‘দর্পণ…মুখের খোঁজে’ পত্রিকা
নদিয়া জেলার করিমপুর থেকে প্রকাশিত একটি মননশীল লিটল ম্যাগাজিন ‘দর্পন… মুখের খোঁজে’। এর সম্পাদক কবি, প্রাবন্ধিক ও শিক্ষক দেবজ্যোতি কর্মকার। ২০০৩ সাল থেকে এই পত্রিকার যাত্রা শুরু। সগৌরবে ২০ বছর অতিক্রান্ত হল এই ছোট্ট পত্রিকাটির পথ চলা। ২০০৮ সাল নাগাদ পত্রিকাটিকে কেন্দ্র করে গঠিত হল একটি সাহিত্যগোষ্ঠী। পত্রিকা গোষ্ঠীর সম্পাদক হলেন দেবজ্যোতি কর্মকার আর প্রথম সভাপতি হলেন অমল চন্দ। লিটল ম্যাগাজিন মানে একটা আন্দোলন, এর ভূমিকা হল ”পরীক্ষা-নিরীক্ষার’, পথ নির্মাণের, উদ্ভাবনের,আবিষ্কারের, বিদ্রোহের, যৌবনের, প্রতিষ্ঠান শাস্ত্র – পরম্পরা, লোকাচার ইত্যাদির চৌহদ্দি পেরিয়ে অভিযাত্রার।” — শিবনারায়নণ রায়।
এই লক্ষণটিকে পাথেয় করেই এর পথচলা। তাঁদের নির্দিষ্ট একটা লক্ষ্য ছিল পূর্ব থেকেই। নির্দিষ্ট লক্ষ্য ব্যতীত লিটল ম্যাগাজিনকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া খুব বেশি দিন সম্ভব নয়।সেই ম্যাগাজিন গুলিই দীর্ঘস্থায়ী হয়, যাদের রয়েছে নির্দিষ্ট লক্ষ্য। ২০১০ সাল থেকে শুরু হয় পত্রিকার বিষয়ভিত্তিক সংখ্যা। ২০১২ সালে জীবনানন্দ সংখ্যা পশ্চিমবঙ্গের ছোটো কাগজের মানচিত্রে সাড়া ফেলে দিল -যার নাম ছিল ‘আমাদের জীবনানন্দ’। প্রায় প্রতিটি খবরের কাগজেই এর সম্পর্কে লেখালিখি হয়েছিল। ২০১৩ সালে করিমপুরে প্রথম আন্তর্জাতিক কবিতা উৎসব অনুষ্ঠিত হল এই পত্রিকার ব্যবস্থাপনায়। তারপর ‘মাঝি’, ‘বৃষ্টি’, ‘সুনীল আকাশ’, ‘ছুটি’ ২০১৫ তে ‘শিশু উৎসব সংখ্যা’, ২০১৬ তে ‘মেরুদণ্ড সংখ্যা’, ২০১৭-র জানুয়ারিতে বইমেলা সংখ্যা (এই সংখ্যার মূল আকর্ষণ ছিল সার্ধশতবর্ষে, নীলরতন মুখোপাধ্যায় ও তাঁর চন্ডীদাস পদাবলী’), ২০১৭-র মার্চে ‘অমর একুশে’ সংখ্যা, ২০১৮ তে ‘অণুকবিতা : কবিতার পরমাণু’ সংখ্যা, এপ্রিল – ২০২১-এ ‘বর্ষবরণের কবিতা’ সংখ্যা, জুলাই – ২০২১- এর বিষয় ভাবনা ‘আমার দেখা প্রথম কবি’, জানুয়ারি ২০২২ এ করোনা মহামারির প্রেক্ষিতে বিশেষ সংখ্যা ‘কেমন আছেন আপনি’? ২০২২ এর ডিসেম্বরে “দর্পণ” এর পরিচালনায় ‘করিমপুর লিটল ম্যাগাজিন মেলা ও শিল্প উৎসব’-এ প্রকাশিত বিশেষ সংখ্যা ‘হাট’ সংখ্যা। বিষয় বৈচিত্র্যের ডালি সাজিয়ে যেভাবে এই ক্ষুদ্র পত্রিকাটি পশ্চিমবঙ্গ সহ অন্যান্য রাজ্য তথা দেশে বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে তাতেই বোঝা যায় লিটল ম্যাগাজিন নামে ‘লিটল’ হলেও কাজে কিন্তু লিটল নয়, তা ‘গ্রেট’ই।
এই বিশেষ সংখ্যাগুলির মধ্যে ‘আমাদের জীবনানন্দ’ সংখ্যাটির কথা না বললেই নয়। পত্রিকাটির প্রথম বিশেষত্ব হল এটা Landscape-এ ছাপা, আর সম্পাদকীয় পৃষ্ঠাটি রয়েছে একদম শেষে। সংখ্যাটির সম্পাদকীয়র প্রথম এবং শেষ অংশটি পড়লেই বোঝা যায় এই সংখ্যাটি করার পিছনে সম্পাদকের যুক্তি। সম্পাদক লিখছেন —
