প্রচ্ছদের উপরেই সম্পাদকীয়-এ এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। আনজনা ডালিয়া ও স্বাতী বেরা প্রামাণিকের ব্যক্তিগত গদ্য, অমিয় আদক রচিত অসাধারণ এক রম্যরচনা দিয়ে ম্যাগাজিনটির এই সংখ্যার সূচনা। ঠোঁটকাটা কথা আর রঙ্গ-ব্যঙ্গের চাবুক চালিয়ে ছোট্ট পত্রিকাটিকে আকর্ষণীয় করে তুলেছেন আমিয় বাবু। তিনি লিখছেন — “এখন যাঁদের মেরুদন্ডে আঘাত করার জন্য দায়ী করলাম; তাঁরা আবার উঠে পড়ে লাগবেন আমার মেরুদণ্ড ভাঙার জন্য। তাঁদের প্রথমেই জানিয়ে রাখি, আমার মেরুদণ্ড ভাঙাই আছে।নতুন করে তাকে আর ভেঙে কোন কৃতিত্বই থাকবে না। আমি তো গড়পড়তা মেরুদন্ডহীন বাঙালি। আমি আমার মেরুদণ্ডের ঋজুতা দেখাই আমার আত্মজ-আত্মজাদের কাছে। এমনকি তাদের মাকেও বিশেষ দেখাই না। বড় জোর পিঠে মেরুদন্ড বরাবর ঘামাচি হলে একটু ভয়ে ভয়ে চুলকে দিতে বলি। তাই যত্রতত্র মেরুদন্ডের ঋজুতা দেখিয়ে হাসির খোরাক হওয়ার ইচ্ছা আমার নেই। কেন জানেন? ইদানীংকালে সাহস প্রদর্শনকে ‘ক্যালি’ দেখানো বলে উপহাস করা হয়।”
তৎসহ এই সংখ্যায় রয়েছে নির্মলেন্দু কুণ্ডু, সু-ব্র-ত, অমিত দাস, বৈশাখী রায় চৌধুরী, হরিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়, সৌমেন সাহা, অনন্যা বন্দ্যোপাধ্যায়, জয়ব্রত বিশ্বাস, অরু চট্টোপাধ্যায়, এর কবিতা। পুনঃপাঠে রয়েছে নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’, জয় গোস্বামীর ‘কবিতা সংগ্রহ’ দৌড় : কবিতা ২০০৭, আনন্দবাজার পত্রিকা থেকে গৃহীত নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর ‘মধ্যরাতে ঘুমন্ত শহরে’, শঙ্খ ঘোষের ‘সবিনয় নিবেদন’, জয় গোস্বামীর ‘কবর’,অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের ‘হেই সামালো’, মৃদুল দাশগুপ্তের ‘ক্রন্দনরতা জননীর পাশে’, উৎপল কুমার বসুর ‘বাড়ি’, শ্রীজাতর ‘সমাপতন’-এর মত কবিতাগুলি। এই প্রথিতযশা কবিদের কবিতাগুলি এই অংশে জুড়ে দিয়ে সংখ্যাটির ঘনত্ব যেন আরো জমজমাটি হয়েছে।
আজকের মানুষ যারা মেরুদন্ডহীন, তাঁদেরকে বার্তা দিয়েছেন কবি প্রাবন্ধিকরা। মেরুদণ্ড সোজা করে প্রতিবাদ করতে শিখিয়েছেন। আত্মসম্মান বিকিয়ে দিয়ে মাজা ভাঙা বাঙালি না হয়ে মাথা উঁচু করে বাঁচো। এই সংখ্যাটি তারই বার্তা।

‘দর্পণ…মুখের খোঁজে’ পত্রিকার ‘মেরুদণ্ড’ সংখ্যার কভার পেজের ছবি
এর পর আর একটি সংখ্যা যেটার কথা না বললে হয়তো অনেকটা অসমাপ্ত থেকে যাবে, সেটি হল — ‘আমার দেখা প্রথম কবি’। অদ্ভূত এক বিষয় ভাবনা।
কেন এ সংখ্যা? আবারও আমরা চোখ রাখব সম্পাদকীয়র পাতায় —
