নদিয়া জেলার সদর শহর কৃষ্ণনগর থেকে প্রকাশিত আর একটি মননশীল সাহিত্য পত্রিকা হল ‘মুদ্রা’। এটি বিশেষত প্রবন্ধ বিষয়ক পত্রিকা। পত্রিকার সম্পাদক শৈবাল সরকার। সংযুক্ত সম্পাদক তমাল বন্দ্যোপাধ্যায় ও অনির্বাণ জানা।১৯৯৭-৯৮ সাল নাগাদ পত্রিকাটির প্রথম আত্মপ্রকাশ ঘটে। শুরুতে মাসিক পত্রিকা হিসাবে এর যাত্রা শুরু।তখন বিশেষ কোনো সংখ্যা হয়নি। সাধারণ সংখ্যা হিসাবেই প্রকাশিত হত। তবে বেশ কিছুদিন স্বনামে ‘মুদ্রা’ সাপ্তাহিক ট্যাবলয়েড আকারেও প্রকাশিত হত। এরপর বেশ কিছু বছর পত্রিকার প্রকাশ বন্ধ হয়ে যায়। তবে থেমে থাকেনি মুদ্রার পথ চলা। ২০১৬ নাগাদ সম্পাদক শৈবাল সরকারের হাত ধরে আবার নবপর্যায়ে ‘মুদ্রা’ বাৎসরিক পত্রিকা হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। আসলে লিটল ম্যাগাজিনের চরিত্রটাই এমন। উত্থান, পতন, থেমে যাওয়া, রাগ, অভিমান, অর্থের অভাবে নানা সময় থমকে যায় এর পথ চলা। কিন্তু ‘মেঘ দেখে কেউ করিস নে ভয়’ — এই ভয় জয় করে ব্যোম কালি বলে কাজে নেমে পড়েন অনেকেই। এখানেই লিটল ম্যাগাজিনগুলির সার্থকতা। নামে ‘লিটল’ হলেও এগুলি ‘লিটল’ নয়, আসলে তা গ্রেট-ই। নবপর্যায়ে ‘মুদ্রা’র এখনো পর্যন্ত চারটি বিশেষ সংখ্যা হয়েছে।চারটি সংখ্যাই যেন এক একটি রত্নগর্ভা মাতা। এই চারটি সংখ্যা হল —
১)’মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র ও সমকাল’, ২) ‘জলাঙ্গী নদী’ বিশেষ সংখ্যা, ৩) ‘রবীন্দ্রনাথের গান’, ৪) ‘সেই সব সাহেবেরা’
এবার আমি এই বিশেষ সংখ্যাগুলি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব। প্রথমেই আলোচনা করব ‘জলাঙ্গী নদী’ বিশেষ এই সংখ্যাটি নিয়ে। এটি প্রকাশিত হয় বাংলা ১৪২৪ বঙ্গাব্দে।
‘মুদ্রা’ পত্রিকা
পত্রিকাটির প্রকাশক সৈকত সরকার ও সুমন সরকার। ২৮, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রোড, এ ভি স্কুল মোড়, কৃষ্ণনগর নদীয়া।সংখ্যাটির প্রচ্ছদ এঁকেছেন শান্তনু দে।অলঙ্করণে ছিলেন শান্তনু দে/শেখর দে। ব্লার্বের ছবিতে রয়েছেন — মৃণাল বিশ্বাস। সংখ্যাটির বিশেষ সহযোগিতায় ছিলেন আনন্দবাজার পত্রিকার সাংবাদিক ও নদী বিশেষজ্ঞ সুপ্রতিম কর্মকার মহাশয়। হঠাৎ করে ‘জলাঙ্গী’ নদীকে নিয়ে একটি গোটা সংখ্যা কেন? বর্তমান কালখন্ডে দাঁড়িয়ে ‘জলাঙ্গী নদী’ সংখ্যার প্রাসঙ্গিকতা আছে বইকি। আর তাই তো এহেন বিষয় নিয়ে সংখ্যা করা শুধুমাত্র লোক দেখানো নয়, এ এক গভীর দায়বদ্ধতা।
“নদী, নদী, নদী,
সোজা যেতিস যদি,
সঙ্গে যেতুম তোর
আমি জীবনভর।
তা নয় গেলি বেঁকে,
সোজা সহজ পথের থেকে।”
শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কলমে নদীর প্রতি ভালোবাসার চিত্র ফুটে উঠেছে একটি মাত্র পঙক্তিতেই ”সঙ্গে যেতুম তোর, আমি জীবন ভর”। তেমনি নদীর প্রতি মানুষের টান আজন্ম। কিন্তু সেই নদী আজ বিপন্ন। মানুষের স্বার্থে নদীই আজ হারাতে বসেছে। শীর্ণকায়, জলাভাবে ধুঁকছে নদীগুলো। আমাদের সাধের জলাঙ্গীও আজ বিপন্ন। একসময় জীবনানন্দ দাশ তাঁর কবিতায় লিখেছিলেন —
“আবার আসিব আমি বাংলার নদী মাঠ ক্ষেত ভালোবেসে।/জলাঙ্গীর ঢেউয়ে ভেজা বাংলার এই সবুজ করুণ ডাঙায়।”
কিন্তু জলাঙ্গীর ঢেউ তো তখনই হবে যখন জল থাকবে অগাধ। সে ঢেউ আজ আর নেই। গ্রীষ্মকালে কোনো কোনো জায়গায় জলাভাবে নদীর হাড়গিলে, শীর্ণকায় চেহারাটাও প্রকট হয়ে ওঠে।
একসময় এই নদীই ছিল দুকূলের মানুষের বেঁচে থাকার আশ্রয়। নদী ছিল তার মায়ের মতো, ‘নদীমাতৃক’ নামটার উৎপত্তিও হয়তো বা এভাবেই হয়েছিল। নদীর মাছ যেমন তার খাদ্য ছিল, জলপথে পরিবহণের খরচও অনেক কম ছিল, তেমনি কৃষিকাজেও মানুষ ব্যবহার করত নদীর জল। এজন্য সিন্ধু সভ্যতা, মিশর কিম্বা চৈনিক সভ্যতার মতো গুরুত্বপূর্ণ সভ্যতাগুলো প্রাচীনকালে নদীর ধারেই গড়ে উঠেছিল। যেমন — নীলনদ না থাকলে মিশর হয়তো হয়ে উঠত মরুভূমির দেশ। কিন্তু নীলনদ মিশরকে শস্য-শ্যামলা — সুজলা-সুফলা ভূমিতে পরিণত করেছে। এজন্য গ্রীক ঐতিহাসিক তথা ‘ইতিহাসের জনক’ হেরোডোটাস মিশরকে “Gift of Nile” বা ‘নীলনদের দান’ বলেছেন।
তেমনি ‘জলাঙ্গী’ নদীরও সুদীর্ঘ এক ইতিহাস আছে। তার উৎপডির ইতিহাস, তার দুতীরের মানুষজনের হাসি-কান্না- হতাশা-বেদনা যেন সে নিজেই বহন করে নিয়ে চলেছে। সে মানুষের সুখে যেমন থেকেছে, থেকেছে মানুষের দুঃখেও।কিন্তু আজ জলাঙ্গী বড়ো বিপদে,তাই আজ সময় এসেছে তার পাশে এসে দাঁড়ানো। সচেতন মানুষ হিসাবে আজ সময় এসেছে শীর্ণকায় এই নদীটিক রক্ষা করা। সম্পাদক সম্পাদকীয়তে লিখছেন —
“বড়লোকের বাউন্ডুলে ছেলের মতন আমরা, রয়ে সয়ে খরচ করতে জানি না।বসে খেলে রাজার ধনও ফুরায়।ফলে একদিন সবকিছুই ধ্বংস হবে, নদীও হবে শেষ।
নদীকে আপন বেগে চলতে না দিয়ে, তাকে আমাদের ইচ্ছামতো চালনা করতে গিয়ে শেষ করে ফেলেছি।আমরা মানুষেরা নিজেদের প্রয়োজনে ভয়ংকর নিষ্ঠুর হতে পারি, প্রয়োজনের খাতিরেই আমরা নদীকে ধংস করেছি।তাৎক্ষণিক প্রয়োজনে আমরা বৃহত্তর প্রয়োজনের কথা ভুলে যাই। ফলে যা হবার তাই হলো অভিমানী নদীগুলো হারাতে বসেছি। আমাদের খেয়াল রইলো না কখন নদীগুলোকে আমরা হারিয়ে ফেলেছি। যে নদীগুলো এখনো বেঁচে-বর্তে আছে, সেগুলো জলাভাবে শীর্ণ। সেই শীর্ণ নদীগুলোকে নিয়ে আমাদের হা হুতাস। আজ আমরা বুঝতে পারছি পরিবেশকে সুস্থ রাখতে গেলে নদীকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে।
