গুপী চরিত্রে অভিনয় করে সিনেমার ইতিহাসে নিজের নামকে চিরকালের জন্য স্বর্ণাক্ষরে লিখে রেখে গেছেন তপেন চট্টোপাধ্যায়। চরিত্রটির তুমুল জনপ্রিয়তা তপেন বাবুর পিতৃদত্ত নামটিকেও ভুলিয়ে দেওয়ার উপক্রম ঘটিয়েছিল। তখন তিনি কারো কাছে গুপীদা, গুপীকাকু বা গুপীমামা। একবার তো মজা করে বললেই ফেললেন, কোনোদিন না নিজের ছেলেই তাকে “গুপীবাবা” বলে ডেকে বসে।
পেশায় অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়ার চাকুরি জীবন শুরু করেন রাজস্থানের বিকানীরে। দু-বছর পরই ফিরে আসেন কলকাতায়। ছোটো বয়স থেকেই ঝোঁক ছিল অভিনয়ে। অষ্টম শ্রেণীতে পড়ার সময় অচলায়তন নাটকে অভিনয় করে দর্শকের মনে দাগ কেটে গিয়েছিলেন। নাটকের জন্য সবসময় ডাক পড়ত তপেনের। পরে যোগ দেন শেখর চট্টোপাধ্যায়ের গ্রুপ থিয়েটারে।
রাজস্থান থেকে কলকাতায় ফিরে ‘সন্দেশ’ পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত হন তপেনবাবু। সেইসময় ‘গুপী গায়েন বাঘা বায়েন’ ছবির জন্য সত্যজিৎ রায় ‘ভিটেছাড়া গ্রাম্য গায়কের সারল্যভরা’ একটি মুখ খুঁজছিলেন। হঠাৎই একদিন তপেনবাবু আসেন সত্যজিৎ রায়ের বাড়িতে পত্রিকার বিজ্ঞাপণের কোন প্রয়োজনে। তাঁকে দেখেই রায়বাবু পেয়ে যান তাঁর ছবির গুপীকে। অমন সাধাসিধে ছেলের মুখ হয়ে ওঠে রায় বাবুর অটোম্যাটিক চয়েস।
১৯৬৮ সালে মুক্তি পায় ‘গুপী গায়েন বাঘা বায়েন’। শুধুমাত্র শিল্পের দিক থেকে নয়, বক্স অফিসে বিশাল সাফল্য অর্জন করে সিনেমাটি। ‘গুপী’ ও ‘বাঘা’ দুটি চরিত্র জনপ্রিয় হওয়া সত্ত্বেও গুপীর জনপ্রিয়তা ছিল কিঞ্চিৎ বেশি। তপেন বাবুর অভিনয় ছাড়াও এর কারণ ছিলো, তাঁর লিপে অনুপ ঘোষালের গাওয়া গানগুলি।

তপেনের গলার সঙ্গে খাপ খাবে বলে গায়কী বদলেছিলেন অনুপ ঘোষাল।
ব্যক্তি তপেন ছিলেন একজন আদ্যপান্ত দায়িত্ববান, আমুদে মানুষ। ঝেড়েবেছে সিনেমার চরিত্রে অভিনয় করতেন তাই জন্যই ফিল্মোগ্রাফিতে তাঁর ১৮টির বেশি ছবির নাম নেই।
গুপী গায়েন হয়েই তিনি আজীবন বাঙালির মননের সঙ্গে জড়িয়ে গেছেন। তবে পরবর্তীকালে গুপীর ছায়া থেকে বেরিয়ে এসে তিনি ‘ধন্যি মেয়ে’ ও ‘রূপসী’ ছবিতে এক্কেবারে চিরপরিচিত, ঘরোয়া কমেডি চরিত্রে অভিনয় করে একজন প্রকৃত শিল্পীর ভার্সেটেইলিটির সংজ্ঞাকেই তুলে ধরেছিলেন।
এমন গুণী অভিনেতা মহানগর, বিকেলে ভোরের ফুল, সঙ্গিনী, ‘ঠগিনী’, ‘গণদেবতা’-র মতো ছবিতে অভিনয় করেছেন চোখের পলকে হারিয়ে যাওয়া কিছু চরিত্রে। অবাক হতে হয় জানলে, “গুপী ট্রিলজি” ছাড়া তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্প অবলম্বনে “জটায়ু” ছবিতে তিনি নায়কের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন । অথচ সেই ছবির রিল, স্ক্রিপ্টের খাতা, বুকলেট, ছবির স্টিল …. সবকিছু পরিচালক নিজের হাতে নষ্ট করে দেন।
১৯৭৮ সালের ৮ ডিসেম্বর ছবিটি মিনার, বিজলী, ছবিঘরে মুক্তি পায়। দর্শকদের মিশ্র প্রতিক্রিয়ার মধ্যে কিছুদিন চলেছিলো ছবিটি। সিনেমার ভূমিকা লিপিতে ছিলেন রবি ঘোষ, চিন্ময় রায়, মিতা দেবরায়, অনামিকা সাহা প্রমুখ। কালীপদ সেনের সঙ্গীত পরিচালনায় গান গেয়েছিলেন অনুপ ঘোষাল, মান্না দে, সবিতাব্রত দত্ত প্রমুখ।
জটায়ু ছবিটির পরিচালনায় ‘উত্তরসূরী’ নামের আড়ালে ছিলেন অমল শূর এবং চিরঞ্জীব ভট্টাচার্য্য। প্রযোজক হিসেবে জোগাড় করা হলো ‘সঞ্চয়িতা চিট ফান্ডের’ এক নামজাদা এজেন্ট তপণ গুহকে। চিত্ররতন প্রোডাকশনের ব্যানারে, অমলবাবুর স্বরচিত চিত্রনাট্যে ছবিটির শ্যুটিং চলেছিলো ডায়মন্ড হারবার রোডের ভাসা গ্রাম ও টেকনিশিয়ান স্টুডিওতে।

