এছাড়াও ‘লৌকিক জলযান: বাঙলা প্রবাদ’ প্রবন্ধে শেখ মকবুল ইসলাম নৌকা সংক্রান্ত কিছু প্রবাদ বিশ্লেষণ করে নৌকার ভাষাতাত্ত্বিক ও গঠনগত বিশ্লেষণ করেছেন। সবশেষে ফাল্গুনী ঘোষের কলমে উঠে এসেছে বিভিন্ন প্রকার নৌকার শব্দটীকা। বজরা, বাইচের নৌকা, মলার হরংগা, গয়না, কোষা, ডিঙ্গি, বাছারি, সাম্পান, ফেটি বালার, পটোল, গোঘী, পিনাশ, বালাম, গসতি, পানসি, কোরাকল ইত্যাদি নানা প্রকার নৌকার সংক্ষিপ্ত টীকা এখানে সংযোজিত হয়েছে, যা নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। এছাড়াও আছে বৈতা, আখা, ময়ূরপঙ্খী, ছিপ, ভেলা ইত্যাদি নিয়েও আলোচনা।
পরিশেষে বলব নৌকা নিয়ে এর আগে আমি কোনো সংখ্যা পড়িনি। তবে সংখ্যাটা পড়ে নৌকা সম্পর্কে একটা মোটামুটি ধারণা তৈরি হল আমার, যা আমার খুব কাজে লেগেছে।
তবে আর একটা সমালোচনা না করে থাকতে পারলাম না। শুধুমাত্র প্রবন্ধ দিয়েই পুরোটা সাজানো হয়েছে, এতে একঘেয়েমী এল পড়তে গিয়ে। বিশেষ করে সংখ্যাটা যখন নৌকা নিয়ে, তাতে কবিতা, গল্প ইত্যাদিও আসতে পারত সুন্দর ভাবে, ছড়াতো বটেই। নৌকা নিয়ে একাধিক কবিতা, ছড়া, ছড়া, গল্প ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বাংলা সাহিত্যে। তবে নতুন কিছু উঠে এলেও মন্দ হত না। আমার সাথে সকল পাঠক একমত নাও হতে পারেন, তাতে ক্ষতি নেই। অন্ততঃ এমনটা আমার মনে হয়েছে। এছাড়া আর কিছু দোষ আমি খুঁজে পেলাম না। আর আমি এখানে সমালোচনা করতেও বসিনি।
আমি আমার অনুভূতিগুলি কেবল লিপিবদ্ধ করেছি এই বইতে।
অনেকদিন থেকে নৌকা’ আর ‘বাংলার কুটির শিল্প’ সংখ্যাদুটির চাহিদা ছিল আমার। সেলিম দাকে বহুবার জানিয়েওছি, হয়তো কাজের চাপে উনি উত্তর দিতে পারেননি।শেষে দুটোরই প্রাপ্তি একসাথে। এজন্য তাঁকে বিশেষ ভাবে ধন্যবাদ দেব। প্রিন্ট না থাকাই জেরক্স করে স্পাইরাল বাইন্ডিং করে উনি আমাকে বাই পোস্টে পাঠিয়েছেন বাড়িতে। পড়ার পরেই এই রিভিউ। আপাতত নৌকা’ সংখ্যার আলোচনা শেষ করছি। পরে বিস্তারিত আলোচনা করছি ‘বাংলার কুটির শিল্প’ সংখ্যাটা নিয়ে।

‘তবুও প্রয়াস’ পত্রিকার ‘নৌকা’ সংখ্যা
‘তবুও প্রয়াস’-এর ‘বাংলার কুটির শিল্প’ সংখ্যাটি প্রকাশিত হয় ২০১৭ সালে। এটি পঞ্চম বর্ষ, বিশেষ সংখ্যা। এর প্রচ্ছদশিল্পী শ্রীতমা রক্ষিত। সম্পাদক — সেলিম উদ্দিন মণ্ডল এবং সম্পাদক মন্ডলীর মধ্যে রয়েছেন- — ফাল্গুনী ঘোষ, দেবোত্তম গায়েন ও পীযূষকান্তি বন্দ্যোপাধ্যায়। বিষয় বৈচিত্র্যে এই লিটল ম্যাগাজিনটির প্রতিটি সংখ্যাই চমক দিতে চেয়েছে। কিন্তু লিটল ম্যাগাজিন বলে এই ম্যাগাজিন গুলিকে বোধহয় ভুল করা হবে।এগুলি যেকোনো বাণিজ্যিক বড়ো বড়ো পত্রিকাকেও হার মানাবে। তো হঠাৎ এই ব্যতিক্রমী সংখ্যা কেন বাংলার কুটির শিল্পকে নিয়ে ?বিষয়টি নতুন না হলেও মোটামুটি আজকের দিনে প্রাসঙ্গিক। আসুন জেনে নিই এই বিষয় নিয়ে সংখ্যা করার পেছনে সম্পাদকের যুক্তি —
