এর পর আসছি ‘নৌকা’ সংখ্যা নিয়ে আলোচনায়। পত্রিকার এই বিশেষ সংখ্যাটির প্রকাশকাল-২০১৬। নদীমাতৃক দেশ ভারত। আর এই নদীমাতৃক দেশে প্রাচীনকাল থেকেই যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হল নৌকা। পণ্য পরিবহন, যাত্রী পরিবহন, অভিযান, মৎস্য আহরণ, শৌখিন দিগ্বিজয় ইত্যাদি নানা কারণে প্রাচীনকাল থেকেই নৌকা ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এ তো আমাদের জানা কথা। তবে এই সময় দাঁড়িয়ে ‘নৌকা’ সংখ্যার প্রাসঙ্গিকতা কোথায়? এর উত্তর আমরা খুঁজব ‘সম্পা ‘নৌ’কীয় তে। সম্পাদক লিখছেন —
“দেখতে দেখতে তিনটে বছর কেটে গেল। চতুর্থ বছরের শুরুতেই একটি বিশেষ সংখ্যা ‘নৌকা’ নিয়ে আমরা পাঠক মহলে আসছি। কিন্তু ‘কেন নৌকা’? এই প্রশ্নটার উত্তর পাঠক সংখ্যাটি পড়েই পাবে, এটুকু আশা করি। জীবনের সঙ্গে আর জলের সঙ্গে নৌকার অতীব যোগ। নৌকার সঙ্গে মানুষের দূরত্ব যতই বাড়ুক না কেন, জল যতদিন থাকবে, নৌকা থাকবেই। জীবনের প্রয়োজনে, জীবিকার প্রয়োজনে। প্রযুক্তিবিদ্যার অগ্রগতিতে বাহ্যিক কাঠামো বা উন্নত ইঞ্জিন জলযান যতই আসুক না কেন, আমাদের বাঙালিদের কাছে আসলে সবই নৌকা। যা জলে ভাসে, যা পারাপার করায়, তাই নৌকা। সে ভেলা হোক, পানসি হোক বা স্টিমার। একবছর আগে যখন সংখ্যাটি শুরু করার কথা ভাবি ; এই সংখ্যার কী পরিসীমা হবে সেটার আন্দাজ ছিল না। কিছু বিষয় ধরে এগোতে শুরু করি। কিন্তু যতই এগোচ্ছি খুলে যাচ্ছে দরজা। একটার পর একটা জানালা।হু হু করে ঢুকছে বাতাস। গা, হাওয়া লাগিয়ে বসন্তে বসন্তে ছড়িয়ে দিচ্ছে আলো। এখানে কোনও পথ ও রাস্তার মধ্যে ফারাক নেই। চলছি আর চলছি। জানছি ও শিখছিও।নোনা জলের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে জীবনের চোরা ঢেউ। মিষ্টি জলে গাঢ় হচ্ছে ভালোবাসার আয়ু। সত্যি বলতে ‘নৌকা’ সংখ্যার জন্য, কোনো সম্পাদক হয় না। এর এত দিক, এত মাত্রা! গভীরতার পর্দা ভেদ করে দীর্ঘ শিকড়ে চুমু খাওয়ার মত ব্যাপার। তাই ‘নৌকা’ হল টিম তবুও প্রয়াসসহ, আমাদের সমস্ত লেখক; বিভিন্ন নৌকর্মী,মাঝি এবং আপনাদের সকলের মিলিত প্রয়াস। এদের ছাড়া এই সংখ্যাটি আলো দেখতে পারত না। এখন “মেঘের কোলে রোদ হেসেছে বাদল গেছে টুটি” কিন্তু আমাদের ছুটি নেই। প্রয়াস চলতেই থাকবে। দৈ, ”নাও ভাসাইয়া দে, পাল তুইলা দে”….
