি সাক্ষাৎকার।
শিল্পীর শিল্পভাবনা অংশে কলম ধরেছেন অমিত বিশ্বাস, অরূপ শিকদার, দেবাশীষ সরকার, পার্থসারথী ভট্টাচার্য, সুশোভন অধিকারী থেকে শুরু করে অনেকেই। কমার্শিয়াল আর্ট-এর প্রসঙ্গ উঠে এসেছে শান্তনু দে, সুমন ভট্টাচার্য ও সুরূপা সাহা চিত্রের লেখনীতে। এছাড়াও শিল্পী নিরঞ্জন প্রধান, চিন্ময় বিশ্বাস ও শিবশঙ্কর দাসের কথাতে — ‘আটগ্রুপের কথা’; অমিতাভ মৈত্র, প্রাণেশ সরকারের কলমে ‘কবির চোখে শিল্প ও শিল্পী’ অংশটি সকলের নজর কাড়ে। তাছাড়া স্বপন কুমার মল্লিক, নিরঞ্জন কুমার শীল,মনোজ সরকার, চন্দন ওঝা-র কলমে উঠে এসেছে ‘শিল্পীর চোখের শিল্প’।
এই সংখ্যায় যাঁরা কলম ধরেছেন তাঁদের অধিকাংশই শিল্পী। তাই তাঁদের শিল্পী মানস, তাঁদের মনন, জীবনবোধ, প্রজ্ঞা সবটাই উঠে এসেছে তাঁদের সৃষ্ট প্রবন্ধে। যাইহোক সবমিলিয়ে অসাধারণ একটা সংখ্যা — যেকোনো বাণিজ্যিক সাময়িক পত্রকেও হার মানাবে — একথা বলাই বাহুল্য।

জীবনকুচি’ পত্রিকার ‘বিশেষ শিল্পকলা সংখ্যা’-র ছবি
এবার আলোচনায় আসছি ‘জীবনকুচি’-র ‘রেডিয়ো’ সংখ্যা নিয়ে। এটার প্রকাশকাল ডিসেম্বর, ২০১৭। নদীয়া জেলা বইমেলা, সপ্তদশ সংখ্যা। এই সংখ্যাটির প্রচ্ছদ শিল্পী বাপী দাস। আবারও নান্দীপাঠ দিয়ে সংখ্যাটির আলোচনা শুরু করব —
“আমাদের ছোটোবেলায় রেডিয়ো পাশে রেখে কৃষককে কাজ করতে দেখেছি। রহমত চাচা সেলাই মেশিন চালাতেন রেডিয়ো শুনতে শুনতে। সুরেশ কাকার সেলুনে রেডিয়ো চলতো সারাদিন। আমাদের একান্নবর্তী পরিবারে রেডিয়ো ছিল প্রিয় বন্ধু। রেডিয়োয় কানপেতে শুনতাম অনুরোধের আসর, যাত্রা, নাটক আরও কত কি। বাবা আকাশবাণী কথিকা বিভাগে নিয়মিত কথিকা বলতেন বহুদিন থেকেই। তাঁর হাত ধরে আকাশবাণীর স্টুডিয়ো দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল খুব ছোটোতেই। তাছাড়া আকাশবাণীর বেশ কিছু অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ায় রেডিয়োর প্রতি ভালোবাসা গড়ে উঠেছিল। রেডিয়ো এমন একটি মাধ্যম, যা আমাদের সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। রেডিয়োকে ঘিরে একদল মানুষের আবেগ এখনও চোখে পড়ে। অনেকেরই রেডিয়োকে ঘিরে কত না স্মৃতি। জীবনকুচির এবারের বিষয় তাই রেডিয়ো।”
আজকের স্মার্টফোনের যুগে ‘রেডিয়ো’ শব্দটা বড়োই বেমানান। নতুন প্রজন্মের কাছে এটা এখন কাঠের বাক্সে ভরা কিছু যন্ত্রের সমাহার ছাড়া কিছুই নয়। কিন্তু এই রেডিয়াকে ঘিরেই কত সব নস্টালজিক মুহূর্ত তা নতুনরা বুঝবে না। মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল ফুটবল ম্যাচই হোক, আর ভারত-পাকিস্তানের ক্রিকেট মাচের ধারাবিরণীই হোক এসবই আমাদের কাছেও জনপ্রিয় ছিল। বস্তুত আমাদের বাড়িতে এখনও রেডিয়ো আছে। এখনও নিয়ম করে সকালবেলায় প্রাত্যহিকী, শুনে ঘুম ভাঙে। তারপর খবর, তরজা, কিম্বা নাটক, আবার মহালয়ার ভোরে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের ‘মহিষাসুর মর্দিনী’-র সুরে এখনও বিভোর হই। তবে সবটাই আমার বাবার দৌলতে। এখনও পরম যত্নে রেডিয়োখানি আকঁড়ে ধরে আছেন, ভাবতে অবাক লাগে। এরকম রেডিয়ো — প্রিয় লোক এখনও আছেন এদিক ওদিক ছড়িয়ে। [ক্রমশ]