“আমাদের ‘বাংলার কুটির শিল্প’ সংখ্যাটি করার পিছনে দুটি উদ্দেশ্য রয়েছে। প্রথমত — আমরা অনেকেই জানি না এই বাংলায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ছোট ছোট শিল্পগুলি সম্পর্কে। সেই সব শিল্পপাঠকদের সামনে তুলে ধরা যেমন উদ্দেশ্য ছিল, তেমনই আরেক উদ্দেশ্য ছিল শিল্পগুলির বর্তমান অবস্থা ও তার গুরুত্বকে মূল্যায়ন করা। সংখ্যাটিতে রয়েছে বাংলার প্রধান প্রধান কুটির শিল্পকে নিয়ে তথ্যমূলক লেখা,… ”
শুধু তাই-ই নয়, আজকের দিনে দাঁড়িয়ে বাংলার বেশ কিছু কুটির শিল্প ধ্বংসের মুখে। সেই সব শিল্পীদের জীবন-যাপন, হতাশা, ক্ষোভ আবার অনেক শিল্পী বংশ পরম্পরায় বাঁচিয়ে রেখেছে নিজস্ব শিল্পকে। কেউ শখ করে, কেউ বা অন্ন সংস্থানের জন্য। এই সমস্ত দিকগুলি তুলে ধরাও সম্পাদকের উদ্দেশ্য ছিল। তাই একের পর এক প্রাবন্ধিক কলম ধরেছেন ও তাদের সৃষ্টি সম্ভার তুলে ধরেছেন।জানা-অজানার ভিড়ে আমাদেরও মিশে যেতে ইচ্ছে করে।তাই চলুন সংখ্যাটার ভিতরে একটু ঢুঁ মেরে আসি। কিন্তু আহা! প্রত্যেকটি প্রবন্ধই যেন-এ বলে আমার দেখ, ও বলে আমায় দেখ। কোনটা ছেড়ে কোনটা পড়ব। শুরু হল পাঠ। একবার নয় দু’-দুবার।পড়ার পরেই এই পাঠ প্রতিক্রিয়া। কিছু আলোচনা করছি আর কি।
প্রথমেই কলম ধরেছেন অলক্তা মাইতি।’সরুল-কুঠির সোপান:পল্লিশ্রী ও শ্রীনিকেতন’ প্রবন্ধে আমরা জানতে পারি শ্রীনিকেতন ও শান্তি নিকেতনের একাধিক কুটির শিল্পের কথা।রবীন্দ্রনাথ দেশের সামগ্রিক আর্থ-সামাজিক উন্নতির জন্য পল্লী উন্নয়নের কথা বলেছিলেন। কারণ তিনি মনে করতেন — “সামগ্রিক আর্থ — সামাজিক উন্নতি লাভ না হলে দেশের প্রগতি অসম্ভব। পল্লি উন্নয়নে তাঁর আগ্রহের সূত্রপাত এখান থেকেই।”
এর জন্য শ্রীনিকেতনে গোড়া থেকেই কুটির শিল্পের উন্নয়ন ও প্রসারের কাজ শুরু হয়েছিল জোর কদমে। চামড়া শিল্প বা ট্যানারি; বয়ন শিল্প — এই দুই ক্ষেত্রে শ্রীনিকেতন মর্যাদার শিখরে উঠেছিল।শাড়ি,গামছা, আসন, শতরঞ্জি, গালিচা, রেশমের কাপড়, তাছাড়া বাটিকের কাজ বা গালা শিল্প, কারুকাজ করা চামড়ার ব্যাগ নির্মাণ, কাপড়ের ঝোলা ব্যাগ যা শান্তিনিকেতনি ব্যাগ ইত্যাদি এখনও সেই শিল্পের গৌরবময় সাক্ষ্য বহন করে চলেছে। প্রাবন্ধিক বলছেন —
“রবীন্দ্রনাথ বারবার বলেছেন গ্রামকে হয়ে উঠতে হবে স্বনির্ভর। রাষ্ট্রের আনুকূল্যে বেঁচে থাকা এক প্রকার গোলামিই। বাংলার কুটির শিল্প, কৃষি ও পশুপালনকে হাতিয়ার করে কবি এক নতুন আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের স্বপ্ন দেখেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের বিশ্বভারতীর ভাবনায় সেই স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে ওঠার চেষ্টাই বিদ্যমান। কিন্তু ভাবতে অবাক লাগে যে, শ্রীনিকেতন কবির বিশ্বভারতীর ভাবনার সবচেয়ে প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য গ্রামোন্নয়নের সাধনপীঠ সেই শ্রীনিকেতনই আজ পড়ে আছে দুয়োরামির অবহেলায়।”
