তবুও প্রয়াস
নদিয়া জেলার লিটল ম্যাগাজিনের তালিকার মধ্যে যে নামটি আমার সব থেকে বেশি করে মনে পড়ছে সেই লিটল ম্যাগাজিনটির নাম ‘তবুও প্রয়াস’। ২০১৩ সালে এই ছোটো পত্রিকাটির পথ চলা শুরু হয়। এর সম্পাদক সেলিম উদ্দিন মণ্ডল। প্রথমে এটি ছিল ত্রৈমাসিক পত্রিকা। এখন বছরে একটি বা কখনো কখনো দুটি সংখ্যা প্রকাশ পায়। সাধারণ সংখ্যার পাশাপাশি প্রকাশিত হয় বিশেষ আকর্ষনীয় সংখ্যাও। এখনো পর্যন্ত যে যে বিশেষ সংখ্যা হয়েছে তা হল —
‘নৌকা’, ‘বাংলার কুটির শিল্প’, ‘গোপাল ভাঁড়’ ‘সত্যজিৎ রায়’ সংখ্যা। পরবর্তী সংখ্যার বিষয় হবে ‘ঋতুপর্ণ ঘোষ’ সংখ্যা।
এর মধ্যে ‘গোপাল ভাঁড়’ সংখ্যাটি নিয়ে আমি পূর্বে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। এবার সময় এসেছে সত্যজিৎ রায় এই সংখ্যাটা নিয়ে কথা বলার। এটা কি একটি লিটল ম্যাগাজিন না বাণিজ্যিক পত্রিকা — যে কেউ এর তফাতটা করতে পারবেন না। ৪৯৫ পাতার ঝকঝকে একটা সংখ্যা। অসাধারণ গবেষণালব্ধ ফসল। নতুন গবেষকদের দারুণ কাজে দেবে এই সংখ্যাটি।
আজকের দিনে যদি সারা পৃথিবীতে চলচ্চিত্র অঙ্গণে কয়েকজন চলচ্চিত্র নির্মাতার তালিকা করা হয়, নিঃসন্দেহে জেমস ক্যামেরুন, স্টিফেন স্পিলবার্গ, জর্জ লুকাস, টিম বার্টন সবার উপরে অবস্থান করবেন। কিন্তু গত শতাব্দীতে যে নামটা সন্দেহাতীত ভাবে উচ্চারিত হত তিনি আর কেউ নন, ভারতের বহুমুখী ও বহুপ্রজ চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়। ভারতীয় চলচ্চিত্র অঙ্গনে তিনি সব্যসাচীর ন্যায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। তিনি এমনই এক উজ্জ্বল নক্ষত্র যিনি বাংলা চলচ্চিত্র তো বটেই এমনকি পুরো উপমহাদেশের চলচ্চিত্রকে এক ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে গিয়েছিলেন। শুধুমাত্র চলচ্চিত্র পরিচালক হিসাবেই নয়, প্রয়োজক, চিত্রনাট্য রচয়িতা, কথা সাহিত্যিক, চিত্রশিল্পী হিসাবেও তাঁর খ্যাতি সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিল। সত্যজিৎ রায় বাংলা চলচ্চিত্র জগতে শুধু একটা নাম নয়, বাঙালি জীবনে একটা আবেগের নাম সত্যজিৎ রায়। সত্যজিৎ মানে প্রেম, সত্যজিৎ মানে বাঙালিকে নতুন করে খুঁজে পাওয়া। পরিশীলিত মনন ও তীক্ষ্ণ ধীশক্তির অধিকারী সত্যজিৎ চিরকালই প্রগতিশীল ও আধুনিক মানসিকতার পরিচয় দিয়েছেন-যা যে কোনো বাঙালি তথা ভারতীয়ের কাছে অত্যন্ত আনন্দের।
১৯৪৯-৫০ সালে বিখ্যাত ফরাসি পরিচালক জঁ রেনোয়া ‘The River” ছবির শুটিং করতে কলকাতায় এসেছিলেন। তিনি ও তাঁর কয়েকজন বন্ধু মিলে একত্রে সেই শুটিং দেখতে জড়ো হতেন। তাঁর এভাবেই চলচ্চিত্র রচনার অনুপ্রেরণা পান তিনি। ইংল্যান্ডে থাকাকালীন ইউরোপের বিখ্যাত সব সিনেমা দেখার সুযোগ পান তিনি। দেশে ফিরে আসেন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পথের পাঁচালী’ উপন্যাসের খসড়া