এরপর যে বিশেষ সংখ্যাটি আমার নজর কেড়েছে, তা হল ‘শিশু উৎসব’ সংখ্যা’, ২০১৫-র ডিসেম্বরে যার আত্মপ্রকাশ। ‘শিশু উৎসব’ আবার কী? দিনের পর দিন আধুনিক যুগ এসে মানুষকে তো বটেই এমনকি শিশুদেরও যান্ত্রিকতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বাবা-মা শিশুদের পিঠে বই-এর বোঝা চাপিয়ে প্রতিযোগিতার ইঁদুর দৌড়ে ঠেলে দিচ্ছে। তাদের শৈশব হচ্ছে বিপন্ন। এই বিপন্ন শৈশব নিয়েই তাদের বেড়ে ওঠা। এই সংখ্যা কেন? তার উত্তরও আছে সম্পাদকীয়তে। সম্পাদকের কথায় —
“আমরা ছুটছি আলোর গতিতে। ছুটতে ছুটতে কখন যে যন্ত্র হয়ে গেছি। যন্ত্রের মতোই বানিয়ে নিচ্ছি চারিপাশটাকে। এমনকি নিজেদের ইচ্ছেটাকেও চাপিয়ে দিচ্ছি সবুজ মনটার ওপর। আমাদের না পাওয়া ভূতগুলোকে শিশুদের স্কুলব্যাগে ভরে দিচ্ছি নিজের অজান্তেই। অথচ ভাবছি না ওই ভূতগুলো কীভাবে কেড়ে নিচ্ছে ওদের স্বাভাবিক ছন্দ।
শিশু তো কোনও যন্ত্র নয়, শিশু ভালোবাসে, “ভোর হল, দোর খোল” কিম্বা”…. তাদের খাড়া দুটো শিং”।সে তো শুধু হাসতে চায়; কখনও ভীমের কার্টুন, কখনও দাদুর শুকনো গালে কিম্বা টাকভর্তি মাথায় হাত বুলিয়ে।
জানি না কেন আমরা ওদের এই যান্ত্রিকতায় ঢুকিয়ে দিচ্ছি! কেনই বা সরিয়ে রাখছি ঠাকুরমার ঝুলি?কেনই বা ভাবছি না — ওরা কী চায়? কেনই বা সমগ্র বিশ্বকে বঞ্চিত করছি ওদের পবিত্র হাসি থেকে। রবি মামা — চাঁদ মামা তো ওদের খিল-খিল হাসিই দেখতে চায়। তবে কেন ওদের ছন্দে পা ফেলাটাকে বেঁধে রাখছি আমাদের দড়ির রিমোর্টে?
তাই ”দর্পণ…মুখের খোঁজে” পত্রিকার সমস্ত রসিক বুড়োরা একজোটে শিশুদের হাতে তুলে দিচ্ছি এ সংখ্যাটি। আমরা উপলব্ধি করেছি ওদের আর্তি-“মা গো আমায় ছুটি দিতে বল…”। আমাদের ১৩তম বর্ষের ৩৪তম সংখ্যাটি তাই সম্পূর্ণরূপে পবিত্র শিশুদের জন্যই।”
এ সংখ্যায় রয়েছে বিখ্যাত শিশু সাহিত্যিক ভবানীপ্রসাদ মজুমদারের সাক্ষাৎকার, রয়েছে শ্যামাপ্রসাদ ঘোষের কবিতা, জয়নাল আবেদিন, কৃষ্ণা বসু, চৈতন্য দাশ, জয়ব্রত বিশ্বাস, জীবানন্দ শীল, মৃনালকান্তি দাশ, কল্যাণ চট্টোপাধ্যায়, দেবজ্যোতি কর্মকারের কবিতা। তাছাড়াও রয়েছে কবি অপূর্ব দত্ত, অরু চট্টো পাধ্যায়, প্রমুখের প্রবন্ধ- যা আমাদের মন ভালো করে দেয়।