“….এবারের বিষয়ভাবনা ‘আমার দেখা প্রথম কবি’। আপাত দৃষ্টিতে খুব সহজ মনে হলেও আদতে বেশ জটিল এবং চির রহস্যময়। ঠিক কবিতার মতো। আসলে কবি এবং কবিতার রহস্যের উন্মোচন কে না চায় বলুন, উদ্দেশ্য একটাই কবিদের কাছেই জানা দরকার তাদের চোখে দেখা প্রথম কবি ঠিক কেমন। শুনেছি গবেষকরা একমাত্র এই কবিদের বৈশিষ্ট্য এবং সংজ্ঞা নির্ধারণে নাকি সবচেয়ে বেশি মতান্তরে হোঁচট খেয়েছেন।
এক তরুণী কলেজে ঢুকে এক নির্ভীক বাউন্ডুলে কবির প্রেমে পড়েছেন। অথবা এক অচেনা মুদি অজস্র কবিতায় জীবন কাটিয়ে ‘একটাও কবিতা তার হল না কোথাও ছাপা’ — এই আক্ষেপও করেন না! আবার আধপাগল রিকশাচালক কবিতার খাতা ছেঁড়া ব্যাগে ঢুকিয়ে যাত্রী আসনের অন্দরে চেপে রাখেন যাবতীয় সমাজতান্ত্রিক বিক্ষোভ, তাঁর সৃজন আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে পবিত্র ওমটুকু পেতেই এ সংখ্যার আয়োজন।”
আসলে আমার দেখা প্রথম কবি- প্রত্যেকের কাছে আলাদা। মানুষ যখন প্রেমে পড়ে, তার প্রেমাস্পদ বা প্রেমাস্পন্দাই তখন তার দেখা প্রথম কবি, যে খুব সুন্দর ভাবে, মনের কথাকে লিখে ব্যক্ত করে। আসলে কবিতা স্বতঃস্ফূর্ত, কবিত্বশক্তিও অনেকটা তাই।তবে তা সহজাত, কিছুটা অর্জিত। কলেজের সোসালে তরুণ কবির স্বরচিত কবিতা পাঠ শুনে প্রেমে পড়ে না এমন মেয়ের সংখ্যা খুবই কম। তখন সেই হয়ে ওঠে ‘কারো চোখে দেখা প্রথম কবি’।
একের পর এক অসম্ভব সুন্দর মননশীল বিষয়ভাবনা নিয়ে আমাদের সামনে হাজির হয়েছে পত্রিকাটি।
আপনাদের মনে হতে পারে বারবার আমি সম্পাদকীয় কেন তুলে ধরছি।
আসলে সম্পাদকীয়ই হচ্ছে একটা ম্যাগাজিনের চালিকাশক্তি। পত্রিকার দর্পণ হচ্ছে সম্পাদকীয়। কেন এই পত্রিকা? বিশেষ সংখ্যাটি নির্বাচনের কারণ কী? এসবই বলা হয় সম্পাদকীয়তে।
তরুণ মুখোপাধ্যায় ও তন্ময় চক্রবর্তীর ‘আমার দেখা প্রথম কবি’, গৌরব বিশ্বাসের ‘আমার রিকশা কবি’, অরিজিত পালের ‘আমার ছুঁয়ে দেখা প্রথম কবি’, শ্যামাপ্রসাদ ঘোষের ‘একের মধ্যে বহু’,অরু চট্টোপাধ্যায়ের ‘কবিতা: রহস্য প্রতিমা, প্রাণ’ শীর্ষক কবিতা বিষয়ক গদ্য, গল্প ও প্রচ্ছদ কথা ইত্যাদি নিয়েই এই অসাধারণ বিষয় সমন্বিত ম্যাগাজিনটি।

দর্পণ … মুখের খোঁজে’ পত্রিকার ‘আমার দেখা প্রথম কবি’ সংখ্যার কভার পেজের ছবি।
এরপর আলোচনা করছি আরেকটি বিশেষ সংখ্যা নিয়ে, তার নাম ‘অণু কবিতা, কবিতার পরমাণু সংখ্যা’। অণু কবিতার পরমাণু বিস্ফোরণ দেখতে গেলে আমাদের চোখ রাখতে হবে বিশেষ এই সংখ্যাটির পাতায়। অণু কবিতা আকারে ছোট হলেও ‘ক্ষুদ্র আমি তুচ্ছ নই’। দু-চার পংক্তির এই ছোট্ট কবিতাগুলিতেই সঞ্চিত আছে বারুদ-যা যে কোন মুহূর্তে বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে। এই সংখ্যাটি করার পিছনেও যুক্তি আছে সম্পাদকীয়তে — “জানি সব ধ্বনি শব্দে পরিণত হয় না; কিছু সুদূর নীহারিকায় ইথারে বিলীন হয়। কিন্তু কিছু ধ্বনি থেকে শব্দ তৈরি করে বিস্ফোরণ ঘটাতে পারবো, যা হবে এ যুগ যন্ত্রণার বিমূর্ত প্রতিবাদ।”