চিত্রনাট্য নিয়ে। শুটিং শুরু হল। টাকার অভাবে অনেকবার বন্ধ হয়ে যায় শুটিং। অতঃপর পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্য মন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায়ের উদ্যোগে চলচ্চিত্রটির কাজ শেষ হয়। ১৯৫৫ সালের ২৬ আগস্ট মুক্তি পায় ‘পথের পাঁচালী’। ছবির সঙ্গীত পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন তৎকালীন সময়ের বিখ্যাত সেতার বাদক পণ্ডিত রবিশংকর। ‘পথের পাঁচালী’ শ্রেষ্ঠ পাশ্চাত্য সিনেমার সমগোত্রজ হিসাবে বিবেচিত হল। তারই স্বীকৃতি স্বরূপ কান চলচ্চিত্র উৎসবে ‘পথের পাঁচালী’ ‘মানবতার শ্রেষ্ঠ দলিল’ বা ‘The Best Human Document’ শিরোপা নিয়ে পুরষ্কৃত হল। তারপর ‘পথের পাঁচালী’র পরবর্তী অংশ নিয়ে তিনি তৈরি করলেন ‘অপরাজিত’ ও ‘অপুর সংসার’, যা অপু ট্রিলজি বা ‘অপুত্রয়ী’ নামে পরিচিত।
তাছাড়া তাঁর পরিচালিত অন্যান্য ছবি যেমন — ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’, ‘জলসাঘর’, ‘নায়ক’, ‘আগন্তুক’ ‘পরশপাথর’, ‘অশনি সংকেত’, ‘প্রতিদ্বন্দ্বী ‘ঘরে বাইরে’ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। তাছাড়া রবীন্দ্রনাথের ‘নষ্টনীড়’ গল্প অবলম্বনে তৈরি ‘চারুলতা’ —এই সিনেমায় মাধবী চক্রবর্তীর অভিনয় দর্শকদের নজর কাড়ে। পাশাপাশি ছোটোদের জন্য নির্মিত ‘হীরক রাজার দেশে’, ‘সোনার কেল্লা’, ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’, ইত্যাদি চলচ্চিত্রগুলিও জনপ্রিয়তার শীর্ষে। বাংলা ভাষা ছাড়াও হিন্দি ভাষায় মুন্সি প্রেমচাঁদের ‘শতরঞ্জ কে খিলাড়ি’ নামেও একটি উপন্যাসকে তিনি চলচ্চিত্রে রূপ দেন।
চিত্রাঙ্কণ ও সঙ্গীত পরিচালনার পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন বিশিষ্ট সাহিত্যিক। সহজ ভাষায় তথ্যসমৃদ্ধ তাঁর অপূর্ব লেখনী বাঙালি পাঠককে আপ্লুত করে। তাঁর সৃষ্ট গোয়েন্দা চরিত্র ফেলুদা সারা বাংলা শ্রেষ্ঠ সাহিত্য গোয়েন্দার শিরোপা অর্জন করেছে। পাশাপাশি প্রোফেসর শঙ্কুকে নিয়ে অদ্ভুত সব কল্পবিজ্ঞান বা ‘Science Fiction’-এর গল্প সারা বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। সম্পাদকীয়তে সম্পাদক বলছেন —
“এ বছর সত্যজিৎ রায়ের জন্ম শতবর্ষ। সত্যজিৎ নিছক একটি নাম নয়। বাঙালির এক আইকন। তাঁকে নিয়ে আমাদের উচ্ছ্বাস আর আগ্রহের কোনো শেষ নেই। এই করোনা কালীন সময়েও বিভিন্ন মানুষ সত্যজিতের জন্ম শতবর্ষ পালন করে চলেছেন। একাধিক পত্র পত্রিকা তাঁকে স্মরণ করে সংখ্যা করছে। আমরা ‘তবুও প্রয়াস’ থেকে একটা সংখ্যা করলে কেমন হয় ? যখন ভেবেছি, বারবার মনে হয়েছে- তাঁর সুবিশাল কর্মকান্ড একটি সংখ্যার একত্রীকরণ সম্ভব নয়। তবে আমরা কোন বিষয়ে আলোকপাত করব? আমরা এর আগে ‘নৌকা’ সংখ্যা, ‘বাংলার কুটির শিল্প’, ‘গোপাল ভাঁড়’ বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করেছি। এই ব্যতিক্রমী ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে কাজ দেখে পাঠকের মনে প্রশ্ন আসতেই পারে — কেন ‘সত্যজিৎ রায়’? জন্ম শতবর্ষ বলেই? আমাদের মনে হয়েছে, ব্যক্তি সত্যজিৎকে পাশে রেখে সৃষ্টিশীল সত্যজিৎ রায়ের খোঁজ একান্ত জরুরি।
