“আসলে নতুন প্রজন্ম রেডিয়ো আর তেমনভাবে শোনে না, যদিও রেডিয়োর অনুষ্ঠান শোনাটা এখন অনেক সহজ স্মার্ট ফোনের দৌলতে। ‘রেডিয়ো’ বলে যে একটি গণমাধ্যম ছিল, তাকে ঘিরে ছিল কত না ইতিহাস, কত না নস্টালজিক অনুভূতি, কত না নাটক-গান-যাত্রা রচিত হয়েছে সেটাই আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে চেয়েছি আমরা।” সম্পাদক, ‘জীবনকুচি’।
‘রেডিয়ো’ নিয়েও যে সংখ্যা করা যায় তা এই সংখ্যাটা করে সম্পাদক বুঝিয়ে দিয়েছেন। শুধুমাত্র আবেগতাড়িত হয়ে নয়, এই সংখ্যার পিছনে রয়েছে সূক্ষ্ম এক অনুভূতি, যা প্রতিটি লেখার পরতে পরতে ধরা পড়েছে। পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল আমি ক্রমশ অবগাহন করছি রেডিয়োর গভীরতায়। সুধীর চক্রবর্তী, তুহিন শুভ্র ভট্টাচার্য, বিদ্যুৎ হালদার, প্রদীপ বাগচী, সঞ্জীব রাহা, ইনাস উদ্দীন, সব্যসাচী বন্দ্যোপাধ্যায়, জিনিয়া রায়, সতীনাথ মুখোপাধ্যায়, শ্যামাপ্রসাদ ঘোষ, সাধন মুখোপাধ্যায়, সুদীপ ভট্টাচার্য্য, রামকৃষ্ণ দে, জনসন সন্দীপ, জয়ন্ত কুমার সরকার প্রমুখ বহু প্রাবন্ধিকের কলমে ঝলসে উঠেছে রেডিয়ো সংখ্যার পাতা। প্রতিটি লেখাই অনন্য- বিষয় বৈচিত্র্যে, লেখার গুনে, মননের সূক্ষ্ম পার্থক্যে অথবা অভিজ্ঞতার সুচারু বন্ধনে।
প্রথমেই সুধীর চক্রবর্তীর ‘আকাশবাণী’ প্রবন্ধটি দিয়েই সংখ্যাটির সূচনা। অসাধারণ কিছু অভিজ্ঞতা তিনি ভাগ করে নিয়েছেন পাঠকদের সঙ্গে। ১৯৪১ এর বাইশে শ্রাবণ রেডিয়োতে ঘোষিত রবিঠাকুরের মহাপ্রয়াণের সংবাদ কিম্বা, ১৯৪৭ এর ১৫ই আগস্ট মধ্যরাতে স্বাধীন ভারতের লোকসভার সম্প্রচার; সুচেতা কৃপালনীর কন্ঠে বন্দেমাতরম গান আর জওহরলাল নেহেরুর ভাষণ এ এক অনন্য অভিজ্ঞতা।কিন্তু এই বেতার যেন আগের তুলনায় এখন অনেকটাই ম্যাড়মেড়ে। ক্রমে ক্রমে ক্ষীয়মান হয়ে উঠছে এই যন্ত্রটির চাহিদা। বেতারের গান বাজনা তার পূর্ব আকর্ষণ হারিয়েছে। তবুও একটা আশার বাণী শুনিয়েছেন প্রাবন্ধিক —
“তবু আকাশবাণী কলকাতা চলছে, চলবে, যেমন কলকাতার ট্রাম। তবে এখনও চড়ে যে-আরাম পাই তার পঞ্চাশভাগ আনন্দ বা উত্তেজনা রেডিওতে নেই। শোনাতে তো নেইই এমন কী বেতার অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েও খুব একটা তৃপ্তি পাইনি- তার কারণ পরিকল্পনার গতানুগতিকতা।”
রেডিয়ো চলবে, কেউ শুনবে, কেউ শুনবে না -এতো স্বাভাবিক। আর এর মধ্যেই দু-চারজন রেডিয়ো পাগল মানুষ থাকবে না না তা কি হয়! তবে পরিকল্পনার গতানুগতিকতাকে ভেঙে আধুনিক যুগের চাহিদা ও মর্জিকে যদি শান দিতে পারে রেডিয়ো — তাহলেই হয়তো কিছু সংখ্যক মানুষের কাছে আরো কিছুদিন এর চাহিদা থাকবে। এমন কিছু অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা উচিত যেগুলো ছাত্রসমাজের চাহিদা মেটাবে, গান পাগল মানুষদের চাহিদা মেটাবে, গল্প প্রেমী, নাটক-যাত্রাপ্রেমী মানুষদের চাহিদা মেটাবে। তবেই আবার বৃহত্তর নাগরিক সমাজের কাছে এই যন্ত্রটির চাহিদা বাড়বে। তবে তাকে গ্রহণ করার মানসিকতাটা তৈরি করে দেওয়ার দায়িত্বও গণমাধ্যমের ও চ্যানেল কর্তৃপক্ষের।