রবীন্দ্রনাথের সাধের সেই স্বপ্ন আজ অনেকটাই বিস্তৃত হয়ে পড়ে আছে। শিল্পীরা আজ ভুখা।কদর হারাচ্ছে। শিল্পী তার শিশুত্ব হারিয়ে আজ কৃত্রিমতাকে বরণ করে নিয়েছে। তাই প্রকৃত অর্থেই শ্রীনিকেতন তার শ্রী হারিয়েছে। এই আক্ষেপ ছড়িয়ে আছে প্রবন্ধটির পাতায় পাতায়।
এর পর ফাল্গুনী ঘোষ বাংলার ৩৯ রকমের কুটির শিল্প নিয়ে মননশীল আলোচনা করেছেন। কী নেই সেখানে? এমব্রয়ডারি বা সূচিশিল্প, কাঁথা শিল্প, পিতল, গালা, চামড়া, জরি, টেরাকোটা, ডোকরা, দড়ি, দারু শিল্প, পট, পাট কিছুই বাদ যায়নি। এরপর অরিত্র দত্তের ‘শাটল কক ও সোলার টোপর’ তৈরির গল্প, ফজলে আজিজ আব্বাসীর ‘মৃৎ শিল্প’ নিয়ে আলোচনা, প্রকল্প ভট্টাচার্যের ‘বাংলার মাদুর শিল্প’, ইন্দ্রজিৎ মাজীর ‘পরচুলার ইতিকথা, দেবোত্তম গায়েনের ‘মুখোশ শিল্প’ প্রবন্ধে ছৌনাচ ও গম্ভীরা নাচের মুখোশ তৈরি ও একদিকে শিল্পীদের অর্থনৈতিক টানাপোড়েন, তাদের অনটন, অপরদিকে শিল্পের প্রতি ভালোবাসা, শিল্পগুলিকে টিকিয়ে রাখার প্রচেষ্টার কথা পাই।
অমিত কুমার বিশ্বাসের কলমে উঠে এসেছে নদিয়ার তাঁত শিল্পের এক সুরুচিসম্পন্ন আলোচনা। নদিয়ার শান্তিপুর, নবদ্বীপ, ফুলিয়া, কৃষ্ণনগর, রানাঘাট, চাকদহের তাঁতশিল্পের বিবর্তন তুলে ধরা হয়েছে। তাছাড়া সুদীপ্তা চৌধুরীর ‘বীরভূমের বাঁশশিল্প’, বিশ্বরূপ শেঠের ‘কাঁথার কথা’, বটুক মহারাজের ‘পটচিত্রের অকপট চিত্রগুলি’, বর্ণালী রায়ের ‘পুতুল পুরীর ইতিকথা’, রামামৃত সিংহের বাঁকুড়ার পুতুলপুর ডোকরা ও কাঁসাশিল্প। তনুশ্রী ভট্টাচার্যের ‘আড়াই পাকের মুর্শিদাবাদ’ অর্থাৎ সেখানকার বিড়ি শিল্পের কথাও উঠে এসেছে এই প্রবন্ধে।ঝিনুক, শঙ্খ, মুক্তো, কিম্বা বাংলার টেরাকোটা শিল্প, হাতপাখা, চর্মশিল্প কিছুই বাদ যায়নি। বাংলার কুটির শিল্পের বর্তমান অবস্থান, তার অতীত ইতিহাস, বর্তমান ও এর ভবিষ্যৎ কী তা এই সকল প্রবন্ধে উঠে এসেছে। প্রাবন্ধিকরা অত্যন্ত যত্ন সহকারে বিষয়গুলিকে সাজিয়ে তুলে ধরেছেন ম্যাগাজিনটিতে।

তবুও প্রয়াস : ‘বাংলার কুটির শিল্প’ সংখ্যা
শুধু তাই নয় শেষে জাতীয় পুরষ্কার প্রাপ্ত শিল্পীর তালিকাও করেছেন সুবীর পাল। তাছাড়া পশ্চিমবঙ্গের হস্তশিল্প কেন্দ্র সমূহ ও শিল্পজাত দ্রব্যের উপাদান ও ব্যবহার, হস্তশিল্প ও উৎপাদিত জেলা ইত্যাদির তালিকাও শেষে সংযোজন করা হয়েছে। অর্থাৎ সম্পাদকের লক্ষ্য ছিল সংখ্যাটা যাতে স্বয়ংসম্পন্ন হয়। তবে পুরোপুরি স্বয়ংসম্পন্ন বা এর বাইরে কিছু হয় না, এমনটা বলা যায় না। এর পরেও হয়তো অনেকটা বাকি থেকে গেল বা যাবে। তবে বাংলার কুটির শিল্পগুলি নিয়ে প্রাবন্ধিকরা যে যে দিক তুলে ধরেছেন তা হয়তো প্রত্যাশিতই ছিল। এখানে যে যে শিল্পগুলি নিয়ে আলোচিত হয়েছে, তার অনেক শিল্পই এখন লুপ্ত হতে বসেছে। তাই আজ সময় এসেছে এই শিল্পগুলি বাঁচিয়ে রাখার। আপাতত এটুকুই। পরবর্তীতে সময় পেলে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। (ক্রমশ)
Thank you