প্রতিটা খোঁজের অজস্র দরজা থাকে। সেই দরজা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমরা কুড়িয়ে পেয়েছি ছড়িয়ে থাকা নানা মণিমানিক্য। অগ্রন্থিত লেখা থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ পুন মুদ্রনযোগ্য বিভিন্ন লেখা। অধিকাংশ লেখাই থিয়োরিটিক্যাল।”
প্রাবন্ধিক শুভদীপ ঘোষের ‘শত বর্ষে সত্যজিৎ : জীবন ও চলচ্চিত্র’ প্রবন্ধে সত্যজিৎ রায়ের পরিবার ও প্রথমজীবন, গঠন পর্ব, তাঁর কর্মজীবন, চলচ্চিত্র জগতে তাঁর প্রবেশ, তাঁর পরিচালিত ছবিগুলির বৈশিষ্ট্য নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। লিখেছেন অভ্রদীপ গঙ্গোপাধ্যায় — ‘সত্যজিৎ রায়ের চিত্রনাট্য ও সংলাপ। — সোমনাথ ঘোষের — ‘সত্যজিৎ রায় পরিচালিত তথ্যচিত্র ও টেলিফিল্ম’, সোহম দাসের ‘সত্যজিতের গল্পে পাশ্চাত্য প্রভাব ও উপনিবেশিকতা ও বিরোধিতার সহবস্থান’, গুরুপ্রসাদ দের ‘আঁকিয়ে সত্যজিৎ’, অলক রায় চৌধুরীর ‘সত্যজিতের সংগীত : দুই ব্যক্তিত্বের ভাবনা’, শুভদীপ অধিকারীর ‘সত্যজিতের গল্পের প্রধান চরিত্ররা’, পিয়াল দাসের ও তাপস দাসের ‘সত্যজিতের কল্পবিজ্ঞান’, রবিউল ইসলামের ‘সত্যজিৎ রায় ও সন্দেশ’ ইত্যাদি প্রবন্ধগুলি পড়লে এক অনালোকিত সত্যজিৎকে আমরা খুঁজে পাই।
তাছাড়া রয়েছে ‘মেমোরিস অব রে’-মৃণাল সেন রচিত রচনার ভাষান্তর। তরজমা করেছেন শীর্ষা মণ্ডল। সত্যজিৎ রায়ের অস্কার বক্তৃতা — তরজমা করেছেন দেবোত্তম গায়েন। এছাড়াও রয়েছে সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে জেমস্ ব্লুর সাক্ষাৎকারের একটি অনুবাদ। অনুবাদ করেছেন রামেশ্বর ভট্টাচার্য। রয়েছে সন্দীপ রায়ের একটি সাক্ষাৎকার। আলাপচারিতায় সপ্তর্ষি ব্যানার্জী। সৌমেন্দু রায়ের একটি সাক্ষাৎকার। সাক্ষাৎকার গ্রহন করেছেন সোহম দাস।তাছাড়া রয়েছে বিশেষ বিশেষ ব্যক্তিত্বের বিশেষ নিবন্ধ ও অনেক লেখার পুনর্মুদ্রণ। রয়েছে রায় বংশের বংশতালিকা, রয়েছে সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্র পঞ্জি, তাঁর রচিত গ্রন্থপঞ্জি এবং সত্যজিৎ রায়ের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সময়ের পুরো ঘটনাবলির পঞ্জি।

তবুও প্রয়াস : সত্যজিৎ সংখ্যার ছবি
সব মিলিয়ে এই ক্ষুদ্র পরিসরে সত্যজিৎ রায়কে চেনা হয়তো খুব সহজে হবে না। তবুও সত্যজিৎ রায়কে যারা বইয়ের মাধ্যমে চিনতে চান, সেই সব গ্রন্থ পিপাসু মানুষদের বলব পারলে বইটা একবার সংগ্রহ করুন। এত কিছু তথ্যের সমাবেশ হয়তো খুব কম সংখ্যক লিটল ম্যাগাজিনের বিশেষ সংখ্যায় পাওয়া যাবে। (ক্রমশ)