মৃণাল কান্তি দাস, অরু চট্টোপাধ্যায়, ঈশিতা ভাদুড়ী, রবীন বসু, প্রীতম ভট্টাচার্য, অমিত দাস, পিন্টু পাল, গৌরাঙ্গ মন্ডল, প্রদীপ কুমার ঘোষ, দেবজ্যোতি কর্মকার, মোহম্মদ শাহবুদ্দিন ফিরোজের কলমে ঘটেছে কবিতার পরমাণু বিস্ফোরণ। কবি সুকান্তের ‘দেশলাই কাঠি’ কবিতায় আমরা দেখি —
“আমি একটা ছোট্ট দেশলাইয়ের কাঠি এত নগণ্য, হয়তো চোখেও পড়ি না: তবু জেনো
মুখে আমার খুশখুস করছে বারুদ
বুকে আমার জ্বলে উঠার দুরন্ত উচ্ছ্বাস;”
তেমনি অণুকবিতা আসলে তাই। একটুখানির মধ্যে অনেকটা ভাবের দ্যোতনা দেয়। এ যেমন পাকাপোক্ত, তেমনি নিরেট, ঘনপিনদ্ধ। কবি অর্পণ কুমার মাজির ‘দেশলাই’ নামক কাব্যগ্রন্থের একটি কবিতা উল্লেখ করি —
“দপ করে জ্বলে ওঠার মুহূর্ত এই। আগুন জ্বালাতে বারুদ লাগে না।শুধু কলমে রিফিল।”
আবার —
“নিজের বাড়িতে ভাড়াটে থাকার নাম গণতন্ত্র আর/ধর্ষিতার গায়ে আঁচড় গোণার নাম রাজনীতি।”
তেমনি এ সংখ্যার একাধিক কবিতাও এক একটা পরমাণু বোমা। পরমাণু বোমার মধ্যে যে পরিমাণ অসীম শক্তি সঞ্চিত থাকে, অণুকবিতা আসলে তাইই। দেবজ্যোতি কর্মকারের ‘ধারণ পর্ব’ কবিতায় পাই —
“ধরে রাখতে পারছি না কিছুই
আমার পূর্বপুরুষেরাও পারেনি
বারবার তবু অস্ত্রে শান দিচ্ছি!
এক
আমার ভেতরেই তবে অস্ত্র আছে! — শানাচ্ছি কেন জানিনা
কাকে খুন করব এবার?
— যাকে বহু জন্মে ধরে আছি বুকে!”
আর শুভ আহমেদের ‘আখ্যা’ কবিতায় পাই —
“এই বক্ষ গহ্বরে
তুমিই সর্বনাশী
পদ্মার ভাঙন।”
আবার সহিদুল ইসলামের ‘রক্তের দাগ’ কবিতায় লিখেছেন —
“ধর্মান্ধ চাবুক সাপের ফণা
বিষ দাঁত-রক্তের দাগ এঁকে দেয়।”
অরু চট্টোপাধ্যায়ের তিনটি কবিতা যেন না বলা কত কথা —
“যা কিছু পারিনি আমি, — তার কথা বলি, শব্দের রৌদ্রস্নানে শুদ্ধ হই রোজ।
যেটুকু পেরেছি। সেখানেই বোবা নিরন্তর।” (‘পারা না পারা’)
“প্রতিদিন শিখি।
সব শিশু নরম ভোরের বেলায় রোদ ভিক্ষা দেয়।
তাদের কাছেই নতজানু থাকি প্রতিদিন।” (‘শেখা’)
“দেয়ালে দেয়ালে শুধু দান ।
কেউ এসে মুছে দিলো; গোপন অভ্যাস। সবাই শুনুক। দেওয়ালও শুনুক।
এবার দেয়াল আকাশ দেখবে।” (‘এবং দেয়াল’)
‘দূরত্ব’ কবিতায় মানসী কবিরাজ লিখেছেন –
“সাঁকোর পাশে দাঁড়াই না
তোমাকে বড় কাছের মনে হয়
আসলে দূরত্বই
আমাদের জুড়ে দেয় রোজ।”

দর্পণ…মুখের খোঁজে’ পত্রিকার ‘অণুকবিতা, কবিতার পরমাণু’ সংখ্যার কভার পেজের ছবি।
এরকম অসংখ্য কবিতায় আধুনিক যুগযন্ত্রণা, হতাশা,ভালোবাসা, আশা- আকাঙ্ক্ষা, সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না উঠে
এসেছে। [ক্রমশ]