জলঙ্গীর বর্তমান সমস্যা, জল দূষণ, কচুরিপানা ইত্যাদির কারণে নদীটি ধুঁকছে। বিপণ্নতার হাত থেকে এই নদীকে বাঁচাতে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে তার বার্তাও দিয়েছেন প্রাবন্ধিক —
“নদীকে বাঁচাতে হবে আজ আমাদের। নদী বাঁচলে আমরা বাঁচব।বেঁচে থাকার এই প্রাথমিক শর্তটাকে বুঝতে হবে। তার জন্য আমাদের কতগুলো দায়িত্ব পালন করতে হবে।
১. রিমোট সেন্সিং ও জি. আই. এস কে ব্যবহার করে (যেমন ‘নদীর চালের মানচিত্র বা Slope map, উপগ্রহ চিত্র, উচ্চতা মানচিত্র (Elevation Map), আসপেক্ট ম্যাপ প্রভৃতি) নদী অববাহিকার সঠিক ব্যবস্থাপন মানচিত্র তৈরি করতে হবে।
২. নদীতে সরাবছর ধরে অবিরল ও নির্মল জলস্রোতকে বজায় রাখতে হবে।
৩. ভৌম জলের ব্যবহারকে নিয়ন্ত্রনে আনতে হবে।
৪. নদীর পাশের অংশ থেকে যত্রতত্র মাটি কাটা বন্ধ করতে হবে।
৫. নদীর অববাহিকা জুড়ে বৃষ্টির জলকে ধরে রাখতে হবে।
৬. নদীর অববাহিকা জুড়ে সবুজের ব্যাপ্তিকে বাড়াতে হবে।
৭. নদীর বুকে বর্জ্য ফেলা বন্ধ করতে হবে। সরকারী উদ্যোগে নয়, নিজেকে আগে বুঝতে হবে নদী ডাস্টবিন নয়।
৮. নদীর জলের গুণগত মানকে বজায় রাখবার জন্য অববাহিকা জুড়ে কৃষিজমিতে পেস্টিসাইড’ বা ‘কীটনাশকের ব্যবহার ও রাসায়নিক সারের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।”
সবশেষে রয়েছে জলঙ্গীকে কেন্দ্র করে বিশেষ কিছু কবিতা ও নির্বাচিত কিছু নদী মানচিত্র, যা সংখ্যাটির একঘেয়েমি কিছুটা কমিয়েছে।
সবমিলিয়ে অসাধারণ একটা সংখ্যা জলঙ্গীকে জানতে নিহাররঞ্জন রায়ের ‘বাঙালীর ইতিহাস, আদি পর্ব’ পড়তে হবে না; পড়তে হবে না — কল্যাণ রুদ্রের ‘বাংলার নদী কথা’, সৌমেন কুমার গুপ্তের ‘পদ্মাপারের ইতিকথা’, হরি ণারায়ণ মণ্ডলের ‘কালান্তরের কৃষি’ বা সায়ন্তনী ভট্টাচার্যের ‘জলঙ্গী, তোমার জল কোথায়’ প্রবন্ধ বা প্রবন্ধের বই। ‘মুদ্রা’র এই সংখ্যাটিই অনুসন্ধিৎসু পাঠকেরতৃষ্ণা অনেকটা মেটাবে সন্দেহ নেই। যাইহোক এত স্বল্প কথায় এত ভালো একখানা সংখ্যা নিয়ে আলোচনা করার শেষ করা যায় না। তবুও কলম থামাতে হচ্ছে- কারণ ক্রমণ প্রকাশ্য। আমি সবটা বলে দিলে পাঠকের মূল বইট পড়ার আগ্রহ থাকবে না। তাই মিছিমিছি সম্পাদকের চক্ষুশূল হতে চাই না। অতএব কেটে পড়ি। না, ভালোকথা মনে করিয়ে দিয়েছেন তো। আলমারি থেকে উঁকি মারছে ‘মুদ্রা’র আরেকটি বিশেষ সংখ্যা — ‘রবীন্দ্রনাথের গান’। অতএব এবার এটা পড়া থাক। তারপর আবার লিখব এটা নিয়ে।

‘মুদ্রা’ পত্রিকার ‘জলাঙ্গী নদী’ সংখ্যার চিত্র
এবারে কথা বলব ‘মুদ্রা’-র ‘রবীন্দ্রনাথের গান’ সংখ্যাটি নিয়ে। তবে এ বিষয়ে খুব বেশি কথা হয়তো আমার মতো রবীন্দ্রনাথের সংগীত অজ্ঞের পক্ষে বলা সম্ভব নয়। তবুও চেষ্টা করা যাক। ১৪২৮ বঙ্গাব্দে এই সংখ্যাটি প্রকাশিত হয়। এই সংখ্যার প্রচ্ছদ এঁকেছেন শান্তনু দে।
বাংলা সাহিত্যের দিকপাল বটবৃক্ষ স্বরূপ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, এক বহুপ্রজ সাহিত্যিক, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, কবি, দার্শনিক, গীতিকার, সুরকার, শিক্ষক। শরৎচন্দ্র যেমন বলেছিলেন — “কবিগুরু তোমার প্রতি চাহিয়া আমাদের বিস্ময়ের সীমা নাই”
রবীন্দ্রনাথ আমাদের সেই পরম বিস্ময়। কিন্তু বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এই মানুষটির আরো অনেক দিক নিয়েই সংখ্যা করা যেত। কিন্তু ‘রবীন্দ্রনাথের গান’ কেন?