ছোটো বড়ো ২২টি প্রবন্ধে সাজানো পত্রিকার বিশেষ সংখ্যাটির পাতা। প্রসেনজিৎ দত্ত, মাফরূহা হোসেন, সেঁজুতি, জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়, গৌতম চট্টোপাধ্যায়, সুব্রত কর্মকার, অনির্বাণ বটব্যাল, ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়, রমজান আলি, জয়তী অধিকারী, প্রকল্প ভট্টাচার্য, তন্ময় ভট্টাচার্য, শেখ মকবুল ইসলাম, পার্থ বসু, নিলাদ্রী বাগচী প্রমুখ প্রাবন্ধিকদের কলমে উঠে এসেছে নৌকার নানা প্রসঙ্গ। নৌকাকে নিয়ে নানা মিথ, রূপকথা, নৌকার আজানা ইতিহাস উঠে এসেছে প্রবন্ধগুলির পরতে পরতে।
প্রথম প্রবন্ধেই আশ্চর্য চমক। ‘হেই নৌকো হৈ নৌকো’ প্রবন্ধে প্রাবন্ধিক প্রসেনজিৎ দত্তের কলমে উঠে এসেছে বন্যার দেশ বলাগড়ের ক্ষেত্র সমীক্ষা ও নানা অজানা জিনিস তুলে আনার গল্প। ইতিহাস ছুঁয়ে ছুঁয়ে যেন আরো গভীরে তলিয়ে যাওয়া! বলাগড়ের বেশ কিছু মানুষের প্রধান জীবিকা নৌকা তৈরি। সেই নৌকার নানা অংশের নাম জানতে পারা, স্বচক্ষে না দেখেও প্রবন্ধ পাঠ করে যেন রোমাঞ্চ লাগছিল, ইচ্ছে হচ্ছিল, এখনই বেরিয়ে পড়ি, দেখে আসি এক পলক। বলাগড়ের ইতিহাসটাও এই দীর্ঘ প্রবন্ধে উঠে এসেছে সুচারুভাবে।
ড. মাফরূহা হোসেন সেঁজুতির ‘বাংলাগানে নৌকাবিলাস: শিল্পরূপ’ প্রবন্ধে উঠে এসেছে নৌকা নিয়ে, প্রাচীন, মধ্যযুগ কিম্বা আধুনিক গীতিকবিদের কবিতা ও গান। প্রাবন্ধিক লিখছেন — “…নৌকা বিষয়টি বাংলা গানের ঐতিহ্যকে যেমন সমৃদ্ধ করে রেখেছে, তেমনি শিল্পরূপের সার্থক রূপায়ণকে ও সর্বজনীন করে তুলেছে।”
সবচেয়ে আকর্ষণীয়, সুব্রত কর্মকারের ‘মুর্শিদাবাদের নৌ শিল্পঃ উপাদান ও গঠন কৌশল’ প্রবন্ধটি।
“মুর্শিদাবাদ নদীকেন্দ্রিক জেলা। গঙ্গা ও পদ্মা নদীর প্রবহমান জলধারা এখানকার সভ্যতাকে পরিপুষ্ট করে তুলেছে। মানুষের জীবন, সমাজ তথা সংস্কৃতি নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে তার দ্বারা।”
গঙ্গা ও পদ্মা নদীতে ব্যবহৃত নৌকা, নৌকা তৈরির যন্ত্রপাতি ও তার ব্যবহার, নৌকার প্রধান প্রধান অংশ, নৌকার উপাদান, পণ্যবাহী নৌকার গঠন কৌশল, কোষার (জেলে নৌকা) গঠন কৌশল ইত্যাদি বিষয় নিয়েই প্রবন্ধটি সাজানো। প্রাবন্ধিকের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা সঞ্জাত একটি সার্থক শিল্পরূপ এই প্রবন্ধটি। আধুনিক প্রজন্মকে সত্যিই ভাবনার মধ্যে ফেলে দেবে।