কলকাতা দূরদর্শনে, আশির দশকের প্রথমার্ধে একবার মাত্র ছবিটি প্রদর্শিত হয়েছিলো। তারপর থেকে আর কোন হদিস পাওয়া যায়নি ছবিটির। তপন রায় সম্পাদিত ‘বিংশ শতকের বাংলা ছবি’ ক্যাটালগে এর নাম উল্লেখ আছে। কায়রো ফ্লিম ফেস্টিভ্যালে ছবিটি পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছিলো। কিন্তু প্রযোজক তপন গুহ সেইসময় ধর্মেন্দ্র-হেমামালিনি কে নিয়ে একটি হিন্দী ছবির প্রযোজনায় এমন ব্যস্ত হয়ে পড়েন যে, ফেস্টিভ্যালে যাওয়ার উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন। শোনা যায়, কায়রো ফ্লিম ফেস্টিভ্যাল থেকে একটি ছবিটি একটি মেরিট সর্টিফিকেট পেয়েছিলো।
যেহেতু প্রযোজক গুহ ছিলেন একজন চিট ফান্ডের বড়ো এজেন্ট, ফলত সঞ্চয়িতার টাকাতেই ছবিটি তৈরি করা হয়। এমনকি পরিচালকদ্বয় তাঁদের পরিশ্রমের অর্ধেক টাকা পেয়েছিলেন এবং বাকি অর্ধেক তাদের নামে সঞ্চয়িতাতে গচ্ছিত ছিলো। আশির দশকের শুরুতে এই পঞ্জি স্কিমটির কেলেঙ্কারির কথা জনসমক্ষে আসা, মালিক শম্ভু মুখার্জীর রহস্যময় মৃত্যু সবকিছু ওলটপালট করে দেয়।
কথায় বলে “বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা, আর পুলিশে ছুঁলে ছত্রিশ।” যার জন্যই ভীত অমলবাবু তাঁর কাছে গচ্ছিত জটায়ু সিনেমার সংক্রান্ত সমস্ত নথি নষ্ট করে ফেলেন। আজ আর তার কিছুই অবশিষ্ট নেই। পরবর্তীকালে যখন সঞ্চয়িতার স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তির নিলাম হয়, তখন জনৈক পরিবেশক প্রযোজক ভূপেন দত্ত স্বল্প মূল্যে ছবিটির একটি ১৬ এম এম প্রিন্ট পান। মূল নেগেটিভ তখন হারিয়ে গেছে। যাই হোক, ভূপেনবাবু সেই ১৬ এম এম প্রিন্টটিকে ব্লো-আপ করে একটি ৩৫ এম এম প্রিন্ট বানান।

ফ্লিমের যে সকল অংশগুলি নষ্ট হয়ে গেছিলো, সেগুলি অমলবাবুর সঙ্গে যোগাযোগ করে তপেন চ্যাটার্জীকে দিয়ে রি-শ্যুট করানোর সিদ্ধান্ত নেন ভূপেন বাবু। এর জন্য পুণের ফ্লিম আর্কাইভ থেকে ছবির চিত্রনাট্যের একটি কপিও নিয়ে আসেন। কিন্ত বিধি বাম। হঠাৎ করেই ভূপেন বাবুর ক্যান্সার রোগ ধরা পড়ে। ছবিটির রি-রিলিজের প্রক্রিয়া স্তব্ধ হয়ে যায়।
কোথাও যেন “সোনার ফসল ফলায় যে তার, দুই বেলা জোটে না আহার… হীরের খনির মজুর হয়েও কানা-কড়ি নাই, ও ভাই রে…” গানটি মিলে যায় তপেন চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয়ের ক্যারিয়ারে। শুধুমাত্র একটি চরিত্রে অভিনয় করেই বাংলার তামাম দর্শকের হৃদয়ে নিজের নামকে চিরকালের জন্য স্বর্ণাক্ষরে লিখে রেখে গেছেন ‘গুপী’ ওরফে তপেন চট্টোপাধ্যায়। আজ কিংবন্তি অভিনেতার জন্মদিনে জানাই আন্তরিক শ্রদ্ধা।।
কৃতজ্ঞতা স্বীকার : “অং Bong চং”-এর লেখক ইন্দ্রনীল মুখোপাধ্যায় এবং সম্পর্কিত বিভিন্ন ম্যাগাজিন।
বেশ ভালো হয়েছে লেখাটি।
অনেক ধন্যবাদ ????
অজানা তথ্য জানলাম।
থ্যাংক ইউ ❤️