তারপর রয়েছে তুহিন শুভ্র ভট্টাচার্যের ‘কলকাতা বেতার ও রবীন্দ্রনাথ’ প্রবন্ধটি। প্রথমদিকে কলকাতা বেতারের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে রবীন্দ্রনাথের যে কতটা অনীহা ছিল আছে তার বিস্তারিত বিবরণ। রবীন্দ্রনাথের গানের নিজস্ব একটা সুর আছে, অনেক শিল্পী নিজের খুশিমত সেটাকে বদলে আকাশবাণীতে প্রচার করত। এর জন্যও রবীন্দ্রনাথের অনুযোগ ছিল। পরে অবশ্য সেই সম্পর্কটা পাকাপোক্ত হয়েছিল। আর এব্যাপারে অশোক কুমার সেন, যিনি কলকাতা বেতার কেন্দ্রের অস্থায়ী স্টেশন ডিরেকটর ছিলেন, তাঁর অবদান ছিল সবচেয়ে বেশি। পরবর্তীতে আকাশবাণীর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ বেশ খানিকটা জড়িয়ে পড়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথের জন্মদিনে কলকাতা বেতার থেকে তাঁর বিশেষ বাণী প্রচারেও কবিকে রাজি করিয়েছিলেন অশোক কুমার সেন। কবি ‘জন্মদিন’ কবিতাটি আবৃত্তি করলেন। তাঁর আবৃত্তিতে মুখরিত হল কলকাতা বেতার কেন্দ্র সহ সমস্ত বিশ্ব। পরবর্তীতে ‘বেতার জগৎ’ পত্রিকায় কবির একটি কবিতাও ছাপা হয়েছিল রেডিয়ো নিয়ে —
“ধরার আঙিনা হতে ঐ শোনো
উঠিল আকাশবাণী।
অমর লোকের মহিমা দিল যে
মর্ত্যলোকেরে আনি।
সরস্বতীর আসন পাতিল
নীল গগনের মাঝে,
আলোক-বীণার সভামণ্ডলে
মানুষের বীণা বাজে।
সুরের প্রবাহ ধায় সুরলোকে
দূরকে সে নেয় জিনি।
কবি কল্পনা বহিয়া চলিল
অলখ সৌদামিনীর
ভাষা-রথ ধায় পূবে-পশ্চিমে
সূর্য রথের সাথে,
উধাও হইল মানব চিত্ত
স্বর্গের সীমানাতে।।”
রবীন্দ্রনাথের বেতারের প্রতি ভালবাসা তারপর থেকে একটুও টলেনি।আমৃত্যু কবি তাকে বহন করে নিয়ে চলেছেন। এরই সঙ্গে প্রাবন্ধিক উল্লেখ করেছেন বাইশে শ্রাবণ কবির মহাপ্রয়াণের দিনটির কথা। প্রখ্যাত সাহিত্যিক সাংবাদিক এবং চিত্রগ্রাহক পরিমল গোস্বামী সেদিন কলকাতা বেতারের অনুষ্ঠানগুলি শুনেছিলেন। পরবর্তী সময়ে সেদিনের স্মৃতি তিনি তাঁর গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন —
“কি বিপুল বিষণ্ণতা আর শোক বিহ্বলতা বাংলার বুকে।….যখন তাঁর সত্য মৃত্যু ঘটল, তখন চিন্তা অসাড় হয়ে গিয়েছিল। রেডিওতে খবর, চোখে ধারা বয়ে যাচ্ছে। আমি তখন কৈলাস বসু স্ট্রীটে বাস করি।…. বাংলার সমস্ত পরিবেশ থেকে সমস্ত বাঙালির হৃদয় থেকে, রবীন্দ্রনাথরূপী সুন্দর পুরুষ মূর্তি হঠাৎ ‘নেই’ হয়ে গেল, মনের উপর এ এক নির্মম আঘাত।মনকে যে কি পরিমাণ চিন্তামূঢ় করে তুলেছিল তা ভাষায় বোঝানো অসম্ভব। দৈহিক ব্যাধি বেদনা সাময়িকভাবে ভুলে গিয়েছিলাম। তারপর রাত্রে আবার রেডিয়োতে শুধু রবীন্দ্রনাথের কথা। সুনীল রায়ের কন্ঠে গান শুনেছি, —
“সমুখে শান্তি পারাবার / ভাষাও তরণী হে কর্ণধার।”

‘জীবনকুচি’ পত্রিকার ‘রেডিয়ো’ সংখ্যার কভার পেজের ছবি
তাছাড়া প্রাবন্ধিক বিদ্যুৎ হালদারের ‘বন্ধুর মত বন্ধু’ প্রবন্ধে প্রাবন্ধিক তাঁর ছেলেবেলার রেডিও পাগলামির বহু নিদর্শন দিয়েছেন। উঠে এসেছে নস্টালজিক সব মুহূর্তের কথা। চারপাশের এত পরিবর্তনের পরেও লেখক ও লেখকদের পরিবার যে আবার নতুন করে ‘বন্ধুর মত বন্ধু’ খুঁজছেন তাতেই বোঝা যায় রেডিও এখনো হারিয়ে যায়নি,এখনো সকলের অলক্ষ্যে সে তার কাজ করে যাচ্ছে। তাছাড়া সঞ্জীব রাহার ”আমার রেডিও শোনা’, ইনাস উদ্দীনের ‘আমার রেডিও’ আবার জিনিয়া রায়ের ‘বেতার জগৎ: ঝলক ফিরে দেখা’ প্রবন্ধে ‘বেতার জগৎ’ পত্রিকার বিস্তারিত তথ্য সকলের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছেন। সকলের লেখাতেই একটা জিনিস লক্ষ্য করলাম সেটা হল তাদের ভিডিও শোনার অভিজ্ঞতা ও রেডিওকে ঘিরে তাদের নস্টালজিক সব মুহূর্তের কথা। এই সংখ্যার মূল লক্ষ্য রেডিওকে নিয়ে যেসব অভিজ্ঞতার কথা অর্বাচীনদের কাছে তুলে ধরা, আধুনিক প্রজন্মের কাছে রেডিও পাগলামির কথা তুলে ধরা। যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই যন্ত্রটিও যাতে হারিয়ে না যায় তার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন সম্পাদক। সব মিলিয়ে অসাধারণ এক সংখ্যা। [সমাপ্ত]