উত্তর আছে সম্পাদকীয়তে — “রবীন্দ্রনাথের ১৬০ তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে, ‘মুদ্রা’র এই সংখ্যা রবীন্দ্রনাথকে নিবেদিত। রবীন্দ্রনাথের বহুমুখী প্রতিভার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সৃষ্টিধারা সংগীতকেই আমরা পত্রিকার বিষয় হিসাবে বেছে নিয়েছি।”
রবীন্দ্রনাথের গান আমাদের প্রাণের আরাম, হৃদয়ের আবেশ যা আমাদের মর্মকে স্পর্শ করে। তাঁর গান আমাদের হৃদয়ের শিরায়, উপশিরায় প্রবাহিত। তাঁর গান শুনতে শুনতেই বড়ো হওয়া। নিস্তব্ধ রাতে একান্তে তাঁর গানে মশগুল হয়ে থাকতে থাকতে এমন এক অনুভূতি হয় যেন ক্রমে ক্রমে আমি ডুবে যাচ্ছি গভীরে, আরো গভীরে। তবে অন্যান্য গানের চাইতে রবীন্দ্রনাথের গান স্বতন্ত্র।এ বিষয়ে অবশ্য তর্ক বিতর্ক আছে।
রবীন্দ্রনাথের গান অন্যান্য গানের চাইতে কেন আলাদা? রবীন্দ্রনাথের এমন অনেক গান আছে যেগুলো কবিতা হিসাবেও পড়া যায়। তাহলে রবীন্দ্রনাথের গানে কোনটার প্রাধান্য সুর না কথা? প্রাবন্ধিক সুভাষ ভট্টাচার্য লিখছেন — “রবীন্দ্রনাথের গানের আলোচনায় অনেককাল যাবৎই দেখি কথা বা বাণী বা গানের কবিতা নিয়ে যত আলোচনা হয়, তত হয় না সুর নিয়ে। … রবীন্দ্রনাথের গানে কথা আর সুরের মধ্যে কোনটির প্রাধান্য-এ তর্ক বহুদিনের। রবীন্দ্রনাথেরই কথার সূত্র ধরে আবু সয়ীদ আইয়ুব কথাটা তুলেছিলেন আর একবার। অবশ্য রবীন্দ্রনাথ নিজেই দুরকম কথা বলেছিলেন দুই সময়ে। গীতবিতানের বহুগান যে কবিতা হিসেবেই পাঠ করা যেতে পারে, একথা তো তাঁরই।”
কথা না সুর এ প্রসঙ্গে না গিয়ে আমরা বলতে পারি রবীন্দ্রনাথের গানের মধ্যে আছে এমন এক উপাদান, যার শৈল্পিক মূল্য তুলনারহিত। তাঁর নিজের গানের মূল্য সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথ যথেষ্ট সচেতন ছিলেন। মি. টমসনকে তিনি একবার বলেছিলেন —
“আমি জানি; আমার গানে আমি কিছু নতুন উপাদান নিয়ে এসেছি। আমি পাঁচশো নতুন গান তৈরি করেছি, হয়তো বা তার বেশিই। এই বিকাশ আমার কবিতার সমান্তরালে। যাই-হোক, আমার সক্রিয়তার এই দিকটিকে আমি বেশ ভালোবাসি। আমি আমার গানের মধ্যে হারিয়ে যাই আর তারপর মনে হয় এগুলিই আমার শ্রেষ্ঠকাজ; আমি সম্পূর্ণ আছন্ন হয়ে থাকি। প্রায়ই আমার মনে হয়, যদি আমার সমস্ত কবিতা মানুষ ভুলেও যায়, আমার দেশের লোকের কাছে আমার গান স্থায়ীভাবে র’য়ে যাবে … তাছাড়াও আমি আমার গানগুলির শৈল্পিক মূল্য বুঝতে পারি। তাদের এক সুমহান সৌন্দর্য আছে। যদিও আমার প্রদেশের বাইরে তাদের কেউ জানতে পারবে না আর আমার বেশিরভাগ কাজই আস্তে আস্তে হারিয়ে যাবে, তবু তাদের আমি উরাধিকার হিসেবে রেখে যাচ্ছি।”