“কবিতা হলো সূক্ষ্ম অনুভূতির বিষয়। একে যুক্তি দিয়ে নয়-গভীর ভাবে উপলব্ধি করতে হয়। চেতনার স্বার উন্মুক্ত হ’লেই কবির সৃষ্ট ভুবনলোকে মন্ত্রমুগ্ধের মতো পাক খেতে হয় বারবার। কবির গম্ভীর নির্মাণ, অন্ধকারের অতলান্তে তলিয়ে না গিয়ে ভেতরের ইচ্ছাটাকে নাড়িয়ে দেয় কখনও কখনও। বেরুতে পারি না কবিতার সৃজনশীল ধারাপাতের শৈলী থেকে।
জীবনানন্দময় কবিতার জগৎ। যাঁর শব্দগ্রহের জগতে আচ্ছন্ন বিশ্ব আধুনিক কবিতার পাঠক।চেতন বা, অবচেতন মনে আমরা তার স্রোতে গা ভাসাই — আমাদের ভেতরেও জন্ম নেয় কোনো এক বোধ-কবিতা লিখবার, পড়বার- আরও পড়বার-শিল্পময়তার বোধ। জীবনানন্দীয় আলোক ঝর্ণায় ঋগ্ধ হতেই আমাদের সৃজনশীল মননের প্রয়াস — ‘আমাদের জীবনানন্দ”।
আর একটি বিশেষত্ব প্রতিটি পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠা-সংখ্যার আগে ঐ পাতার মূলভাব জীবনানন্দ দাশের কবিতার পঙক্তি দ্বারা ব্যক্ত করার চেষ্টা করেছেন সম্পাদক। এরকম অভিনব প্রয়াস এর আগে আমি লক্ষ্য করিনি।
যেমন —
“আমি কবি, — সেই কবি” — ৪
”অনেক কবিতা লিখে চলে গেলো যুবকের দল” — ৫,
“শরীর রয়েছে; তবুও মরে গেছে আমাদের মন!” — ১০,
”পৃথিবীর সব গল্প একদিন ফুরাবে যখন” — ১৫ ইত্যাদি।

‘দর্পণ…মুখের খোঁজে’ পত্রিকার ‘আমাদের জীবনানন্দ’
বরিশাল থেকে ০২/০৭/১৯৪৬-এ জনৈক অনুরাগীকে লেখা জীবনানন্দ দাশের পত্রাংশটি উদ্ধৃত করেই সংখ্যাটির সূচনা।
‘ফিরে দেখা’ অংশে রয়েছে ‘জীবনানন্দের লেখা প্রবন্ধ থেকে’ কয়েকটি ক্ষুদ্রাংশ, রয়েছে জীবনানন্দ দাশ রচিত ইংরেজি কবিতা ও স্বকৃত’ (বাংলা থেকে ইংরেজি) অনুবাদ, রয়েছে বুদ্ধদেব বসু, শান্তনু কায়সার, হুমায়ুন কবীর, লাবণ্য দাশের কিছু কথা, রয়েছে ড. বাসন্তী কুমার মুখোপাধ্যায় এর ‘ধূষর পাণ্ডুলিপি’-র ‘শকুন’ কবিতার পাঠপ্রতিক্রিয়া।
এরপর রয়েছে আধুনিক কবি, প্রাবন্ধিকদের কবিতা, প্রবন্ধ ও পাঠ প্রতিক্রিয়া। প্রথমেই আছে কবি অরু চট্টোপাধ্যায়ের পাঠপ্রতিক্রিয়া-‘জেগে আছ, হে মানুষ’ (অগ্রন্থিত কবিতা), ‘নগ্ন নির্জন হাত’ কবিতা দুটির। আধুনিক যুগের আশাভঙ্গের নিদারুন আক্ষেপ, অনিবার্য মৃত্যুর হাতছানি, ক্লান্তি, হতাশা, নৈরাজ্য তাঁর কবিতায় ছায়া ফেলেছে। রবীন্দ্র পরবর্তী আধুনিক কবিদের মধ্যে জীবনানন্দ প্রকৃতি প্রেমিক, নিসর্গ চেতনা, মৃত্যুচেতনার কবি, মিস্টিক কবি, চিত্ররূপময়তার কবি। এই ক্ষুদ্র ম্যাগাজিনটির মধ্যে উঠে এসেছে বেশ কিছু তরুণ কবি সহ অন্যান্য পরিচিত কবিদের কবিতা। শেষে রয়েছে প্রবন্ধ। সত্যেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের ‘চাঁদ ডুবে চলে গেলে’, সেঁজুতি ভটাচার্যের ‘নির্জনতম কবি জীবনানন্দ দাশ’, ঈশিতা ভাদুড়ীর ‘জীবনানন্দ দাশ’, মিমি সরকারের ‘পৃথিবীর সিঁড়ি ভেঙে চলে যারা’, তাপস কুমার গাঙ্গুলীর ‘চেতনার কবি জীবনানন্দ’, শ্যামাপ্রসাদ ঘোষের ‘কবির কবি জীবনানন্দ’ ইত্যাদি প্রবন্ধে উঠে এসেছে জীবনানন্দের কবিতার বৃহৎ জগতের ইঙ্গিত। কল্পনার জগৎ নয়, বাস্তবের রুক্ষ্ম মাটিতে দাঁড়িয়ে জীবনানন্দের সৃষ্ট কথা, শব্দ চয়ন কৌশল, উপমা ব্যবহারের প্রাচুর্য, রোমান্টিকতা, সুররিয়্যালিজম আমাদের মুগ্ধ করে। জীবনানন্দকে নিয়ে যারা প্রথাগত ঘাঁটাঘাঁটি করেন না, তারাও অনেকটাই জীবনানন্দকে খুঁজে পাবেন ছোট্ট এই ম্যাগাজিনটির পাতায় — জীবনানন্দ কী ও কেন ?

‘দর্পণ…মুখের খোঁজে’ পত্রিকার ‘আমাদের জীবনানন্দ’ সংখ্যার প্রচ্ছদ
এরপর যে সংখ্যাটির কথা বলব তা হল ‘মেরুদণ্ড সংখ্যা’। সম্পাদকীয়তে এই সংখ্যা করার পেছনের যুক্তি আপনারাও অবগত হোন। সম্পাদক লিখছেন —
“সৃষ্টির আদি লগ্নে মানুষে পশুতে বিশেষ পার্থক্য ছিল না। আমাদের সঙ্গে ‘ইতর’ বিশেষ প্রাণীর প্রথম পার্থক্য তারা গড়িয়ে বা লতিয়ে চলার খেলায় নিজেকে মগ্ন রেখেছিল। কিন্তু খেয়ালী মানুষ হাত বাড়িয়ে আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখেছিল। মানুষের সেই দাম্ভিকতার ইতিহাস সমাজ বিবর্তনের পরতে পরতে লুকিয়ে থাকতে দেখা যায়। অত্যাধুনিক সমাজ জীবনে মানুষ যত অভ্যস্ত হচ্ছে, তত মনে হচ্ছে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হতে চলেছে। আধুনিক সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক অবস্থা তাকে ক্রমশ পিছন দিকে ঠেলার ইঙ্গিত দিচ্ছে। একটা অশুভ আঁতাত শুভ বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের চিন্তা চেতনায় আঘাত হানছে নিরন্তর। লক্ষ্য করা যায়, লতিয়ে চলার খেলায় আয়োজন চারিদিকে। সাধারণ মানুষ অসাধারণত্ব বজায় রেখে তার থেকে দূরে থাকতে পারে না। তবে তারই মধ্যেই প্রতিবাদী কন্ঠস্বর আওয়াজ তুলছে কখনও কখনও জলদ গম্ভীর কণ্ঠে। যেন মনে হয় কেউ প্রশ্ন করছে; রাজা তোর কাপড় কোথায়?
এই প্রশ্নই আমাদের এবারের ‘দর্পণ… মুখের খোঁজে’-র এই সংখ্যায় তুলে ধরার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। ‘মেরুদণ্ড’ সংখ্যাটির প্রকাশ কোন কাকতালীয় ঘটনা নয়, বিদগ্ধ জনেদের সুচিন্তিত মতামত ও অনুপ্রেরণার ফসল। সাহিত্যিক সাহিত্য রচনা করেন সমাজে প্রতিনিয়ত ঘটে যাওয়া বিষয়বস্তুর দিকে লক্ষ্য রেখে। বর্তমান সমাজ ও মানুষের চিন্তা চেতনার অভিমুখ কোন খাতে বইবে-মেরুদণ্ডী হিসাবে নিজের ঋজুতা প্রমাণ করবে না কি ফিরে যাবে শিরদাঁড়াহীন অমেরুদণ্ডীদের দলে — তা পাঠক ঠিক করবেন। সম্পাদকীয়’র কলামে আপনাদের সামনে আমাদের এই প্রশ্ন রইল।” [ক্রমশ]