দুরন্ত স্বপ্নের পেছনে ছুটতে ছুটতে আমরা যেন আগের তুলনায় একটু বেশিই যান্ত্রিক হয়ে পড়েছি। শৈশবের সংজ্ঞাটাই যেন বদলে গিয়েছে। দুধের শিশুর পিঠে যখন দেখি ব্যাগভর্তি ভারি বই এর বোঝা, সময় নেই ঘুমোবার, ব্যস্ত প্রাইভেট টিউশনে। এরকম নানা কাজে আমরা তাদের প্রতিযোগিতার ইঁদুর দৌড়ে ঠেলে দিচ্ছি। জয় গোস্বামীর ‘টিউটোরিয়াল’ কবিতার গর্বিত বাবার মতোই আমরা অনেকেই চাই আমার সন্তান ক্লাসে ফার্স্ট হোক, ভালো নম্বর পাক। কিন্তু আমরা ভেবে দেখি না শিশু কী চায়, তার ইচ্ছা-অনিচ্ছা। এর ফলেই আজকের শিশু বিষণ্নতার শিকার। তাদের সেই জায়গা থেকে বের করে আনার প্রচেষ্টা করেছে “দর্পণ”। তারা মোবাইল ফোনের বদলে হাতে তুলে নিক ‘ঠাকুরমার ঝুলি’ কিম্বা ‘হ-য-ব-র-ল’ বা ‘পাগলা দাশু’। পড়াশোনার পাশাপাশি তাদের দৈহিক বা মানসিক বিকাশ হোক, পড়ার পাশাপাশি চলুক খেলাধূলা।এসব বিষয়ই উঠে এসেছে বিভিন্ন ছড়ায়। শিশুরাও হাতে তুলে নিয়েছে কলম, বাগিয়ে লিখেছে ছড়া, তাদের মনের ভাবনা।
জয়নাল আবেদিন তাঁর ‘ডাক দিয়েছে’ ছড়াতে লিখছেন —
“ডাক দিয়েছে গরম হাওয়া
বোঁচকা ঘামের গন্ধ
জ্বলজ্বলে রোদ তাকানো দায়
চোখ করে দেয় অন্ধ।
#
ডাক দিয়েছে ভরাট নদী
স্রোতরা ফণা তুলছে
আউশ ধানের লম্বা শিসে
এদিক ওদিক দুলছে।
#
ডাক দিয়েছে শীতের দুপুর
ব্যাট ও বলের ছন্দ
হাড়কাঁপানো ভোরের হাওয়া
খেজুর রসের গন্ধ।
#
ডাক দিয়েছে চাঁদ গলা রাত
পাতায় ঘেরা বনটি
দেখতে দেখতে এসব ছবি
হারিয়ে গেছে মনটি।”
অপূর্ব দত্তের ‘বাংলা-টাংলা ছড়ার ঢঙে স্মরজিৎ বিশ্বাস লিখছেন ”খুকুর মন’ —
“রেজাল্ট নিয়ে হাসি মুখে ফিরল বাড়ি বেলি/বাড়ির সবাই হামলে পড়ে দেখি কত পেলি?/ বাংলাতে বেশ দারুন খবর আছে সাতের ঘরে /অঙ্কে দেখি থমকে গেছিস সাতান্ন নম্বরে।”
এছাড়াও চৈতন্য দাশ রচিত ‘মন্ত্রী হতে চাই’ কবিতাতে দেখি —
“ভোলা ময়রার সাতটি ছেলে সবটি বেগড়বায়/পড়াশুনায় লবডঙ্কা শুধু করে খায় যায়/পড়তে বললে ঘুমিয়ে পড়ে/
লিখতে বললে কান্না ধরে/
ইস্কুল যাওয়ার নাম করলেই বলবে সবাই পালাই।”
এরকম একাধিক ছড়া/কবিতাতে উঠে এসেছে শিশুদের প্রসঙ্গ। শিশুরা স্বভাবতই কল্পনাপ্রবণ হয়। তাদের মন সর্বদায় কৌতুকপ্রিয় ও অনুকরণ প্রিয়। ছড়া এমনই এক লৌকিক উপাদান, যাতে শিশুমনের খুশি, আনন্দ, কল্পনার উপাদান লুকিয়ে থাকে।
“হাট্টিমাটিম টিম/তারা মাঠে পাড়ে ডিম, / তাদের খাড়া দুটো শিঙ/তারা হাট্টিমাটিম টিম।” — এটা শুনলেই তাদের মনে কল্পনা বাসা বাঁধে। হাট্টিমাটিম টিম নামক পাখিটির একটা কল্পিত চেহারা তাদের মনে আঁকা হয়ে যায়। তেমনি ছড়াগুলোও তাই। আর এই ছড়ার জগতে শিশুদের নিয়ে যাওয়া, তাদের ভাবানো — বোধ হয় এটাই এই সংখ্যা করার একটা কারণ। শেষে অপূর্ব দত্তের ‘বাংলা ছড়ায় ছন্দের ব্যবহার’ নিবন্ধটি যেন আমার মন কেড়ে নিল। অনেকেই জিজ্ঞেস করেন ছড়া আর কবিতার মধ্যে পার্থক্য কী? ছড়া