‘চর্যাপদের নৌকা’র কথাও উঠে এসেছে অনির্বান বটব্যাল এর প্রবন্ধে। চর্যাপদ-এর সমকালীন ইতিহাসের ভাঙা গড়ার খেলা, সমকালীন সাহিত্যে তার ইঙ্গিত, চর্যাপদে নৌকার প্রসঙ্গ তুলে ধরে প্রাবন্ধিক ধরতে চেয়েছেন সমাজের সেই চরম অস্থিরতাকে। আবার রূপকের আড়ালে সিদ্ধাচার্যদের রচনাকে প্রতিষ্ঠা করা, আলো আঁধারিকে সঠিক তত্ত্বজ্ঞানের মাধ্যমে উপস্থাপিত করা। এ যেন অন্য এক যাপনের চিত্র। তবে এই প্রবন্ধের ৬৪ পাতায় একটি ভুল চোখে পড়ল। এখানে নৌকার অনুষঙ্গে বড়ু চন্ডীদাসের ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’-এর নৌকাখণ্ডের ৭ নং শ্লোকটা উদ্ধৃত করা হয়েছে ও শেষে ‘শ্রীকৃষ্ণবিজয়’ নামটি উল্লেখ করা হয়েছে। আসলে এটি হবে ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’। আর ‘শ্রীকৃষ্ণবিজয়’ আসলে মালাধর বসুর লেখা ভাগবতের দশম ও একাদশ দ্বন্দ্বের অনুবাদগ্রন্থ। যাইহোক এই ভুল পাঠকের পক্ষে অন্বিষ্টকর। বিশেষত যাঁরা গবেষণার জন্য পত্রিকার এই সংখ্যাটা কিনবেন, তাঁরাও যদি উদ্ধৃতি দিতে গিয়ে ভুলটাকেই ব্যবহার করেন, তবে তাদের লেখাতে কু প্রভাব পড়বে। প্রুফ সংশোধনের সময় সম্পাদককে এ বিষয়ে আরো সচেতন হওয়ার আবেদন রাখছি। আর যদি প্রাবন্ধিকের ভুল হয়, তাঁকেও এ ব্যাপারে সচেতন হতে হবে।
চুয়াত্তরোর্ধ্ব ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়ের কলমেও উঠে এল ‘নৌকা নিয়ে সাত-সতেরো’। শৈশব থেকেই গঙ্গাতীরে বসবাস করার সুবাদে নৌকা ও নদীর সঙ্গে তাঁর যেন নাড়ির যোগ। কলম্বাসের নৌকা, ‘সান্টা মারিয়া’ কিম্বা নরওয়ের জলদস্যুদের তৈরি ‘ভাইকিং’ নৌকার নাম শুনে জানতে ইচ্ছ হল কী তার ইতিহাস। যদিও ছুঁয়ে গেছেন প্রাবন্ধিক কিছুটা ইতিহাস। কলকাতার প্রাচীন ইতিহাস লেখক তুলে এনেছেন। নৌকা নিয়ে নানা গল্প, বাণিজ্য, উপনিবেশ বিস্তারের কাহিনি শুনিয়েছেন বেশ হালকা চালে। তবে দুঃখের বিষয় এতেও ভুল চোখে পড়ল একটা। ৮৩ পৃষ্ঠায় কবিকঙ্কণ মুকুন্দ চক্রবর্তীর ‘চণ্ডীমঙ্গল’ কাব্যের বণিক খণ্ডের দুটি পঙক্তি ব্যবহৃত হয়েছে —
“বালিখাটা এড়াইল বেনিয়ার বালা।
কালিঘাটে গেল ডিঙ্গা অবসান বেলা।।”
উল্লেখ করা হয়েছে — ‘কবিকঙ্কণ মুকুন্দরামের মনসামঙ্গলে ধনপতি সওদাগরের বাণিজ্য যাত্রার বর্ণনা।’ আদতে মনসামঙ্গল না হয়ে হবে ‘চণ্ডীমঙ্গলে’।
এত সুন্দর প্রবন্ধের মাঝে এ ধরনের ভুল এক বালতি দুধে একফোঁটা গোচোনা। যাইহোক ভুল থেকেই তো মানুষ শিক্ষা নেয়। পরবর্তীতে এই ভুল গুলো হয়তো এড়ানো যাবে।
এছাড়াও রমজান আলির প্রবন্ধ ‘প্রাচীন নৌকা ভাইকিং’-এ ভাইকিং নৌকার ইতিহাস, জয়তী অধিকারীর ‘কোরাকল’ একটি নৌকার নাম’ প্রবন্ধে ‘কোরাকল’ নৌকার বিস্তারিত ইতিহাস উঠে এল। জয়তী অধিকারীর সংগ্রহে ‘ডাকটিকিটে নৌকার কোলাজে’ উঠে এল বিভিন্ন দেশের ডাকটিকিট এবং সবকটিই কোনো না কোনো নৌকা কেন্দ্রীক।
সুদূর মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, কানাডা, পোর্তুগাল, বাংলাদেশ, হল্যান্ড, কিউবা প্রভৃতি দেশের ডাকটিকিটে নৌকা প্রসঙ্গ — বিষয়টি সত্যিই অভিনব। এজন্য সম্পাদককে ধন্যবাদ দেব — এই সকল প্রতিভাকে তুলে আনার জন্য। (ক্রমশ)
ধন্যবাদ।।।