আমাদের প্রিয় জলাঙ্গীও এমনই মানুষোচিত কৃতকর্মের ফলে আজ বিপন্ন। সেই হারিয়ে যাওয়া জলাঙ্গীকে নিয়ে এবারের মুদ্রা।”
ছেড়ে আসা গ্রামের জন্য যেমন আমাদের মন কেমন করে, জলাঙ্গী নদীর সঙ্গে একাত্মমনা মানুষগুলোও সেই জলাঙ্গীকেও আর হয়তো তেমন আপন করে পায় না।
”নদী তুমি কোথা হইতে আসিয়াছো?” মনে পড়ে জগদীশচন্দ্র বসুর মুখে সেই উক্তি। আমাদেরও এমন আকাঙ্ক্ষা জাগে বইকি! নদী বয়ে যাক অনন্তকাল ধরে, দুতীরের মানুষের হাসি-কান্নাকে বুকে নিয়ে। তাই তো চারিদিকে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে সচেতনতার বার্তা, মাঝে মাঝেই চলছে অনুষ্ঠান, সেমিনার। সম্প্রতি কৃষ্ণনগর শহরের একটি নদী প্রেমী সংস্থা ‘জলাঙ্গী বাঁচাও কমিটি’-র উদ্যোগে ১৭ই ফেব্রুয়ারি দিনটিকে ‘জলঙ্গি দিবস’ হিসাবে পালন করল।
সাধু উদ্যোগ। কিন্তু সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে সচেতনতার বার্তা। নদী বাঁচলে আমরা বাঁচব-এই হোক আমাদের শ্লোগান।
প্রথমেই কলম ধরেছেন সদ্য প্রয়াত অধ্যাপক সুধীর কুমার চক্রবর্তী। তিনি তাঁর প্রবন্ধ ‘আমাদের সেই নদীর নামটি জলাঙ্গী’-তে জলাঙ্গীর সঙ্গে কাটানো শৈশব, পৌঢ়ত্বে পৌঁছে নদীর সঙ্গে বিচ্ছেদের এক অপরূপ চিত্র নির্মাণ করেছেন। তিনি বলছেন —
“জলে না নামলে কি জীবনের পাঠ সম্পূর্ণ হয়? মনে পড়ে বড় হয়ে হারিয়ে ফেলেছি শেষ কৈশোরের দুর্মর দুর্দান্ত সাহসী সব জলের পাড়াতুতো বা নদীতুতো বান্ধবদের। সকালে দশটা থেকে বারোটা আর বিকেলে চারটে থেকে পাঁচটা/ছটা, যতক্ষণ না পশ্চিমপারে সুয্যি ডোবে একেবারে অনিবার্য ডাক আসত জলাঙ্গীর বুক থেকে।”
শৈশবে নদীর সঙ্গে স্বাভাবিক ভাবেই তৈরি হয়েছিল তাঁর মিতালি। নদীর তীরে দল বেঁধে বেড়াতে যাওয়া, কোমর জলে দাঁড়িয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ননস্টপ আড্ডা; ”খালি গায়ে, হাফপ্যান্ট পরে, গামছা একটা কোমরে বেঁধে খালি পায়ে সোজা একছুটে ছুতোর পাড়ার ঘাটে সেই বহুদিনের চেনা বুকজলে ঝাঁপ দেওয়া, যেন মায়ের কোলে এসে পড়েছি।সেই আলগা স্রোত, সেই গাঢ় কোমল রোদে-ভেজা স্নিগ্ধ জল, সেই বালির স্পর্শ, সেই শ্যাওলার গন্ধ আর ছোট ছোট রুপোলি রঙের চুনোচানা মাছেদের ঠোক্কর।” এসবই জলাঙ্গীর সঙ্গে আশ্চর্য এক মিতালির গল্প। কত সব বিচিত্র অভিজ্ঞতা আমাদের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছেন প্রাবন্ধিক। [ক্রমশ]