বলতে অনেকে ছোটদের কবিতা ভাবেন, কিন্তু আসলে তা নয়। তাদের মৌলিক পার্থক্য বুঝতে পারবেন নিবন্ধটি পাঠ করলেই। শুধু তাই নয়, বাংলা ছড়াতে ছন্দের ব্যবহার নিয়ে রীতিমতো গবেষণাধর্মী এই লেখা পাঠকদের অনেক উপকারে আসবে। সবমিলিয়ে এত সুন্দর একটা সংখ্যা করতে বেশ পরিশ্রম করতে হয়েছে সম্পাদক সহ পত্রিকার অন্যান্য কর্ণধারদের তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

দর্পণ…মুখের খোঁজে’ পত্রিকার ‘শিশু উৎসব’ সংখ্যার কভার
এরপর আলোচনা হবে সর্বশেষ প্রকাশিত বিশেষ সংখ্যা ‘হাট’ সংখ্যা নিয়ে। ”দর্পণ…মুখের খোঁজে” সাহিত্য পত্রিকার সর্বশেষ প্রকাশিত জনপ্রিয় ও সর্বাধিক প্রশংসিত সংখ্যা ‘হাট’ সংখ্যা।পত্রিকাটির সম্পাদক কবি,প্রাবন্ধিক তথা শিক্ষক দেবজ্যোতি দা নিজে এসে সৌজন্য সংখ্যা তুলে দিলেন আমার হাতে।তারজন্য আমি তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ।এটি ২০ তম বর্ষ ও ৫০ তম বিশেষ সংখ্যা।প্রকাশ ডিসেম্বর, ২০২২। প্রথমেই মন ভালো করা একটা প্রচ্ছদ,যাতে বাংলার চিরায়ত হাটুরে জীবনের ছবি তুলে ধরা হয়েছে।প্রচ্ছদ শিল্পী বিশ্বভারতীর সুতনু চট্টোপাধ্যায়। সম্পাদকীয়তে সম্পাদক লিখছেন —
“…পঞ্চাশতম প্রকাশের মাইল ফলক স্পর্শ করার এই সংখ্যার বিষয় ভাবনা ‘হাট’।হাট নিয়ে কাজ করতে গিয়ে অনেকটাই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছি।
এ সংখ্যায় এমন কিছু বিষয় উঠে এলো যা শুধু বাংলা সাহিত্যেই নয়, গবেষণার ক্ষেত্রেও নতুন দিশা দেখাবে। বাংলা সাহিত্যে ‘হাট’ নিয়ে আলোচনা হয়েছে অসংখ্যবার। কবিতায়, গানে কিম্বা গল্প প্রবন্ধে ‘হাট’ প্রসঙ্গ এসেছে ঘুরে ফিরে। লিটল ম্যাগাজিনের একটি বৃহৎ আকারের সংখ্যাতেও হাট নিয়ে অসাধারণ কাজ হয়েছে। তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে আবারও ‘হাট’ নিয়ে সংখ্যা কেন?”
এর উত্তর সম্পাদক নিজেই দিয়েছেন সম্পাদকীয়র পরবর্তী স্তবকে —
“আসলে, আমরা অনুভব করেছি এখনও কিছু বাকি আছে। এর পরও বাকি থাকবে জানি। যে সব আলোচনা এখানে সংকলিত হল তা পূর্বে প্রায় হয়নি বললেই চলে। হাট নিয়ে যেমন তথ্য সমৃদ্ধ প্রবন্ধ আছে, তেমনই কিছু কবিতায় ‘হাট’ উঠে এসেছে একটি বৃহৎ আকাশের মতো। অপরিসীম এই ভাবনার স্রোত চিরকালীন গানের সুরটি বেঁধে নিলাম আমরা হাটের পসরা, হাটের রূপান্তর নতুন করে ভাবিয়েছে আমাদের। এটাও একটা কারণ। হাটের ভবিষ্যৎ কেমন হতে পারে সে চিন্তাও হয়েছে বারবার। সব মিলিয়ে অনিবার্যতার হাটের ভিড়ে প্রবেশ করার উদ্দেশ্যেই এ সংখ্যার ভাবনা।” [ক্রমশ]