আলোচ্য সংখ্যায় রয়েছে কিছু নতুন লেখা আর কিছু প্রবন্ধের পুণর্মুদ্রণ।
অমিত্রসূদন ভট্টাচার্য, রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়, সুশোভন অধিকারী, তিলোত্তমা মজুমদার, শ্রীজাত, স্বপনবরণ আচার্য, জয় গোস্বামী, বিদ্যুৎ হালদার, অমৃতাভ দে, পবিত্র সরকার, শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ লেখকদের প্রবন্ধে উদ্ভাষিত হয়েছে পত্রিকার এই সংখ্যাটি। ঝকঝকে প্রচ্ছদ, দামটাও নেহাত কম নয়। এরকম দামী একটা সংখ্যা নেওয়ার লোভটাও সামলাতে পারিনি। তবে হ্যাঁ বইটা কিনে ঠকিনি। এত ভালো ভালো প্রবন্ধে ভরপুর একটা সংখ্যা ইতিপূর্বে আমি দেখিনি।
কেন এই সংখাটি নিতে গেলাম সে সম্পর্কে দু-চার কথা বলি। বেশ কিছুদিন PSC Assistant Teacher-এর পরীক্ষার জন্য পড়াশোনা করেছিলাম। সেই সিলেবাসে কাজী আবদুল ওদুদ-এর ‘নির্বাচিত প্রবন্ধ’-এর মধ্যে রবীন্দ্রনাথের ‘গান’ প্রবন্ধটি ছিল। সেই প্রথম তাঁর গান সম্পর্কে প্রবন্ধ পড়ার সূত্রপাত। ‘মুদ্রা’র এই সংখ্যাটা দেখেই আমার ওদুদ সাহেরের প্রবন্ধটির কথা মনে পড়ল। ‘মুদ্রা’র স্টলে গিয়ে কিনেও ফেললাম আস্ত একখানা সংখ্যা।
ওদুদসহেব তাঁর ‘রবীন্দ্রনাথের গান’ প্রবন্ধের শুরুতে লিখছেন — “রবীন্দ্রনাথের সুর-সৃষ্টিতে মৌলিকতা অনেকখানি। কিন্তু সেই সুর বাদ দিয়ে কবিতা- হিসাবেও তাঁর গানগুলো পড়া যেতে পারে, আর পড়ে যে- আনন্দ পাওয়া যায় তার স্বাদ বেশ নূতন রকমের।”

‘মুদ্রা’ পত্রিকার ‘রবীন্দ্রনাথের গান’ সংখ্যার চিত্র
কী আধ্যাত্মিক সংগীত, বাউল, টপ্পা, ঠুংরি, গজল, দেশাত্মবোধক সংগীত, ধ্রুপদ, ধামার, ভাঙাগান, আনুষ্ঠানিক সংগীত, প্রেম সংগীত সর্বত্র তাঁর বিচরণ। বাঙালির আবেগ-অনুভূতি, সরস প্রাণের, লীলাখেলা, আনন্দ-বেদনা, দুঃখ-হতাশা, নৈরাশ্য, আত্মসমর্পণ সবই তাঁর গানের বিষয়। প্রাবন্ধিকদের কলমে উঠে এসেছে এক এক দিক,যা রীতিমতো সংখ্যাটিকে মাধুর্যমন্ডিত করে তুলেছে সন্দেহ নেই আর কিছু আলোচনা করছি না এ সংখ্যা নিয়ে। আপাতত শেষ করছি। পরে আবার বাকি দুটি সংখা নিয়ে আলোচনা করব।